রামাযানের প্রকৃত শিক্ষা
পবিত্র রামাযান মুসলিম উম্মাহর জন্য কেবল একটি মাসের ইবাদতের নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম, তাক্বওয়া এবং মানবিকতার এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। বছরের অন্য মাসগুলোর তুলনায় এই মাসে মানুষ নিজের ভেতরের মানুষটিকে নতুন করে আবিষ্কার করে। ছিয়াম মানুষকে শেখায় কিভাবে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কিভাবে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে হয় এবং কিভাবে মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে হয়। রামাযানের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো তাক্বওয়া অর্জন (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৩)। তাক্বওয়া এমন একটি গুণ, যা মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং তাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে। রামাযান এই তাক্বওয়ার অনুশীলনের একটি বাস্তব ক্ষেত্র। রামাযান আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৩, ৬০৫৭)।
ছিয়াম কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং এটি চরিত্র ও নৈতিকতার পরিশুদ্ধি। চোখ, জিহ্বা, কান ও অন্তরকে গুনাহ থেকে রক্ষা করাই ছিয়ামের প্রকৃত উদ্দেশ্য। আমরা এই মাসে কেবল খাবার-পানীয় থেকে বিরত থাকি না; বরং চোখ, কান, জিহ্বা এবং অন্তরকেও গুনাহ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। মিথ্যা, গীবত, অশালীনতা, পাপ ও অন্যায়ের পথ থেকে দূরে থাকার যে অনুশীলন আমরা রামাযানে করি, সেটিই প্রকৃতপক্ষে একজন মুসলিমের সারাবছরের জীবনধারার অংশ হওয়া উচিত। রামাযান আমাদেরকে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতেও উদ্বুদ্ধ করে। রামাযান হলো কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাস। এ মাস মানবিকতারও মাস। দরিদ্র-অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি, দান-ছাদাক্বাহ, যাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজে এক অনন্য ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করে একজন ছিয়ামপালনকারী দরিদ্র মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে শেখে। ফলে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মমত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রামাযান শেষ হওয়ার পর আমরা কী করব? যদি রামাযান আমাদের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে না পারে, তবে তার প্রকৃত শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। রামাযান আমাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ শিবিরের মতো। এই মাসে যে ইবাদতের অভ্যাস তৈরি হয়েছে, নিয়মিত ছালাত আদায়, ফরয ইবাদত পালন, মসজিদের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা, কুরআন তেলাওয়াত, নিয়মিত দান-ছাদাক্বাহ এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, সেগুলোই রামাযানের পরবর্তী মাসগুলোতে ধরে রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিছু মানুষকে দুঃখজনকভাবে রামাযান মাসে দেখা যায় যে, তারা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ এবং কুরআন তেলাওয়াতে নিয়মিত থাকে। কিন্তু রামাযান শেষ হয়ে গেলে তারা এগুলো ছেড়ে দেয়। ফরয কাজ ও ছালাতের ব্যাপারে অবহেলা করে এবং নষ্ট করে, এমন লোকদের ব্যাপারে বলা হয় যে, তাদের এই রমাযানের চেষ্টা-সাধনা গ্রহণযোগ্য নয়। সালাফদের একজনকে বলা হয়েছিল, কিছু লোক আছে, যারা রামাযানে খুব ইবাদত করে, কিন্তু রামাযান শেষ হলে আমল ছেড়ে দেয়। তখন তিনি বললেন, بِئْسَ الْقَوْمُ لَا يَعْرِفُونَ اللهَ إِلَّا فِي رَمَضَانَ ‘তারা খুবই নিকৃষ্ট লোক; যারা আল্লাহকে কেবল রামাযানেই চেনে’ (শায়খ ছলেহ আল-ফাওযান, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৮৬)। ইবনু রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَهُوَ يُحَدِّثُ نَفْسَهُ أَنَّهُ إِذَا أَفْطَرَ عَصَى رَبَّهُ، فَصَوْمُهُ مَرْدُودٌ عَلَيْهِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানে ছিয়াম রাখে কিন্তু মনে মনে সিদ্ধান্ত রাখে যে, রামাযান শেষ হলেই সে আবার গুনাহে লিপ্ত হবে, তার ছিয়াম তার ওপরই প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়’ (ইবনু রজব হাম্বলী, লাত্বাইফুল মা‘আরিফ, পৃ. ৩৭৮)।
মনে রাখতে হবে যে, রামাযানে নেক আমলের ক্ষেত্রে অধিক চেষ্টা-সাধনা করা অবশ্যই ভালো কাজ। রামাযানের বিশেষ মর্যাদা আছে এবং এটি এক মহান মৌসুম। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রয়োজন হলো, সে যেন তার সারা জীবন, সব সময় এবং সব মাসেই ভালো কাজ করার চেষ্টা করে এবং ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৬১)। এ কারণে ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সালাফে সালেহীনরাও রামাযানের শিক্ষা সারা বছর জীবনে বাস্তবায়ন করতেন। হাসান আল-বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إِنَّ اللهَ لَمْ يَجْعَلْ لِعَمَلِ الْمُؤْمِنِ أَجَلًا دُونَ الْمَوْتِ ‘আল্লাহ মুমিনের আমলের জন্য মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কোন সমাপ্তি নির্ধারণ করেননি’ (ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৪১৮)। অর্থাৎ ইবাদত ও নেক আমলের জীবন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলমান থাকবে। তেমনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রামাযানের পরেও ইবাদত অব্যাহত রাখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়াম রাখল, এরপর শাওয়াল মাসে ছয়টি ছিয়াম রাখল, সে যেন সারা বছর ছিয়াম রাখল’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৪)। এ থেকে বোঝা যায়, রামাযানের ইবাদত যেন একটি মাসে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তা সারা বছরের জীবনে প্রবাহিত হয়।
সুতরাং রামাযান বিদায় নিলেও তার শিক্ষা আমাদের জীবনে চিরস্থায়ী হওয়া উচিত। রামাযানের অর্জিত তাক্বওয়া, ইবাদতের অভ্যাস এবং মানবিকতা যদি বছরের বাকি মাসগুলোতেও বজায় থাকে, তবেই আমরা বলতে পারব, আমরা সত্যিই রামাযানের শিক্ষা গ্রহণ করেছি। কারণ মানুষের জীবন একটি মূল্যবান সুযোগ, জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর সে এমন এক আবাসের (আখিরাতের) দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে আমলের প্রয়োজন হবে। কেননা আখিরাতে প্রতিদান কেবল আমলের ভিত্তিতেই দেওয়া হবে। সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য কর্তব্য হলো, সে যেন দুনিয়ার জীবনে নেক আমলের মাধ্যমে তার সময়কে কাজে লাগায় এবং ফযীলতপূর্ণ দিন ও কল্যাণময় মৌসুমগুলো বেশি পরিশ্রম ও ইবাদতে মনোযোগ দেয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে রামাযানের শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি মাসে, প্রতিটি দিনে এবং প্রতিটি কাজে বাস্তবায়ন করার তাওফীক্ব দান করুন। اللَّهُمَّ سَلِّمْنَا إِلَى رَمَضَانَ، وَسَلِّمْ لَنَا رَمَضَانَ، وَتَسَلَّمْهُ مِنَّا مُتَقَبَّلًا ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রামাযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন, রামাযানকে আমাদের জন্য নিরাপদ রাখুন এবং আমাদের কাছ থেকে তা কবুল করে নিন’-আমীন!!
رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ
প্রসঙ্গসমূহ »:
ছিয়াম-রামাযান