উত্তর : ইসলামে আল্লাহভীরু, সৎকর্মশীল, তাক্বওয়াবান ও নেককার দরিদ্র মানুষের মর্যাদা দুনিয়া ও আখিরাতে অত্যধিক। দুনিয়াতে নেককার দরিদ্রের মর্যাদা হল, আল্লাহ তাদের বিশেষভাবে ভালোবাসেন। রাসূল (ﷺ) বলেন,
إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَى أَعْمَالِكُمْ وَقُلُوبِكُمْ
‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চেহারা ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি লক্ষ্য করেন না, বরং তিনি তোমাদের কার্যকলাপ ও অন্তরের দিকে লক্ষ্য রাখেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৪; ইবনু মাজাহ, হা/৪১৪৩; ছহীহুল জামি‘, হা/১৮৬২)। অর্থাৎ দারিদ্র্য মর্যাদা কমিয়ে দেয় না; বরং অন্তর যদি নেক হয়, মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রাসূল (ﷺ) সাধারণত দরিদ্র মুমিনদের সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতেন। কুরআনে এসেছে, ‘আর যারা তাদের রবকে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ডাকে তাদেরকে আপনি বিতাড়িত করবেন না। তাদের কাজের জবাবদিহিতার দায়িত্ব আপনার উপর নেই এবং আপনার কোন কাজের জবাবদিহিতার দায়িত্ব তাদের উপর নেই, যে আপনি তাদেরকে বিতাড়িত করবেন; করলে আপনি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (সূরা আল-আন‘আম : ৫২)। সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা ছয়জন রাসূল (ﷺ)-এর কাছে বসা ছিলাম।
এমতাবস্থায় কতিপয় কুরাইশ সর্দার রাসূল (ﷺ)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা রাসূল (ﷺ)-কে বললেন, তুমি এদের তাড়িয়ে দাও, যাতে তারা আমাদের মাঝে আগমনের সাহস না পায়। সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তন্মধ্যে আমি, ইবনু মাসঊদ, বানু হুযায়লের এক লোক, বিলাল এবং আরও দু’জন লোক ছিলাম, যাদের নাম আমি নিচ্ছি না। রাসূল (ﷺ)-এর মনে আল্লাহ যা চাইলেন তা জাগল। তিনি মনে মনেই কথা বললেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করলেন, ‘যারা তাদের প্রতিপালককে সকালে ও সন্ধ্যায় তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আহ্বান করে, তাদের আপনি বিতাড়িত করবেন না’ (সূরা আল-আন‘আম : ৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪১৩)। উল্লেখিত আয়াত থেকে কতিপয় নির্দেশ বুঝা যায় যে, কারো ছিন্নবস্ত্র কিংবা বাহ্যিক দূরবস্থা দেখে তাকে নিকৃষ্ট ও হীন মনে করার অধিকার কারো নেই। এ ধরণের পোশাকে এমন লোকও থাকেন, যারা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রিয়। রাসূল (ﷺ) বলেন, মাথায় উস্কুখুস্কু চুল ও দেহে ধূলিমলিন দু’খানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন (তিরমিয়ী, হা/৩৮৫৪)। অনুরূপভাবে, শুধু পার্থিব ধনদৌলতকে শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা নীচতার মাপকাঠি মনে করা অবমূল্যায়ন করার শামিল। বরং এর প্রকৃত মাপকাঠি হচ্ছে সচ্চরিত্র ও সৎকর্ম।
আখিরাতে নেককার দরিদ্রদের মর্যাদা হল তারা জান্নাতে ধনীদের চেয়ে আগে প্রবেশ করবে। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘দরিদ্ররা সম্পদশালীদের চেয়ে পাঁচশ’ বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে। আর তা হলো (আখিরাতের) অর্ধদিনের সমান’ (তিরমিযী, হা/২৩৫৩; ইবনু মাজাহ, হা/৪১২২)। ধনী ব্যক্তিরা হিসাবের কারণে পিছিয়ে থাকবে, আর দরিদ্ররা অল্প হিসাব দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে দারিদ্র্যতা বা প্রাচুর্যতা ভালো মন্দের মানদণ্ড নয়। বরং তাক্বওয়া ও সৎ আমল মর্যাদার আসল ভিত্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি- যার তাক্বওয়া বেশি’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)। সেই জন্য কৃতজ্ঞ ধনী ও ধৈর্যশীল দরিদ্র-কে শ্রেষ্ঠ, এ বিষয়ে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি আলিমদের মধ্যে একটি প্রাচীন মতভেদপূর্ণ বিষয়। আলিমরা এ নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন-কে শ্রেষ্ঠ : ধৈর্যশীল দরিদ্র, না-কি কৃতজ্ঞ ধনী? আমরা বলেছি, সম্পদের কৃতজ্ঞতা হল, এই সম্পদে যাদের হক আছে, তাদের হক আদায় করা, যেমন যাকাত প্রদান, নফল ছাদাক্বাহ ইত্যাদি।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন যে- এই অর্থে কৃতজ্ঞ ধনী ধৈর্যশীল দরিদ্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ ধৈর্যশীল দরিদ্রের কল্যাণ, উপকার ও ইবাদত অন্যের কাছে পৌঁছায় না; তা কেবল তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেÑ সে নিজেই শুধু তার ধৈর্যের উপকার পায়। পক্ষান্তরে কৃতজ্ঞ ধনীর কল্যাণ অন্যদের মাঝেও বিস্তৃত হয়। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ছিয়াম পালনকারী, ক্বিয়ামকারী ও ইবাদতগুজার- তার আর কোন কাজ নেই এবং তার কোন সম্পদও নেই। এটি সেই ধনী ব্যক্তির মত নয়- যিনি ছিয়াম পালনকারী, ক্বিয়ামকারী, ধৈর্যশীল এবং আল্লাহ তা‘আলার দেয়া সম্পদের হক জানেন। তিনি এই সম্পদ থেকেও ব্যয় করেন; সব ক্ষেত্রে তা ব্যবহার করেন- সেনা ও মুজাহিদদের প্রস্তুত করেন, দরিদ্র, ইয়াতীম, বিধবা ও মিসকীনদের সাহায্য করেন ইত্যাদি। নিঃসন্দেহে এ ব্যক্তির উপকার সেই ধৈর্যশীল দরিদ্র ব্যক্তির উপকারের চেয়ে বেশি (হাসান আবুল আশবাল, শারহু ছহীহ মুসলিম, ৫৩/৪ পৃ.)।
প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ, ফরিদপুর।