তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্কীকরণ
-মুহাম্মাদ ইবনু নাছির আল-উরাইনি (রাহিমাহুল্লাহ)
-অনুবাদ : মাসঊদুর রহমান*
(৭ম কিস্তি)
আত্মঘাতী অভিযানসমূহ
শয়তান এই আত্মঘাতী হামলাকারীকে প্রলুব্ধ ও পথভ্রষ্ট করেছে (এই বিতাড়িত শয়তান হতে আল্লাহ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন)। অন্যথায়, কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কীভাবে এমন জঘন্য অপরাধ করতে পারে? শায়খ ছালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) আত্মহত্যার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল’ (সূরা আন-নিসা : ২৯)।
সুতরাং, কোনো ব্যক্তির জন্য আত্মহত্যা করা জায়েজ নয়। বরং তার উচিত সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে নিজের জীবন রক্ষা করা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর পথে জিহাদ করা বা তাঁর পথে লড়াই করা যাবে না। আর এটাও ঠিক নয় যে, কেউ আত্মহত্যা করলে বা নিহত হলেই, সে শহীদ। কেননা নবী (ﷺ)-এর যুগে, কোনো এক যুদ্ধে এক সাহসী ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিলেন। লোকেরা তার প্রশংসা করে বলছিল, ‘আমাদের মধ্যে কেউই অমুকের মতো এত ভালোভাবে যুদ্ধ করেনি’। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘সে জাহান্নামী’। ছাহাবীদের জন্য এই কথাটি বোঝা কঠিন ছিল। যে ব্যক্তি প্রত্যেক কাফেরের সাথে যুদ্ধ করেছে, তাদের তাড়া করেছে এবং হত্যা করেছে, সে কীভাবে জাহান্নামের আগুনে থাকতে পারে? তাই, এক ব্যক্তি উক্ত ব্যক্তিকে অনুসরণ করল, তার উপর নজর রাখল এবং আহত হওয়ার পরেও তার খোঁজ করতে লাগল। অবশেষে, সে দেখল যে, লোকটি তার তরবারির খাপ মাটিতে রেখে তরবারির ফলাটি তুলল এবং তার উপর ভর দিয়ে আত্মহত্যা করল। ছাহাবী বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সত্য বলেছেন, কারণ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজের ইচ্ছানুযায়ী কথা বলেন না’।
এই কাজের জন্য তিনি কেন জাহান্নামে প্রবেশ করলেন? কারণ সে ধৈর্য ধারণ না করে আত্মহত্যা করেছিল। কোনো ব্যক্তির জন্য আত্মহত্যা করা বা এমন কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া জায়েজ নয়, যা তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তবে হ্যাঁ যদি সেটা মুসলিম শাসকের নেতৃত্বে জিহাদের প্রেক্ষাপট হয়, তাহলে ভিন্ন কথা, কেননা এতে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ক্ষতির চেয়ে সার্বিক কল্যাণ অনেক বেশি (শাইখ আল-ফাওযানের উপকারী উত্তর)।
আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘বর্তমান সময়ের সমস্ত আত্মঘাতী অভিযান অবৈধ ও নিষিদ্ধ এবং সেইসব অভিযান, যেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত; যা তার পরিচালনাকারিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে সেগুলোও হারাম। এই আত্মঘাতী অভিযানগুলো মোটেও ইসলামসম্মত নয়’ (টেপ : বোমা হামলা, বিক্ষোভ এবং গুপ্তহত্যা বিষয়ে আলেমদের ফাতাওয়া)।
আত্মঘাতী সম্পর্কে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে উছায়মিন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘কিছু লোক আত্মঘাতী হামলা যেভাবে করে তা হল, যেমন বিস্ফোরক যন্ত্র বহন করে কাফেরদের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং তাদের মাঝে থাকাকালীন সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো, এটাকে আত্মহত্যা বলে গণ্য করা হয় এবং আমরা তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই’ (উৎস : উম্মাহকে আলোকিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফাতাওয়া)।
কোনো পর্যবেক্ষকের কাছেই এটা গোপন নয় যে, আত্মঘাতী অভিযানের ফলে সর্বত্র ইসলামের বিকৃতি ঘটেছে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যেমনটি ১১ সেপ্টেম্বর বা নাইন ইলেভেনের ঘটনা এবং অন্যান্য ঘটনার ফলে ঘটেছে, যদিও এই অপরাধগুলো আদৌ ইসলামসম্মত নয় এবং যারা একনিষ্ঠভাবে ইসলাম ধর্মের প্রতি সত্যিকারের নিবেদিতপ্রাণ, সেই মুসলমানদের দ্বারাও অনুমোদিত নয়।
শাসক ও শাসিতের অধিকার
শাসকদের উপর জনগণের অধিকার : শাসকরা যেন মহান আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব নামক আমানত পূর্ণ করেন এবং তা রক্ষা করার জন্য জনগণের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন, যার মধ্যে রয়েছে জনগণকে উপদেশ দেওয়া এবং এমন সরল পথে পরিচালিত করা, যা দুনিয়া ও পরকালে তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করে। মুমিনদের পথ অনুসরণের মাধ্যমে এটি অর্জন করা সম্ভব, যে পথে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) চোলেছিলেন। এর মধ্যেই শাসক, তাদের প্রজা এবং তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সুখ নিহিত রয়েছে। শাসকদের প্রতি জনগণের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা, তাদের মধ্যে একটি বন্ধন গড়ে তোলা এবং তাদের আদেশ পালনে আনুগত্য ও তাদের উপর অর্পিত আমানত রক্ষা করার জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, মানুষও তাকে ভয় করে। আর যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে, মহান আল্লাহ মানুষের সাথে তার আচরণে তাকে যথেষ্ট করে তোলেন এবং তাদেরকে তার প্রতি সন্তুষ্ট রাখেন, কেননা সকল অন্তর মহান আল্লাহর হাতেই, তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন।
জনগণের উপর শাসকদের অধিকার
প্রজাদের উপর শাসকদের অধিকারের মধ্যে রয়েছে :
১. শাসকদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদিতে পরামর্শ দেওয়া, তারা উদাসীন হলে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, সত্য থেকে বিচ্যুত হলে তাদের জন্য দু‘আ করা এবং আল্লাহর অবাধ্যতা নয় এমন সব বিষয়ে তাদের আদেশ পালন করা। কারণ এর মধ্যেই রয়েছে তাদের শক্তি ও শৃঙ্খলা এবং তাদের বিরোধিতা ও অবাধ্যতার মধ্যেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা ও ফেতনা। অতএব, মহান আল্লাহ তাঁর নিজের, রাসূলের এবং খলিফা বা রাষ্ট্রনায়কের আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন, যেমন মহান আল্লাহ বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ اُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡکُمۡ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের অনুগত হও এবং তোমাদের জন্য যারা বিচারক তাদের’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)।
عَنْ عَبْدِ اللهِ عَنْ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلاَ سَمْعَ وَلاَ طَاعَةَ
আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি (ﷺ) বলেছেন, যতক্ষণ আল্লাহর নাফরমানীর নির্দেশ দেয়া না হয়, ততক্ষণ পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় সকল বিষয়ে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার মান্যতা ও আনুগত্য করা কর্তব্য। যখন নাফরমানীর নির্দেশ দেয়া হয়, তখন আর কোন মান্যতা ও আনুগত্য নেই।[৪]
আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। অতঃপর (বিশ্রামের জন্য) এক স্থানে অবতরণ করলাম। তারপর আমাদের কিছু লোক তাঁবু ঠিক করছিল এবং কতক লোক তীরন্দাজিতে প্রতিযোগিতা করছিল ও কতক লোক জন্তুদের ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ঘোষণাকারী ঘোষণা করল যে, ‘ছালাতের জন্য জমায়েত হও’। সুতরাং আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট একত্রিত হলাম। তারপর তিনি বললেন, ‘আমার পূর্বে প্রত্যেক নবীর জন্য যরূরী ছিল, তাঁর উম্মতকে এমন কর্মসমূহের নির্দেশ দেওয়া, যা তিনি তাদের জন্য ভালো মনে করেন এবং এমন কর্মসমূহ থেকে ভীতি-প্রদর্শন করা, যা তিনি তাদের জন্য মন্দ মনে করেন। আর তোমাদের এই উম্মত এমন, যাদের প্রথমাংশে নিরাপত্তা রাখা হয়েছে এবং তাদের শেষাংশে রয়েছে পরীক্ষা (ফিতনা-ফাসাদ) এবং এমন ব্যাপার সকল, যা তোমরা পছন্দ করবে না।
এমন ফিতনা প্রকাশ পাবে যে, একটি অন্যটিকে হাল্কা করে দেবে (অর্থাৎ পরের ফিতনাটি আগের ফিতনা অপেক্ষা গুরুতর হবে)। ফিতনা এসে গেলে মুমিন ব্যক্তি বলবে, এটাই আমার ধ্বংসের কারণ হবে। অতঃপর তা দূরীভূত হবে। পুনরায় অন্য ফিতনা প্রকাশ পাবে, তখন মুমিন বলবে, ‘এটাই এটাই (আমার সবচেয়ে বড় ফিতনা)’। অতএব যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে থাকতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে ভালোবাসে, তার নিকট এই অবস্থায় মৃত্যু আসুক যে, সে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং লোকদের সাথে সেই ব্যবহার প্রদর্শন করে, যা সে নিজের সাথে প্রদর্শন পছন্দ করে। আর যে ব্যক্তি রাষ্ট্রনেতার সাথে বায়‘আত করে, সে নিজের হাত এবং নিজ অন্তরের ফল (নিষ্ঠা) তাকে দিয়ে দেয়, সে সাধ্যমত তার আনুগত্য করুক। অতঃপর অন্য কেউ যদি তার (প্রথম ইমামের) সাথে (ক্ষমতা কাড়ার) ঝগড়া করে, তাহলে দ্বিতীয়জনের গর্দান উড়িয়ে দাও।[৫]
অপর বর্ণনায় এসেছে, সালামাহ ইবনু ইয়াযীদ আল জু‘ফী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ মর্মে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর নবী (ﷺ)! যদি আমাদের উপর এমন শাসকের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় যে, তারা তাদের হক্ব আমাদের কাছে দাবী করে কিন্তু আমাদের হক্ব তারা দেয় না। এমতাবস্থায় আপনি আমাদেরকে কী করতে বলেন? তিনি তার উত্তর এড়িয়ে গেলেন। তিনি আবার তাকে প্রশ্ন করলেন। আবার তিনি এড়িয়ে গেলেন। এভাবে প্রশ্নকারী দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারও একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। তখন আশ‘আশ ইবনু কায়স (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে (সালামাকে) টেনে নিলেন এবং বললেন, তোমরা শুনবে এবং মানবে। কেননা তাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তাদের উপর বর্তাবে আর তোমাদের উপর আরোপিত দায়িত্বের বোঝা তোমাদের উপর বর্তাবে।[৬]
২. জনগণের উপর শাসকদের অধিকারগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো, শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ কাজে জনগণের সহযোগিতা করা, যেন তারা শাসকদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব বাস্তবায়নে সহযোগী হতে পারে। যাতে করে প্রত্যেক ব্যক্তি সমাজে তার ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত থাকে, আর উক্ত বিষয়গুলো প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়ন হয়। আর যদি জনগণ শাসকদেরকে তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা না করে, তবে সেগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পূরণ হবে না। (ইমাম মুহাম্মাদ আল-উছায়মিন (রাহিমাহুল্লাহ) রচিত ‘প্রাকৃতিক স্বভাবগত অধিকার এবং ইসলামী আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অধিকারসমূহ’)
ইমাম ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘জনগণের উপর আবশ্যক হলো রাষ্ট্রকে যথাযথ ও সমুন্নত রাখতে সাহায্য করা, রাষ্ট্রের ভালো কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তার প্রশংসা করা। এছাড়াও, রাষ্ট্রের যেকোনো ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে সদয় ও নম্রভাষী হয়ে অবহিত করার মাধ্যমে সাহায্য করাও তাদের উপর আবশ্যক। সংবাদপত্রে বা মিম্বরে দোষত্রুটি প্রচার ও উল্লেখ করে নয়’ (টেপ : শাসকদের আনুগত্যের বিষয়ে আলেমদের ফাতাওয়া)।
* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. আল-জাজিরা, ৪ সফর ১৪৩২ হিজরি; ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৬।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০১৫।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১০।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৪৪।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৪।
[৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৬।