যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবী: কূটনৈতিক বিজয়, না-কি আদর্শের পরাজয়
পৃথিবী বর্তমান এক নাজুক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। যেখানে বিশ্বশক্তির দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক সংঘাত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে শরণার্থী সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এবং অসংখ্য মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। তবে, এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে কূটনীতির মাধ্যমে মাঝে মধ্যে কিছু শান্তির আলো দেখা যায়, কিন্তু সেই শান্তি আদর্শের দৃষ্টিতে কতটা সঠিক এবং টেকসই, তা একটি বিরাট প্রশ্ন। ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তি এবং মানবতার প্রকৃত মাপকাঠি কখনোই কূটনৈতিক চুক্তি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। বরং এটি নিজস্ব স্বকীয়তায় চির ভাস্বর।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত বিশ্বে বর্তমানে এককেন্দ্রিক কূটনৈতিক বিজয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। সংঘাত ও বিপর্যয়ের মাঝে শান্তির ঘোষণা অনেক সময় বাহ্যিকভাবে সাফল্য মনে হলেও আদর্শিকভাবে তা সম্পূর্ণটাই ব্যর্থ। কেননা বিধ্বস্ত দেশে বা অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে হয়তো যুদ্ধ থেমে যেতে পারে, কিন্তু আদর্শিকভাবে সেখানে যদি ন্যায়, মানবাধিকার এবং ইসলামী মূল্যবোধের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে সেই শান্তি কতটুকু স্থায়ী হতে পারে? কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে শান্তির পথ শুধু রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কখনোই আদর্শিক নীতি, নৈতিকতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হয় না। সেক্ষেত্রে, যদিও বাহ্যিকভাবে যুদ্ধ থেমে যায় এবং একটি স্থিতিশীল পরিবেশও তৈরি হয়, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো অব্যাহত থাকে, যা একদিন আবার বিশাল সংঘাতে রূপ নেয়। বর্তমান যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবী তার অন্যতম উদাহরণ।
শান্তির মূল ভিত্তি হলো ‘ইসলাম’, যা অর্জন করা যায় ন্যায়, সুষম বণ্টন এবং মানবাধিকার রক্ষার মাধ্যমে। ইসলামে কখনোই স্বার্থের কাছে আদর্শ বিক্রি করার সুযোগ নেই। কিন্তু আজকের কূটনীতিতে যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, সেখানে ইসলামী নীতি ও আদর্শ অনেক সময় উপেক্ষিত হচ্ছে। ফলে, যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় তা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, কচুর পাতার পানির মত ক্ষণস্থায়ী হয়। এর মৌলিক কারণ হল, চুক্তি আদর্শিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত না হওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিশেষত, ইসরাঈল-ফিলিস্তীন যুদ্ধ, সিরিয়া, ইয়ামান, ইরাকের যুদ্ধ পরিস্থিতি, ইরান-ইসরাঈল সংঘাত এসবের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা এবং চুক্তি ঘটলেও, বাস্তবতা হল- সেখানে ইসলামী ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হয় না। ইসরাঈলের সঙ্গে আরব দেশের সম্পর্ক স্থাপন বা ফিলিস্তীনিদের অধিকার বিষয়ে বৈশ্বিক কূটনীতি যতই এগিয়ে যাক, সেখানে ইসলামী আদর্শের সঠিক বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফিলিস্তীনিদের মৌলিক অধিকার এখনো অধিকারহীন, তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন আজও অধরাই রয়ে গেছে। বরং ক্রমান্বয়ে প্রলম্ভিত হচ্ছে। যা কূটনীতির ভাষায় বিজয় হলেও আদর্শিকভাবে চূড়ান্ত পরাজয়।
চলমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে বাহ্যিকভাবে কূটনৈতিক বিজয় সাধিত হলেও সংঘটিত যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি, শিশু-নারী সহ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের নির্মমভাবে নিহত হওয়া, বিশাল বিশাল স্থাপনার ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়া, যুদ্ধে আতঙ্কগ্রস্ত অসহায় মানবতার গগণবিদারী আর্তচিৎকারের কি কোন সুরাহা হয়? এটা কি ন্যায়গতভাবে আদর্শিক পরাজয় নয়? এটাকে কিভাবে কূটনৈতিক বিজয় বলা যেতে পারে, যেখানে মানবতার জীবনের কোন গ্যারান্টি নেই? যেমন, সিরিয়া এবং ইয়ামানের যুদ্ধের পর, ইরাক যুদ্ধের পর, আন্তর্জাতিক চুক্তি বা শান্তি সমঝোতার মাধ্যমে কূটনৈতিক বিজয় অর্জিত হলেও, এসব অঞ্চলের সাধারণ জনগণের জীবনে শান্তির ছোঁয়া কি পৌঁছেছে? তারা কি নিরাপত্তার সাথে জীবন অতিবাহিত করতে পারে? বরং এখনো তারা যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এটাকে কিভাবে কূটনৈতিক বিজয় বলা যাবে? মূলত যুদ্ধ-সংঘাতের মাধ্যমে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো অস্ত্র ব্যবসায়ে লাভবান হয় ঠিকই কিন্তু ধ্বংস্তূপে পরিণত হয় মানবতা। সুতরাং মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে কূটনীতি ও কৌশলের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও মুসলিম জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কোন অধিকার অর্জিত হয় না, ভোগও তারা করতে পারে না। ইসলামী আদর্শের শুদ্ধতা, শান্তি এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা শুধু রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং অবশ্যই তা মানুষের হৃদয়েও গ্রোথিত হওয়া ও তাদের জীবনে প্রতিফলিত হওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব।
ইসলামে শান্তি এবং ন্যায়ের পথ একেবারে স্পষ্ট। নবী (ﷺ)-এর কূটনীতি ছিল ন্যায় ও শান্তির পক্ষে। ইসলামী সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এই শান্তির ভিত্তি ছিল মানবতার প্রতি দয়া, একে অপরকে সহায়তা করা এবং আদর্শিকভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। কূটনৈতিক চুক্তি, শাস্তি এবং যুদ্ধের সমঝোতা কখনোই প্রকৃত শান্তির সমাধান হতে পারে না, যদি তা আদর্শিকভাবে নিশ্চিত না হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা নেক কাজ করতে ও সংযমী হতে পরস্পরকে সাহায্য কর। তবে পাপ ও সীমালংঘনের ব্যাপারে তোমরা এক অপরকে সাহায্য কর না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর’ (মায়িদা: ২)। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তির মাপকাঠি শুধু কূটনৈতিক বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ঐক্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ভিত্তিতে হতে হবে।
বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক বিজয়ের পেছনে গভীর আদর্শিক সংকট বিদ্যমান। কূটনীতির মাধ্যমে শান্তির পথে অনেক সময় অগ্রগতি হলেও, আদর্শিকভাবে সেই শান্তির সফলতা নির্ভর করে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকারের রক্ষা এবং ধর্মীয় নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতি ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের প্রতি। অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বের দায়িত্ব হচ্ছে কূটনৈতিক বিজয়ের পাশাপাশি আদর্শিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা, যাতে পরবর্তীতে পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অতএব আমাদের কূটনীতি হবে দ্বীনের আলোকে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে হবে উম্মাহর কল্যাণের ভিত্তিতে। তাই কূটনৈতিক বিজয় তখনই মূল্যবান হবে, যখন তা আদর্শভিত্তিক হবে। অন্যথা এই বিজয় বাহ্যিকভাবে গৌরবময় হলেও ইতিহাসে তা এক আত্মঘাতি পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এ পৃথিবীকে শান্তিময় করুন-আমীন!
প্রসঙ্গসমূহ »:
সম্পাদকীয়