দ্বীনে কোন জবরদস্তি নেই : প্রেক্ষিত সালাফদের বুঝ
- ওবায়দুল্লাহ বিন মূসা*
হা-মিদান ওয়ামুছল্লিয়ান আম্মা বা’দ-
ভূমিকা
ইসলামের এই ক্রান্তিলগ্নে ফেতনার দারপ্রান্তে এসে শরী‘আহকে আমরা নিজেদের বুঝ অনুযায়ী বোঝার চেষ্টা করছি। হোক সেটা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অথবা অন্য কোন দুনিয়াবী কারণে। মূলত যামানা ও পরিস্থিতির পরিক্রমায় ইলমের উঁচু শিখায় পৌঁছানো আমাদের পৌঁছানো সম্ভব হয়ে উঠে না, যার কারনে কুরআন-হাদীছ নিজের মত বুঝতে গেলেও ভুল আর অপব্যাখ্যা করা যেন আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তজ্জন্য কুরআন ও হাদীছের মাফহূম বা বুঝ বুঝতে গিয়ে ‘ফাহমুস সালাফ’ বা সালাফদের বুঝের উপর নির্ভর করা উচিত। যাতে করে ভ্রষ্টতার জ্বালে আটকে না যাই। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে এ সংক্রান্ত কুরআন মাজীদের একটি আয়াত ও তার ব্যাখ্যা সালাফদের বুঝ অনুযায়ী তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
আলোচ্য আয়াত
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لَاۤ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ١ۙ۫ قَدْ تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ‘দ্বীনের মধ্যে জবরদস্তির কোন অবকাশ নেই, নিশ্চয় হিদায়াত গোমরাহী হতে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৫৬)।
সম্প্রতি দ্বীনের বিধি-বিধান বা হুকুম আহকাম সংক্রান্ত বিষয়ে লোকসমাজে প্রচারের ক্ষেত্রে আয়াতটির ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। এই উদ্দেশ্যে যে, দ্বীনের বিধিবিধান প্রয়োগে কোন জবরদস্তি নেই। অথচ উক্ত আয়াতটি আদৌ হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, না-কি মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য- চলুন সালাফদের নিকট থেকে আমরা তা জেনে নিই।
সালাফদের কেন অনুসরণ করব?
সালাফদের অনুসরণ কেন করব এর উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে সালাফ কারা? জমহূর ওলামায়ে কেরামের মতে,السلف: هم الصحابة، والتابعون، وتابعو التابعين ‘সালাফ হলেন ছাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম), তাবেঈগণ এবং তাবে‘ তাবেঈগণ (রাহিমাহুল্লাহ)’।[১] উক্ত বক্তব্যের দলীল নিম্নবর্ণিত হাদীছ।
عَنْ عَبْدِ اللهِ عَنْ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ أَقْوَامٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِيْنَهُ وَيَمِيْنُهُ شَهَادَتَهُ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ وَكَانُوْا يَضْرِبُوْنَنَا عَلَى الشَّهَادَةِ وَالْعَهْدِ
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী এরপরে এমন সব ব্যক্তি আসবে যারা কসম করার আগেই সাক্ষ্য দিবে, আবার সাক্ষ্য দেয়ার আগে কসম করে বসবে। ইবরাহীম নাখ্ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমাদেরকে সাক্ষ্য দিলে ও অঙ্গীকার করলে মারতেন।[২]
মুফাসসিরগণের বক্তব্য
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্ব বিখ্যাত মুফাসসিরগণের বক্তব্য জানা দারকার। যা নিম্নরূপ:
১- সর্বজনসমাদৃত বিশুদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীর ইবনে কাছীর-এর মুফাসসির ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
يقول تعالى : (لَاۤ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ) أي : لَا تُكْرِهُوا أَحَدًا عَلَى الدُّخُولِ فِي دِينِ الْإِسْلَامِ فَإِنَّهُ بَيِّنٌ وَاضِحٌ جَلِيٌّ دَلَائِلُهُ وَبَرَاهِينُهُ لَا يَحْتَاجُ إِلَى أَنْ يُكْرَهَ أَحَدٌ عَلَى الدُّخُولِ فِيهِ
‘আল্লাহ তায়ালা বলেন : لَاۤ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই’। অর্থাৎ কাউকে ইসলামে প্রবেশ করতে বা ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না, কারণ ইসলাম স্পষ্ট এবং সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা ও প্রমাণসমৃদ্ধ’।[৩]
২- ‘তাফসীরে কাবীর’ এর মুছান্নিফ ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রাহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন,
مَعْنَاهُ أَنَّهُ تَعَالَى مَا بَنَىْ أَمْرَ الْإِيمَانِ عَلَى الْإِجْبَارِ وَالْقَسْرِ، وَإِنَّمَا بَنَاهُ عَلَى التَّمَكُّنِ وَالِاخْتِيَارِ، ثُمَّ احْتَجَّ الْقَفَّالُ عَلَى أَنَّ هَذَا هُوَ الْمُرَادُ بِأَنَّهُ تَعَالَى لَمَّا بَيَّنَ دَلَائِلَ التَّوْحِيْدِ بَيَانًا شَافِيًا قَاطِعًا لِلْعُذْرِ
‘এর অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলা ঈমানের ব্যাপারটি জবরদস্তি বা যুল্মের উপর প্রতিষ্ঠা করেননি; বরং তিনি তা প্রতিষ্ঠা করেছেন ক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে। এরপর ইমাম ক্বাফ্ফাল রহ. এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন এইভাবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাওহীদের দলীলসমূহ এমনভাবে পরিষ্কার ও পরিপূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তার মাধ্যমে কোনো অজুহাত টিকে থাকতে পারে না’।[৪] শুধু তাই নয়, মুফাসসিগণ ‘আম বা সাধারণ ব্যাপক হুকুম দিতে গিয়ে এই মতটাই পোষণ করেছেন যে, ইসলাম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কাউকে জবরদস্তি করা যাবে না, হুকুম আহকামের ক্ষেত্রে নয়।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ তথা শানে নুযূল বর্ননা করা হয়েছে। যদিও এ নিয়ে মুফাসসিরগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। যেমন ইমাম আবু জা‘ফর আত-ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘তাফসীরে ত্বাবারী’তে, ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘তাফসীর ইবনু কাছীরে’ এবং ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) তার ‘তাফসীরে কুরতুবী’তে উল্লেখ করেছেন। যা নিম্নরূপ-
- প্রথম অভিমত : আয়াতটি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। আর এই মতটি পোষণ করেছেন সুলাইমান ইবনু মুসা। তিনি মাসঊদ এবং অনেক মুফাসসিরের রেওয়ায়েত দিয়ে বলেছেন, يٰۤاَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَ الْمُنٰفِقِيْنَ ‘(হে নবী! আপনি কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন’ (সূরা আত-তাওবাহ: ৭৩)। এই আয়াত দ্বারা মানসুখ করে দিয়েছেন।
- দ্বিতীয় মত : আয়াতটি রহিত হয়নি বরং আয়াতটি শুধু আহলে কিতাব ও মাজুসী তথা অগ্নি উপাসকদের জন্য খাছ বা নির্দিষ্ট।
- তৃতীয় মত : আবূ দাঊদ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, ‘এটি আনছারদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। একজন মিক্বলাত মহিলা ছিল এবং মানত করছিল যে, যদি তার একটি সন্তান বেঁচে থাকে, তবে তাকে ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করাবে। যখন বনু নাজিরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তখন তাদের মধ্যে আনছারদের অনেক পুত্র ছিল। তাই তারা বলেছিল, ‘আমরা আমাদের পুত্রদের পরিত্যাগ করব না অর্থাৎ অন্য ধর্মে যেতে দিব না। তখন আল্লাহ তা‘আলা আয়াতটি নাযিল করলেন। আবূ দাঊদ বলেন, ‘আর মিক্বলাত হলো তারা যাদের কোন সন্তান বেঁচে থাকে না’ (বন্ধা)।
- চতুর্থ মত : আস-সুদ্দী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আয়াতটি আবূ হুসাইন নামক আনছারদের একজন ব্যক্তির সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল, যার দু’টি পুত্র ছিল। শামের কিছু ব্যবসায়ী তেল বহন করে মদীনায় এসেছিলেন । যখন তারা চলে যেতে চাইল, তখন আল-হুসাইনের দুই পুত্র তাদের কাছে এসে তাদের খ্রিস্টধর্মে আমন্ত্রণ জানায়। তারা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং তাদের সাথে শামে যায়। তাদের বাবা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এসে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন এবং কামনা করলেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যেন তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য কাউকে পাঠান। এরপর উক্ত আয়াতটি নাযিল হয়।
- পঞ্চম মত : এমন কাউকে বলবেন না যে, তরবারীর নিচে জোর করে ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
- ষষ্ঠ মত : আয়াতটি السبي (যুদ্ধবন্দী) সম্পর্কে। যদি তারা আহলে কিতাব হয় এবং বড় হয় তবে জোর করা হবে না। কিন্তু যদি তারা মাজূস বা মূর্তিপূজক হয়- ছোট বা বড়- তবে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে। কারণ তাদের ধর্মীয় অবস্থা থেকে দাসত্বকারীরা কোন উপকার পায় না (তাদের খাবার-যব্হ হারাম, নারীরা বৈধ নয় ইত্যাদি)।[৫]
সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মন্তব্যটি উল্লেখ করার প্রয়োজনবোধ করছি। শায়েখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আয়াতটি ছিল তখনকার কথা, যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সব মুশরিকদের বিরুদ্ধে তলোয়ার দ্বারা জিহাদ ফরয করেননি, তবে আহলে কিতাব (ইহুদী-খ্রিস্টান) ও মাজূসীদের (আগুনপূজারী) থেকে জিজিয়া গ্রহণ বৈধ করা হয়েছিল’।[৬] সুতরাং এই আয়াত আহলে কিতাব ও মাজূসীদের জন্য বিশেষ, যদি তারা জিজিয়া (ভূমিকর) দেয় এবং নিজেদের হীনতা ও আনুগত্য প্রকাশ করে তবে তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হবে না। এর প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী:
قَاتِلُوا الَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ لَا بِالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَ لَا يُحَرِّمُوْنَ مَا حَرَّمَ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُهٗ وَ لَا يَدِيْنُوْنَ دِيْنَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ حَتّٰى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَّدٍ وَّ هُمْ صٰغِرُوْنَؒ
‘তোমরা যুদ্ধ কর তাদের সঙ্গে, যারা আল্লাহ্র প্রতি এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনে না, এবং যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, এবং যারা সত্য ধর্মকে ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে না তাদের মধ্যে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল, এমনকি তারা নিজ হাতে জিজিয়া প্রদান না করা পর্যন্ত, আর তারা হবে অবনত’ (সূরা আত-তাওবাহ : ২৯)। হাদীছে এসেছে যে, ‘নবী (ﷺ) হিজরের মাজূসীদের থেকে জিজিয়া গ্রহণ করেছিলেন’।[৭]
আহলে কিতাব ও মাজূসি ছাড়া অন্য কাফের, মুশরিক ও নাস্তিকদের ব্যাপারে করণীয় হলো- সক্ষম হলে তাদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতে হবে। যদি তারা মেনে নেয়, তবে আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি না মেনে নেয়, তবে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের থেকে জিজিয়া (ভূমিকর) গ্রহণ বৈধ নয়। কারণ, রাসূল সা. আরবের কাফেরদের কাছে জিজিয়া দাবি করেননি এবং তা গ্রহণও করেননি। ছাহাবীগণও রা. এর পরে এ নীতি অবলম্বন করেছেন। এর প্রমাণ হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
فَاِذَا انْسَلَخَ الْاَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِيْنَ حَيْثُ وَجَدْتُّمُوْهُمْ وَ خُذُوْهُمْ وَ احْصُرُوْهُمْ وَ اقْعُدُوْا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ١ۚ فَاِنْ تَابُوْا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوةَ فَخَلُّوْا سَبِيْلَهُمْ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ
‘অতঃপর যখন হারাম মাসগুলো অতিবাহিত হবে, তখন মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাবে, তাদের বন্দী কর, তাদের অবরুদ্ধ কর এবং তাদের জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, ছালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আত-তাওবা : ৯)।
সুধী পাঠক! উপরিউক্ত আলোচনায় নিশ্চয় বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, আয়াতটির হুকুম হল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বা ইসলামে প্রবেশ করতে কোন জবরদস্তি নেই। মুসলিমদের জন্য ইসলামের কিছু বিধি-বিধান গ্রহণ করতে যে চাপ সৃষ্টি করা হবে, কিছু বিষয়ে শাস্তি প্রয়োগ করা হবে এই নিষেধাজ্ঞাটি এখানে মোটেও উদ্দেশ্য নয়।
অপব্যাখ্যার জবাব
সুধী পাঠক! উক্ত আয়াতের অপব্যাখ্যা করতে গিয়ে বর্তমান সমাজে দু’টি দল দেখা যায়। যেমন:
- একদল প্রশ্ন করে বসে যে, আয়াতের দ্বারা বোঝা যায়, দ্বীন গ্রহণে কোন বল প্রয়োগ নেই। অথচ দ্বীন ইসলামে জিহাদ ও যুদ্ধের শিক্ষা দেয়া হয়েছে?
বিচক্ষণ পাঠকসমাজে এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিলে তা যথার্থই বোকামি বলে অভিমত পেশ করবেন। কারণ, ইসলামে জিহাদ ও যুদ্ধের শিক্ষা মানুষকে ঈমান আনয়নের ব্যাপারে বাধ্য করার জন্য দেয়া হয়নি। বরং যমীন থেকে ফেতনা ফাসাদ দমানোর জন্য যুদ্ধের বিধান দেয়া হয়েছে। কেননা, ফাসাদ আল্লাহর পসন্দনীয় নয়, অথচ কাফেররা ফাসাদের চিন্তাতেই ব্যস্ত থাকে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ يَسْعَوْنَ فِي الْاَرْضِ فَسَادًا١ؕ وَ اللّٰهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِيْنَ ‘তারা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা ফাসাদকারীদের পসন্দ করেন না’ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৬৪)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ قَاتِلُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ الَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَكُمْ وَ لَا تَعْتَدُوْا١ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِيْنَ۰۰۱۹۰ وَ اقْتُلُوْهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوْهُمْ۠ وَ اَخْرِجُوْهُمْ مِّنْ حَيْثُ اَخْرَجُوْكُمْ وَ الْفِتْنَةُ اَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ١ۚ وَ لَا تُقٰتِلُوْهُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ حَتّٰى يُقٰتِلُوْكُمْ فِيْهِ١ۚ فَاِنْ قٰتَلُوْكُمْ فَاقْتُلُوْهُمْ١ؕ كَذٰلِكَ جَزَآءُ الْكٰفِرِيْنَ
‘তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর তাদের সঙ্গে যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পসন্দ করেন না। আর তাদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাবে এবং তাদের বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা তোমাদের বের করেছে। আর ফিতনা হলো হত্যার থেকেও কঠিন। তবে মসজিদুল হারামে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো না, যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। আর যদি তারা যুদ্ধ করে, তবে তোমরা তাদের হত্যা কর; এটাই কাফেরদের প্রতিদান’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯০-১৯১)। কাজেই উক্ত আয়াতটি কোন ভাবেই যুদ্ধের পরিপন্থী নয়।
- আরেকদল নামধারী মুসলিম ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। তাদেরকে এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা ‘দ্বীন সম্পর্কে জোর-জবরদস্তি নেই’ এ অংশটুকু বলে। অথচ তারা জানে না যে, এ আয়াত দ্বারা যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি শুধু তাদেরকে জোর করে ইসলামে আনা যাবে না বলা হয়েছে। কিন্তু মুসলিম মাত্রই হুকুম-আহকাম মানতে বাধ্য। সেখানে শুধু জোর-জবরদস্তি নয়, উপরন্তু শরী‘আত না মানার শাস্তিও ইসলামে নির্ধারিত।
সুধী পাঠক! আপনার অধিনস্ত কাউকে ছালাতের আদেশ বারবার দেয়ার পরে সে যদি সাড়া না দিয়ে আয়াতটির উদ্ধৃতি দিয়ে যদি বলে যে, ‘এত জোর করো না তো- দ্বীনে কোন জবরদস্তি নেই!’, তাহলে কি এটা গ্রহণযোগ্য হবে? কশ্চিনকালেও নয়। কারণ, দশ বছর বছর বয়সের সন্তান ছালাত না পড়লে বেত্রাঘাত করার আদেশ করা হয়েছে, যদি না করেন তাহলে আপনি হবেন দায়িত্ব পালনে অক্ষম, যার জন্য আপনি গুনাহগার হবেন। সুতরাং এখানে অবশ্যই আপনাকে জবরদস্তি করতেই হবে। এখানেই শেষ নয়, কোন ব্যক্তি ইসলামের কোন বিধান লঙ্ঘন করতে দেখলে সে যদি সামর্থ্যানুযায়ী প্রতিহত না করে, তাহলে তাকেও অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত করা হবে। যেমন হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُوْلُ مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
আবূ সাঈদ খুদরী (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোন মন্দ কাজ (গুনাহ, অন্যায়) দেখতে পায়, সে যেন তা হাতে (শক্তি দ্বারা) পরিবর্তন করে। যদি তা করতে না পারে, তবে মুখে (কথা দ্বারা) পরিবর্তন করে। আর যদি তাও না পারে, তবে অন্তরে (অপসন্দ করা ও ঘৃণা করা দ্বারা) পরিবর্তন করে- আর সেটাই হচ্ছে ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর’।[৮] উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘অসৎকাজ নিরসন (মুনকারের নিষেধ) হাত দ্বারা করা হবে তাদের দায়িত্বে, যারা তা করতে সক্ষম। যেমন: শাসকগণ, যেসব দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে, হিসবাহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তগণ, আমীর তার উপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী, বিচারক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী, আর একজন ব্যক্তি তার ঘরে নিজের সন্তান ও পরিবার-পরিজনের মধ্যে যেসব বিষয়ে সক্ষম, সেগুলো দ্বারা সে প্রতিহত করবে’।[৯]
শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ’ গ্রন্থে বলেন, ‘হাত দ্বারা পরিবর্তন (অসৎকাজ দূর করা) কেবল সেই ব্যক্তি-ই করতে পারে, যার হাতে ক্ষমতা আছে। অর্থাৎ আমীর (শাসক) বা তার নিযুক্ত প্রতিনিধি, যাদেরকে তিনি তার স্থলাভিষিক্ত করেছেন। সাধারণ মানুষের কাজ নয়, বিশেষত আমাদের এই যুগে। কারণ আমাদের মধ্যে কেউ হয়তো মনে করবে এটি মন্দ কাজ, অথচ সেটি আসলে মন্দ নয়। তখন সে হাত দিয়ে পরিবর্তন করবে এবং এর ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। তাই এই সময়ে হাত দ্বারা পরিবর্তন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; বরং এটি শাসকদের কাজ’।[১০]
ইবনু মুফলিহ (রাহিমাহুল্লাহ) তার এর ‘ফুরূ‘’ গ্রন্থে বলেন, ‘ইমামদের বক্তব্যের প্রকাশ্য অর্থ হল- সন্তানকে শাসন করা বৈধ, যদিও সে বড় হয়ে যায়, বিবাহিত হয় এবং আলাদা ঘরে বসবাস করে’। কেননা আয়েশা ম হতে বর্ণিত, যখন তার হার হারিয়ে গেল এবং নবী (ﷺ) লোকদের পানি ছাড়া অবস্থায় থামিয়ে দিলেন, তখন আবূ বকর প আমাকে গালিগালাজ করলেন এবং আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই বললেন, আর আমার কোমরে আঙুল দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন’।[১১] ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘আল্লাহর বান্দীবৃন্দকে আল্লাহর মসজিদ থেকে বাধা দিও না। তখন তার ছেলে বিলাল বলল, আল্লাহর কসম, আমরা অবশ্যই তাদের বাধা দেব। তখন ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) তাকে কঠোরভাবে গালিগালাজ করলেন এবং তার বুকে আঘাত করলেন’।[১২] এক্ষেত্রে পরিচিত একটি হাদীছ তুলে ধরা হল:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالْإِمَامُ الَّذِيْ عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْؤُوْلَةٌ عَنْهُمْ وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْؤُوْلٌ عَنْهُ أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। ক্বিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। আর পুরুষও তার পরিবারের একজন দায়িত্বশীল। তাকে তার এই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। স্ত্রীও তার স্বামীর ঘর-সংসার এবং সন্তানের ওপর দায়িত্বশীলা। তাকেও এই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এমনকি কোন ব্যক্তির গোলাম বা দাস তার প্রভুর সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সেদিন তাকেও তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। অতএব, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেককেই এই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।[১৩]
উপরিউক্ত কয়েকটি হাদীছ ও নস-এর মাধ্যমে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয় যে, যে ব্যক্তি যে বিষয়ে দায়িত্বশীল সে তার অধীনস্তদেরকে শরী‘আতের হুকুম-আহকাম বা বিধি-নিষেধ মানার ক্ষেত্রে তাকীদ দিবে।
শাসক তার প্রজাদের উপর দায়িত্বশীল। সে এটা বলতে পারবে না যে, কাউকে শরী‘আত মানতে জোর করা হবে না- যার ইচ্ছা সে মানবে, কাউকে পর্দা করতে বাধ্য করা হবে না- যার ইচ্ছে সে মানবে, এমনটা করলে তাকে কঠিন জবাবদিহিতার শিকার হতে হবে। কলেজ-ভার্সিটির ভিপি তার শিক্ষার্থীদের উপর, বাবা তার পরিবারের উপর দায়িত্বশীল সাধ্যমত তারাও হুকুম-আহকাম মানতে বাধ্য করবে, কোনভাবেই لَاۤ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ ‘দ্বীনে কোন জবরদস্তি নেই’ আয়াতের অপব্যাখ্যা করে ছাড় পেতে পারবে না। এমনটা করলে তাদেরকেও মহান রবের কাঠগড়ায় জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।
উপসংহার
চিন্তাশীল পাঠকবৃন্দ! সালাফদের তাফসীর এবং বক্তব্য-মন্তব্যের দারস্থ হয়ে নিশ্চয় একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছেন যে, لَاۤ اِكْرَاهَ فِي الدِّيْنِ দ্বারা সমাজে কথিত যে ব্যাখ্যা করা হয়, তা আদৌ সঠিক নয়। তাই কুরআন এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন কিছু বলা বৈধ নয়Ñ যেটা মহান রব বলেননি। পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিবেদন জানাই, হে মহান মালিক! আপনি আমাদেরকে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর সঠিক বুঝ দান করুন, অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখুনÑ আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন!
* শিক্ষার্থী, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. শারহু উছূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৫২।
[৩]. আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনু কাছীর আদ-দিমাস্কী, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম (দারু ত্বাইয়েবা, ২য় সংস্করণ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৮২।
[৪]. আবূ ‘আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু উমার ইবনু হাসান ইবনুল হুসাইন ফাখরুদ্দীন রাযী আত-তাইমী, মাফাতীহুল গাইব (বৈরূত: দারু ইহইয়াইত তুরাছিল ‘আরাবী, ৩য় সংস্করণ, ১৪২০ হি.), ৭ম খণ্ড, পৃ. ১৫।
[৫]. আবূ ‘আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ শামসুদ্দীন আল-কুরতুবী, আল-জামি‘ঊ লি আহকামিল কুরআন (রিয়াদ: দারু ‘আলিমিল কুতুব, ১৪২৩ হি./২০০৩ খ্রি.), ৩য় খণ্ড, ২৮০-২৮১।
[৬]. মাজমূঊ ফাতাওয়া লিইবনি বায, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৪০৯।
[৭]. তিরমিযী, হা/১৫৮৬, সনদ ছহীহ।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯।
[৯]. মাজমূঊ ফাতাওয়া লিইবনি বায, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৫১।
[১০]. লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং ২১৫।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৪।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪২।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮২৯।
প্রসঙ্গসমূহ »:
শিশু-কিশোর