ফিলিস্তীনের কান্না
- মো. মশিউর রহমান বিন মো. মুনসুর আলী*
ভোরের আযান তখনো শেষ হয়নি। হঠাৎ আকাশ কেঁপে উঠল বোমার ভয়াবহ শব্দে। মুহূর্তেই চারদিকে ধুলোয় ঢেকে গেল সবকিছু, আকাশ-যমীন কালো হয়ে গেল। বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। মানুষের আর্তনাদ, শিশুদের কান্না, মায়েদের আহাজারি মিশে এক ভয়ংকর দৃশ্য তৈরি করল।
ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে বসে আছে সাত বছরের এক ছোট্ট শিশু, নাম আহমাদ। তার চোখে আতঙ্ক, মুখে তৃষ্ণা ও ক্ষুধার ছাপ। কিন্তু বুকের ভেতর শক্ত করে চেপে রেখেছে একটি ছেঁড়া স্কুল ব্যাগ। ব্যাগে নেই কোন বই, নেই কোন খাতা, আছে শুধু একটি ছোট্ট কুরআন মাজীদ। সে তাকিয়ে খুঁজছে, তার মা কোথায়? তার ভাই-বোন কোথায়? হঠাৎ ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটি দুর্বল শব্দ ভেসে এল- ‘আল্লাহ! আল্লাহ!! আল্লাহ!!!’। আহমাদ ছুটে গেল। দেখল তার ছোট বোন মারিয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। তার ছোট্ট হাত বেরিয়ে আছে, কাঁপছে। আহমাদ ছোট্ট হাতে ইট-পাথর সরাতে লাগল, চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। সে কাঁপা গলায় বলতে লাগল, ‘মারিয়াম! ভয় পেয়ো না বোন, আমি আছি তো। আমি তোমাকে একা ছাড়ব না। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তোমার কিচ্ছু হবে না। এমন সময় কিছু মানুষ ছুটে এল সাহায্য করতে। অবশেষে মারিয়ামকে টেনে বের করা গেল। কিন্তু সে তখনো অচেতন। আহমাদ বোনকে বুকে চেপে ধরে বলল, ‘আপু ও আপু আপুরে, উঠো না, কথা বল! তুমি কেন ঘুমাচ্ছ? উঠো, আমি তোমাকে স্কুলে নিয়ে যাব। ছুটি হলে দৌড়ে আসবো, উঠোনা আপু উঠো’। চারপাশে মানুষের ঢল, তারা দারিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল, তাদের চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। থামাতে পারলো না অশ্রু বিসর্জন। কেউ তো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। শহরের কোন আলো নেই, শুধু আগুন আর ধ্বংসাবশেষ। ছোট্ট আহমাদ বোনকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তখন একজন বিদেশি সাংবাদিক এগিয়ে এলো। সে ক্যামেরা তাক করে জিজ্ঞেস করল- ‘তুমি কী চাও’? আহমাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর চোখ মুছে বললÑ ‘আমি চাই, আমার মা যেন আর কাঁদে না। আমার নিষ্পাপ বোনটা যেন কথা বলে। আমার সহপাঠীরা আতঙ্কহীন জীবন ধারণ করবে’। আচ্ছা, তুমি ছবি তুলে কী করবে??!! আমি আমার বোনসহ সকাল হতে না খেয়ে বসে আছি। একফোঁটা পানি পর্যন্ত পায়নি আমরা। সাংবাদিক বিস্কুট ও পানি দিয়ে বলল, ‘এই নাও খাও’। ক্ষুধার তাড়নায় দ্রুত সাবার করে বলতে আরম্ভ করল, ‘সাংবাদিক স্যার! আমরা কি কিছু অন্যায়- অপরাধ করেছিলাম। আমরা কি তাদের কোন ক্ষতি করেছিলাম। তাহলে কেন??!! কেন আমাদের মত অসহায় অবুঝ নিষ্পাপ শিশুদের এই অমানবিক নিষ্ঠুর, নির্যাতন, নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার হতে হচ্ছে? এর কি কোন জবাব দিতে পারবেন’? সাংবাদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু যেখানে খেলনা, খাবার, সুন্দর বাড়ির স্বপ্ন দেখেÑ সেখানে একটি অবুঝ শিশু শুধু চাইলো, তার মা যেন না কাঁদে, বোন যেন কথা বলার সুযোগ পায়, সহপাঠীরা যেন আতঙ্কিত জীবন থেকে মুক্তি পায়।
রাত গভীর হলো। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু আহতদের গোঙানি শোনা যাচ্ছে। আহমাদ তখনো জেগে আছে। তার ছোট্ট হাতে ধরা কুরআন মাজীদ, বোনের মাথায় হাত রেখে সে ফিসফিস করে পড়ছে সূরা ফাতিহা। হঠাৎ এক বৃদ্ধ এসে তার মাথায় হাত রেখে বললেন- ‘বাছা, ভয় পেয়ো না। আমাদের ঘর ভেঙে গেছে, কিন্তু আমাদের ঈমান কেউ ভাঙতে পারবে না। দুনিয়ার সব শক্তি সীমিত, কিন্তু আল্লাহর দয়া অসীম। তিনি আমাদের সাহায্য করবেন’। শিশুটির চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। সে দুই হাত তুলে দু‘আ করল, ‘হে আল্লাহ! আমাদের ঘর ফিরিয়ে দিয়েন না। বরং জান্নাতে আমাদের জন্য আরও সুন্দর ঘর বানিয়ে দিন। আর আমাদেরকে একটু সস্তিতে বাচঁতে দিন। আমাদের মা বোনেরা যেন আর কখনো না কাঁদে’। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই ভেঙে পড়ল। কারো চোখ শুকনো রইল না। ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়ানো সেই শিশু সেদিন সবার শিক্ষক হয়ে গেল।
নৈতিকতার শিক্ষা : এই গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয়, প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, ধৈর্যে ও ঈমানে। ভালোবাসা মানে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাশে থাকা। মানবতা মানে দুঃখ ভাগ করে নেয়া, দয়া ও সহানুভূতি দেখানো। যখন দুনিয়ার বড় শক্তিধররা নীরব থাকে, তখন সেই ছোট্ট শিশুর অশ্রু মানবতার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। হে আল্লাহ! আমাদের হৃদয়কে নরম করুন, যেন আমরা অবুঝ শিশুদের কান্না শুনে জেগে উঠি। আমাদের শিখিয়ে দিন, নৈতিকতা মানে শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বরং দুঃখি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্ত শিশুর অশ্রু মুছে দেয়া, আর মায়ের চোখের পানি থামানো। আমীন!!
* প্রাক্তন শিক্ষার্থী, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্সে,রাজশাহী।