নবী করীম (ﷺ) এর তাঁর স্ত্রীদের থেকে কিছু সময়ের জন্য আলাদা থাকা
- মূল : ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-উক্বাইলী
- অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ﷺ)-এর সহধর্মিণীদের মধ্যে ঐ দুই সহধর্মিণী সম্পর্কে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞাসা করতে সবসময় আগ্রহী ছিলাম, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنۡ تَتُوۡبَاۤ اِلَی اللّٰہِ فَقَدۡ صَغَتۡ قُلُوۡبُکُمَا ‘যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা কর (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম)। কারণ তোমাদের উভয়ের অন্তর বাঁকা হয়েছে’ (সূরা আত-তাহরীম : ৪)। আমি এক বছর ধরে চেষ্টায় ছিলাম যেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞাসা করতে পারি। কিন্তু আমি সুযোগ পাচ্ছিলাম না এবং তাঁর সম্মান ও গাম্ভীর্যের কারণে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস করছিলাম না। অবশেষে তিনি হজ্জে গেলেন আমিও তাঁর সঙ্গে হজ্জ করলাম। হজ্জ থেকে ফিরে আসার পর আমরা যখন ‘যুহরান’ নামক স্থানে ছিলাম, তখন তিনি প্রকৃতির প্রয়োজনে একটি ‘আরাক’ গাছের দিকে সরে গেলেন। আমিও তাঁর সঙ্গে গেলাম। অতঃপর তিনি বললেন, আমার জন্য ওযূর পানি নিয়ে এসো। আমি একটি পানির পাত্র নিয়ে তাঁকে ওযূর জন্য দিলাম। তিনি প্রকৃতির প্রয়োজন সারলেন, আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর তিনি ফিরে আসলে আমি তাঁর হাতে পানি ঢাললাম, তিনি ওযূ করলেন। অতঃপর আমি তাঁর সাথে হাঁটতে লাগলাম এবং তখন আমি উপযুক্ত সময় পেয়ে তাঁকে বললাম, ‘হে আমীরুল মুমিনীন! সেই দুই স্ত্রী কারা ছিলেন, যারা নবী করীম (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে একত্র হয়েছিল, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,اِنۡ تَتُوۡبَاۤ اِلَی اللّٰہِ فَقَدۡ صَغَتۡ قُلُوۡبُکُمَا ‘যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা কর (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম)। কারণ তোমাদের উভয়ের অন্তর বাঁকা হয়েছে’ (সূরা আত-তাহরীম : ৪)।
আমি আমার কথা শেষ করতেই পারিনি, তখনই উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে ইবনু আব্বাস! কি আশ্চার্য বিষয়, তারা হচ্ছে আয়েশা ও হাফছা। আমি বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমি এক বছর ধরে আপনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনার কাম্ভীর্য (ভয় বা সম্মানবোধ) আমাকে জিজ্ঞাসা করতে দিত না। তিনি বললেন, ‘তুমি করেছ ভালই। আমার ব্যাপারে তোমার যা ধারণা যে, আমার নিকট হয়তো কোনো জ্ঞান আছে, তাহলে জিজ্ঞাসা কর। যদি আমার নিকট সে বিষয়ে কোনো জ্ঞান থাকে, আমি অবশ্যই তা তোমাকে জানাব। এরপর উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিজের কথা বর্ণনা করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন,
আমি এবং আমার একজন আনছারী প্রতিবেশী আমরা বনু উমাইয়া ইবনু যায়দ গোত্রে বসবাস করতাম, যা ছিল মদীনার উপরের দিকের এলাকা (আওয়ালী)। আমরা পালাক্রমে নবী করীম (ﷺ)-এর খিদমতে যেতাম, একদিন আমি যেতাম, আরেকদিন সে যেত। আমি গেলে সে দিনের সমস্ত অহি ও ঘটনা শুনে এসে তাকে জানাতাম, আর সে গেলে সেও এসে আমাকে সে দিনে খবর বলে দিত, অহি হোক বা অন্য কিছু। আর আমরা কুরাইশরা নারীদের উপর কর্তৃত্ব করতাম। উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা জাহেলীয়াতের যুগে নারীদের কোনো গুরুত্ব দিতাম না, তাদের কোনো মতামতের মূল্য ছিল না। এমনকি তাদের কোন অধিকারও ছিল না। পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা নারীদের সম্পর্কে কুরআনে যা কিছু নাযিল করলেন এবং তাদের যে অধিকার নির্ধারণ করে দিলেন, তখন আমরা বুঝতে পারলাম, তাদেরও আমাদের উপর কিছু অধিকার রয়েছে। এরপরও আমরা আমাদের কোনো গৃহস্থালী বা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তাদের অংশগ্রহণ করতে দিতাম না। কিন্তু যখন আমরা মদীনায় এলাম, তখন দেখি আনছারদের মধ্যে নারীরা স্বামীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এরপর আমাদের নারীরাও আনছার নারীদের স্বভাব ও আচরণ শিখতে লাগল।
একদিন আমি কোনো এক বিষয়ে পরিকল্পনা করছিলাম, তখন আমার স্ত্রী বলল, তুমি যদি এটা-ওটা করো, তবে ভালো হয়। আমি বললাম, তোমার কী কাজ এসব বিষয়ে? তুমি আমার কাজে হস্তক্ষেপ করছ কেন? সে আমার সঙ্গে চিৎকারে তর্ক শুরু করল। আমি বিস্মিত হলাম যে, সে আমাকে এমনভাবে কথা শুনাচ্ছে! সে বলল, কি আশ্চার্য! তুমি কেন অবাক হচ্ছো হে ইবনুল খাত্তাব? আল্লাহর কসম! নবী করীম (ﷺ)-এর স্ত্রীরাও তাঁকে জবাব দেন, এমনকি তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সারাদিন তাঁর সঙ্গে কথা বন্ধ রাখেন? আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং বললম, যে এই কাজ করেছে, সে ধ্বংস হয়ে গেছে! নবী করীম (ﷺ)-এর স্ত্রীরা কি এমন কিছু করতে পারে! তারপর আমি তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পরলাম এবং বের হয়ে গেলাম। আমি সোজা গিয়ে আমার মেয়ে হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর কাছে প্রবেশ করলাম। আমি হাফছাকে বললাম, ‘হে হাফছা! তোমাদের মধ্যে কি কেউ নবী করীম (ﷺ)-এর উপর এতটা রাগ করে যে, সারাদিন তাঁর সাথে কথা বলে না? সে বলল, হ্যাঁ। আল্লাহর কসম! আমরা তাঁকে জবাব দিই। আমি বললাম, তাহলে তো তোমরা ধ্বংস হয়েছ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ! তুমি কি বুঝতে পারো না, আমি তোমাকে আল্লাহর শাস্তি ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাগ থেকে সতর্ক করছি! তুমি কি নিশ্চিন্ত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাগ করলে আল্লাহও রাগ করবেন? আর এর ফলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে? তুমি নবী করীম (ﷺ)-এর সামনে বেশি কিছু দাবি করো না, তাঁর সঙ্গে তর্ক করো না এবং তাঁকে ছেড়ে দূরে থেকো না। তুমি যা কিছু চাও, সেটা আমাকে বল, আমি ব্যবস্থা করব। হে আমার মেয়ে, তোমার প্রতিবেশী (আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)) যদি তোমার চেয়ে বেশি সুন্দরী হয় এবং নবী করীম (ﷺ)-এর কাছে বেশি প্রিয় হয়, সেটা যেন তোমাকে ধোকায় না ফেলে। উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এরপর আমি বের হয়ে গেলাম এবং আমার আত্মীয়তার কারণে উম্মু সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে গেলাম এবং তার সঙ্গে কথা বললাম। উম্মু সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, কি আশ্চার্য, হে ইবনু খাত্তাব! তুমি তো প্রতিটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করো, এখন কি তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যকার বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতে চাও? আল্লাহর কসম! তিনি এমনভাবে আমাকে চুপ করালেন যে, আমি লজ্জায় চুপ হয়ে গেলাম এবং আমি যা অনুভব করছিলাম, তা অনেকটা প্রমাণিত হয়ে গেল। এরপর আমি তাঁর কাছ থেকে বের হয়ে গেলাম।
উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ﷺ)-এর চারপাশের অবস্থা স্থির ছিল, তবে আমরা আশঙ্কায় ছিলাম গাসান গোত্রের কোনো রাজা সম্পর্কে, যার কথা আমাদের কাছে এসেছে, সে নাকি আমাদের আক্রমণ করতে চায়। এতে আমাদের অন্তর আতঙ্কে ভরে গিয়েছিল। আমরা শুনেছিলাম, গাসান লোকেরা ঘোড়ার খুরে লোহার নাল লাগাচ্ছে (অর্থাৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে) আমাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য। এমন সময় আমার আনছারী সাথী, যার পালা ছিল সেদিন নবী করীম (ﷺ)-এর কাছে যাওয়ার, সে রাতের বেলা ফিরে এলো। সে আমার দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ল এবং বলল, সে কি এখানে আছে? আমি ভয় পেয়ে গেলাম, দ্রুত বের হয়ে এলাম। সে বলল, খুলো! খুলো! উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমার সেই আনছারী সাথী বলল, আজ এক মহা ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম, কি হয়েছে? গাসানরা কি (আক্রমণ করতে) এসেছে? সে বলল, না, বরং তার চেয়েও বড় এবং ভয়াবহ বিষয় ঘটেছে; নবী করীম (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন! আমি বললাম, তাহলে তো হাফসা ধ্বংস হলো, সে ব্যর্থ হলো! হাফসা ও আয়েশার নাক ধুলোয় মিশুক! আমি তো আগেই আঁচ করছিলাম, এই ঘটনা ঘটতে পারে।
আমি দ্রুত আমার পোশাক পরে নিলাম এবং গিয়ে নবী করীম (ﷺ)-এর সঙ্গে ফজরের ছালাত আদায় করলাম। এরপর নবী করীম (ﷺ) একটি দোতলা কক্ষে উঠে গেলেন এবং সেখানে স্ত্রীদের থেকে একান্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবস্থান করতে লাগলেন। আমি হাফছার কাছে গেলাম, দেখি সে কাঁদছে। আর শুধু সে নয়, সব স্ত্রীদের কক্ষেই কান্নার আওয়াজ। আমি বললাম, ‘তুমি কেন কাঁদছো? আমি কি তোমাকে আগেই সতর্ক করিনি? নবী করীম (ﷺ) কি তোমাদের তালাক্ব দিয়েছেন? সে বলল, আমি জানি না। তিনি এখন ঐ কক্ষে একা আছেন এবং দ্রুততার সাথে উপরে উঠে যান। আমি বের হয়ে এসে মসজিদের মিম্বারের দিকে গেলাম। সেখানে কিছু ছাহাবী বসে কাঁদছিলেন। আমি কিছুক্ষণ তাদের সঙ্গে বসে রইলাম। কিন্তু আমার মন অস্থির হয়ে পড়ল, তখন আমি নবী করীম (ﷺ) যেই কক্ষে অবস্থান করছিলেন, সেই দোতলায় গেলাম। দেখি, একজন কৃষ্ণাঙ্গ খাসি দাস (নবী করীম (ﷺ)-এর সেবক) সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে বললাম, উমরের জন্য অনুমতি চাও। বল, উমর ইবনুল খাত্তাব দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সে গেল, নবী করীম (ﷺ)-এর সঙ্গে কথা বলল, তারপর ফিরে এসে বলল, আমি তাঁকে আপনার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।
আমি ফিরে এসে আবার মিম্বারের পাশে ছাহাবীদের সঙ্গে বসে গেলাম। আবার আমার অস্থিরতা বাড়তে লাগল। আমি আবার গিয়ে বললাম, উমরের জন্য অনুমতি চাও। সে আবার গেল, ফিরে এসে বলল, আমি তাঁকে বলেছি, কিন্তু তিনি চুপ ছিলেন। আমি আবার ফিরে এলোম, কিন্তু মন আর স্থির রাখতে পারছিলাম না। তৃতীয়বার আমি আবার গেলাম এবং দাসটিকে বললাম, উমরের জন্য আবার অনুমতি চাও। আমি তাঁকে বলেছি, কিন্তু তিনি চুপ ছিলেন। আমি যখন ফিরে যাচ্ছিলাম, তখন সে দাস আমাকে ডাকল; নবী করীম (ﷺ) আপনার জন্য অনুমতি দিয়েছেন। আমি ভিতরে ঢুকলাম, দেখি নবী করীম (ﷺ) একটি খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন। তাঁর ও চাটাইয়ের মাঝে কিছুই নেই, ফলে চাটাইয়ের দাগ তাঁর পাশে পড়ে গেছে। তিনি একটি চামড়ার বালিশে হেলান দিয়ে ছিলেন, যার ভিতরে খেজুরের আঁশ ছিল। আমি সালাম দিলাম এবং দাঁড়িয়ে বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক্ব দিয়েছেন? তিনি চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, না। আমি বললাম, আল্লাহু আকবার! তারপর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! যদি আপনি আমাকে দেখতেন, কী অবস্থা হয়েছিল আমার। আমরা, কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, নারীদের উপর প্রভাবশালী ছিলাম (তাদের কর্তৃত্বে রাখতাম)। কিন্তু যখন আমরা মদীনায় এলাম, তখন দেখলাম, এখানে পুরুষদের উপর নারীরা প্রভাব বিস্তার করে। নবী করীম (ﷺ) তা শুনে হাঁসলেন।
আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি যদি আমাকে দেখতে পেতেন, আমি যখন হাফছার কাছে গেলাম, আমি তাকে বললাম, তোমার প্রতিবেশিনী আয়েশা যেহেতু তোমার চেয়ে বেশি সুন্দরী এবং নবী করীম (ﷺ)-এর অধিক প্রিয়, এটা যেন তোমাকে ধোকায় না ফেলে। নবী করীম (ﷺ) তখন আবার হাঁসলেন। আমি বসে পড়লাম, যখন দেখলাম তিনি হাঁসছেন। আমি যখন উম্মু সালামাহর প্রসঙ্গ আনলাম, নবী করীম (ﷺ) তখন আবার হাঁসলেন। আমি তাঁর ঘরের দিকে তাকালাম। আল্লাহর কসম! আমি তাঁর ঘরে এমন কিছু দেখিনি যা চোখে পড়ে বা দৃষ্টিনন্দন, শুধু তিনটি জিনিস ছিল, যেগুলো মাথার কাছে ঝুলানো ছিল। আর তাঁর পায়ের দিকে শুকনো চামড়া (চামড়ার তৈরি বিছানা বা কার্পেট) ছিল। আমি দেখলাম, চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে তাঁর শরীরে। তখন আমি কাঁদতে লাগলাম। তিনি বললেন, ‘তুমি কেন কাঁদছো? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কিসরা (পারস্যের বাদশা) এবং কায়ছার (রোমের সম্রাট) যেভাবে ভোগ-বিলাসে আছে, অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল হয়েও এই অবস্থা! তিনি বললেন, তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখেরাত? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি আল্লাহর নিকট দু‘আ করুন, যেন আপনার উম্মতের ওপর স্বচ্ছলতা আসবে। কেননা পারস্য ও রোমকে আল্লাহ দুনিয়া দিয়েছেন, অথচ তারা আল্লাহর ইবাদতও করে না!
নবী করীম (ﷺ) হেলান দিয়ে বসেছিলেন, তখন তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, এই বিষয়ে তুমিও কথা বললে, হে (উমর) ইবনুল খাত্তাব! ওরা (কিসরা ও কায়সার) এমন এক কওম, যাদের জীবনের সব সুখ-শান্তি দুনিয়াতেই আগেভাগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি আমার জন্য মাফ চেয়ে দিন। এরপর নবী করীম (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখেন এই ঘটনার জন্য। যখন হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এই গোপন কথা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলে দিয়েছিলেন। তিনি ২৯ রাত তাদের থেকে পৃথক থাকেন। তিনি বলেছিলেন, আমি এক মাস পর্যন্ত তাদের কাছে যাবো না। এই কথা বলেছিলেন স্ত্রীদের উপর বিরক্ত হয়ে, যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এই বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। ২৯ রাত কেটে যাওয়ার পর, তিনি আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকেই শুরু করেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি তো কসম করেছিলেন যে, এক মাস আমাদের কাছে আসবেন না। কিন্তু আজ তো ২৯ রাত হয়েছে। আমি গুনে গুনে হিসাব করে দেখেছি। তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন, মাস তো ২৯ রাতও হয়। আর সেবার মাসটি ছিল আসলেই ২৯ রাতের। আয়েশা (ﷺ) বলেন, তারপরই আল্লাহ তা‘আলা নির্বাচন করার সুযোগ সম্পর্কিত আয়াত নাযিল করলেন। যখন নবী করীম (ﷺ)-এর স্ত্রীরা নির্বাচনের সুযোগ পেলেন, তখন নবী করীম (ﷺ) প্রথমে আমার কাছে এ ব্যাপারে এলেন। তিনি বললেন, হে আয়েশা! তোমার জন্য একটি বিষয় বলব, কিন্তু তাড়াহুড়া করবে না, আগে তুমি তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ কর। আমি বললাম, আমি জানি আমার পিতা-মাতা কখনই আমাকে আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলবে না। এরপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَ زِیۡنَتَہَا فَتَعَالَیۡنَ اُمَتِّعۡکُنَّ وَ اُسَرِّحۡکُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا . وَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ وَ الدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ فَاِنَّ اللّٰہَ اَعَدَّ لِلۡمُحۡسِنٰتِ مِنۡکُنَّ اَجۡرًا عَظِیۡمًا
‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’ (সূরা আল-আহযাব : ২৮-২৯)। তখন আমি বললাম, তাহলে কেন আমি আমার পিতা-মাতার নিকট উপদেশ চাইবো? আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং পরকালের আবাসকে কামনা করি। এরপর নবী করীম (ﷺ) তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরও এই সুযোগ দিয়েছেন এবং সকলেই একই উত্তর দিয়েছেন যেভাবে আমি করেছি’।[১]
শিক্ষণীয় বিষয়
১. ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর জ্ঞানার্জনে আগ্রহ, বুঝাশোনা এবং সুক্ষ্ম জ্ঞানের অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ পায়, যখন তিনি উম্মুল মুমিনীনদের সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াত সম্বন্ধে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞাসা করেন এবং তাদের মাঝে কথোপকথন চলতে থাকে যতক্ষণ না তারা আমাদের ও সমগ্র উম্মাহর জন্য একটি উজ্জ্বল জানালা খুলে দেন, যা প্রথম প্রজন্মের জীবন ও তাদের বিশেষ ও সাধারণ অবস্থাগুলো বর্ণনা করে, যা আমাদের আদর্শ ও জীবনের সংবিধান হওয়া উচিত।
আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কুমাইল বিন যিয়াদকে বলেন, হে কুমাইল! জ্ঞান সম্পদের চেয়ে উত্তম, জ্ঞান তোমাকে রক্ষা করে, আর তুমি সম্পদের রক্ষা কর, জ্ঞান শাসক, আর সম্পদ শাসিত, সম্পদ খরচ করলে কমে যায়, আর জ্ঞান ব্যয়ে বৃদ্ধি পায়। আর তিনি বলেছিলেন,
ما الفخــــر إلا لأهل العلم إنهم .. على الهدى لمن استهدى أدلاء
‘গর্ব তো শুধু জ্ঞানীদেরই + তারা পথপ্রার্থীতে পথ দেখায়।
وقدر كل امرئ ما كان يحسنه .. والجاهـلون لأهل العـلم أعداء
প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা তার দক্ষতার উপর নির্ভর করে .. আর অজ্ঞরা জ্ঞানীদের শত্রু।
فـفـز بعلم تعش حيـا ً به أبــدا .. الناس موتى وأهل العلم أحياء
তাই জ্ঞানার্জন কর, এর দ্বারা তুমি চিরকাল জীবিত থাকবে ...মানুষ মৃত আর জ্ঞানীরা জীবিত।
২. ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর এই কথায় প্রকাশ পায় যে, তিনি বলেছিলেন, আমি তাঁর (উমর)-এর প্রতি সম্মানের কারণে জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাই না। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য এক সঠিক পন্থা ‘উম্মাহর প্রতি’ আমাদের সামনে নির্ধারণ করেছেন, বিশেষভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য এবং সাধারণ মানুষের জন্যও। যা হল আলেমদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পন্থা।
কারণ, একজন আলেমের সম্মান রক্ষা করা দ্বীনের পরিপূর্ণতার অংশ। জ্ঞান ও তার মর্যাদা সংরক্ষিত হয় তার ধারক ও বাহকদের মর্যাদা সংরক্ষণের মাধ্যমে।
আমাদের উচিত আমাদের আলেম ও ইমামদের মর্যাদা সংরক্ষণ করা, তাদের সম্মান রক্ষা করা এবং তাদের বিষয়ে সমালোচনায় লিপ্ত হওয়া থেকে কঠরভাবে সতর্ক থাকা।
৩. ইসলাম মহিলাদের মর্যাদার স্তর অনেক উঁচুতে উন্নীত করেছে এবং জাহেলীয়াতের যুগে তাদের উপর যে যুলুম হত, তা দূর করে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা ইসলামের বাইরে আর কোনো ধর্মকে জানি না, যা নারীকে এতো সম্মান, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার দিয়েছে।
৪. বৈবাহিক জীবন দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যামুক্ত নয়। নবী করীম (ﷺ) যিনি আদর্শ স্বামী এবং তাঁর স্ত্রীগণ, যারা মুমিনদের মা ও শ্রেষ্ঠ স্ত্রীগণ, এমন পরিবারেও এমন ঘটনা ঘটেছিল যে, নবী করীম (ﷺ) তাদের থেকে এক মাস পর্যন্ত আলাদা থাকেন এবং কারো ঘরে প্রবেশ করেননি।
৫. এই হাদীছে একটি মহান শিক্ষা নিহিত, তা হলো উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রজ্ঞা যা তিনি তাঁর কন্যা হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর সাথে ব্যবহার করেছেন এবং তাঁকে উপদেশ দিয়েছেন। ঠিক এই রকমই হওয়া উচিত একজন পিতার। যেন সে তার জামাইয়ের সহযোগী হয় এবং তাঁর মেয়েকে জামাইয়ের বিরুদ্ধে উস্কানি না দেয়, যাতে সংসার জীবনে বিপর্যয় না আসে।
৬. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোমলতা ও সহনশীলতা তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে আচরণ স্পষ্ট, এমনকি যখন তাঁদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ বা ঝগড়া হতো তখনও। তাঁর মহান মর্যাদা ও উচ্চ অবস্থান থাকা সত্ত্বেও, তিনি কখনও রুক্ষ ব্যবহার করতেন না। নবী করীম (ﷺ)-এর যেই উচ্চ মর্যাদা ছিল এবং যেভাবে যিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর দুঃখ-কষ্ট নিজের উপর বহন করতেন। তবুও তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে আচরণ যে কোমলতা ছিল, তা বর্ণনার অতীত!!
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, তিনি ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। তিনি ঘরে প্রবেশ করলে ঘর শান্তি, প্রশান্তি, আনন্দ ও হাস্যরসপূর্ণ হয়ে যেত। তিনি নিজ হাতে তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে বসে গোশত কাটতেন, অথচ তিনিই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি ক্বিয়ামতের দিন প্রথম ও শেষ সকল মানুষের জন্য সুপারিশকারী হবেন এবং যাঁর নিয়ে আসা বার্তা চিরকালীন স্থায়ী হবে। মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি নেতা তাঁর একটি ছওয়াব, আর মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি আলেম তাঁর একটি ছওয়াব। তিনি (ﷺ) নিজের হাতে জুতা সেলাই করতেন, কাপড় সেলাই করতেন, ঘর ঝাড়ু দিতেন এবং পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে সম্মান ও মর্যাদায় ক্রমাগত উন্নীত করতেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এইসব আচরণ প্রতিটি মুসলমানের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হওয়া উচিত।
৭. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীগণের মর্যাদা- যাঁরা মুমিনদের মা এবং যাঁরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আখেরাতকে প্রাধান্য নিয়েছিলেন, তাঁদের ফযীলত অতুলনীয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীগণ এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ নারীগণ; কারণ, তাঁদের মর্যাদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ছিল, তাঁরা মুমিনদের মা, তাঁরা আখেরাতেও রাসূল (ﷺ)-এর স্ত্রী হবেন এবং তাঁরা সকল অপবিত্রতা থেকে পবিত্র। এই কারণেই তাঁদের কাউকে গালি দিলে কুফরী সাব্যস্ত হয়, কারণ এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মর্যাদাকে অপমান করা হয় এবং তাঁর বৈবাহিক জীবনের পবিত্রতা নষ্ট হয়। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ; খাদিজা ও আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)।
৮. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীগণ দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে আখেরাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। স্ত্রীদের উচিত, আখেরাতকে প্রাধান্য দেওয়া, দুনিয়াকে নয়।
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৬৮, ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭৯।
প্রসঙ্গসমূহ »:
শিক্ষণীয় ঘটনা