শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০৪ অপরাহ্ন

যাদুকর ও যুবক 

- মূল: ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-ঊক্বাইলী 
- অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন* 



ছুহায়ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে এক বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক যাদুকর। বার্ধক্যে পৌঁছে সে বাদশাহকে বলল, আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরা একজন বালককে আপনি আমার নিকট প্রেরণ করুন, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব। অতঃপর যাদুবিদ্যা শিক্ষা দেয়ার জন্য বাদশাহ তার নিকট এক বালককে প্রেরণ করল।

বালকের যাত্রা পথে ছিল এক ধর্মযাজক। বালক তার নিকট বসল এবং কথা শুনল। তার কথা বালকের পসন্দ হলো। তারপর বালক যাদুকরের নিকট যাত্রাকালে সর্বদাই ধর্মযাজকের নিকট যেত এবং তার নিকট বসত। তারপর সে যখন যাদুকরের নিকট যেত তখন সে তাকে মারধর করত। ফলে যাদুকরের ব্যাপারে সে ধর্মযাজকের নিকট অভিযোগ করল। তখন ধর্মযাজক বলল, তোমার যদি যাদুকরের ব্যাপারে ভয় হয় তবে বলবে, আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে আসতে দেয়নি। আর যদি তুমি তোমার গৃহকর্তার ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ কর তবে বলবে, যাদুকর আমাকে বিলম্বে ছুটি দিয়েছে।

এমনিভাবে চলতে থাকাবস্থায় একদিন হঠাৎ সে একটি ভয়ানক হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হলো, যা লোকেদের পথ আটকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থা দেখে সে বলল, আজই জানতে পারব, যাদুকর উত্তম না ধর্মযাজক উত্তম। অতঃপর একটি পাথর হাতে নিয়ে সে বলল,

اللهم إِنْ كَانَ أَمْرُ الرَّاهِبِ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ أَمْرِ السَّاحِرِ فَاقْتُلْ هَذِهِ الدَّابَّةَ حَتَّى يَمْضِيَ النَّاسُ

‘হে আল্লাহ! যদি যাদুকরের চাইতে ধর্মযাজক আপনার নিকট পসন্দনীয় হয়, তবে এ পাথরাঘাতে এ হিংস্র প্রাণীটি নিঃশেষ করে দিন, যেন লোকজন চলাচল করতে পারে। অতঃপর সে সেটার প্রতি পাথর ছুড়ে দিল এবং সেটাকে মেরে ফেলল। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত শুরু করল। এরপর সে ধর্মযাজকের নিকট এসে তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা বলল। ধর্মযাজক বলল, أَيْ بُنَيَّ أَنْتَ الْيَوْمَ أَفْضَلُ مِنِّ ‘হে বৎস! আজ তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ’। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে শীঘ্রই তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি পরীক্ষার মুখোমুখি হও তবে আমার কথা গোপন রাখবে।

এদিকে বালক আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করতে লাগল এবং লোকেদের সমুদয় রোগ-ব্যাধির নিরাময় করতে লাগল। বাদশাহর পরিষদবর্গের এক লোক অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার সংবাদ সে শুনতে পেয়ে বহু হাদিয়া ও উপটৌকন নিয়ে তার নিকট আসল এবং তাকে বলল, তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পার তবে এসব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দিব। এ কথা শুনে যুবক বলল, আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দেন আল্লাহ তা‘আলা। তুমি যদি আল্লাহর উপর ঈমান আনো তবে আমি আল্লাহর নিকট দু‘আ করব, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। তারপর সে আল্লাহর উপর ঈমান আনল। আল্লাহ তা‘আলা তাকে রোগ মুক্ত করে দিলেন। এরপর সে বাদশাহর নিকট (কাছে) এসে অন্যান্য দিনের ন্যায় এবারও বসল। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞাসা করল, কে তোমার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে? সে বলল, আমার পালনকর্তা। এ কথা শুনে বাদশাহ তাকে আবার জিজ্ঞাসা করল, আমি ছাড়া তোমার অন্য কোন পালনকর্তাও আছে কি? সে বলল, رَبِّي وَرَبُّكَ اللهُ ‘আমার ও আপনার সকলের প্রতিপালকই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন’।

অতঃপর বাদশাহ তাকে পাকড়াও করে অবিরতভাবে শাস্তি দিতে লাগল, অবশেষে সে ঐ বালকের অনুসন্ধান দিল, অতঃপর বালককে নিয়ে আসা হল। বাদশাহ তাকে বলল, হে প্রিয় বৎস! তোমার যাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকেও নিরাময় করতে পার। বালক বলল, আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় করেন আল্লাহ। ফলে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে লাগল, অবশেষে সে ধর্মযাজকের কথা বলে দিল। এরপর ধর্মযাজককে ধরে আনা হল এবং তাকে বলা হল তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। সে অস্বীকার করল, ফলে তার মাথার তালুতে করাত রেখে সেটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হল। এতে তার মাথাও দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। অবশেষে ঐ যুবকটিকে আনা হল এবং তাকেও বলা হল তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো। সেও অস্বীকার করল।

অতঃপর বাদশাহ তাকে তার কিছু সহচরের হাতে তাকে তুলে দিয়ে বলল, তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সহ পাহাড়ে আরোহণ করো। পর্বত সৃঙ্গে পৌঁছার পর সে যদি তার দ্বীন থেকে ফিরে আসে তবে ভাল। নতুবা তাকে সেখান থেকে ছুড়ে মারবে। তারপর তারা তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে সহ পর্বতে আরোহণ করল। তখন সে (বালক) দু‘আ করে বলল, اللهم اكْفِنِيْهِمْ بِمَا شِئْتَ  ‘হে আল্লাহ! আপনার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন’। তৎক্ষণাৎ তাদেরকে সহ পাহাড় কেঁপে উঠল। ফলে তারা পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়ল। আর সে হেঁটে হেঁটে বাদশাহর নিকট চলে এলো। এ দেখে বাদশাহ তাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার সাথীরা কোথায়? সে বলল, আল্লাহ আমাকে তাদের চক্রান্ত হতে সংরক্ষণ করেছেন।

আবারো বাদশাহ তাকে তার কতিপয় সহচরের হাতে সমর্পণ করে বলল, তোমরা তাকে নিয়ে নাও এবং নৌকায় উঠিয়ে তাকে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে যাও। অতঃপর সে যদি তার দ্বীন হতে ফিরে আসে তবে ভাল, নতুবা তোমরা তাকে সমুদ্রে ফেলে দাও। তারা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেল। এবারও সে দু‘আ করে বলল, اللهم اكْفِنِيْهِمْ بِمَا شِئْتَ  ‘হে আল্লাহ! আপনার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন’। তৎক্ষণাৎ নৌকাটি তাদেরসহ উল্টে গেল। ফলে তারা সকলেই পানিতে ডুবে গেল। আর যুবক হেঁটে হেঁটে বাদশাহর নিকট চলে এল। এ দেখে বাদশাহ তাকে আবার জিজ্ঞাসা করল, তোমার সঙ্গীগণ কোথায়? সে বলল, আল্লাহ আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা করেছেন।

অতঃপর সে (যুবক) বাদশাহকে বলল, তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না যে পর্যন্ত না তুমি আমার নির্দেশিত পদ্ধতি অবলম্বন করবে। বাদশাহ বলল, সে আবার কী? বালক বলল, একটি মাঠে তুমি লোকদেরকে একত্রিত কর। অতঃপর একটি কাঠের শূলীতে আমাকে উঠিয়ে আমার তীরদানী হতে একটি তীর নিয়ে একটি ধনুকের মাঝে রাখ। এরপর بِاسْمِ اللهِ رَبِّ الْغُلَامِ ‘বালকের প্রভুর নামে’ বলে আমার দিকে তীর নিক্ষেপ কর। এটা যদি কর তবে তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারবে। তার কথা অনুসারে বাদশাহ লোকদেরকে একটি মাঠে একত্রিত করল এবং তাকে একটি কাঠের শূলীতে চড়ালো। অতঃপর তার তীরদানী হতে একটি তীর নিয়ে সেটাকে ধনুকের মাঝে রেখে بِاسْمِ اللهِ رَبِّ الْغُلَامِ ‘বালকের প্রভুর নামে’ বলে তার দিকে তা নিকে তা নিক্ষেপ করল। তীর তার কানের নিম্নাংশে গিয়ে বিধল। অতঃপর সে তীরবিদ্ধ স্থানে নিজের হাত রাখল এবং সাথে সাথে প্রাণত্যাগ করল। এ দৃশ্য দেখে রাজ্যের লোকজন বলে উঠল,

آمَنَّا بِرَبِّ الْغُلَامِ آمَنَّا بِرَبِّ الْغُلَامِ آمَنَّا بِرَبِّ الْغُلَامِ

‘আমরা এ বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম, আমরা এ বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম, আমরা এ বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান আনলাম’। 

এ সংবাদ বাদশাহকে জানানো হল এবং তাকে বলা হল, লক্ষ্য করেছেন কি? আপনি যে পরিস্থিতি হতে আশঙ্কা করছিলেন, আল্লাহর কসম! সে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিই আপনার মাথার উপর চেপে বসেছে। সকল মানুষই বালকের পালনকর্তার উপর ঈমান এনেছে। এ দেখে বাদশাহ সকল রাস্তার মাথায় গর্ত খননের নির্দেশ দিল। গর্ত খনন করা হল এবং ওগুলোতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হল। অতঃপর বাদশাহ আদেশ করল যে, যে ব্যক্তি তার ধর্মমত বর্জন না করবে তাকে ওগুলোতে নিপতিত করবে। কিংবা সে বলল, তাকে বলবে, যেন সে অগ্নিতে প্রবেশ করে। লোকেরা তাই করল। পরিশেষে এক মহিলা একটি শিশু নিয়ে অগ্নিগহবরে পতিত হবার ব্যাপারে ইতস্তত বোধ করছিল। এ দেখে দুধের শিশু তাকে (মাকে) বলল, হে আম্মাজান! তুমি ছবর কর। কেননা, তুমি সত্যের উপরে আছ’।[১]

শিক্ষনীয় বিষয়

১. দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই যুগে আমরা অশ্লীল কাহিনী ও হাস্যকর উপন্যাসে জড়িয়ে পড়েছি, যা বড় ছোট সকলেই আগ্রহ সহকারে পড়ে থাকে। অথচ এসব কাহিনীতে রয়েছে গুরুতর বিপদ ও কল্পকাহিনী, যা শিশুদের স্বাভাবিকতা ও তাদের পবিত্র প্রকৃতিকে নষ্ট করে দেয়!! তাই বাবা-মা ও শিক্ষকদের জন্য অপরিহার্য যে, তারা নতুন প্রজন্মকে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর কাহিনীগুলোর দিকে পরিচালিত করবেন। কেননা এসব কাহিনীতে রয়েছে সৌন্দর্য, নিখুঁততা, অপার উপকারিতা, শিক্ষা এবং আত্মার উপর প্রভাব।

২. এই চমকপ্রদ কাহিনীন নায়ক হল একটি ‘শিশু’!! এই শিশুটির হাত ধরেই আল্লাহ তা‘আলা এসব ঘটনাবলী ঘটিয়েছেন। এটি আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে শিশুদের প্রতি গভীর মনোযোগ দিতে। কেননা আজকের শিশুরাই আগামী দিনের পুরুষ, যারা বিভিন্ন চিন্তা ও আদর্শ বহন করবে। এমনকি যুগের একজন সংস্কারকও এদের মধ্য থেকেই হতে পারে। কিন্তু আমাদের শিশুদের সাথে সম্পর্ক কেবল দেহগত-খাবার, পানীয় ও পোশাকের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ! আর শিক্ষাদানের সম্পর্ক-তা তো অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন, আল্লাহ যাদের দয়া করেন তারা ব্যতিক্রম। অথচ শিক্ষা ও তারবিয়াত (নৈতিক গঠন) হল একটি দীর্ঘ ও ধাপে ধাপে গঠনমূলক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন শিশুকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَارًا وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ  ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ (সূরা তাহরীম, ৬৬/৬)।

৩. শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে উৎসাহ দেয়ার গুরুত্ব আমরা দেখতে পাই রাহিবের (ধর্মজাযকের) এই বাণী থেকে- أَيْ بُنَيَّ أَنْتَ الْيَوْمَ أَفْضَلُ مِنِّيْ ‘হে আমার সন্তান! আজ তুমি আমার চেয়েও উত্তম’। এই হল সেই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা আমরা শত শত বছরেও অতিক্রম করতে পারিনি-আর তা হল, একজন শিক্ষক কর্তৃক এই স্বীকৃতি প্রদান যে, তার ছাত্র তার থেকেও উত্তম হয়ে উঠতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উৎসাহদানের অন্যতম পদ্ধতি হিসাবে ছিলেন এমন কিছু বিদ্বান ছাহাবীদের বৈশিষ্ট্যমূলক উপাধি প্রদান করা। যেমন তিনি (ﷺ) বলেছেন, أَفْرَضُهُمْ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ وَأَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللهِ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ ‘ফারায়েয (উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধান) সম্বন্ধে যায়দ ইবনু ছাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সবচাইতে বেশী অভিজ্ঞ এবং অধিক উত্তমরূপে কুরআন মাজীদ পাঠকারী ওবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)’।[২]

৪. বিভ্রান্তির দাওয়াতদাতাদের মানুষের উপর কু-প্রভাব এবং সমাজে তাদের ফিৎনা ও দুর্নীতির প্রসার ঘটানোর অপচেষ্টার বিপদ এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন: যাদুকর তার যাদুবিদ্যার সংরক্ষণে কতটা আগ্রহী ছিল, যদিও যাদু আল্লাহর বিধানের বিরোধিতা এবং মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক।

৫. আওলিয়া কিরামের কারামতের সত্যতা: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিছু নিকটবর্তী বান্দার মাধ্যমে স্বাভাবিক নিয়মকে ভেঙ্গে দিয়ে বিশেষ ঘটনা ঘটান। যেমন: সাধারণ নিয়মে একটি ছোট পাথর কোন বড় প্রাণীকে হত্যা করতে পারে না, কিন্তু এখানে এই ধর্মনিষ্ঠ শিশুর মাধ্যমে আল্লাহ এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিয়েছেন-এটি তার জন্য একটি কারামত।

৬. মানুষের হৃদয়ে এ বিষয়টি গভীরভাবে প্রেথিত করতে হবে যে, উপকার-অপকার একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনি ব্যতীত আর কেউ উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। সুতরাং কারও হৃদয় অন্য কারও সাথে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত নয়। এই শিক্ষা আমরা দেখতে পাই সেই ঘটনায়, যখন রাজ দরবারের অন্ধ ব্যক্তি সেই বালককে বলল তাকে আরোগ্য দান করে দিতে। তখন বালকটি বলেছিল,

إِنِّيْ لَا أَشْفِيْ أَحَدًا إِنَّمَا يَشْفِي اللهُ فَإِنْ أَنْتَ آمَنْتَ بِاللهِ دَعَوْتُ اللهَ فَشَفَاكَ فَآمَنَ بِاللهِ فَشَفَاهُ اللهُ

‘আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দেন আল্লাহ তা‘আলা। তুমি যদি আল্লাহর উপর ঈমান আনো তবে আমি আল্লাহর নিকট দু‘আ করব, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। তারপর সে আল্লাহর উপর ঈমান আনল। আল্লাহ তা‘আলা তাকে আরোগ্য দান (রোগ মুক্ত) করে দিলেন’।

৭. আল্লাহর প্রতি আন্তরিকভাবে আশ্রয় গ্রহণ, দু‘আর পদ্ধতি এবং দু‘আ কবুল হওয়ার প্রতি অগাধ আস্থা-এসবই ফুটে ওঠে যখন সেই বালকটি বলেছিল-اللهم اكْفِنِيْهِمْ بِمَا شِئْتَ ‘হে আল্লাহ! আপনার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন’। এটি একটি মহান দু‘আ, যেখানে বালকটি আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছে। সে দু‘আয় কোন বিশদ বর্ণনা করেনি যে কীভাবে মুক্তি চায়, কী উপায়ে চায়-বরং সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছে। কারণ, মুক্তি লাভের উপায় বা তার প্রকৃতি এমন নয় যে তা মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে, বরং তা হয় আল্লাহ যেভাবে চান, সেভাবেই। মানুষের কর্তব্য হল আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করা এবং সমস্ত উপায় তাঁর উপর নির্ভর করে ছেড়ে দেয়া।

৮. দাওয়াতের প্রতি দৃঢ় সংকল্প ও অটলতা। এটি আমরা বুঝতে পারি সেই দৃশ্য থেকে যেখানে বালকটি দুইবার রাজ প্রাসাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও আবার স্বেচ্ছায় অত্যাচারী রাজার নিকট ফিরে যায়। প্রশ্ন জাগে- সে তো পালাতে পারত, তাহলে কেন সে ফিরে গেল? কারণ, সেই বালকটির কাঁধে একটি বার্তা ছিল, একটি দাওয়াতী দায়িত্ব, যা তাকে পালন করতেই হতো। তাই সে আবারও ফিরে যায়। এটি দাওয়াতের জন্য একটি মহান শিক্ষা-কীভাবে একজন দাঈ বা আহ্বানকারী নিজের দাওয়াতী দায়িত্বে দৃঢ় থাকে এবং কীভাবে সত্য প্রকাশে অটলতা দেখায়, তা এই বালকের মাধ্যমে আলোকপাত করা হয়েছে।

৯. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কখনো কখনো তাঁর শত্রুদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের ওপর কর্তৃত্ব দান করেন। তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যদি কখনো কাফেররা মুমিনদের উপর হামলা চালায়, তাদের হত্যা করে, আগুনে পুড়িয়ে দেয়, কিংবা তাদের সম্মানহানি করে। আশ্চর্য হবার কিছু নেই-এতে রয়েছে আল্লাহর বিশেষ হিকমত। মুমিনদের এই কষ্ট ও বিপদের প্রতিদান আল্লাহর নিকট অনেক বড়। আর যারা যুল্মকারী কাফের-আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কিছুটা সময় দিয়ে যাচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা তা বুঝতেও পারছে না।

১০. পরীক্ষা (বিপদ-আপদ ও কষ্ট) হলো আল্লাহর একটি নির্ধারিত বিধান, যা তাঁর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। এজন্য তা সহ্য করা ও ধৈর্যধারণ করা অপরিহার্য। তবে মানুষ এই পরীক্ষার ধাপে ধাপে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকে-কারও ধৈর্য বেশি, কারও কম।

১১. যখন কোন বান্দা ঈমানের স্বাদ অনুভব করে এবং তার মাধুর্য আস্বাদন করে, তখন সে শরীরের যন্ত্রণা ও কষ্টের চেয়ে অন্তরের শান্তিকে বেশি মূল্য দেয়। ঈমান অন্তরকে বন্দী করে রাখে। কেননা তা মানুষের প্রকৃত স্বভাবের সাথে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ। ফলে একজন মুমিন সবচেয়ে কঠিন নির্যাতনও সহ্য করতে পারে, কিন্তু তার পক্ষে আত্মা ত্যাগ করা সহজ হয়, ঈমান ত্যাগ করা নয়।

১২. হাসান বছরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই কথাটি গভীরভাবে চিন্তা করুন-انْظُرُوْا إِلَى هَذَا الْكَرَمِ وَالْجُوْدِ قَتَلُوا أَوْلِيَاءَهُ وَهُوَ يَدْعُوْهُمْ إِلَى التَّوْبَةِ وَالْمَغْفِرَةِ ‘দেখো আল্লাহর কৃপা ও দানশীলতা! তারা আল্লাহর অলিদের হত্যা করছে, তাদেরকে ফিৎনার মধ্যে ফেলছে-তারপরও আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও তওবার দিকে ডাকছেন’।[৩] আল্লাহু আকবার! কী মহান আমাদের প্রতিপালক! কী অপার তাঁর দয়া ও ক্ষমা।

১৩. নীতিতে অটল থাকা: এটি মুসলিম ব্যক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ, যা আমাদের এই যুগে এবং প্রত্যেক যুগেই থাকা অপরিহার্য। বিশেষ করে তখন, যখন আমরা দেখি মানুষ খুব সহজেই সামান্য দুনিয়া লাভের বিনিময়ে নিজের নীতিকে ত্যাগ করে বসে। সত্যে অটল থাকার প্রকৃত উদাহরণ হল সেই মায়ের ঘটনা, যিনি তার সন্তানকে নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তখন শিশুটি তার মাকে বলেছিল, يَا أُمَّهْ اصْبِرِيْ فَإِنَّكِ عَلَى الْحَقِّ ‘হে আম্মাজান! তুমি ছবর কর। কেননা, তুমি সত্যের উপরে আছ’।

ঈমানের উপর অটল থাকা এবং তার জন্য জীবন বিসর্জন দেয়া- এটি এক বিশাল বিজয়ের চিত্র। কারণ, এর পরিণাম হল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْكَبِيْرُ ‘পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীসমূহ। আর এটাই হল বড় সফলতা’ (সূরা আল-বুরূজ: ১১) এবং লক্ষণীয় বিষয় হলো-‘মহাবিজয় (الْفَوْزُ الْكَبِيرُ)-এই শব্দগুচ্ছ কেবল এই একটি সূরাতেই এসেছে, সূরা বুরুজ! তাই ভেবে দেখুন, এর মাঝে কত গভীর অর্থ নিহিত আছে।



*পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৫।
[২]. তিরমিযী, হা/৩৭৯০; মিশকাত, হা/৬১২০; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১২২৪।
[৩]. সূরা বুরূজ, ৮৫/১০ আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।




কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১১তম পর্ব) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হিজরত - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১২তম পর্ব) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ১০ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ই একমাত্র সুপারিশকারী - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কা‘ব ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তাওবাহ - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
মাযলূমের বদদু‘আ ও তোমার সাক্ষ্যের ভিত্তি কী? - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
নবী করীম (ﷺ)-এর শাফা‘আত - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
হাজেরা এবং তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ