যুদ্ধের দাবানলে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী : প্রয়োজন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
বর্তমান পৃথিবী এক গভীর অস্থিরতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধের দাবানল জ্বলছে, অন্যদিকে পৃথিবীর বায়ূমণ্ডল ভেদ করে মহাকাশ যাত্রার মহাশূন্যের শ্বাসরুদ্ধকর পরিভ্রমণ শেষে চার নভোচারীর নিশ্চিদ্র অবতরণ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা প্রমাণ করেছে। এটা একদিকে হতাশাজনক অন্যদিকে আশাব্যঞ্জক। কেননা তথ্য-প্রযুক্তির পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন মানবজাতির সামগ্রিক কার্যক্রম যেমন সহজ ও সাবলীল করেছে, তেমনি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে টার্গেটভিত্তিক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র মিসাইল ছুড়ছে, বোমা নিক্ষেপ করছে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে অন্যায়ভাবে হত্যা করছে। মানবতাকে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করছে, ফিলিস্তীন সহ বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে ধ্বংসস্তূপ করা সহ বিলীন করে দিচ্ছে। এপেস্টিন ফাইল ফাঁস হয়ে আধুনিক সভ্যতাগর্ভী মোড়লদের আত্মিক দেউলিয়াত্ব ও নষ্টামি প্রকাশ পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মধ্যপ্রাচ্য সহ গোটা মুসলিম বিশ্বে মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। আর এগুলোই হচ্ছে সর্বাধুনিক এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহারের চূড়ান্ত পরিণতি।
যুদ্ধের এই দাবানলে কোন পক্ষই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী নয়। একদিকে লক্ষ লক্ষ নিরীহ বনী আদমের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের করাল গ্রাস; অন্যদিকে অবকাঠামো ধ্বংস, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিতিশীলতা। মনে হচ্ছে পৃথিবী যেন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে, দুর্ভিক্ষ ও দূরোরোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমেই অনিশ্চিত ও অসহনীয় হয়ে উঠছে। নৈতিকতার অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে দুর্বলদের ওপর নির্যাতনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবসৃষ্ট কোন ব্যবস্থাই প্রকৃত শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়, যদি তা আল্লাহর নির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। আর এটিই ঘটছে বর্তমানে তথাকথিত আধুুনিক সভ্য দুনিয়ায়।
মধ্যপ্রাচ্য সহ গোটা পৃথিবীতে অন্যায় আধিপত্য বিস্তার, অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ, শক্তিশালী কূটনীতির বয়ান ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এখন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছে। অথচ এই যুদ্ধে শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক, আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক যে কুপ্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হবে। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি তার জ্বাজল্য প্রমাণ। এভাবে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে যে নীতির আশ্রয় নেয়, তা দুর্বলদের জন্য হয়ে ওঠে নিপীড়নের হাতিয়ার। ফলে পৃথিবী ক্রমশঃ এমন এক অন্ধকার ও বর্বরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচার একটি আপেক্ষিক ধারণা, আর সত্য একটি রাজনৈতিক শ্লোগান। এটি এমন এক মহাসংকট, বিশ্বের সকল দেশের সকল ধরনের নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর সকলেই যেন তাদের ধ্বংসযজ্ঞ কর্মতৎপরতার আওতাভুক্ত। বাসযোগ্য এ পৃথিবীর একটি শিশুও যেন তাদের বলয়ের বাইরে নয়। স্মার্ট ফোন, ওয়াইফাই, ব্রডব্যান্ড, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ওয়াটসআ্যাপ, ইমো ইত্যাদির মাধ্যমে আজ প্রতিটি মানুষের চলাচল তাদের নখদর্পনে। জন্মগতভাবে প্রতিটি মানুষ যেন নিরাপত্তাহীনতার ভয় নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করছে। বর্তমান অভিভাবক সহ দায়িত্বশীলবর্গের যেখান থেকে বের হওয়ার আসা ব্যতীত বিকল্প কোন পথ-ঘাট নেই। এজন্য তারা রীতিমত পরিপূর্ণরুপে ঘর্মাক্ত ও কর্মক্লান্ত।
বিশ্বব্যাপী এই সংকট মুকাবেলার ক্ষেত্রে ইসলামের ভূমিকা ভারসাম্যপূর্ণ, স্থায়ী ও কার্যকরী। ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া সকল ধরনের ফিতনা-ফাসাদ মূলত মানুষের অন্তরের বিকৃতি ও আমলের অবক্ষয়ের প্রতিফলন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে’ (সূরা আর-রূম: ৪১)। তাইতো পৃথিবীতে মানবজাতি যখনই আল্লাহর নির্দেশনা থেকে দূরে সরে গেছে, তখনই তারা নিজের জন্য নিজেরাই ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমান বস্তুবাদী বিশ্ব তার জ্বাজল্য প্রমাণ বহন করে। ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মানুষের গুনাহ ও অবাধ্যতা যখন বৃদ্ধি পায়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর শত্রুকে প্রভাবশালী করে দেন। এটি কোন আকস্মিক ঘটনা নয় বরং একটি সুস্পষ্ট সুন্নাহ, যা ইতিহাসের প্রতিটি যুগে প্রতিফলিত হয়েছে (মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১৪/৪২৪, ১৫/২৪)। একইভাবে ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সমাজে যখন ফিতনা বৃদ্ধি পায়, তখন তা মানুষের অন্তর্গত রোগের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে দেখা উচিত (তিব্বুন নাবাবী, পৃ. ২৭৫)।
সুতরাং ইসলাম সমস্যার শিকড় উপড়ে ফলে সমাধানের মূলের দিকে দৃষ্টি দিতে শেখায়, আর তাহল- আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। সালাফগণ কখনোই কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করেননি; বরং তারা ঈমান, তাওহীদ, তাক্বওয়া এবং সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। অতএব রাজনৈতিক চুক্তি, কূটনৈতিক সমঝোতা, সামরিক ভারসাম্য বা অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সাময়িক স্থিতিশীলতা আনলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বিশ্ব ইতিহাসে এর কোন নযীর নেই। এজন্য প্রয়োজন বিশ্বজগতের নিয়ন্ত্রণকারী মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যে ফিরে আসা, নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং উন্নত নৈতিকতা তথা আখলাক্বে হাসানার সেই চিরন্তন মানদণ্ডকে গ্রহণ করা, যা আল্লাহ তা‘আলা নির্ধারণ করেছেন।
পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের এ আহ্বান কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এক অনিবার্য দাবি। তাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সর্বশ্রেষ্ঠ মডেল হিসাবে নির্ধারণ, তাঁর বিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, সেই জীবনব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং যা প্রকৃত শান্তি, ন্যায় এবং স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। মহান আল্লাহ এ পৃথিবীকে আমাদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শান্তিপূর্ণ বাসযোগ্য পৃথিবী হিসাবে কবুল করুন। মহাকাশের মহাশূন্যে বিলীন হওয়ার পূর্বে গোটা পৃথিবীকে নির্ভেজাল তাওহীদের যমীন হিসাবে কবুল করুন-আমীন!!
رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ
প্রসঙ্গসমূহ »:
সম্পাদকীয়