মঙ্গলবার, ০৯ Jun ২০২৬, ১২:৫১ পূর্বাহ্ন

ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা

-মূসা ইবরাহীম বিন রঈসুদ্দীন*


(শেষ কিস্তি) 

অন্যায়ের প্রতিরোধ করার উপায়

ক. সামর্থ্য থাকলে হাত দ্বারা প্রতিহত করা

সমাজের সকল স্তর আজ ইসলাম বিরোধী কর্মতৎপরতায় জর্জরিত। বর্তমানে মন্ত্রী, সচিব, প্রফেসর, প্রভাষক, আমলা, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, আলেম, ছাত্র-শিক্ষক, এমপি, চেয়ারম্যান, মেম্বার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্ত, বেসরকারী ও এন.জি.ও কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচালনা কমিটি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও বৈষয়িক সংগঠন সহ সকল স্থানে অনৈতিকতা, প্রতারণা, ছলনা ও মিথ্যাচারের উপর পরিচালিত হচ্ছে। দেশের প্রত্যেক বিভাগ ও ব্যক্তি যেন আজ শান্তির অন্বেষায় পথ হারিয়ে ফেলছে। এরকম মুহূর্তে একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব হল- স্ব স্ব অবস্থানে থেকে বুদ্ধিমত্তার সাথে উক্ত নোংরা ও জঘন্যতম অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে সামর্থ্যানুযায়ী হাত দ্বারা প্রতিরোধ করা। মদের ভাণ্ডগুলো ভেঙ্গে ফেলা, খেল-তামাশার যন্ত্রগুলো ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া, যারা মানুষের অনিষ্টের ইচ্ছা করে, নিজের মত প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের উপর যুলুম করে, হিংসা-অহংকারে মদমত্ত হয়ে অন্যকে হেয় গণ্য করে, অস্থায়ী ও সংকীর্ণ ক্ষমতায় স্ফীত হয়ে অধীনস্ত কর্মী ও দায়িত্বশীলদের উপর অযথা সন্দেহ ও মানসিক নির্যাাতন করে  সামর্থ্য থাকলে তাদেরকে হাত দ্বারা প্রতিহত করা। হাদীছে এসেছে,

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَان

‘তোমাদের যেকেউ কোন অপসন্দনীয় (কথা বা কর্ম) দেখলে সে যেন হাত দ্বারা বাধা প্রদান করে। (হাত দ্বারা বাধা প্রদান) সম্ভব না হলে যেন কথার মাধ্যমে বাধা প্রদান করে। এটাও সম্ভব না হলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে। আর এটিই হচ্ছে দুর্বলতম ঈমান’।[১] উল্লেখ্য যে, হাদীসে لَمْ يَسْتَطِعْ শব্দটি উল্লেখ করে বুঝানো হয়েছে যে, সামর্থ্য থাকলে হাত দ্বারা প্রতিহত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন রকম সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। তাহলে বিশৃঙ্খলার পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে। তবে যতটুকু সম্ভব ততটুকুই। যেমনটা বাদশা বা তাদের সমপর্যায়ের সামর্থ্যবান লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

খ. মৌখিকভাবে নিষেধ করা এবং ভাল কাজের পরামর্শ দেয়া

সমাজে ইসলামী বিরোধী কার্যক্রমগুলো মূলত ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়ে থাকে। ফলে অনেক সময় হাত দ্বারা বাধা দেয়া সম্ভব হয় না কিংবা থাকলেও বৃহত্তর সামাজিক শৃঙ্খলার স্বার্থে তা থেকে বিরত থাকতে হয়। কিন্তু  কোন রকম নীরবতা অবলম্বন করা চলবে না। তার ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ করতেই হবে। এজন্য যাবতীয় অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ দিতে হবে এবং ভাল কাজের দিকে আহ্বান করতে হবে ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে ধৈর্যধারণের নছীহত করতে হবে। রাসূল (ﷺ)-এর সময়ের প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। নিষ্ঠুর ও বর্বরতম আচরণের শিকার হত তাঁর সম্মানিত ছাহাবীগণ। অনৈতিকতা ও অশ্লীলতায় ভরপুর ছিল তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু তাঁদেরকে ধৈর্যধারণের নছীহত ছাড়া তিনি কিছুই করতে পারতেন না। এরকমই ঘটনা ঘঠেছিল ইয়াসির (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পরিবারের সাথে। যখন ইয়াসির ও তার পরিবার কঠিন অত্যাচারে জর্জরিত, তখন রাসূল (ﷺ) তাদেরকে শুধু ধৈর্যধারণের উপদেশ দিয়েছিলেন। তখন হাত দ্বারা বাধা দেয়ার মত অবস্থা ছিল না। রাসূল (ﷺ) ইয়াসির পরিবারকে লক্ষ্য করে বলেন,

صَبْرًا يَا آلَ يَاسِرٍ فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْجَنَّةُ

‘হে ইয়াসির পরিবার! ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয় তোমাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করা হয়েছে’।[২] রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সকল কাজে নম্রতা পসন্দ করেন’।[৩] এটাই হচ্ছে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের যথাযোগ্য পন্থা। নিম্নের হাদীসটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য,

مَا مِنْ نَبِىٍّ بَعَثَهُ اللَّهُ فِى أُمَّةٍ قَبْلِى إِلاَّ كَانَ لَهُ مِنْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّونَ وَأَصْحَابٌ يَأْخُذُونَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُونَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوفٌ يَقُولُونَ مَا لاَ يَفْعَلُونَ وَيَفْعَلُونَ مَا لاَ يُؤْمَرُونَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الإِيمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ

‘আল্লাহ তা‘আলা আমার পূর্বে যখনই কোন জাতির মাঝে নবী প্রেরণ করেছেন, তখনই সেই উম্মতের মধ্যে তার এমন হাওয়ারী ও সাথী দিয়েছেন, যারা তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে চলতেন, তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। অনন্তর তাদের পর এমন সব লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে, যারা মুখে যা বলে বেড়াত কাজে তা পরিণত করত ন। আর সে সব কর্ম তারা করত; যার জন্য তারা আদিষ্ট ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে যারা হাত দ্বারা জিহাদ করবে তারা মুমিন, যারা এদের বিরুদ্ধে মুখের কথার দ্বারা জিহাদ করবে তারাও মুমিন এবং যারা এদের বিরুদ্ধে অন্তরের ঘৃণা দ্বারা জিহাদ করবে তারাও মুমিন। এর বাইরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট নেই’।[৪]

রাষ্ট্রীয় নেতা, সমাজ নেতা বা ধর্মীয় নেতা যেই হোক না কেন যদি কেউ অন্যায় ও ইসলাম বিরোধী কাজের সাথে জড়িত হয় কিংবা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে অধীনস্তদের উপর শাসন চালায় এবং উক্ত কাজের কেউ যদি বিরোধিতা না করে তাহলে সেইও তাদের অনুসারী বলে বিবেচিত হবে। বরং সে ব্যাপারে যথাসাধ্য ন্যাসঙ্গতভাবে প্রতিবাদ করাই হবে মুক্তির পথ। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ زَوْجِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ إِنَّهُ يُسْتَعْمَلُ عَلَيْكُمْ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ كَرِهَ فَقَدْ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ فَقَدْ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِىَ وَتَابَعَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ أَلاَ نُقَاتِلُهُمْ قَالَ لاَ مَا صَلَّوْا أَىْ مَنْ كَرِهَ بِقَلْبِهِ وَأَنْكَرَ بِقَلْبِهِ

উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী করীম (ﷺ)-এর স্ত্রী থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, অদূর ভবিষ্যৎতে তোমাদের উপর এমন শাসকবৃন্দ নিযুক্ত করা হবে, যাাদের কিছু কাজ তোমরা ভাল দেখবে এবং কিছু কাজ গর্হিত দেখবে। অতএব যে ব্যক্তি সে কাজকে ঘৃণা করবে, সে দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে এবং যে আপত্তি ও প্রতিবাদ জানাবে সেও পরিত্রান পেয়ে যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তাতে সম্মত হবে এবং তাদের অনুসরণ করবে (সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে)। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? তিনি বললেন, না, যে পর্যন্ত তিনি ছালাত আদায় করেন’।[৫]

গ. হৃদয় দিয়ে উক্ত কাজকে প্রত্যাখ্যান করা

যখন কোন মুমিন হাত ও মুখ দ্বারা অন্যায় কাজে বাধা দিতে অক্ষম হবে, তখন সে অন্তর দ্বারা প্রতিরোধ করবে। সে অন্তর থেকে সেই অসৎ কাজকে অপসন্দ করবে, ঘৃণা করবে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবে না।[৬]

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সম্পর্কে হাদীছে একটি বিখ্যাত উপমা বর্ণিত হয়েছে, যা ‘নৌকা ছিদ্র করার উপমা’ নামে সমধিক বিখ্যাত। এটি সমাজে অন্যায় ও পাপকর্মে বাধা না দেয়ার ভয়াবহ পরিণাম বুঝাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ব্যবহার করেছেন। নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,

«مَثَلُ الْقَائِمِ عَلَى حُدُوْدِ اللهِ وَالْوَاقِعِ فِيْهَا كَمَثَلِ قَوْمٍ اسْتَهَمُوْا عَلَى سَفِيْنَةٍ، فَأَصَابَ بَعْضُهُمْ أَعْلَاهَا وَبَعْضُهُمْ أَسْفَلَهَا، فَكَانَ الَّذِيْنَ فِىْ أَسْفَلِهَا إِذَا اسْتَقَوْا مِنَ الْمَاءِ مَرُّوْا عَلَى مَنْ فَوْقَهُمْ فَقَالُوْا لَوْ أَنَّا خَرَقْنَا فِىْ نَصِيْبِنَا خَرْقًا، وَلَمْ نُؤْذِ مَنْ فَوْقَنَا. فَإِنْ يَتْرُكُوْهُمْ وَمَا أَرَادُوْا هَلَكُوْا جَمِيْعًا، وَإِنْ أَخَذُوْا عَلَى أَيْدِيْهِمْ نَجَوْا وَنَجَوْا جَمِيْعًا».

‘যে মহান আল্লাহর সীমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং যে সীমালংঘন করে, তাদের দৃষ্টান্ত সেই যাত্রীদলের মত, যারা লটারীর মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। তাদের কেউ স্থান পেল উপরতলায়, কেউ নিচতলায়। নিচতলার লোকেরা পানি সংগ্রহকালে উপরতলার লোকদের ডিঙ্গিয়ে যেত। তখন নিচতলার লোকেরা বলল, উপরতলার লোকদের কষ্ট না দিয়ে আমরা যদি নিজেদের অংশে একটি ছিদ্র করে নিই (তাহলে ভাল হত)। এমতাবস্থায় উপরতলাবাসীরা যদি এদেরকে আপন মর্জির উপর ছেড়ে দেয় তাহলে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা এদের হাত ধরে রাখে (বিরত রাখে) তবে তারা এবং সকলেই রক্ষা পাবে’।[৭]

উক্ত হাদীছের মূল শিক্ষা হল- (১) সমষ্টিগত নিরাপত্তা: সমাজ একটি নৌকার মত। সমাজবদ্ধ জীবনের কারো পাপে বা অন্যায়ে বাধা না দিলে তার খেসারত কেবল অপরাধী নয়, বরং পুরো সমাজকে দিতে হয়। (২) অসৎ কাজে বাধা দেয়া ফরয: প্রকাশ্য অন্যায় দেখলে তা হাত, মুখ বা অন্তরে ঘৃণা করে (সক্ষমতা অনুযায়ী) প্রতিহত করা ওয়াজিব। (৩) উদাসীনতার পরিণতি: যদি ভাল মানুষরা অন্যায়কারীকে ‘নিজের অংশ’ মনে করে ছেড়ে দেয়, তবে অন্যায়ের ছিদ্র দিয়ে বিপর্যয়ের পানি ঢুকে সবাইকে ডুবিয়ে ফেলবে। (৪) ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পাপ: সমাজ থেকে অন্যায় দূর না করলে আল্লাহর শাস্তি সবার ওপর নেমে আসে এবং পরবর্তীতে দু‘আ করলেও তা কবুল হয় না। অতএব এই হাদীছটি প্রমাণ করে যে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্র রক্ষার একটি অপরিহার্য দায়িত্ব।

৪. আইনের শাসন

আইনের শাসন রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিবিশেষ, যেখানে সরকারের সকল ক্রিয়াকর্ম আইনের অধীনে পরিচালিত হয় এবং যেখানে আইনের স্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ব্যবহারিক ভাষায় আইনের শাসনের অর্থ এই যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার সর্বদা আইন অনুযায়ী কাজ করবে, যার ফলে রাষ্ট্রের যেকোন নাগরিকের কোন অধিকার লঙ্ঘিত হলে সে তার প্রতিকার পাবে। মোট কথা, আইনের শাসন তখনই বিদ্যমান থাকে, যখন সরকারি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অনুশীলন সাধারণ আদালতের পর্যালোচনাধীন থাকে, যে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার সকল নাগরিকের সমান।[৮]

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইনের অনুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রে আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সকল নাগরিক সমানভাবে স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা পেতে পারে। কেউ কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে না। সাধারণভাবে আইনের অনুশাসন ২টি ধারণা প্রকাশ করে। যথা- আইনের প্রাধান্য ও আইনের দৃষ্টিতে সকলের সাম্য। আইনের প্রাধান্য বজায় থাকলে সরকার স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না এবং ক্ষমতা অপব্যবহার করতে সচরাচর সাহস করে না। আইনের প্রাধান্য নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। সমাজের আইনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে কেউ আইন অমান্য করে অন্যের অধিকারের হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সরকারও কারও ব্যক্তিস্বাধীনতায় অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে সাহস পাবে না। আইনের দৃষ্টিতে সাম্য মানে সমাজে ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, জাতি, ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলেই সমান। আইনের চোখে কেউ বাড়তি সুবিধা পাবে না। সকলের জন্য একই আইন প্রযোজ্য। রাষ্ট্রে ব্যাক্তি স্বাধীনতা তখনই খর্ব হয় যখন আইনের অনুশাসন থাকে না। আইনের অনুশাসনের অভাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সচরাচর নাগরিকদের হয়রানি করে, বিনা অপরাধেও আটক করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি না হলে আইনের শাসন কায়েম হয় না।[৯]

৫. মানবিক মূল্যবোধ

মানুষের জীবনকে যথার্থ সৌন্দর্যময় ও সাফল্যমণ্ডিত করে তার নৈতিক মূল্যবোধ। মানুষের জীবনের সাধনা হচ্ছে মনুষ্যত্ব অর্জনের চেষ্টা। মনুষ্যত্বের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক বিদ্যমান। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আদর্শবাদিতা প্রভৃতি মহৎ গুণের সমাবেশেই নৈতিকতার স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়। মনুষ্যত্বের উচিত-অনচিত নির্ধারণের মানণ্ড কী? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, মানুষের যেসব আচার-আচরণকে ভালো বলে বিবেচনা করা হয়, যেসব কাজ করে সুফল পাওয়া যায়, যেগুলো জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানবসমাজে প্রচলিত প্রথা ও রীতি, সেগুলোকেই ভালো বলে গ্রহণ করতে হবে। গতানুগতিক গোত্রীয় রীতিনীতির ওপর এসব সামাজিক ব্যবস্থার আওতায় নৈতিক মানদণ্ডসমূহ প্রতিষ্ঠিত। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত গোত্রীয় প্রথার ভিত্তিতেই মানবজীবনের আদর্শ বিবেচিত হয় এবং সেই উত্তম আদর্শ দ্বারাই পরিচালিত হয় সভ্য মানুষের জীবনাচরণ। ধর্মপ্রাণ মানুষ যত দিন বিবেকবান হয়ে এ ধরনের নীতি-আদর্শকে সমুন্নত রাখে, তত দিন মনুষ্যত্বের গৌরব বিকশিত হয় এবং ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের পরিচয় সমুজ্জ্বল হয়ে থাকে। সার্থক মানুষ ও সুন্দর সমাজ গঠনে ইসলামে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।[১০]

ধর্মীয় নীতি-আদর্শ দ্বারা পরিচালিত জীবনব্যবস্থা নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি মানুষের ইচ্ছার একটি প্রধান মানদণ্ড। এই মানদণ্ডে সমাজে মানুষের মৌলিক মানবীয় কর্মকাণ্ডের ভালোমন্দ বিচার করা হয়। তাই সামাজিক মূল্যবোধ হচ্ছে সততা, বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়নীতি, শিষ্টাচার, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, মায়া-মমতা, ক্ষমা, উদারতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, সদাচরণ প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তি বা মানবীয় গুণাবলির সমষ্টি। ইসলাম মানবজাতিকে এসব মহৎ গুণ অর্জনের জন্য আজীবন প্রয়াস চালাতে বিশেষভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’।[১১]

সামাজিক মূল্যবোধ হলো সমাজের ভিত্তি। সমাজজীবনে মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত আচরণ এবং কর্মকাণ্ড যেসব ইসলামি নীতিমালার আলোকে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাদের সমষ্টিই সামাজিক মূল্যবোধ। জীবনে কোনো প্রকার অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন থাকবে না, মানুষ স্বার্থপরতা-সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকবে এটি ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক ধর্মটাই এমন যে এখানে আত্মস্বার্থ ও পরার্থ দু’টি পরস্পরবিরোধী প্রবৃত্তি পাশাপাশি বিদ্যমান। একদিকে দৈহিক জৈবিক প্রবৃত্তি যেমন মানুষকে আত্মস্বার্থ হাসিল করতে প্ররোচিত করে, অন্যদিকে মানুষের বিবেক তাকে একই সঙ্গে নিজের ও অপরের সুখ-সুবিধার ব্যাপারে উদ্যোগী ও সহমর্মী হতে শেখায়। তাই অন্ধ প্রবৃত্তির চাপের মুখেও মহৎপ্রাণ মানুষ সমাজকল্যাণে বৃতী হন, আর্তমানবতার দুঃখ-দুর্দশা ও দারিদ্র্য বিমোচনে এগিয়ে যান। যুক্তিহীন প্রবৃত্তিসৃষ্ট প্রবল প্রতিকূলতার মুখেও মানুষের এই যে পরার্থপর ও কল্যাণমুখী প্রেরণা, এর মূলে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি কার্যকর। আর সেটি হচ্ছে অন্যের দুঃখে সহমর্মী না হলে তার নিজের দুঃখেও কেউ সহমর্মী হবে না। সে অন্যের ভালো না চাইলে অন্য কেউও তার ভালো চাইবে না।[১২]

যেকোনো সমাজের রীতিনীতি, মনোভাব এবং সমাজের অন্যান্য অনুমোদিত ব্যবহারের সমন্বয়ে মানুষের মধ্যে স্নেহ, মায়া-মমতা, সততা, সম্প্রীতি প্রভৃতি সৃষ্টি হয়। এমন হলে সেখানে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ বিদ্যমান আছে বলে মনে হয়। নৈতিক আদর্শসংবলিত সমাজে কোনো অনাচার থাকবে না। ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, শোষণ, স্বার্থপরতা এসব কুপ্রবৃত্তি থেকে সমাজ মুক্ত থাকলেই তখন নৈতিকতার আদর্শ প্রতিফলিত হয়। সব ধরনের দুর্নীতি থেকে মুক্ত জীবনই আদর্শ জীবন। ন্যায়নীতি থেকে বিচ্যুত জীবন কখনোই আদর্শরূপে গণ্য হতে পারে না। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (ﷺ) মানবজাতিকে অন্যায় প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখে তাহলে সে যেন তার শক্তি দ্বারা তা প্রতিহত করে। যদি সে এতে অক্ষম হয়, তবে মুখ দ্বারা নিষেধ করবে। যদি সে এতেও অপারগ হয় তবে সে অন্তর দ্বারা ঘৃণা পোষণ করবে’।[১৩]

ইসলামের বিধিবিধান ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, সত্যপথের অনুসারী হওয়া, অন্যের কোনো ক্ষতি না করা, পরোপকারের মহান ব্রতে উদ্দীপ্ত হওয়া এসবের চর্চা দ্বারাই মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটে। মানুষ যথার্থ সাফল্য অর্জন করে তখনই যখন সে নিজের কল্যাণ-অকল্যাণকে অপরের কল্যাণ-অকল্যাণের সঙ্গে সমন্বিত করে নিজের কল্যাণের মাধ্যমে অপরের কল্যাণের পথ সুগম করে। মানবিক গুণাবলিসমৃদ্ধ চরিত্রই নৈতিক মূল্যবোধে বিকশিত হয়। নৈতিক মূল্যবোধ ব্যক্তিজীবনকে উচ্চমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তার আদর্শ সবার জন্য অনুসরণীয় হয়। বর্তমান সমাজে নানা রকম দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটায় নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটছে। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে দুর্নীতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কোনো প্রকার অন্যায়ই যেন আজ অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না। নীতিভ্রষ্ট মানুষ নিজেকে অপরাধী বা হীন বলে গণ্য করে না। দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্তশালী হয়েও সংকোচবোধ করে না, বরং অর্থের অহংবোধে গৌরবান্বিত হয়। দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে জাতীয় জীবন থেকে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতির অবসান ঘটাতে নৈতিকতার চর্চা প্রয়োজন। এ জন্য প্রচলিত আইনে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে মানুষের জানমাল ও জীবিকার পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। নীতিবোধসম্পন্ন ও সুদক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং জনগণের মধ্যে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা জাগ্রত করতে হবে।[১৪]


* রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট, গাজীপুর।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৯, হাদীছ নং ১৮৬; মিশকাতুল মাসাবীহ, প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৪, হাদীছ নং-৫১৩৭।
[২]. আবু বকর আহমাদ ইবন আল-বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, ২য় খণ্ড (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১০ হি.), পৃ.২৩৯, হাদীছ নং-১৬৩১; আল-মুসতাদরাক আলাছ ছহীহাইন, প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৩২, হাদীছ নং-৫৬৪৬।
[৩]. আল-জামি‘উছ ছহীহিল মুখতাসার, প্রাগুক্ত, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২২৪২, হাদীছ নং-৫৬৭৮; ছহীহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৭০৬, হা/২১৬৫।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৯, হাদীছ নং-৫০; মিশকাতুল মাসাবীহ, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪, হাদীছ নং-১৫৭।
[৫] ছহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪৮০, হাদীছ নং-১৮৫৪; মিশকাতুল মাছাবীহ, প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৪৮০, হাদীছ নং-১৮৫৪।
[৬] ছহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৯, হাদীছ নং-১৮৬; মিশকাতুল মাছাবীহ, প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৪, হাদীছ নং-৫১৩৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৯৩।
[৮]. সম্পাদনা পরিষদ, বাংলাপিডিয়া, ৪ জুন ২০১৪, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
[৯]. https://myacademybd.com/?module=basic&page=digital-book&subId.
[১০]. মুহাম্মাদ আবদুল মুনিম খান, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা, দৈনিক প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট, ২০১৩, ‘ধর্ম’ পাতা দ্র.।
[১১]. সূরা আল-আহযাব: ২১।
[১২]. দৈনিক প্রথম আলো, মুহাম্মাদ আবদুল মুনিম খান, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা, ৩১ আগস্ট, ২০১৩, ‘ধর্ম’ পাতা দ্র.।
[১৩]. ছহীহ মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৯, হাদীছ নং-১৮৬; ইবনু মাজাহ হাদীছ নং ৪৯; মিশকাতুল মাছাবীহ, প্রাগুক্ত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১১৪, হাদীছ নং-৫১৩৭।
[১৪]. দৈনিক প্রথম আলো, মুহাম্মাদ আবদুল মুনিম খান, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা, ৩১ আগস্ট, ২০১৩, ‘ধর্ম’ পাতা দ্র.।




তওবার গুরুত্ব ও ফযীলত (শেষ কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
সূদ-ঘুষ ও অবৈধ ব্যবসা (শেষ কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
জঙ্গিবাদ বনাম ইসলাম - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ছালাতে একাগ্রতা অর্জনের ৩৩টি উপায় (শেষ কিস্তি) - আব্দুল হাকীম বিন আব্দুল হাফীজ
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আলো ও অন্ধকার (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
ইসলামী শরী‘আতে খাওয়ার আদব - আল-ইখলাছ ডেস্ক
সুন্নাতের রূপরেখা (৪র্থ কিস্তি) - মাইনুল ইসলাম মঈন
বিদ‘আত পরিচিতি (২৫ তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
পরবর্তীদের তুলনায় সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব (৩য় কিস্তি) - অনুবাদ : আযহার বিন আব্দুল মান্নান
মাযহাবী গোঁড়ামি ও তার কুপ্রভাব (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : রিদওয়ান ওবাইদ
তারুণ্যের উপর সন্ত্রাসবাদের হিংস্র ছোবল : প্রতিকারের উপায় - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
কুরবানীর মাসায়েল - আল-ইখলাছ ডেস্ক

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ