দাজ্জাল
-মূল : ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-উক্বাইলী
-অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
নাওওয়াস ইবনু সাম‘আন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা সকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। আলোচনার সময় তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেন। পরে অনেক গুরুত্ব সহকারে উপস্থিত করেন, যাতে তাঁকে আমরা ঐ বৃক্ষরাজির নির্দিষ্ট এলাকায় (অবস্থানস্থল সম্পর্কে) ধারণা করতে লাগলাম। এরপর আমরা সন্ধায় আবার তাঁর নিকটে গেলাম। তিনি আমাদের মধ্যে এর প্রভাব দেখতে পেয়ে বললেন, তোমাদের ব্যাপার কি? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি সকালে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং এতে আপনি কখনো ব্যক্তিত্বকে তুচ্ছ করে তুলে ধরেছেন, আবার কখনো তার ব্যক্তিত্বকে বড় করে তুলে ধরেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি যে, দাজ্জাল বুঝি এ বাগানের মধ্যেই বিদ্যমান। এ কথা শুনে তিনি বললেন, দাজ্জাল নয়, বরং তোমাদের ব্যাপারে অন্য কিছুর আমি অধিক ভয় করছি। তবে শোন, আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকাবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি নিজের পক্ষ হতে তাকে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তা‘আলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধানকারী।
দাজ্জাল; যুবক এবং ঘন চুল বিশিষ্ট হবে, চোখ আঙ্গুরের ন্যায় হবে। আমি তাকে কাফের ‘আব্দুল উয্যা ইবনু কাতান’-এর মতো মনে করছি। তোমাদের যে কেউ দাজ্জালের সময়কাল পাবে, সে যেন সূরা আল-কাহফ-এর প্রথমোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করে। সে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যপথ হতে আবির্ভূত হবে। সে ডানে-বামে দুর্যোগ সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অটল থাকবে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে পৃথিবীতে কয়দিন অবস্থান করবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, চল্লিশদিন পর্যন্ত। এর প্রথম দিনটি এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতই হবে।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! যেদিন এক বছরের সমান হবে, সেটাতে এক দিনের ছালাতই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না, বরং তোমরা এদিন হিসাব করে তোমাদের দিনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে নিবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! দুনিয়াতে দাজ্জালের অগ্রসরতা কি রকম বৃদ্ধি পাবে? তিনি বললেন, বাতাসের প্রবাহ মেঘমালাকে যে রকম হাকিয়ে নিয়ে যায়। সে এক সম্প্রদায়ের নিকটে এসে তাদেরকে কুফরীর দিকে ডাকবে। তারা তার উপর ঈমান আনবে এবং তার আহ্বানে সাড়া দিবে। অতঃপর সে আকাশমণ্ডলীকে আদেশ করবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে এবং ভূমিকে নির্দেশ দিবে, ফলে ভূমি গাছ-পালা ও শস্য উৎপন্ন করবে। তারপর সন্ধায় তাদের গবাদি পশুগুলো পূর্বের চেয়ে বেশি লম্বা কুজ, প্রশস্ত স্তন এবং পেটভর্তি অবস্থায় তাদের নিকটে ফিরে আসবে।
তারপর দাজ্জাল অপর এক সম্প্রদায়ের নিকটে আসবে এবং তাদেরকে কুফরীর প্রতি ডাকবে। তারা তার কথাকে উপেক্ষা করবে। ফলে সে তাদের নিকট হতে প্রত্যাবর্তন করবে। তখনি তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ও পানির অনটন দেখা দিবে এবং তাদের হাতে তাদের ধন-সম্পদ কিছুই থাকবে না। তখন দাজ্জাল এক পতিত স্থান অতিক্রমকালে সেটাকে সম্বোধন করে বলবে, তুমি তোমার গুপ্তধন বের করে দাও। তখন যমীনের ধন-ভাণ্ডার বের হয়ে তার চতুরপার্শ্বে একত্রিত হতে থাকবে, যেমন মধু মক্ষিকা তাদের সর্দারের চারপাশে সমবেত হয়।
অতঃপর দাজ্জাল এক যুবক ব্যক্তিকে ডেকে আনবে এবং তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তীরের লক্ষ্যস্থলের ন্যায় দু’ টুকরো করে ফেলবে। তারপর সে আবার তাকে আহ্বান করবে। যুবক আলোকময় হাস্যোজ্জল চেহারায় তার সম্মুখে এগিয়ে আসবে। এ সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈসা ইবনু মারিয়াম (আলাইহিস সালাম)-কে প্রেরণ করবেন। তিনি দু’ ফেরেশতার কাঁধের উপর ভর করে ওয়ারস ও জাফরান রং এর জোড়া কাপড় পরিহিত অবস্থায় দামেশক নগরীর পূর্ব দিকের উজ্জল মিনারে অবতরণ করবেন। যখন তিনি তাঁর মাথা ঝুঁকবেন তখন ফোটা ফোটা ঘাম তাঁর শরীর থেকে গড়িয়ে পড়বে। তিনি যে কোন কাফেরের নিকট যাবেন, সে তার শ্বাসের বাতাসে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁর দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত যাবে, তাঁর শ্বাসও ততদূর পর্যন্ত পৌঁছবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করতে থাকবেন। অবশেষে তাকে ‘বাবে লুদ’ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করবেন এবং তাকে হত্যা করবেন।
অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) ঐ সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আলাইহিস সালাম) তাদের নিকটে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি অহি নাযিল করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটিয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তা‘আলা ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়কে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি ‘বুহাইরায়ে তাবরিয়া’র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?
তারা আল্লাহর নবী (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশত দীনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবী (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আযাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে যমীনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না, যেখানে তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবেন।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে যমীন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় যমীনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে যমীন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন কর এবং তোমার বরকত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নীচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বরকত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভী একগোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরী এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে।[১]
শিক্ষনীয় বিষয়
১. দাজ্জালের ফিতনা সংঘটিত হওয়া সত্য এবং এমন কোন নবী ছিলেন না, যিনি তাঁর জাতিকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেননি। আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ফাতাওয়ায় বলেন, ‘পৃথিবীর বুকে আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টি থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ফিতনা হল দাজ্জালের ফিতনা। যেমনটি নবী (ﷺ) বলেছেন। এই কারণেই নূহ (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত এমন কোন নবী আসেননি, যিনি তাঁর জাতিকে দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক করেননি, তার ভয়াবহতা বর্ণনা করেননি এবং তা থেকে ভয় প্রদর্শন করেননি। অন্যথায় আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই জানেন যে, শেষ যুগ ছাড়া বের হবে না। কিন্তু রাসূলগণকে তাঁদের জাতিকে এ বিষয়ে সতর্ক করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, যাতে তার ভয়াবহতা ও মহা বিপর্যয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে নবী করীম (ﷺ) থেকে ছহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘তবে শোন, আমি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকাবস্থায় দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি নিজের পক্ষ হতে তাকে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আল্লাহ তা‘আলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধানকারী’।[২] এই হাদীছটি ছহীহ মুসলিম-এ নাওয়াস ইবনু সাম‘আন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত হয়েছে।
নিশ্চয়ই খলীফা আমাদের রব মহান ও সুউচ্চ। এই দাজ্জাল নামক ব্যক্তি অত্যন্ত ভয়ংকর; বরং আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করার পর থেকে ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ফিতনা, যেমনটি হাদীছে এসেছে। তাই উপযুক্ত ছিল যে, মানুষ ছালাতের মধ্যে তার ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনায় বিশেষ গুরুত্ব দিবে।
اللهم إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে জাহান্নাম ও কবরের আযাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিতনার ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’।[৩] এটি ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছ থেকে।
২. আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন দাজ্জালের আবির্ভাবস্থল সম্পর্কে বলেন, দাজ্জাল পূর্ব দিক থেকে বের হবে, সেখানে ফিতনা ও অনিষ্টের উৎস। যেমন নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, الفتنة هاهنا ‘ফিতনা এখানে’। [৪] ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর হাদীছ থেকে বর্ণিত।
তিনি পূর্ব দিক থেকে ইঙ্গিত করেছিলেন। কারণ পূর্বাঞ্চলই হল অনিষ্ট ও ফিতনার উৎসস্থান। দাজ্জাল পূর্ব দিকের খোরাসান অঞ্চল থেকে বের হবে। সে ইছফাহান হয়ে শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী (الجزيرة) অঞ্চলে প্রবেশ করবে। মদীনা ছাড়া তার জন্য আর কোন স্থান থাকবে না। কারণ সেখানে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী নবী (ﷺ) অবস্থান করেছেন। তাই সে মদীনাবাসীদের ধ্বংস করতে চাইবে, কিন্তু তার জন্য সেখানে প্রবেশ হারাম করে দেয়া হয়েছে। সেখানে নবী করীম (ﷺ) থেকে প্রমাণিত হয়েছে, المَدِينَةُ يَأْتِيهَا الدَّجَّالُ فَيَجِدُ المَلاَئِكَةَ يَحْرُسُونَهَا فَلاَ يَقْرَبُهَا الدَّجَّالُ ‘মদীনার দিকে দাজ্জাল আসবে, সে ফেরেশতাদেরকে মদীনা প্রহরারত অবস্থায় দেখতে পাবে। অতএব দাজ্জাল এর নিকটবর্তী হবে না’।[৫] এটি ছহীহ বুখারী-এ আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছ থেকে’।[৬]
এই লোকটি শাম (সিরিয়া) ও ইরাকের মধ্যবর্তী একটি অনুর্বর ভূমি থেকে বের হবে। তার অনুসারীদের মধ্যে থাকবে ইছফাহানের ৭০ হাজার ইয়াহূদী; কারণ তারাই হবে তার সৈন্যবাহিনী। ইয়াহূদীরা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, আর এই উম্মত হল আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তাই তারা দাজ্জালকে অনুসরণ করবে, তাকে সহযোগিতা করবে এবং তাকে সমর্থন দিবে। তারা তার জন্য সশস্ত্র সৈন্যে পরিণত হবে- অর্থাৎ তারা হবে তার সহকারী বাহিনী এবং তাদের অনুসারীরাও তাই করবে। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, يَا عِبَادَ اللهِ فَاثْبُتُوا ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অটল থাকবে’।[৭] (হাদীছটি নাওয়াস ইবনু সাম‘আন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর দীর্ঘ হাদীছের একটি অংশ)।
আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে; কারণ বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,
مَنْ سَمِعَ بِالدَّجَّالِ فَلْيَنْأَ عَنْهُ فَوَاللّٰهِ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَأْتِيهِ وَهُوَ يَحْسِبُ أَنَّهُ مُؤْمِنٌ فَيَتَّبِعُهُ مِمَّا يَبْعَثُ بِهِ مِنَ الشُّبُهَاتِ
‘কেউ দাজ্জালের আবির্ভাবের কথা শুনলে সে যেন তার থেকে দূরে চলে যায়। আল্লাহর কসম! যে কোনো ব্যক্তি তার নিকট এলে সে অবশ্যই মনে করবে যে, সে ঈমানদার। অতঃপর সে তার দ্বারা তার মধ্যে জাগরিত সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে অনুসরণ করবে’।[৮]
মানুষ তার নিকট গিয়ে বলতে পারে, ‘সে কখনোই আমাকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না এবং আমি তার দ্বারা প্রভাবিত হব না’। কিন্তু দাজ্জাল ক্রমাগত তার মনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি নিক্ষেপ করতে থাকবে, অবশেষে সে দাজ্জালের অনুসারী হয়ে যাবে।
৩. ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব’-এ বলেন, যখন তাঁকে শেষ যুগে প্রকাশিত হওয়া মাসীহ দাজ্জাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো- সে কি কথা বলবে? আর যদি কথা বলেন, তবে কোন ভাষায় কথা বলবে? তখন তিনি উত্তর দিলেন- ‘হ্যাঁ, সে কথা বলবে। সে শেষ যুগে আবির্ভূত হবে এবং সে আদম সন্তানেরই একজন। বাহ্যিকভাবে হাদীছসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সে আরবী ভাষায় কথা বলবে।’ তার সাথে এমন সব আশ্চর্যজনক ঘটনা ও ফিতনা থাকবে, যা মানুষের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। তার সাথে একটি নদী থাকবে, সেটিকে সে জান্নাত বলে দাবী করবে; আর আরেকটি নদী থাকবে, সেটিকে সে জাহান্নাম বলে দাবী করবে। তার হাতে অনেক অলৌকিক ধরনের বিষয় প্রকাশ পাবে- এগুলো হবে মানুষের জন্য পরীক্ষা ও বিপদস্বরূপ। একারণেই আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন আমরা প্রত্যেক ছালাতের শেষাংশে তার ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমাদেরকে এ দু‘আ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে
اللهم إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ .
‘হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় ভিক্ষা করছি জাহান্নামের আযাব হতে, কবরের আযাব হতে, জীবন ও মৃত্যুকালীন ফিতনা হতে এবং দাজ্জালের ফিতনা হতে’।[৯]
দাজ্জাল হবে একচোখা। তার ডান চোখ ত্রুটিযুক্ত থাকবে। তার দুই চোখের মাঝখানে كافر (কাফের) লেখা থাকবে। প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি তা পড়তে পারবে- সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত। এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত যে, তিনি এমন একটি নিদর্শন নির্ধারণ করেছেন, যার মাধ্যমে মুমিনরা তাকে চিনতে পারবে এবং তার ধোঁকায় পড়বে না। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, مَا بَيْنَ خَلْقِ آدَمَ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ خَلْقٌ أَكْبَرُ مِنَ الدَّجَّالِ ‘আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টির পর থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় কোন ফিতনা নেই’।[১০] এটি মহা ফিতনা। সুতরাং যে ব্যক্তি তার সময় পাবে, তার জন্য কর্তব্য হলো- দাজ্জাল থেকে সতর্ক থাকা, তার দ্বারা প্রতারিত না হওয়া এবং তাকে মিথ্যাবাদী মনে করা।
৪. দাজ্জালের জন্য আল্লাহ তা‘আলা কিছু মহান নিদর্শন (অলৌকিক ক্ষমতা) প্রদান করবেন। আল্লামা উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘মাজমুঊ ফাতাওয়া ও রাসাইল’-এ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম হিকমত হলো, তিনি দাজ্জালকে এমস কিছু নিদর্শন (ক্ষমতা) দেবেন, যার মধ্যে মানুষের জন্য বিরাট পরীক্ষা ও ফিতনা থাকবে। দাজ্জাল কোনো জাতির নিকট এসে তাদেরকে তার অনুসরণের আহ্বান জানাবে। তারা তার অনুসরণ করবে। ফলে তারা এমন অবস্থায় সকাল করবে যে, তাদের যমীনে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে এবং গবাদি পশুসমূহ পরিপুষ্ট ও মোট-তাজা হয়ে যাবে। তাদের পশুগুলো পূর্বের তুলনায় অধিক উঁচু কুঁজবিশিষ্ট, অধিক দুধে ভরা থনবিশিষ্ট এবং অধিক মোটাসোটা পার্শ্ববিশিষ্ট হয়ে তাদের নিকট ফিরে আসবে। অর্থাৎ দাজ্জালের অনুসরণ করার কারণে তারা বাহ্যিকভাবে প্রচুর প্রাচুর্য, সম্পদ ও সুখ-সমৃদ্ধি লাভ করবে।
দাজ্জাল কোনো সম্প্রদায়ের নিকট এসে তাদেরকে নিজের অনুসরণ করার আহ্বান জানাবে। কিন্তু তারা যদি তার অনুসরণ না করে, তাহলে তারা এমন অবস্থায় উপনীত হবে যে, তাদের সম্পদ-সম্পত্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং তারা দারিদ্র্যের মধ্যে সকাল করবে। এটি একটি ভয়াবহ পরীক্ষা, বিশেষত গ্রামাঞ্চল ও মরুভূমির অধিবাসীদের জন্য। আর সে কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের পাশ দিয়ে গিয়ে বলবে, ‘তোমার গুপ্তধন বের করে আনো’। তখন সেই জনপদের গুপ্তধন বের হয়ে আসবে এবং মৌমাছির ঝাঁক যেমন রাণী মৌমাছির পেছন চলে, তেমনি স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য ধন-সম্পদ তার পেছনে চলতে থাকবে। কোনো যন্ত্র বা বাহ্যিক উপকরণ ছাড়াই এমনটি ঘটবে। এটি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা। পৃথিবীর ভোগ-বিলাসে আসক্ত কিংবা দুনিয়াবী স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন ফিতনা।
দাজ্জালের অন্যতম বড় ফিতনা হলো, আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে এমন কিছু রাখবেন, যা মানুষের চোখে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো প্রতীয়মান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হবে সম্পূর্ণ উল্টো। তার তথাকথিত ‘জান্নাত’ আসল জলন্ত আগুন, আর তার তথাকথিত ‘জাহান্নাম’ প্রকৃতপক্ষে জান্নাতস্বরূপ। যে ব্যক্তি দাজ্জালের আনুগত্য করবে, সে তাকে মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতসদৃশ স্থানে প্রবেশ করাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে ভয়ংকর অগ্নিকুণ্ড-আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তা থেকে হেফাযত করুন। আর যে ব্যক্তি দাজ্জালের অবাধ্য হবে, তাকে সে মানুষের দৃষ্টিতে আগুনে নিক্ষেপ করবে। অথচ বাস্তবে তা হবে জান্নাত এবং সেখানে থাকবে সুস্বাদু ও নির্মল পানি।
অতএব এ পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে দৃঢ় ঈমান ও অবিচলতা অত্যন্ত প্রয়োজন। আল্লাহ যদি কোনো বান্দাকে সত্যের উপর অটল না রাখেন, তবে সে ধ্বংস ও পথভ্রষ্টতায় পতিত হতে পারে। সুতরাং প্রত্যেক মুমিনের উচিত, আল্লাহর নিকট এ দু‘আ করা যে, তিনি যেন তাকে তাঁর দ্বীনের উপর দৃঢ় ও অবিচল রাখেন এবং সকল ফিতনা, বিশেষত দাজ্জালের ফিতনা থেকে হেফাযত করেন-আমীন!!
দাজ্জালের অন্যতম ফিতনা হলো, এক সময় মানুষের মধ্য থেকে এক যুবক তার সামনে এসে দাঁড়াবে। সে হবে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী ও সাহসী একজন মুমিন যুবক। সে দাজ্জালকে উদ্দেশ্য করে বলবে, ‘তুমিই সেই দাজ্জাল, যার সম্পর্কে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ দিয়েছেন’। তখন দাজ্জাল তাকে নিজের অনুসরণ করার আহ্বান জানাবে। কিন্তু যুবকটি তার অনুসরণ করতে অস্বীকার করবে। ফলে দাজ্জাল প্রথমে তাকে আঘাত করবে এবং তার মাথা ফাটিয়ে দিবে। এরপর তাকে হত্যা করবে এবং তার দেহকে দুই টুকরো করে ফেলবে। দাজ্জাল সেই দুই খণ্ড দেহের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাবে, যেন সবাই সম্পষ্টভাবে বুঝতে পারে যে, দেহটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এরপর সে তাকে পুনরায় ডাকবে।
অতঃপর সেই যুবক আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। তার চেহারা আনন্দ ও ঈমানের জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে আবার বলবে, ‘তুমিই সেই দাজ্জাল, যার সম্পর্কে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জানিয়েছেন’। এরপর দাজ্জাল আবার তাকে হত্যা করতে চাইবে। কিন্তু এবার সে তার উপর কোনো ক্ষমতা পাবে না এবং তাকে হত্যা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়বে। আর এই ঘটনার পর দাজ্জাল অন্য কাউকেও এভাবে হত্যা করার ক্ষমতা পাবে না। আল্লাহর নিকট এই যুবক মানুষের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। কারণ সে এমন এক ভয়ংকর ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে, যার প্রকৃত ভয়াবহতা কেবল সেই উপলব্ধি করতে পারে, যে এর সম্মুখীন হয়েছে। তবুও সে মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করবে এবং সতর্ক করবে যে, ‘তুমিই সেই দাজ্জাল, যার সম্পর্কে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ দিয়েছেন’। এভাবেই সে দাজ্জালের প্রকৃত পরিচয় ও তার ভ্রান্ত আহ্বানকে মানুষের সামনে উন্মোচিত করবে।
৫. প্রশ্ন : আল্লামা ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে দাজ্জাল পৃথিবীতে কতদিন অবন্থান করবে-এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।
উত্তর : তিনি বলেন, দাজ্জাল পৃথিবীতে মোট চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। তবে সেই চল্লিশ দিনের মধ্যে একটি দিন হবে এক বছরের সমান, একটি দিন হবে এক মাসের সমান, একটি দিন হবে এক সপ্তাহের সমান, আর বাকি দিনগুলো হবে আমাদের সাধারণ দিনগুলোর মতো। এভাবেই নবী করীম (ﷺ) আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। তখন ছাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! যে দিনটি এক বছরের সমান হবে, সে দিনে কি এক দিনের ছালাতই যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, ‘না; বরং তোমরা সময় অনুমান করে (প্রতিটি ছালাতের) নির্ধারিত সময় হিসাব করবে’। এই ঘটনাটি গভীরভাবে লক্ষ্য করুন, যাতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। দেখুন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবাগণ তাঁর কথাকে কীভাবে সত্য বলে গ্রহণ করতেন। তাঁরা এ কথাকে বিকৃত করার চেষ্টা করেননি এবং বলেননি যে, ‘একটি দিন এত দীর্ঘ হওয়া সম্ভব নয়; কারণ সূর্য তো তার কক্ষপথে চলতে থাকে এবং তার গতিতে কোনো পরিবর্তন হয় না। তাঁরা এমনও বলেননি যে, ‘দিনটি দীর্ঘ মনে হবে কেবল কষ্ট ও দুর্ভোগের আধিক্যের কারণে; বাস্তবে দিন দীর্ঘ হবে না’। যেমন আজকাল কিছু বক্তা এ ধরনের ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। বরং ছাহাবাগণ বিশ্বাস করেছেন যে, সেই দিনটি প্রকৃত অর্থেই বারো মাসের সমান হবে- কোনো প্রকার বিকৃতি, অপব্যাখ্যা বা মনগড়া তা‘বীল ছাড়াই।
এটাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) গায়েবী বিষয় সম্পর্কে যা সংবাদ দিয়েছেন, মুমিন তা মেনে নেয়; যদিও তার বুদ্ধি সে বিষয়ে বিস্মিত বা ভ্রান্ত হয়ে যায়। তবে জানা উচিত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সংবাদ এমন কোনো বিষয় নয়, যা বিবেক-বুদ্ধির দৃষ্টিতে অসম্ভব। বরং এমন বিষয় হতে পারে, যার প্রকৃত রহস্য মানুষের বোধগম্যতার বাইরে থাকায় বুদ্ধি সেখানে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ দিয়েছেন যে, দাজ্জালের আবির্ভাবের সময় প্রথম দিনটি এক বছরের সমান দীর্ঘ হবে। যদি এই হাদীছটি পরবর্তী যুগের সেইসব লোকের কাছে পৌঁছত, যারা নিজেদেরকে খুব বুদ্ধিমান মনে করে, তবে তারা বলত, ‘এটি প্রকৃত অর্থে নয়; বরং কষ্ট ও দুর্ভোগের দীর্ঘতার রূপক। কারণ আনন্দের দিনগুলো ছোট মনে হয় আর দুঃখ-কষ্টের দিনগুলো দীর্ঘ মনে হয়’। কিন্তু ছাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর অন্তর ছিল নির্মল ও স্বচ্ছ। তাই তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই তা মেনে নিয়েছিলেন এবং তাদের অবস্থা যেন এ কথাই প্রকাশ করছিল। যিনি সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন এবং দিন-রাত মিলিয়ে চব্বিশ ঘন্টায় তাকে পরিভ্রমণ করান, তিনি চাইলে তাকে বারো মাসেও পরিভ্রমণ করাতে সক্ষম। কারণ সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ, আর তিনি সর্বশক্তিমান। তাই ছাহাবাগণ এ সংবাদকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা তখন কীভাবে ছালাত আদায় করব? ..........তাঁরা মহাজাগতিক বা সৃষ্টিগত বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি। কারণ তারা জানতেন, আল্লাহর ক্ষমতা তাদের উপলব্ধির অনেক ঊর্ধ্বে। বরং তারা শারঈ বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, যে বিধানের অনুসরণে তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত; আর তা হলো ছালাত। আল্লাহর কসম! এটাই প্রকৃত আনুগত্য এবং গ্রহণযোগ্যতার বাস্তব নমুনা। তারা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! যে দিনটি এক বছরের সমান দীর্ঘ হবে, সে দিনে কি এক দিনের ছালাতই যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, ‘না; বরং সময়ের হিসাব নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ছালাত আদায় করবে’। মহান আল্লাহ কতই না পবিত্র! গভীরভাবে চিন্তা করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই দ্বীন পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ। ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজন হতে পারে-এমন কোনো মাসআলা নেই, যার মূলনীতি এ দ্বীনের মধ্যে পাওয়া যায় না। আল্লাহ কী সুন্দরভাবে ছাহাবায়ে কিরামকে এ প্রশ্নটি করার তাওফীক্ব দিয়েছিলেন! তিনি তাদের মুখে এ প্রশ্ন উচ্চারিত করিয়েছিলেন, যাতে দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হয়ে যায় এবং পরে আর কোনো সংযোজনের প্রয়োজন না থাকে। আজ আমরা বাস্তবেই এই হাদীছের প্রয়োজন অনুভব করছি। কারণ পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের কিছু স্থানে ছয় মাস রাত এবং ছয় মাস দিন থাকে। সুতরাং এ ধরনের পরিস্থিতিেিত আমাদের এই হাদীছের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়।
লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কীভাবে এই সমস্যাটি সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই এ বিষয়ে ফৎওয়া প্রদান করেছেন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে বলেছেন, اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম’ (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫/৩)। আল্লাহর কসম! যদি আমরা এই বাণীটির প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করি (اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ) ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম’-তবে আমরা বুঝতে পারব যে, দ্বীনের মধ্যে কোনো ঘাটতি বা অপূর্ণতা নেই। দ্বীন সর্বদিক থেকে পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ। তবে ঘাটতি আমাদের মধ্যেই রয়েছে। কখনো আমাদের বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণে, কখনো বুঝার অক্ষমতার কারণে, আবার কখনো নিয়ন্ত্রণহীন প্রবৃত্তি ও ইচ্ছার কারণে। অনেক সময় মানুষ নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, ফলে সত্যকে দেখতে অন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলার নিকট আমরা নিরাপত্তা কামনা করছি। যদি আমরা জ্ঞান, সঠিক উপলব্ধি এবং উত্তম নিয়তের সাথে বিষয়গুলো বিচার করি, তাহলে দেখতে পাব যে-আলহামদুলিল্লাহ, দ্বীনের কোনো পরিপূরক বা সংযোজনের প্রয়োজন নেই এবং দ্বীনের কোনো বিষয়কে পূর্ণ করার জন্য অন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। এমন কোন ছোট বা বড় সমস্যা নেই, যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহ-তে পাওয়া যায় না। কিন্তু যখন মানুষের মধ্যে প্রবৃত্তির অনুসরণ বৃদ্ধি পেল এবং তা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করল, তখন এমন অবস্থা সৃষ্টি হল যে, অনেক মানুষের নিকট সত্য অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং তারা সত্যকে চিনতে পারে না। আপনি দেখবেন, যখন কোনো নতুন ঘটনা বা সমস্যা সামনে আসে-যখন নির্দিষ্ট রূপ আগে পরিচিত ছিল না, যদিও তার মূল প্রকৃতি পরিচিত। তখন মানুষ সে বিষয়ে এত বেশি মতভেদে লিপ্ত হয় যে, তা গুনে শেষ করা যায় না। কোনো বিষয় যদি মাত্র দু’টি মতামতের সম্ভাবনা রাখে, তবুও সেখানে আপনি দশটি মতামত দেখতে পাবেন। এসবরে মূল কারণ হল, বর্তমান যুগে মানুষের ওপর প্রবৃত্তির প্রভাব অত্যন্ত বেশী। অন্যথায়, যদি উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ হতো, উপলব্ধি স্বচ্ছ হতো এবং জ্ঞান বিস্তৃত হত, তাহলে সত্য সুস্পষ্টভাবেই প্রকাশিত হয়ে যেত।
যাই হোক, আমি বলি, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ দিয়েছেন যে, দাজ্জাল পৃথিবীতে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। আর সেই চল্লিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ তাঁর নিকট উঠিয়ে নেওয়া মারিয়ামের পুত্র মসীহ ঈসা (আলাইহিস সালাম) অবতরণ করবেন। ছহীহ হাদীছসমূহে বর্ণিত আছে যে, তিনি দামেস্ক নগরীর পূর্ব দিকে অবস্থিত সাদা মিনারের নিকটে অবতরণ করবেন। সে সময় তাঁর দুই হাত দুই ফেরেশতার ডানার উপর রাখবে। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন, তখন সেখান থেকে পানির ফোটা ঝরবে; আর যখন মাথা উঁচু করবেন, তখন তা থেকে মুক্তার মতো উজ্জ্বল দানার ন্যায় ফোঁটা গড়িয়ে পড়বে। কোনো কাফের যদি তাঁর সুগন্ধ অনুভব করে, তবে সে মৃত্যুবরণ না করে থাকতে পারবে না। এটি আল্লাহ তা‘আলার মহান নিদর্শনসমূহের একটি। অতঃপর তিনি ফিলিস্তিনের ‘বাবে লুদ’ নামক স্থানে দাজ্জালকে অনুসরণ করে ধরবেন এবং সেখানেই তাকে হত্যা করবেন। এর মাধ্যমে দাজ্জালের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটবে। ঈসা (আলাইহিস সালাম) তখন ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করবেন না। তিনি জিযিয়া গ্রহণ করবেন না, ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন এবং শূকর হত্যা করবেন। ফলে একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করা হবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করা হবে না। এ ভিত্তিতে বলা যায় যে, ইসলাম নির্ধারিত জিযিয়া ব্যবস্থারও একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে; যা ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণের পর সমাপ্ত হয়ে যাবে।
এ কথা বলা যাবে না যে, এটি ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রবর্তিত কোনো নতুন বিধান। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিষয়ে পূর্বেই সংবাদ দিয়েছেন এবং তা সমর্থনও করেছেন। সুতরাং ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণের পর জিযিয়া রহিত হয়ে যাওয়াও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাত বলতে তাঁর কথা, তাঁর কর্ম এবং তাঁর অনুমোদন (সমর্থন)-কে বোঝায়। আর তিনি যখন মারিয়ামের পুত্র ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর কার্যাবলীর কথা উল্লেখ করে তা সমর্থন করেছেন, তখন সেটিও তাঁর সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। অন্যথায় ঈসা (আলাইহিস সালাম) কোনো নতুন শরী‘আত নিয়ে আসবেন না। তাঁর পরে কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি ক্বিয়ামত পর্যন্ত নতুন কোনো শরী‘আত নিয়ে আসবে না। ক্বিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর ও অনুসরণীয় শরী‘আত হল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শরী‘আতই। দাজ্জাল সম্পর্কে এ পর্যন্তই আলোচনা। আমরা আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাকে ও আপনাদেরকে সবাইকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখেন’।[১১]
৬. দাজ্জালের ফিতনা থেকে আত্মরক্ষার অন্যতম উপায় হলো সূরা আল-কাহফের প্রথম দশটি আয়াত তেলাওয়াত করা। যেমনটি ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতএব যখন তোমরা দাজ্জালকে দেখতে পাবে, তখন তার সামনে সূরা আল-কাহফের প্রারম্ভিব আয়াতসমূহ পাঠ করবে’।
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭; মিশকাত, হা/৫৪৭৫।
[২]. মাজমুঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩, ফাতাওয়া নং-১৪০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭; মিশকাত, হা/৫৪৭৫।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮৮ ‘শব্দ বিন্যাস তাঁরই’; মিশকাত, হা/৯৪০।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯০৫।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩৪।
[৬]. মাজমু‘ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪, ফাতাওয়া নং-১৪২।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭; মিশকাত, হা/৫৪৭৫।
[৮]. আবূ দাঊদ, হা/৪৩১৯; মিশকাত, হা/৫৪৮৮, সনদ ছহীহ।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮৮।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৪৬।
[১১]. শায়খ উছাইমীন, মাজমুঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ১৬ তম খণ্ড, পৃ. ১৯।