উত্তর : আভিধানিক অর্থে রিবা বা সূদ হল, নির্দিষ্ট কিছু বস্তুর অতিরিক্ত অংশ। ‘রিবা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অতিরিক্ত, বর্ধিত। মূলধনের অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করাকে সূদ বলে। ফিক্বহের পরিভাষায়, الزيادة في أشياء مخصوصة ‘নির্দিষ্ট কিছু জিনিসের মধ্যে অতিরিক্ত গ্রহণ করাকে রিবা বলা হয়’ (তাহযীবুল লুগাহ, ১৫/১৯৫ পৃ.)।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তোমরা মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পেতে যে সূদ দাও, তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না’ (সূরা আর-রূম: ৩৮)। অর্থাৎ তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি বা উন্নতি লাভ করে না। এর মূল কারণ হল: জাহিলী যুগে যখন কারো ঋণ পরিশোধের সময় আসত, তখন ঋণদাতারা বলত: ‘আমাদেরকে একশ’ দিয়ে দাও, না হয় এটাকে বাড়িয়ে একশ’ পঞ্চাশ করে দাও’। আবার যখন একশ’ পঞ্চাশ পরিশোধের সময় হত, তারা বলত: ‘একশ’ পঞ্চাশ দিয়ে দাও, না হয় এটাকে বাড়িয়ে দুইশ’ করে দাও’ এভাবে তারা ঋণের পরিমাণ বাড়াতেই থাকত (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৯৪৫৮)। সমজাতীয় পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে মূল পণ্যের অতিরিক্ত যা কিছু গ্রহণ করা হয়, তাকে ইসলামী শরী‘আতে সূদ বলা হয়। রাসূল (ﷺ) বলেন, স্বর্ণের বদলে স্বর্ণ, রৌপ্যের বদলে রৌপ্য, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর, লবণের বদলে লবণ সমান সমান ও হাতে হাতে নিবে। অতঃপর যে ব্যক্তি তাতে বেশী দিল বা বেশী চাইল, সে সূদে পতিত হল। গ্রহীতা ও দাতা উভয়ে সমান’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৮৪)।
পারিভাষিক অর্থে রিবা হল: রিবায়ী (সূদ-সম্পর্কিত) বস্তুকে একই জাতীয় বস্তুর বিনিময়ে অতিরিক্ত গ্রহণ করা অথবা রিবায়ী বস্তুর লেনদেনে যে ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিনিময় (কাবয) আবশ্যক, সেখানে বিনিময় বিলম্বিত করা। অথবা এটি কিছু নির্দিষ্ট বস্তুর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গ্রহণকেও বলা হয় (মুনতাহাল ইরাদাত, ২/৩৪৭; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২৩/৫৭৫; আল-মুগনী, ৪/৩; আশ-শারহুল কাবীর আলা মাতনিল মুক্বনি, ৪/১২২ পৃ.)। সূদ দুই প্রকার। যথা: (১) রিবাল ফাযল (رِبا الفَضلِ) ও রিবান নাসীআহ (رِبا النَّسيئةِ)। রিবাল ফাযল বলতে বুঝায় নগদে বেশী নেয়া। যেমন বলা হয়,
وهو الزِّيادةُ في أحَدِ العِوَضَينِ في النَّوعِ الواحِدِ مُتَّحِدِ الجِنسِ، كالذَّهبِ بالذَّهبِ
‘এটি হল- একই জাতের এবং একই ধরণের বস্তুর এক পক্ষে অতিরিক্ত প্রদান, যেমন স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ। শাব্দিক অর্থে ফাযল (অতিরিক্ত) শব্দটি কমতির বিপরীত। যেমন ১ কিলোগ্রাম সোনার বিনিময়ে দেড় কিলোগ্রাম সোনা বিক্রয় করা, অথবা গমের এক ছা‘-এর বিনিময়ে দেড় ছা‘ গম বিক্রয় করার মত লেনদেন (ফাৎহুল আযীয, ৮/১৬২; আল-ইতকান ওয়াল ইহকাম ফী শারহি তুহফাতিল হুক্কাম, ১/২৯৪; আশ-শারহুল মুমতি‘, ৮/৩৯২ পৃ.)। এছাড়া হস্তগত রিবা (রিবাল ইয়াদ) নিষিদ্ধ। হস্তগত রিবার অর্থ হল- নগদ-বিনিময়ে একটি বস্তু বিক্রয় করা, কিন্তু লেনদেনের সময় এক পক্ষ তার প্রাপ্য গ্রহণ করবে, অন্যপক্ষ তার প্রাপ্য গ্রহণ করবে না (কিফায়াতুন নাবীহ, ৯/১২৫ পৃ.)। আর রিবান নাসীআহ বলতে বুঝায়: বাকীতে বেশী নেয়া। যেমন বলা হয়,
وهو تأْخيرُ القَبضِ فيما يَجْري فيه الرِّبا
‘এটি হল- রিবা (সূদ) সম্পর্কিত লেনদেনে বিলম্বিত গ্রহণ’। নাসী’আহ শব্দের অর্থ বাকী ও বিলম্বের সূদ। সূদসহ ঋণ ফেরত দিতে বিলম্বের বিনিময়ে ঋণের সূদের উপর অতিরিক্ত সূদ গ্রহণ করা। যেমন গমের এক ছা‘ পরিমাণের বিনিময়ে চাল বা যবের এক সা‘ বিক্রি করা এবং ক্রয়-বিক্রয়ের মাজলিস থেকে বিলম্বে গ্রহণ করা (তুহ্ফাতুল মুহতাজ, ৪/২৭৩; আল-ইকনা‘, ২/১২০; আশ-শারহুল মুমতি‘, ৮/৩৯২ পৃ.)।
এই দুই প্রকার সূদই নিষিদ্ধ। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘সূদ হল বাকীতে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২১৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৬)। তবে নগদে হলে সেটা সূদ হবে না। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘হাতে হাতে নগদ লেনদেনে কোন সূদ নেই’ (ছহীহ বুখারী, হা/২১৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৬)। অনুরূপভাবে বিনিময়ের ক্ষেত্রে পণ্যের ভিন্নতা থাকলেও সেটা সূদ হবে না। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যখন দ্রব্য ভিন্ন হবে, তখন তোমরা যেভাবে খুশী ক্রয়-বিক্রয় কর, যখন তা হাতে হাতে নগদে হবে’ (ছহীহ মুসলিম হা/১৫৮৭; আবূ দাঊদ, হা/৩৩৫০)।
একই জাতীয় পণ্য বিনিময়ে কম-বেশী যেহেতু বৈধ নয়, সুতরাং কেউ নিজের কাছে থাকা নিম্ন মানের জিনিস পরিবর্তন করে উন্নত মানের জিনিস নিতে চাইলে কী করবে এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) খায়বার এলাকায় এক ব্যক্তিকে চাকুরী দিলেন। ঐ ব্যক্তি সেখান থেকে বেশ ভালো খেজুর নিয়ে আসল। রাসূল (ﷺ) তা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, খায়বারের সব খেজুর-ই কি এমন ভালো হয়? ঐ ব্যক্তি বলল, জি-না, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা এক ছা‘ এরূপ খেজুর দুই ছা‘ (খারাপ) খেজুরের বিনিময়ে গ্রহণ করে থাকি। অথবা ভালো দুই ছা‘ খারাপ তিন ছা‘র বিনিময়ে গ্রহণ করে থাকি। এ কথা শুনে তিনি বললেন, এভাবে বিনিময় করো না। বরং খারাপ খেজুর (দুই বা তিন ছা‘) মুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করে ঐ মুদ্রা দিয়ে ভালো খেজুর কিনে নাও’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৪)।
উপরিউক্ত সব প্রকারের সূদ আল্লাহ্ তা‘আলা নিম্নোক্ত আয়াতের মধ্যে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহ কেনাবেচা হালাল করেছেন এবং সূদ হারাম করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৭৫)। জাবির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) সূদখোর, সূদদাতা, তার সাক্ষীদাতা ও তার লেখককে অভিসাম্পত করেছেন এবং বলেছেন, ‘ওরা সবাই সমান’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৭-১৫৯৮; আবূ দাঊদ, হা/৩৩৩৩; তিরমিযী, হা/১২০৬; ইবনে মাজাহ, হা/২২৭৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪২৬৩)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন, ‘ঋণদাতার জন্য ঋণগ্রহীতার নিকট ঋণ প্রদানের বিনিময়ে লাভবান হওয়ার শর্তারোপ করা জায়েয নয় (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৪/১৭৭-১৭৮ পৃ.)।
প্রশ্নকারী : শাকিল, রাজশাহী।