নবী করীম (ﷺ)-এর শাফা‘আত
- মূল : ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-উক্বাইলী
-অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে এক দাওয়াতে ছিলাম। তাঁর সামনে কিছু গোশত আনা হল এবং তাঁর নিকট রানের গোশত পেশ করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড়ে খেলেন। এরপর বললন, আমি হব ক্বিয়ামতের দিন মানবজাতির নেতা। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? ক্বিয়ামতের দির আগের ও পরের সকল মানুষ এমন এক ময়দানে একত্রিত হবে, যেখানে একজন আহ্বানকারীর আহ্বান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর করবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে, যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন কিছু লোক বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আমাদের নিকট চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাঁকে বলবে, আপনি আবুল বাশার।[১]
আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে নিজ হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাকে হুকুম দিলে তাঁরা আপনাকে সিজদা করেছেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি। তখন আদম (আলাইহিস সালাম) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন, যার আগেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের নিকট যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নাফসী, নাফসী, নাফসী, (আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী) তোমরা অন্যের নিকট যাও, তোমরা নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট যাও।
তখন সকলে নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এসে বলবে, হে নূহ (আলাইহিস সালাম)! নিশ্চয়ই আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রথম রাসূল।[২] আর আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আমার রব আজ এত ভীষণ রাগান্বিত যে, আগেও এমন রাগান্বিত হননি আর পরেও কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমার একটি গ্রহণযোগ্য দু‘আ ছিল, যা আমি আমার সম্প্রদায়ের জন্য করে ফেলেছি, (এখন) নাফসী, নাফসী, নাফসী। তোমরা অন্যের নিকট যাও-যাও তোমরা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট।
তখন তারা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এসে বলবে, হে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)! আপনি আল্লাহর নবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহর বন্ধু। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি তাদের বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ রাগান্বিত, যার আগেও কোন দিন এরূপ রাগান্বিত হননি, আর পরেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা কথা বলে ফেলেছিলাম। বর্ণনাকারী আবূ হাইয়ান তাঁর বর্ণনায় এগুলো উল্লেখ করেছেন-(এখন) নাফসী, নাফসী, নাফসী। তোমরা অন্যের নিকট যাও-যাও তোমরা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট।
তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এসে বলবে, হে মূসা (আলাইহিস সালাম)! আপনি আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দিয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে সমস্ত মানবজাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আজ আমার রব ভীষণ রাগান্বিত আছেন, এরূপ রাগান্বিত আগেও হননি এবং পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এখন নাফসী, নাফসী, নাফসী। তোমরা অন্যের নিকট যাও-যাও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট।
তখন তারা ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এসে বলবে, হে ঈসা (আলাইহিস সালাম)! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং কালিমাহ[৩], যা তিনি মারিয়ম (আলাইহিস সালাম)-এর উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি ‘রূহ’[৪] আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন ঈসা (আলাইহিস সালাম) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত যে, এর আগে এত রাগান্বিত হননি এবং এর পরেও এরূপ রাগান্বি হবেন না। তিনি নিজের কোন গুনাহের কথা বলবেন না। নাফসী, নাফসী, নাফসী, তোমরা অন্য কারও নিকট যাও-যাও মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট।
তারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ তা‘আলা আপনার আগের, পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সিজদায় পড়ব। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি।
এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার মাথা ওঠান। আপনি যা চান, আপনাকে দেয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ কবূল করা হবে। এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ব্যতীত অন্যদের সঙ্গে অন্য দরজায়ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ! জান্নাতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা যেমন মক্কা ও হামীমের মধ্যবর্তী দূরত্ব অথবা মক্কা ও বছরার মাঝে দূরত্বের সমতুল্য।[৫]
শিক্ষণীয় বিষয়
১. আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব; কেননা নবী করীম (ﷺ) সমস্ত সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। কেননা রাসূলগণ, নবীগণ ও ফেরেশতাগণ, এরা সকলেই এই মহান মর্যাদা, অর্থাৎ শাফা‘আতের (সুপারিশের) স্থানটি পালন করতে অক্ষম, শুধুমাত্র তিনি (ﷺ) ব্যতীত। তিনি (ﷺ) প্রত্যেক ফেরেশতা, প্রত্যেক নবী এবং প্রত্যেক সৃষ্টির চেয়ে উত্তম।
২. মানুষের জন্য বৈধ যে, সে আল্লাহর নে‘মতের কথা প্রকাশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ ‘অতঃপর আপনি আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করুন’ (সূরা আয-যুহা : ১১)।
অতএব আল্লাহর নে‘মত ও অনুগ্রহ প্রকাশ করা আদম সন্তানের জন্য আল্লাহর একটি আদেশ এবং এটি আল্লাহর অসংখ্য নে‘মতের উপর শুকরিয়া প্রকাশের একটি রূপ। নে‘মতের কথা প্রকাশ করা হয় সবসময় অন্তরে ও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করার মাধ্যমে এবং এটিকে দাতা (তথা আল্লাহ তা‘আলা)-এর দিকে সমর্পণ করার মাধ্যমে। যিনি একক, যার কোন শরীক নেই। আবার এটি প্রকাশ করার মাধ্যমেও হয় এবং এ বিষয়ে কথা বলা হয় মুখে ও কর্মে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে।
একটি আছারে এসেছে, قَيِّدُوا النِّعْمَةَ بِالشُّكْرِ ‘নে‘মতকে শুকরিয়ার মাধ্যমে বেঁধে রাখ’। এটি মূলত আল্লাহর নির্দেশের অনুসরণ। তিনি বলেন, ‘অতঃপর আপনি আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করুন’ (সূরা আয-যুহা : ১১)।
৩. ক্বিয়ামতের দিনই হবে সেই সময় যখন নবী করীম (ﷺ)-এর নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সবার নিকট, প্রথম থেকে শেষ মানুষ পর্যন্ত, কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রকাশিত হবে। হাদীছে এসেছে, أَنَا سَيِّدُ النَّاسِ يَوْمَ القِيَامَةِ ‘আমি হব ক্বিয়ামতের দিন মানবজাতির নেতা’।[৬]
৪. প্রশ্নকারী ব্যক্তির উচিত যে, সে যখন কোন দায়িত্বশীল বা অভিভাবকের নিকট প্রশ্ন করবে তখন প্রথমে প্রশংসা পেশ করবে, যাতে সে উত্তর দেয়। সুতরাং যখন মানুষ আল্লাহর নিকট দু‘আ করবে তখন প্রথমে তার রবের প্রশংসা করবে, সরাসরি তাড়াহুড়া করে বলবে না, ‘আমাকে দাও’। বরং প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করবে, তারপর দু‘আ করবে। আর সে উত্তম সময়, উত্তম স্থান ও উত্তম ভঙ্গিমা বেছে নিয়ে তারপর দু‘আ করবে।
৫. অদৃশ্যের প্রতি ঈমান এবং পুনরুত্থানকে সাব্যস্ত। অদেৃশ্যের প্রতি ঈমান আনা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমানের চাবিকাঠি এবং যা রাসূলগণ সংবাদ দিয়েছেন তার প্রতি ঈমানের মূল। আর যে ব্যক্তি অদৃশ্যকে অস্বীকার করে, তার মধ্যে কোন সক্ষমতা নেই যে, সে রাসূলগণের সংবাদকে সত্য বলবে এবং আসমানী কিতাবসমূহে যা নাযিল হয়েছে তাকে মানবে; কেননা এগুলোর প্রতি ঈমানের ভিত্তিই হলো অদৃশ্যের প্রতি ঈমান। আর যতই অদৃশ্যের প্রতি ঈমান দৃঢ় হবে, ততই আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান এবং তাঁর নিকট থেকে যা এসেছে তার প্রতি ঈমান বান্দার অন্তরে শক্তিশালী ও দৃঢ় হবে।
৬. নবী করীম (ﷺ)-এর শাফা‘আতের প্রমাণ এবং যে তিনি সকলের আগে কবর থেকে পুনরুত্থিত হবেন ও বের হবেন ও প্রথম শাফা‘আতকারী হবেন; সুতরাং কেউ তাঁর আগে অগ্রসর হবে না। ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ফাতাওয়া গ্রন্থে বলেন, ‘নবী করীম (ﷺ)-এর তিনটি বিশেষ শাফা‘আত রয়েছে’।
প্রথম শাফা‘আত : মহাশাফা‘আত যা ক্বিয়ামতের দিন মাঠে উপস্থিত মানুষের জন্য হবে। তিনি তাদের জন্য শাফা‘আত করবেন, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে ফায়ছালা সম্পন্ন হয়। আর এটাই হল ‘মাক্বামে মাহমুদ’। যার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودً ‘আর আপনি রাত্রির কিছু অংশে (শেষ রাতে) তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত। অবশ্যই আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে উঠাবেন’ (সূরা আল-ইসরা : ৭৯)। এটাই সেই মাক্বামে মাহমুদ যা আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন তাঁকে দান করবেন। অর্থাৎ তিনি (ﷺ) ক্বিয়ামতের মাঠে উপস্থিত লোকদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট শাফা‘আত করবেন, যাতে আল্লাহ তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেন। এরপর প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা যা তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন তার দিকে চলে যাবে।
দ্বিতীয় শাফা‘আত : জান্নাতবাসীদের জন্য শাফা‘আত, যাতে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। কেননা নবী করীম (ﷺ)-এর শাফা‘আত ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তিনি তাঁর রবের নিকট শাফা‘আত করবেন, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি প্রদান করা হবে।
তৃতীয় শাফা‘আত : বিশেষভাবে তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের জন্য। নবী করীম (ﷺ) তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের জন্য শাফা‘আত করবেন, যেন তাঁর উপর থেকে (আযাব) হালকা করা হয়। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, তিনি (আবূ ত্বালিবকে) আগুনের গভীরে পেয়েছেন, তারপর তার জন্য শাফা‘আত করেছেন, অবশেষে সে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আগুনে আছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর চাচা আবূ ত্বালিবের জন্য কেবল হালকা করার শাফা‘আত করেছেন। এটাই হল আলেমগণ ও গবেষকদের সিদ্ধান্ত যে, তিনি কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। নবী করীম (ﷺ) তাঁর মৃত্যুর সময় চেয়েছিলেন যে, তিনি لا إله إلا الله বলুক, কিন্তু তিনি অস্বীকার করেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘আমি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর আছি’। অতএব তিনি আল্লাহর সাথে কুফরীর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন।
অতএব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর জন্য শাফা‘আত করেছেন যে, সে যেন আগুনের পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত থাকে, এর কারণ হলো, তিনি নবী করীম (ﷺ)-কে সাহায্য করেছেন, কষ্ট করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে রক্ষা করেছেন। এ কারণেই নবী করীম (ﷺ) খুব চেষ্টা করেছিলেন যেন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁর ইসলাম নির্ধারিত হয়নি। ফলে এটা প্রমাণকারী নিদর্শন হয়ে দাঁড়ালো যে, নবী করীম (ﷺ) কারও হেদায়াত দেওয়ার মালিক নন; হেদায়াত তো আল্লাহ তা‘আলার হাতে। তিনি যাকে চান হেদায়াত দেন। এ কারণেই যখন তাঁর চাচা আবূ ত্বালিব কুফরীর উপর মৃত্যুবরণ করলেন, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ব্যাপারে নাযিল করলেন, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ‘নিশ্চয়ই আপনি হেদায়াত করতে পারেন না, যাকে আপনি ভালোবাসেন। বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে হেদায়াত করে থাকেন’ (সূরা আল-ক্বাছাছ : ৫৬)। তিনি আরো বলেন, لَيْسَ عَلَيْكَ هُدَاهُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ‘তাদেরকে হেদায়াত করার দায়িত্ব আপনার নয়। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়াত দান করেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭২)।
অতএব তাঁর জন্য শাফা‘আত করা হয়েছে যে, তিনি আগুনের পায়ের গোড়ালির অংশে থাকবেন, যেখান থেকে তাঁর মগজ ফুটতে থাকবে, আমরা আল্লাহর নিকট আযাব থেকে নিরাপত্তা চাই। নিশ্চয়ই নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, أهون الناس عذابا يوم القيامة أبو طالب فإنه فِي ضحضاح مِنَ النار يغلي منه دماغه ‘ক্বিয়ামতের দিন সবচেয়ে হালকা আযাবপ্রাপ্ত হবে আবূ ত্বালিব। সে আগুনের অগভীর অংশে থাকবে, যেখান থেকে তার মগজ ফুটবে’।[৭] অন্য বর্ণনায় রয়েছে,
إن أهون أهل النار عذابا يَوْمَ القيامة من يكون له نعلان من نار يغلي مِنْهُ دماغه وهو يرى أنه أشد الناس عذابا وهو أهونهم عذابا
‘ক্বিয়ামতের দিন জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা আযাবপ্রাপ্ত সেই ব্যক্তি, যার জন্য থাকবে আগুনের দু’টি জুতা, সেগুলো থেকে তার মগজ ফুটবে। আর সে মনে করবে যে, সে সবচেয়ে কঠিন আযাবে আছে, অথচ সেই সবচেয়ে হালকা আযাবে থাকবে শেষ পর্যন্ত’।[৮]
৭. কিছু আমল, যার মাধ্যমে মুসলিম শাফা‘আত লাভ করবে। প্রথমতঃ বলা, لا إله إلا الله ‘অন্তর থেকে খাঁটিভাবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান আনা এমন একটি বিষয়, যার মাধ্যমে মুসলিম শাফা‘আত লাভ করবে। ছহীহ বুখারীতে এসেছে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ القِيَامَةِ؟ فَقَالَ لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لاَ يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الحَدِيثِ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ القِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قِبَلِ نَفْسِهِ
‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! ক্বিয়ামতের দিন আপনার শাফা‘আত দ্বারা সমস্ত মানুষ থেকে অধিক ভাগ্যবান হবেন কোন্ ব্যক্তি? তখন তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! আমি ধারণা করেছিলাম যে, তোমার পূর্বে কেউ এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। কারণ হাদীছের প্রতি তোমার চেয়ে বেশি আগ্রহী আমি আর কাউকে দেখিনি। ক্বিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত দ্বারা সবচেয়ে ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি হবে, যে বিশুদ্ধ অন্তর থেকে বলে لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ’।[৯]
অতএব তোমার ঈমান যতটুকু হবে, তোমার শাফা‘আতের অংশও ততটুকু হবে। আর যত বেশি তোমার ঈমান বৃদ্ধি পাবে, তত বেশি হবে তোমার শাফা‘আতের অংশ নবী করীম (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে।
দ্বিতীয়তঃ আযানের জবাবে মুয়াযযিনের সাথে পুনরাবৃত্তি করা, তারপর নবী করীম (ﷺ)-এর জন্য ‘অসীলা’ প্রার্থনা করা। জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ য বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ اللهم رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلاَةِ القَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الوَسِيلَةَ وَالفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ القِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি আযান শুনে বলে- اللهم رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ ...‘হে আল্লাহ! (তাওহীদের) এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিত ছালাতের আপনিই প্রভু। মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আপনি দান করুন ‘অসীলা’ (নামক জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান) ও মর্যাদা এবং পৌঁছে দিন তাঁকে (শাফা‘আতের) প্রশংসিত স্থান ‘মাক্বামে মাহমূদে’ যার ওয়াদা আপনি তাঁকে দিয়েছেন’। ক্বিয়ামতের দিন সে আমার শাফা‘আত লাভের অধিকারী হবে’।[১০]
তৃতীয়তঃ মদীনাতুন নববীতে বসসবাস করা। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, لَا يَصْبِرُ أَحَدٌ عَلَى لَأْوَائِهَا فَيَمُوتَ إِلَّا كُنْتُ لَهُ شَفِيعًا أَوْ شَهِيدًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا كَانَ مُسْلِمًا ‘যে ব্যক্তি এখানকার (মদীনার) কষ্ট সহ্য করে মৃত্যুবরণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন অবশ্যই আমি তার জন্য শাফা‘আত করব অথবা সাক্ষী হব, যদি সে মুসলিম হয়ে থাকে’।[১১] এখানে اللأواء দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ‘এর অধিবাসীদের উপর আসা কষ্ট, তীব্র গরম, শীত, আর জীবিকার সংকীর্ণতা’।
চতুর্থতঃ নফল ছালাত অধিক পরিমাণে আদায় করা। হাদীছে এসেছে, যা আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) ও অন্যরা ছহীহ বলেছেন, নবী করীম (ﷺ) খিদমতকারীকে বলতেন,
ألك حاجة؟ قال حتى كان ذات يوم فقال يا رسول الله ! حاجتي قال وما حاجتك؟ قال حاجتي أن تشفع لي يوم القيامة قال ومن دلك على هذا؟ قال ربي قال أما لا فأعني بكثرة السجود.
‘তোমার কি কোন প্রয়োজন আছে? যতক্ষণ না একদিন সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার একটি প্রয়োজন আছে। নবী করীম (ﷺ) বললেন, তোমার প্রয়োজন কী? সে বলল, আমার প্রয়োজন হলো, ক্বিয়ামতের দিন আপনি আমার জন্য শাফা‘আত করুন। তিনি (ﷺ) বললেন, এটা তোমাকে কে শিখিয়েছে? সে বলল, আমার রব। তিনি (ﷺ) বললেন, যদি তাই হয়, তবে আমাকে অধিক সিজদার মাধ্যমে সাহায্য কর’।[১২] অতএব যে ব্যক্তি ফরয ছালাতগুলোতে গাফেল হয়, সে নবী করীম (ﷺ)-এর শাফা‘আত লাভ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে।
আর এমন কিছু আমল আছে, যা বান্দাকে ক্বিয়ামতের দিন কারো জন্য শাফা‘আতকারী হওয়া থেকে বঞ্চিত করে। এর মধ্যে একটি হল, অত্যধিক অভিশাপ দেওয়া। আবূ দারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, لَا يَكُونُ اللَّعَّانُونَ شُفَعَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‘অভিশাপকারীরা ক্বিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী কিংবা সাক্ষ্যদাতা হতে পারবে না’।[১৩]
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র:
[১]. ‘আবুল বাশার’ অর্থ মানব জাতির পিতা।
[২]. প্রথম নবী হচ্ছেন আদম (আলাইহিস সালাম) আর প্রথম রাসূল হচ্ছেন নূহ (আলাইহিস সালাম)।
[৩]. ‘কালিমাহ’-এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, كُنْ শব্দ। যেহেতু এ শব্দটি বলার সঙ্গে সঙ্গে ঈসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর কুদরতে মাতৃগর্ভে আসেন। তাই তাকে ‘তাঁর কালিমাহ’ (আল্লাহর কালিমাহ) বলা হয়।
[৪]. যেহেতু আল্লাহর নির্দেশে তাঁর মাতৃগর্ভে এসেছিলেন সেহেতু তাঁকে রুহুল্লাহ বলা হয়।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭১২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৪।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭১২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৪।
[৭]. মুসতাদরাক হাকিম, হা/৮৭৩৫।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫৬১, ৬৫৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৩; মুসতাদরাক হাকিম, হা/৮৭২৯।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫৭০; মিশকাত, হা/৫৫৭৪।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৪; মিশকাত, হা/৬৫৯।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৭৪।
[১২]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২১০২।
[১৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯৮; আবূ দাঊদ, হা/৪৯০৭।