শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০৪ অপরাহ্ন

হাজেরা এবং তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)

- মূল: ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-ঊক্বাইলী
- অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*



ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর মায়ের নিকট থেকে। হাজেরা (আলাইহিস সালাম) কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ (আলাইহিস সালাম) থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। অতঃপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) হাজেরা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর শিশু ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাজেরা (আলাইহিস সালাম) শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা‘বা ঘর অবস্থিত, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নিচে তাঁদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোন মানুষ, না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাঁদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর এ ছাড়া তিনি তাঁদের নিকট রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি।

অতঃপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর মা পিছু পিছু আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইবরাহীম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী আর না আছে কোন ব্যবস্থা। তিনি এ কথা তাঁকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর দিকে তাকালেন না। তখন হাজেরা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে বললেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। হাজেরা (আলাইহিস সালাম) বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-ও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাঁকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তখন তিনি কা‘বা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি দু’হাত তুলে এ দু‘আ করলেন আর বললেন, 

رَبَّنَاۤ اِنِّيْۤ اَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِيْ بِوَادٍ غَيْرِ ذِيْ زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ١ۙ رَبَّنَا لِيُقِيْمُوا الصَّلٰوةَ فَاجْعَلْ اَفْىِٕدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِيْۤ اِلَيْهِمْ وَ ارْزُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرٰتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ.

‘হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে, তারা যেন ছালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফল-ফলাদি দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করুন, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে’ (সূরা ইবরাহীম: ৩৭)। আর ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে স্বীয় স্তনের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তাঁর শিশু পুত্রটি তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তাঁর বুক ধড়পড় করছে অথবা বর্ণনাকারী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটপট করছে।
শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ‘ছাফা’-কে একমাত্র তার নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি তার উপর উঠে দাঁড়ালেন এবং ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোথাও কাউকে দেখা যায় কি না? কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন ‘ছাফা’ পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমনকি যখন তিনি নিচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মত ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ‘মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তার উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কিনা? কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।


ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী করীম (ﷺ) বললেন, এজন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সাঈ করে থাকে। অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। যদি তোমার নিকট কোন সাহায্যকারী থাকে। হঠাৎ যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে তিনি একজন ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন অথবা তিনি বলেছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। তখন হাজেরা (আলাইহিস সালাম)-এর চার পাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে একটি হাউজের মত করে দিলেন এবং হাতের কোষ ভরে তাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তখনো পানি উপচে উঠছিল।

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী করীম (আলাইহিস সালাম) বলেছেন, ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে যমযমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা বলেছেন, যদি কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম একটি কূপ না হয়ে একটি প্রবাহমান ঝর্ণায় পরিণত হত। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর হাজেরা (আলাইহিস সালাম) পানি পান করলেন, আর শিশু পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাঁকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোন আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তাঁর পিতা দু’জন মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। ঐ সময় আল্লাহ্র ঘরের স্থানটি যমীন থেকে ঢিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল।

অতঃপর হাজেরা (আলাইহিস সালাম) এভাবেই দিন যাপন করছিলেন। অবশেষে জুমহুর গোত্রের একদল লোক তাঁদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা বর্ণনাকারী বলেন, জুমহুর পরিবারের কিছু লোকা কাদা নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কায় নিচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে তারা সকলেই সেদিকে অগ্রসর হল। বর্ণনাকারী বলেন, ইসমাঈল ও তাঁর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ, বলে তাদের মত প্রকাশ করল।

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী করীম (আলাইহিস সালাম) বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদেরও সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল। আর ইসমাঈলও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌঁছে তিনি তাদের নিকট অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাজেরা (আলাইহিস সালাম) মৃত্যুবরণ করেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি পুত্রবধুকে তাঁদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, সে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি।

সে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ি আসলে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের চৌকাট পরিবর্তন বা বদলিয়ে ফেলে। অতঃপর যখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বাড়ি আসলেন, তখন তিনি যেন কিছুটা আভাস পেলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নিকট কেউ কি এসেছিল। স্ত্রী বলল, হ্যাঁ। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি তোমাকে কোন নছীহত করেছেন? তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে সালাম পৌঁছাই এবং তিনি আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাট পরিবর্তন বা বদল করেন। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। অতএব তুমি তোমার আপনজনদের নিকট চলে যাও। এ কথা বলে, ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) তাকে ত্বালাক্ব দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অন্য একটি ময়েকে বিবাহ করলেন।

অতঃপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ তা‘আলা যতদিন চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার দেখতে আসলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর দেখা পেলেন না। তিনি পুত্রবধূর নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। সে বলল, তিনি আমাদের খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাঁদের জীবন যাপন  ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। আর সে আল্লাহ্র প্রশংসাও করল। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের প্রধান খাদ্য কী? সে বলল, গোশত। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কী? সে বলল, পানি। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) দু‘আ করলেন, হে আল্লাহ! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। নবী করীম (আলাইহিস সালাম) বলেন, ঐ সময় তাঁদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হত না। যদি হত তাহলে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সে বিষয়েও তাদের জন্য দু‘আ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা বতীত অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা, শুধু গোশত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হতে পারে না।

ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, যখন তোমার স্বামী ফিরে আসবে, তখন তাঁকে সালাম বলবে, আর তাঁকে আমার পক্ষ থেকে আদেশ করবে যে, সে যেন তাঁর ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখে। অতঃপর ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমার নিকট কেউ এসেছিল কি? সে বলল, হ্যাঁ। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোন কিছুর জন্য আদেশ করেছেন? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাট ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইনি আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাট। এ কথার দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি। অতঃপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) এদের থেকে দূরে রইলেন, যতদিন আল্লাহ চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার আসলেন। (দেখতে পেলেন) যমযম কূপের নিকটস্থ একটি বিরাট বৃক্ষের নিচে বসে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁর একটি তীর মেরামত করছেন। যখন তিনি তাঁর পিতাকে দেখতে পেলেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন।

অতঃপর একজন পিতা-ছেলের সঙ্গে, একজন ছেলে-পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ তোমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আপনার রব! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, তুমি আমার সাহায্য করবে কি?  ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি আপনার সাহায্য করব। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বললেন, আল্লাহ তোমাকে এখানে একটি ঘর নির্মাণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি উঁচু ঢিলাটির দিকে ইশারা করলেন যে, এর চার পাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি তাঁরা উভয়ে কা‘বা ঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) (মাক্বামে ইবরাহীম নামে খ্যাত) পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তাঁরা উভয়ে এ দু‘আ করতে থাকলেন,

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا١ؕ اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

‘হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবুল করে নিন। নিশ্চয় আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১২৭)। তাঁরা উভয়ে আবার কা‘বা ঘর তৈরি করতে থাকেন এবং কা‘বা ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে এ দু‘আ করতে থাকেন,

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا١ؕ اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

‘হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবুল করে নিন। নিশ্চয় আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১২৭)।[১]

শিক্ষনীয় বিষয়

১. একজন মুমিন আল্লাহ তা‘আলার আদেশের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে এবং তাঁর আনুগত্য ও ভালোবাসাকে সব কিছুর উপর অগ্রাধিকার দেয়, এমনকি যদি তা হয় সৎ [নেককার] স্ত্রী বা একমাত্র সন্তান। যেমনটি করেছিলেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)। আমাদের জন্য নবীদের জীবনীতে রয়েছে উত্তম আদর্শ।

২. হাজেরা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর দ্বিতীয় স্ত্রী, একজন মুমিনা, ধৈর্যশীলা ও ছওয়াবের প্রত্যাশী নারী। তাঁর কঠিন ও অনুপ্রেরণাদায়ক জীবনের মাধ্যমে তিনি মুসলিম নারীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে উঠেছেন। তাঁর মহান ধৈর্য ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সুতরাং ইতিহাসের উচিত তাঁকে সংরক্ষণ করা...তাঁর স্মৃতিকে কুরআন, সুন্নাহ এবং ইতিহাসে সংরক্ষিত রাখা উচিত... এবং তিনি মায়েদের জন্য এক আদর্শ হয়ে থাকাটা ও শিক্ষাদানে ও দায়িত্ব পালনে আদর্শ তাঁর প্রাপ্য।

৩. একজন সৎ (নেককার) নারী আল্লাহর আদেশের সাড়া দেয়, তাঁর উপর ভরসা করে এবং স্বামীকে আল্লাহর আনুগত্যে সহায়তা করে। হাজেরা (আলাইহিস সালাম), এই ঈমানদার স্ত্রী, তাঁর স্বামী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এ আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? এই প্রশ্নের মাধ্যমে আমরা এই মহীয়সী নারীর গভীর আক্বীদা ও বিশ্বাস অনুভব করতে পারি। এতে দেখা যায়, কিভাবে ঈমান তাঁর অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। তিনি আল্লাহ ব্যতীত আর কার উপর নির্ভর করতে চাননি এবং একমাত্র তাঁরই উপর ভরসা করেছেন। আর যিনি আল্লাহর উপর ভরসা করেন, তার জন্য এটাই যথেষ্ট যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّ اللّٰهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِيْنَ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর উপর ভরসাকারীগণকে ভালোবাসেন’ (সূরা আলে-ইমরান: ১৫৯)।

৪. আল্লাহ তাঁর বন্ধুদের (আউলিয়াগণ) হেফাযত করেন এবং তাদের দেখাশুনা করেন। তিনি কোন সৎ কাজের প্রতিদান নষ্ট করেন না। সুতরাং যখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আলাইহিস সালাম) ও পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে মক্কায় রেখে গেলেন, তখন আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং তাঁদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং তাঁদের জন্য বরকতময় যমযমকূপ জারি করলেন। যার পানি আজও মানুষ পান করছে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা জুরহুম গোত্রের লোকদের তাদের কাছে পাঠালেন যাতে তারা তাদের সঙ্গ দেয় এবং একাকীত্ব দূর হয়। তেমনি একজন মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহর সাথে থাকে, ফলে আল্লাহ তা‘আলাও তার সাথে থাকেন। আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন, হেফাযত করেন এবং বিজয় দান করেন। কারণ প্রতিদান কর্মেরই অনুরূপ হয়ে থাকে।

  • হে সেই ব্যক্তি! যে দুঃখ ও হতাশায় কাতর। আল্লাহর সাথে থাক। জেনে রাখ! আল্লাহ কখনও তোমাকে ব্যথিত করবেন না।
  • হে সেই ব্যক্তি! যে ঋণের ভার ও অভাবের কষ্টে ভুগছে। আল্লাহর সাথে থাক। জেনে রাখ! আল্লাহ কখনও তোমাকে ব্যথিত করবেন না।
  • হে সেই ব্যক্তি! যার জন্য পৃথিবী বিস্তৃত  হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ মনে হচ্ছে। অতএব আল্লাহর সাথে থাক। জেনে রাখ! আল্লাহ কখনও তোমাকে ব্যথিত করবেন না।
৫. অভাব-অনটনের কারণে অস্থিরতা ও অতৃপ্তি প্রকাশ করা সৎ ব্যক্তিদের আচরণ নয়।

প্রফেসর রিফাঈ ‘বাইতুদ দাওয়াহ’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘ভালোবাসা থাকলে তৃপ্তিও আসে। স্ত্রী যখন স্বামীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং জীবন-যাপন নিয়ে তুষ্ট থাকে, তখন এই সন্তুষ্টি সংসার রক্ষার জন্য একটি পূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। আর যদি সে অসন্তুষ্ট থাকে, তবে সে নিজ হাতে নিজের ঘর ভেঙ্গে ফেলবে’। তাই আমরা দেখি, যখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে দেখতে এলেন এবং দেখলেন সে বিবাহ করেছে, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীর নিকট তাদের অবস্থা জানতে চাইলেন। সে [ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রী)] জানালো যে অবস্থা খুবই সংকীর্ণ। তখন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বুঝলেন যে, সে অসন্তুষ্ট, তাই তিনি বললেন, ‘যখন ইসমাঈল আসবে, তখন তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে যেন সে তার দরজার চৌকাঠ বদলে দেয়’। ইসমাঈল ফিরে এলে স্ত্রী সব কথা জানালো। তখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘তুমি সেই চৌকাঠ, তুমি তোমার বাবার বাড়ি ফিরে যাও। অতঃপর তিনি তাকে ত্বালাক্ব দেন।

৬. সুন্দর শিক্ষা ও নৈতিকতা সন্তানদের ভালো চরিত্র গঠনে বিশাল প্রভাব রাখে। আল্লাহ তা‘আর তাওফীকের পর। এটা আমরা দেখতে পাই, যখন ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতার আদেশের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আনুগত্য প্রকাশ করেন।


* পরিচালক, দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৬৪ ‘আম্বিয়া (আলাইহিস সালাম)’ অধ্যায়।




প্রসঙ্গসমূহ »: শিক্ষণীয় ঘটনা
কা‘ব ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তাওবাহ - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ১০ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
আত্মত্যাগের নযীরবিহীন ঘটনা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
মাযলূমের বদদু‘আ ও তোমার সাক্ষ্যের ভিত্তি কী? - আল-ইখলাছ ডেস্ক
যাদুকর ও যুবক - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১১তম পর্ব) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
যিনাকারীর পরিণাম - আবূ মাহী
আবূ সুফিয়ান ও হিরাক্লিয়াস - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৯ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ - মুহাম্মাদ জাহিদুল ইসলাম
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ