উত্তর : যদি কোন মুসলিম প্রার্থী উপস্থিত থাকেন, সে ক্ষেত্রে অমুসলিম ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন বা নির্বাচিত করা জায়েয নয়। মুসলিমদের উপর কাফিরকে কর্তৃত্ব প্রদান করা সর্বসম্মতভাবে হারাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহ কখনো কাফিরদেরকে মুমিনদের উপর কর্তৃত্ব দান করবেন না’ (সূরা আন-নিসা : ১৪১)। ফক্বীহগণ বলেন, ‘ইমামত (রাষ্ট্রপ্রধান) হওয়ার জন্য যেসব শর্ত ফক্বীহগণ নির্ধারণ করেছেন, তার কিছু সর্বসম্মত। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
(১) ইসলাম : কারণ ইমামত (রাষ্ট্রনেতৃত্ব) বৈধ হওয়ার জন্য ইসলাম শর্ত। যেমন সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলাম শর্ত, তেমনি ইমামতের চেয়ে নিম্নস্তরের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও ইসলাম শর্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহ কখনো কাফিরদেরকে মুমিনদের উপর কোন কর্তৃত্ব দেবেন না’ (সূরা আন-নিসা : ১৪১)। আর ইমামত সম্পর্কে ইমাম ইবনু হাযম্ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন- এটি হল সর্ববৃহৎ ‘কর্তৃত্ব’ (সাবীল) এবং এতে মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা আবশ্যক।
(২) তাকলীফ অর্থাৎ শারঈ দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়া : এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হল- বুদ্ধিসম্পন্ন ও বালিগ হওয়া। সুতরাং কোন অপ্রাপ্তবয়ষ্ক শিশু বা পাগলের ইমামত (নেতৃত্ব) বৈধ নয়; কারণ তারা নিজেরাই অন্যের অভিভাবকত্বের অধীন, তাই তারা মুসলিমদের নেতৃত্ব দিতে পারে না। একটি আছার এসেছে, تعوذوا بالله من رأس السبعين, وإمارة الصبيان ‘সত্তর বছরের উর্ধে (অযোগ্য বৃদ্ধ নেতৃত্ব) এবং শিশুদের শাসন থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর’।
(৩) পুরুষ হওয়া : নারীর নেতৃত্ব (ইমারত) বৈধ নয়। কারণ হাদীছে এসেছে, ‘যে জাতি তাদের নেতৃত্ব কোন নারীর হাতে অর্পণ করে, তারা সফল হবে না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪২৫; তিরমিযী, হা/২২৬২; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৬১৩)। এছাড়া এই পদটির সঙ্গে গুরুতর দায়িত্ব ও ভারী বোঝা সংশ্লিষ্ট, যা নারীর স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তার সাধ্যের অতীত। ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হয় এবং কখনো কখনো নিজেও যুদ্ধে অংশ নিতে হয়।
(৪) কিফায়াহ বা যোগ্যতা- প্রয়োজনে সহযোগীদের মাধ্যমেও : এখানে ‘কিফায়াহ’ বলতে সাহস, বীরত্ব ও দৃঢ়তা বোঝায়- যাতে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা, রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা, শরী‘আতের দণ্ডবিধি (হুদূদ) বাস্তবায়ন এবং উম্মাহর প্রতিরক্ষা করার ক্ষেত্রে সক্ষম ও দায়িত্বশীল হতে পারেন।
(৫) স্বাধীন হওয়া : যার মধ্যে দাসত্ব (পরাধীনতা) রয়েছে, তার জন্য ইমামতের (নেতৃত্বের) দায়িত্ব অর্পণ করা বৈধ নয়, কারণ সে তার মনিবের সেবায় ব্যস্ত থাকে।
(৬) ইন্দ্রিয় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুস্থতা : ইমামতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে যে চলাফেরা ও কার্যসম্পাদন প্রয়োজন, তা থেকে বিরত রাখে- এমন ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ত্রুটি থাকা চলবে না। উল্লিখিত এই শর্তগুলো সর্বসম্মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে (আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ, ৬/২১৮ পৃ.)।
শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনু জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘মুসলিমের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বা শাসক নির্বাচনে অংশগ্রহণের হুকুম কী?’ তিনি বলেন, ‘মুসলিমের জন্য এমন কাজে অংশ নেয়া জায়েয নয়, যা কাফিরদের শক্তি বৃদ্ধি করে বা তাদেরকে মুসলিমদের উপর কোন সাধারণ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত করে। এটি তাদের সঙ্গে মৈত্রী, সমর্থন ও নির্ভরতার শামিল। আল্লাহ আমাদের ও কাফিরদের মধ্যে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব ছিন্ন করেছেন, যদিও তারা আত্মীয়স্বজন হয়’। তবে তিনি আরও বলেন, ‘যদি মুসলিমের শাসনে অংশগ্রহণ কাফিরদের অত্যাচার লাঘব করে বা মুসলিম নাগরিকদের জন্য কিছু স্বস্তি ও সুবিধা বয়ে আনে, আর সম্পূর্ণ নেতৃত্ব তাদের হাতে ছেড়ে দিলে মুসলিমদের বেশি ক্ষতি হয় এবং মুসলিমদের জন্য আলাদা স্বাধীন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কোন উপায় না থাকে- তাহলে এই নিয়তে অংশগ্রহণ জায়েয হতে পারে, যাতে কিছু ক্ষতি দূর করা যায়। কারণ যা পুরোপুরি অর্জন করা যায় না, তার অধিকাংশও পরিত্যাগ করা হয় না; এবং কোন কোন ক্ষতি অন্য ক্ষতির চেয়ে হালকা’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪৬৪৩২)। কিন্তু মুসলিমের জন্য কাফির রাষ্ট্রপতিকে ভোট দেয়া মোটেই জায়েয নয়; কারণ এতে কাফিরদের কর্তৃত্ব স্বীকার ও তাদেরকে মুসলিমদের উপর অধিষ্ঠিত করা হয়। সুতরাং আপনি মুসলিম প্রার্থীর পরিবর্তে অমুসলিমকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভুল করেছেন। তবে যদি কোন মুসলিম প্রার্থী না থাকে এবং মুসলিমরা ভোট দেয়াতে কল্যাণ দেখেন, তাহলে তারা এমন ব্যক্তিকে সমর্থন করতে পারেন, যিনি মুসলিমদের জন্য বেশি উপকারী বা কম ক্ষতিকর- যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৩০৬২)।
প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বী, বরিশাল।