অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর
-খশিউর রহমান বিন মুনসুর*
এখন ঘর থেকে বের হওয়া মানেই যেন অনিশ্চয়তার দিকে এক নীরব যাত্রা। কে জানে, এই বের হওয়াই শেষ বের হওয়া কি না! ফিরে আসতে পারবো কি না, এই প্রশ্নটা যেন অদৃশ্যভাবে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে লেগে থাকে। একটি ফোনকল, একটি ছোট্ট খবর, আর তাতেই ভেঙে পড়ে একটি পরিবার, নিভে যায় একটি ঘরের আলো। যে মানুষটি সকালবেলা হাসিমুখে বের হয়েছিল, সন্ধ্যায় তারই নিথর দেহ ফিরে আসে, কখনো কফিনে, কখনো অ্যাম্বুলেন্সে, আবার কখনো আর ফিরেই আসে না।*
কত পরিবার আছে, যেখানে সেই মানুষটিই ছিল একমাত্র উপার্জনকারী, তার কাঁধেই ছিল পুরো সংসারের ভার। তার চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু একজন মানুষ হারায় না, হারিয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভেঙে পড়ে ভবিষ্যতের সমস্ত পরিকল্পনা। ছোট ছোট সন্তানেরা হারায় তাদের আশ্রয়, বৃদ্ধ মা-বাবা হারায় তাদের ভরসা। এক মুহূর্তেই সবকিছু থেমে যায়, হাসি থেমে যায়, চুলা নিভে যায়, জীবন হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ ও অন্ধকারময়।
গত সাত দিনের (১৮/০৩/২৬ থেকে ২৫/০৩/২৬) পত্রিকার পাতাগুলো যেন শোকের কালো অক্ষরে ভরে উঠেছে। দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ২০৭ জন মানুষের। কিন্তু আমরা সবাই জানি, সংখ্যাটা এখানেই থেমে নেই। পত্রিকার পাতায় যে সংখ্যা উঠে আসে, তার বাইরেও রয়েছে অসংখ্য নামহীন মৃত্যু, অগণিত অজানা গল্প, যাদের কান্না কেউ শোনে না, যাদের ব্যথা কেউ লিখে না।
আরো এমন অনেক দূর্ঘটনা আছে, যে দুর্ঘটনাতে নিখোঁজ রয়েছে অনেক প্রাণ, কোথায় তারা, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না, কউ জানে না। তাদের পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে দুঃসহ অপেক্ষায়, অনিশ্চয়তার দহন নিয়ে। প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে বুক কেঁপে ওঠে, এই বুঝি কোনো খবর এলো! কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সেই অপেক্ষা রয়ে যায় শূন্যতায়।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও কখনো কখনো এত মানুষের মৃত্যু একসঙ্গে ঘটে না। অথচ আমাদের দেশে কোনো যুদ্ধ নেই, তবুও প্রতিদিন আমরা হারাচ্ছি আমাদের আপনজনদের। সড়ক দুর্ঘটনা যেন আমাদের নীরব যুদ্ধ, যেখানে নেই কোনো সাইরেন, নেই কোনো যুদ্ধঘোষণা, কিন্তু প্রতিদিন লাশের মিছিল বাড়ছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ হেরে যাচ্ছে এই অদৃশ্য যুদ্ধে।
এরই মাঝে আরও বেদনাদায়ক এক বাস্তবতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। গত বুধবার ২৫ মার্চের বাস দুর্ঘটনায় বলা হচ্ছে, নিহতদের পরিবার পাবে ২৫ হাজার টাকা! আর আহতদের পরিবার পাবে ১৫ হাজার টাকা। এই ঘোষণাটি শুনে বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে ওঠে।
একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ, সবকিছুর মূল্য কি তাহলে মাত্র ২৫ হাজার টাকা? একজন আহত মানুষের যন্ত্রণা, তার সারাজীবনের কষ্ট, সেটার মূল্য কি মাত্র ১৫ হাজার টাকা? যে মানুষটি প্রতিদিন আয় করে পরিবার চালাত তার অনুপস্থিতিতে এই সামান্য অর্থ কতদিনই বা চলবে? যে মানুষটি দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে গেল, তার চিকিৎসা আর জীবনের সংগ্রাম কি এতটুকু টাকায় মিটবে? একটি শিশুর বাবাহারা হওয়া বা এক মায়ের একমাত্র সন্তান হারানো, এসব বেদনার কি কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায়?
এখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি মানুষের জীবন এতটাই সস্তা হয়ে গেছে? মানুষের জীবন কি তবে এভাবে টাকার অঙ্কে কেনাবেচা করা যায়? এ যেন শুধু কিছু অর্থের ঘোষণা নয়, এ যেন আমাদের অসহায়তার এক নীরব স্বীকারোক্তি, যেখানে একটি জীবনের প্রকৃত মূল্য কোনো সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
প্রতিদিন এত শোক, এত কান্না, এত লাশ, সবকিছু দেখতে দেখতে আমাদের হৃদয় যেন ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ছে। আগে যেখানে একটি মৃত্যু আমাদের কাঁদাতো, এখন শত মৃত্যুর খবরও আমাদের ভেতরকে তেমন নাড়িয়ে দিতে পারে না। আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি লাশের সংখ্যা গুনতে, দুর্ঘটনার খবর জানতে, শোকের গল্প পড়তে। সত্যিই, আমরা যেন সেই অবস্থায় পৌঁছে গেছি, ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’।
এ এক ভয়াবহ সময়, যেখানে মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু নিরাপদ নয়; চলাফেরা করছে, কিন্তু নিশ্চিন্ত নয়; হাসছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয় নিয়ে বেঁচে আছে। এ এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে আমরা জীবনের পথে চলছি, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর ছায়া আমাদের পিছু নিয়েছে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু শোক প্রকাশ করে থেমে থাকতে পারি না। প্রতিদিন এত প্রাণ ঝরে পড়ছে, এত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, এগুলো আর শুধুই দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান জাতীয় সংকট। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি আমাদের কিছু যরূরী প্রত্যাশা ও দাবি।
>> সরকারের করণীয়
১. আইন ও শাস্তির কঠোর প্রয়োগ
- ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা
- লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া
- অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং ও মাদকাসক্ত অবস্থায় ড্রাইভিংয়ের শাস্তি বাড়ানো
২. উন্নত সড়ক অবকাঠামো
- রাস্তা প্রশস্ত ও মানসম্মত করা
- ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও কালো স্পটগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করা
- পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড, স্পিড ব্রেকার ও লেন মার্কিং নিশ্চিত করা
৩. চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থা
- ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
- পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া
- দক্ষতা যাচাই ছাড়া লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা
৪. যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ
- নিয়মিত ফিটনেস চেক বাধ্যতামূলক করা
- ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা
৫. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন
- আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও সিসিটিভি স্থাপন
- প্রশিক্ষিত ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি
৬. গণসচেতনতা বৃদ্ধি
- মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা
- স্কুল-কলেজে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা
৭. মানবিক ও বাস্তবসম্মত ক্ষতিপূরণ
- নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক সহায়তা নিশ্চিত করা।
৮. দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা
- দুর্ঘটনার পরপরই যরূরী সেবা ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
>> জনগণের করণীয়
১. ট্রাফিক আইন মেনে চলা
- সিগন্যাল মানা ও নির্ধারিত গতিসীমা অনুসরণ করা
- হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার করা
২. সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণ
- রাস্তা পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করা
- মোবাইল ফোন ব্যবহার করে রাস্তা পারাপার বা ড্রাইভিং না করা
৩. অনিয়মের প্রতিবাদ করা
- বেপরোয়া চালনা ও নিয়মভঙ্গ দেখলে প্রতিবাদ করা
- প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো
৪. যানবাহন ব্যবহারে সতর্কতা
- ফিটনেসবিহীন যানবাহনে না ওঠা
- চালক ক্লান্ত বা অসুস্থ হলে তাকে বিশ্রাম নিতে বলা
৫. সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা
- পরিবার ও আশপাশের মানুষকে সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা
- শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সঠিক নিয়ম শেখানো
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো একক কারণে ঘটে না; এটি বহু কারণের সমষ্টি। তাই সরকার ও জনগণ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল আচরণই এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই সড়ক হবে নিরাপদ।
অতএব আমরা বলতে চাই, আমাদের দাবি একটাই, মানুষের জীবনের মূল্য যেন কাগজের অঙ্কে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হোক।
সবশেষে আমরা মহান আল্লাহ তা‘আলার নিকট দু‘আ করি, হে আল্লাহ! আমাদের দেশ ও সড়কগুলোকে নিরাপদ করুন, সকল দুর্ঘটনা থেকে আমাদের হেফাজত করুন। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের ক্ষমা করুন, আহতদের পূর্ণ শিফা দিন। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফীক্ব দিন, যেন মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে-আমীন!!
* মুতাদার্রিব, মাদরাসা দারুত তাওহীদ, ঢাকা ।
প্রসঙ্গসমূহ »:
শিশু-কিশোর