ঈদুল আযহা : করণীয় ও বর্জনীয়
-আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
ভূমিকা
ঈদুল আযহা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এটি ত্যাগ, কুরবানী ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান শিক্ষা বহন করে। এই ঈদ মূলত হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে, যেখানে তাঁরা আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ ঘটনার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ শিখে যে, আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের প্রিয় বস্তু পর্যন্ত ত্যাগ করাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। ঈদুল আযহা কেবল আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; বরং এটি ইবাদত, তাকবীর, ছালাত, কুরবানী, দান-ছাদাক্বাহ ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা প্রকাশের এক মহৎ উপলক্ষ। এই দিনে মুমিন বান্দারা আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনার অঙ্গীকার নবায়ন করে। তাই একজন মুমিনের উচিত এই দিনকে আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করা এবং শরী‘আতসম্মত আনন্দের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। নিম্নে ঈদুল আযহায় মুসলিমের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে উপস্থাপন করা হলো।
ঈদুল আযহার করণীয়
ঈদুল আযহা মুসলমানদের জন্য ত্যাগ, ইবাদত ও আনন্দের দিন। এই দিনে কিছু সুন্নাত ও করণীয় রয়েছে, যা পালন করলে সওয়াবের পাশাপাশি ঈদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।
১. ঈদের দিন গোসল করা
ঈদের দিনে গোসল করা সুন্নাত। এটি পবিত্রতা অর্জন, সতেজতা বৃদ্ধি এবং ঈদের সালাতের জন্য প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। নাফি‘ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ قَبْلَ أَنْ يَغْدُوَ إِلَى الْمُصَلَّى ‘আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ঈদের ছালাতের জন্য যাওয়ার আগে গোসল করতেন’।[১]
ফাক্বিহ ইবনে সাঈদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,أَنَّ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ كَانَ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَيَوْمَ الْأَضْحَى ‘উছমান ইবনে আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে গোসল করতেন’।[২]
২. শরী‘আতসম্মত সাজসজ্জা করা
ঈদের দিনে পরিষ্কার ও উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবী (ﷺ)-এর কাছে এক খিলাত (সুন্দর পোশাক) আনলেন এবং বললেন, يَا رَسُولَ اللهِ، اشْتَرِ هَذِهِ، فَتَجَمَّلْ بِهَا لِلْعِيدِ وَالْوُفُودِ ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এটি কিনুন এবং ঈদ ও মেহমানদের সাথে সাক্ষাতের সময় পরুন’।[৩]
৩. সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা
ঈদের দিনে সাধ্যমতো উত্তম ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা, যা ইসলামের সৌন্দর্য এবং ঐশ্বরিকতা প্রকাশ করে। নবী (ﷺ) নিজেও ঈদের দিনে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন এবং ছাহাবাদেরও তা করতে উৎসাহিত করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَلْبَسُ أَحْسَنَ ثِيَابِهِ فِي الْعِيدِ وَيَوْمَ الْجُمُعَةِ ‘নবী কারীম (ﷺ) ঈদের দিনে এবং জুমু‘আর দিনে তাঁর উত্তম পোশাক পরিধান করতেন’।[৪]
৪. ঈদের দিনে সুগন্ধি ব্যবহার করা
ঈদের দিনে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাত ও একটি সুন্দর আমল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদের দিনে ভালো পোশাক পরিধান করতেন এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। জাফর ইবনু মুহাম্মাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَلْبَسُ يَوْمَ الْعِيدِ أَحْسَنَ ثِيَابِهِ، وَيَتَطَيَّبُ بِأَطْيَبِ طِيبٍ عِنْدَهُ ‘নবী (ﷺ) ঈদের দিনে উত্তম পোশাক পরিধান করতেন এবং তার কাছে থাকা সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন’।[৫]
৫. ঈদের ছালাতের আগে কিছু না খাওয়া
ঈদুল আযহার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ হলো ঈদের ছালাতের আগে কিছু না খাওয়া এবং ছালাত শেষে কুরবানীর গোশত দিয়ে আহার শুরু করা। এতে কুরবানীর ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আত্মসমর্পণের শিক্ষা প্রকাশ পায়। এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,
كان رسولُ اللهِ ﷺ لا يَغْدو يَومَ الفِطْرِ حتى يَأكُلَ، ولا يَأكُلُ يَومَ الأضْحى حتى يَرجِعَ، فيَأكُلَ مِن أُضحِيَّتِه
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদুল ফিতরের দিনে কিছু না খেয়ে (ঈদের ছালাতের জন্য) সকালবেলা বের হতেন না; আর ঈদুল আযহার দিনে তিনি কিছু না খেয়ে (ঈদের সালাত শেষে) ফিরে না আসা পর্যন্ত আহার করতেন না, এরপর তিনি তাঁর কুরবানীর গোশত থেকে আহার করতেন’।[৬]
৬. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
সম্ভব হলে যানবাহন ছাড়া পায়ে হেঁটে ঈদের ছালাতের জন্য ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَخْرُجُ إِلَى الْعِيدِ مَاشِيًا، وَيَرْجِعُ مَاشِيًا
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদের ছালাত আদায়ের জন্য পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং ফিরে আসতেন’।[৭] আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,مِنَ السُّنَّةِ أَنْ تَخْرُجَ إِلَى الْعِيدِ مَاشِيًا، وَأَنْ تَأْكُلَ شَيْئًا قَبْلَ أَنْ تَخْرُجَ ‘সুন্নাত হল ঈদের দিন (ঈদগাহে) হেঁটে বের হওয়া এবং বের হওয়ার আগে কিছু খাওয়া’।[৮]
৭. ঈদের ছালাত খোলা মাঠ বা ঈদগাহে আদায় করা
শারঈ ওযর (অসুবিধা, বৈধ কারণ) ছাড়া ঈদের ছালাত ঈদগাহে আদায় করা সুন্নাত। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَخْرُجُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالأَضْحَى إِلَى الْمُصَلَّى، فَأَوَّلُ شَيْءٍ يَبْدَأُ بِهِ الصَّلَاةُ، ثُمَّ يَنْصَرِفُ، فَيَقُومُ مُقَابِلَ النَّاسِ، وَالنَّاسُ جُلُوسٌ عَلَى صُفُوفِهِمْ، فَيَعِظُهُمْ وَيُوصِيهِمْ وَيَأْمُرُهُمْ، فَإِنْ كَانَ يُرِيدُ أَنْ يَقْطَعَ بَعْثًا قَطَعَهُ، أَوْ يَأْمُرَ بِشَيْءٍ أَمَرَ بِهِ، ثُمَّ يَنْصَرِفُ
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহে বের হতেন। প্রথমেই তিনি ছালাত আদায় করতেন, তারপর ফিরে আসতেন এবং লোকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুত্ববা দিতেন, উপদেশ দিতেন, নির্দেশ দিতেন। যদি তিনি কোনো সেনা দল প্রেরণের ইচ্ছা পোষণ করতেন, তাহলে তা পাঠাতেন অথবা কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিতেন, তারপর ফিরে যেতেন’।[৯]
৮. ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবীর পাঠ করা
ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবীর পাঠ করা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাত এবং ঈদের আনন্দ প্রকাশের অন্যতম উপায়। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لِتُکَبِّرُوا اللّٰہَ عَلٰی مَا ہَدٰىکُمۡ وَ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ‘যাতে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো, তিনি তোমাদের যে পথনির্দেশ দিয়েছেন সেজন্য, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৫)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদের দিন নিচে উল্লেখিত তাকবীরটি পাঠ করতেন,اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لَاإِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الحَمْدُ ‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন মা’বুদ নেই, আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য’।
ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার সময় আস্তে আস্তে এই তাকবীর পাঠ করা এবং ঈদুল আযহায় ঈদগাহে যাবার সময় পথে এ তাকবীর আওয়াজ করে পাঠ করা সুন্নাহ।[১০]
৯. ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময়
ঈদের দিন ছাহাবায়ে কেরাম تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكُمْ বলে পরস্পরে একে অপরকে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। ইবনে হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,كَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ ﷺ إِذَا الْتَقَوْا يَوْمَ الْعِيدِ يَقُولُ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ تَقَبَّلَ اللَّهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ ‘নবী কারীম (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ যখন ঈদের দিনে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতেন, তখন বলতেন, ‘আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের পক্ষ থেকে (ইবাদত) কবুল করুন’।[১১]
১০. ঈদের ছালাত গুরুত্বের সাথে আদায় করা
ঈদের ছালাত ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি ফরয না হলেও অধিকাংশ ফক্বীহ এটিকে ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বলেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদের ছালাত কখনো পরিত্যাগ করেননি, তাই এটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করা উচিত। উম্মে আতিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,أَمَرَنَا يَعْنِي النَّبِيَّ ﷺ أَنْ نُخْرِجَ فِي الْعِيدَيْنِ الْعَوَاتِقَ وَذَوَاتِ الْخُدُورِ ‘নবী (ﷺ) আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যে, ঈদের দিনে আমরা যুবতী মেয়েদের এবং পর্দানশীন নারীদেরও ঈদগাহে বের করে আনব’।[১২] এই হাদীছ প্রমাণ করে যে, ঈদের ছালাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি নারীদেরকেও এতে অংশগ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,شَهِدْتُ مَعَ النَّبِيِّ ﷺ الصَّلَاةَ يَوْمَ الْعِيدِ فَبَدَأَ بِالصَّلَاةِ قَبْلَ الْخُطْبَةِ ‘আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ঈদের ছালাতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি প্রথমে ছালাত আদায় করলেন, তারপর খুত্ববা দিলেন’।[১৩]
১১. মহিলাদের ব্যবস্থা থাকলে ঈদগাহে মহিলাদেরও অংশগ্রহণ
ইসলাম শর্তসাপেক্ষে মহিলাদেরকেও ঈদগাহে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। উম্মে আতিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
أَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ أَنْ نُخْرِجَ فِي الْعِيدَيْنِ الْعَوَاتِقَ وَذَوَاتِ الْخُدُورِ، حَتَّى تَخْرُجَ الْجَارِيَةُ وَالْحَائِضُ، وَلِتَكُنَّ فِي صَلَاةِ الْمُسْلِمِينَ وَدُعَائِهِمْ
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন নারীদের, এমনকি ঋতুস্রাব অবস্থায় থাকা মহিলাদেরও ঈদগাহে বের হওয়ার জন্য আদেশ দিয়েছেন, তবে তাদের ছালাত না পড়ে মুসলিমদের সঙ্গে দু‘আ ও প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করা উচিত’।[১৪]
মহিলাদের ঈদগাহে যাওয়ার শর্ত
(ক) ঈদগাহে একান্তভাবে মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকা, যেমন : আলাদা জায়গা, নিরাপত্তা ইত্যাদি।
(খ) নেকতা ও শরী‘আতের দিক থেকে পরিপূর্ণতা। মহিলাদের ঈদগাহে যাওয়ার উদ্দেশ্য ঈদগাহে ঈদের ছালাতে অংশগ্রহণ নয়, বরং মুসলিমদের সঙ্গে দু‘আ, খুশি এবং ঈদের আনন্দে শামিল হওয়া।
(গ) অস্বস্তিকর পরিস্থিতি না হওয়া। মহিলাদের জন্য কোনও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি (যেমন- ইভটিজিং বা শারীরিক দুর্ব্যবহার) হলে তাদের ঈদগাহে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
১২. ঈদের দিনে প্রশিক্ষণ স্বরূপ শিশুদেরকেও ঈদগাহে নিয়ে যাওয়া। ঈদে শিশুদের অংশগ্রহণ একটি আনন্দদায়ক ও সুন্নাত অনুসরণীয় আমল। ঈদ ইসলামী সমাজের আনন্দের দিন এবং এটি সকল বয়সের মুসলিমদের জন্য উদযাপন করা উচিত, বিশেষ করে শিশুরা যাতে ঈদ উদযাপন ও আনন্দের মধ্যে অংশ নিতে পারে। সেজন্য নবী (ﷺ) শিশুদের প্রতি সদয় ছিলেন এবং তাদের ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করতেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
فَرِحَ النَّاسُ يَوْمَ عِيدٍ فَسَأَلَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا النَّبِيَّ ﷺ يَا رَسُولَ اللهِ، أَلَا تَأْمُرُ بِالْحَمَامِ لِلْغُرْبَاءِ؟ فَقَالَ ﷺ : الْغُرْبَاءُ فِي عِيدٍ لَا تَجُزُّهُ أَيْنَمَا كَانَ
‘একটি ঈদের দিনে মানুষ আনন্দ করছিল এবং আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি কি غُرَباء (অপরিচিত বা দূরের লোকদের) জন্য ঈদের আনন্দের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা করতে বলবেন? এতে নবী (ﷺ) বললেন, ‘অপরিচিতরা ঈদের দিনে অংশ নিতে পারে, তারা যার মধ্যে খুশি থাকে তা গ্রহণ করে’।[১৫] ঈদগাহে শিশুদের উপস্থিতি ঈদের আনন্দের অংশ, যা মুসলিম সমাজের ঐক্য ও বন্ধুত্বকে শক্তিশালী করে।
শিশুদের অংশগ্রহণের প্রমাণ
(ক) ঈদের দিন নবী (ﷺ) শিশুদের সাথে আনন্দ করতে উৎসাহিত করতেন। নবী (ﷺ)-এর সময়কালে ছোট ছোট শিশুরা ঈদের দিন উপস্থিত থাকত এবং মসজিদে তাদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হত।
(খ) নবী (ﷺ) শিশুদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
নবী (ﷺ) তার সন্তানদের এবং ছাহাবীদের শিশুদের জন্য ঈদ উদযাপন করতে উৎসাহিত করতেন, তাদের সাথেও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতেন।
(গ) শিশুদের জন্য খুশি প্রকাশ করা। নবী (ﷺ) শিশুদের জন্য বিশেষভাবে ঈদের দিনে আনন্দকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন এবং তারা যেন ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে তার জন্য সে দিনটিকে উজ্জ্বল এবং স্মরণীয় করে তোলার জন্য চেষ্টা করতেন।
১৩. এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ঈদগাহ থেকে বাড়ীতে আসা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঈদের দিন সাধারণত এক পথ দিয়ে যেতেন এবং ভিন্ন পথ দিয়ে ফিরে আসতেন। জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا كَانَ يَوْمُ عِيدٍ خَالَفَ الطَّرِيقَ ‘নবী (ﷺ) ঈদের দিন এক পথ দিয়ে যেতেন এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতেন’।[১৬]
১৪. কুরবানী করা
ঈদুল আযহার প্রধান ইবাদত হলো কুরবানী। অধিকাংশ আলেমদের মতে, উট, গরু ও ছাগল, এই চতুষ্পদ জন্তু কুরবানী করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ; এদের নর-মাদি উভয়ই বৈধ এবং ভেড়া ও দুম্বাও ছাগলের অন্তর্ভুক্ত। তবে হানাফি মাযহাবসহ কিছু আলেমের মতে, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব। এই মতকে শক্তিশালী বলেছেন ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ)। তাই যার সামর্থ্য আছে, তার জন্য কুরবানীর ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। অতএব, কোনো সচ্ছল ও সামর্থ্যবান মুমিন ব্যক্তির জন্য কুরবানীর ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,من كان له سَعَةٌ ولم يُضح؛ فلا يقربن مُصَلَّانا ‘যার সামর্থ্য আছে কিন্তু কুরবানী দেয় না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে-কাছেও না আসে’।[১৭]
তবে এটি অবশ্যক নয় যে, সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও যেকোন মূল্যে প্রত্যেককে কুরবানী করতেই হবে। লোকেরা যাতে এটাকে আবশ্যক মনে না করে, সেজন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আবূ বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, বেলাল, আবু মাসউদ আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) প্রমুখ ছাহাবীগণ কখনো কখনো কুরবানী করতেন না।[১৮]
১৫. কুরবানীর গোশত বণ্টন করা
কুরবানীর গোশত বণ্টন করাও ঈদুল আযহার অন্যতম কাজ। কুরবানীদাতার জন্য নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া দেওয়া এবং গরিব-মিসকীনদের মাঝে ছাদাক্বাহ করা উত্তম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَکُلُوۡا مِنۡہَا وَ اَطۡعِمُوا الۡبَآئِسَ الۡفَقِیۡرَ ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং দুঃস্থ-দরিদ্রকে খাওয়াও’ (সূরা আল-হাজ্জ : ২৮)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَکُلُوۡا مِنۡہَا وَ اَطۡعِمُوا الۡقَانِعَ وَ الۡمُعۡتَرَّ ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং সন্তুষ্ট ও প্রার্থী উভয়কে খাওয়াও’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৬)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا ‘তোমরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করো’।[১৯]
উলামাদের মতে, এক-তৃতীয়াংশ নিজে খাওয়া, এক-তৃতীয়াংশ হাদিয়া দেওয়া এবং এক-তৃতীয়াংশ ছাদাক্বাহ করা উত্তম; এ মতটি ইবনে মাসউদ ও ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত। তবে এর চেয়ে বেশি নিজে খেলেও সমস্যা নেই। মূলকথা, কুরবানীর গোশত এমনভাবে বণ্টন করা উচিত, যাতে গরিবদের অধিকার আদায় হয় এবং সমাজে সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়।
১৬. ইসলামী সংস্কৃতির মাধ্যমে ঈদের আনন্দ প্রকাশ করা
ইসলামে ঈদ এবং উৎসবের দিনগুলোতে বৈধ উপায়ে আনন্দ প্রকাশ করা অনুমোদিত। তবে এটি অবশ্যই শরী‘আতের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
دَخَلَ عَلَيَّ أَبُو بَكْرٍ فِي أَيَّامِ الْعِيدِ، وَعِندِي جَارِيَتَانِ تُغَنِّيَانِ وَتَضْرِبَانِ، وَالنَّبِيُّ ﷺ مُتَغَشٍّ بِثَوْبِهِ، فَانْتَهَرَهُمَا أَبُو بَكْرٍ، فَكَشَفَ النَّبِيُّ ﷺ عَنْ وَجْهِهِ وَقَالَ: دَعْهُمَا يَا أَبَا بَكْرٍ، فَإِنَّهَا أَيَّامُ عِيدٍ
‘ঈদের দিনে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন আমার পাশে দুইজন কিশোরী গান গাচ্ছিল এবং ঢোল বাজাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে ছিলেন। তখন আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাদেরকে তিরস্কার করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, ‘হে আবু বকর! তাদের ছেড়ে দাও, কারণ এটি ঈদের দিন’।[২০]
আনন্দ প্রকাশের কিছু বৈধ পদ্ধতি
১. হালাল বিনোদন (যেমন : নাশিদ, ইসলামিক গান, ক্রীড়া অনুষ্ঠান) করা।
২.পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটানো।
৩. ছাদাক্বাহ বা দান-খয়রাত করা।
৪. বাচ্চাদের আনন্দ দেওয়া ও তাদের জন্য উপহার দেওয়া।
৫. প্রসন্ন ও হাসিমুখ থাকা এবং পরস্পরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো।
ঈদুল আযহায় বর্জনীয় আমল
মুমিন ব্যক্তি ঈদের দিন আল্লাহর নে‘মতের উপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং মাগফিরাত লাভের আনন্দে আনন্দিত হবে। তবে এ আনন্দ অবশ্যই শরী‘আতের সীমার মধ্যে হতে হবে। ঈদ হলো ইবাদত ও কৃতজ্ঞতার দিন, পাপ-পঙ্কিলতার নয়। তাই নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থেকে বর্জন করা উচিত।-
১. শারঈ কোনো কারণ ছাড়া ঈদের ছালাত আদায় না করা।
২. ঈদের দিন এবং যিলহজ্জের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে সিয়াম পালন না করা।
৩. সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী থেকে বিরত থাকা।
৪. কুরবানীর নিয়তকারীর জন্য যিলহজ্জের চাঁদ দেখা থেকে কুরবানী সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত চুল, নখ বা শরীরের কোনো অংশ না কাটা।
৫. মানুষকে দেখানো বা খুশি করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করা (রিয়া)।
৬. কুরবানীর গোশত বা চামড়া বিক্রি করা।
৭. কসাইকে মজুরি হিসেবে গোশত বা চামড়া দেওয়া।
৮. গরিব ও আত্মীয়দের হক উপেক্ষা করা।
৯. বিজাতীয় আচার-আচরণ ও সংস্কৃতির অনুসরণ করা
১০. নারীদের বেপর্দা ও খোলামেলা চলাফেরা থেকে বিরত থাকা।
১১. গান-বাজনা, ডিজে পার্টি ও অশ্লীল বিনোদন থেকে দূরে থাকা।
১২. অনলাইন ও অফলাইনে অযথা সময় নষ্ট না করা।
১৩. ছালাতসহ অন্যান্য ইবাদতে গাফলতি না করা।
১৪. হারাম খাদ্য ও পানীয় (ধূমপান, মাদক ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকা।
১৫. জুয়া খেলা ও আতশবাজি ফোটানো থেকে দূরে থাকা।
১৬. অপচয় ও অপব্যয় না করা।
১৭. বিনোদনের নামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থেকে বিরত থাকা।
১৮. নিজের আনন্দের কারণে অন্যকে কষ্ট না দেওয়া বা সীমালঙ্ঘন না করা।
মূলকথা, ঈদের আনন্দ হবে হালাল, সংযত ও আল্লাহমুখী, যেখানে থাকবে ইবাদত, কৃতজ্ঞতা ও শৃঙ্খলা। কিন্তু থাকবে না পাপ, অশ্লীলতা ও অপচয়।
উপসংহার
ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যা কেবল আনন্দের নয়; বরং ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বাস্তব শিক্ষা দেয়। এই উৎসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর আত্মত্যাগের মহিমা এবং ইমানের দৃঢ়তার আদর্শ। আমাদের সমৃদ্ধ ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এই ঈদের পবিত্রতাকে আরও অর্থবহ করে তোলে। তাই এই দিনে এমন কোনো আচরণ বা অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ যেন না ঘটে, যা ঈদের পবিত্রতা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে; সে বিষয়ে সকলেরই সচেতন থাকা প্রয়োজন।
আসুন, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদ পালন করি এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ঈদুল আযহা পালনের তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!
* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. মুওয়াত্বা মালেক, হা/৪৮৮, সনদ ছহীহ।
[২]. ইবনু আবী শাইবা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৪৮।
[৪]. মু’জামুল আওসাত লিত ত্ববারানী, হা/৭৭১১; সনদ হাসান।
[৫]. মুস্তাদরাক হাকীম, হা/৭৫৬০; সনদ ছহীহ।
[৬]. তিরমিযী, হা/৫৪২, সনদ ছহীহ।
[৭]. ইবনু মাজাহ, হা/১২৯৫, সনদ হাসান।
[৮]. তিরমিযী, হা/৫৩০, সনদ হাসান।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬।
[১০]. মুস্তাদরাক হাকীম, হা/১১০৫।
[১১]. মুস্তাদরাক হাকীম, হা/১১০৫।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯০।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৮৪।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯৩।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৯।
[১৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮৬।
[১৭]. ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৩, সনদ হাসান।
[১৮]. মির‘আতুল মাফাতিহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৭১-৭৩।
[১৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬৯।
[২০]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯২।