উত্তর : ইসলামী শরী‘আতের আলোকে চুল কাটার সঠিক পদ্ধতি হল- চতুর্দিক থেকে সমানভাবে চুল কাটা। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূল (ﷺ) ‘ক্বাযা’ থেকে নিষেধ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি নাফি‘ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্বাযা’ কী? তিনি বললেন, শিশুর মাথার (চুল) কিছু কামানো এবং কিছু রেখে দেয়া (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯২০-৫৯২১; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২০)।
অন্যত্র বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, একদা নবী (ﷺ) দেখলেন যে, একটি শিশুর মাথার কিছু অংশ কামানো আর কিছুটা অবশিষ্ট রাখা আছে। তিনি তাদেরকে এরূপ করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, হয় সবটুকু কামিয়ে ফেলো নতুবা সবটুকু রেখে দাও (আবূ দাঊদ, হা/৪১৯৫; নাসাঈ, হা/৫০৪৮)। আলেমগণ বলেন, ‘ক্বাযা’ বলতে বোঝায় ‘মাথার কিছু অংশ কাটা ও কিছু অংশ অবশিষ্ট রাখা, অথবা মধ্যস্থলের চুলগুলো কাটা এবং চতুর্দিকের চুলগুলো অবশিষ্ট রাখা, যেমন : খ্রীষ্টানরা করে থাকে, অথবা চারিধারের চুল কাটা এবং মধ্যস্থলের চুলগুলো অবশিষ্ট রাখা।
যেমন : অধিকাংশ নির্বোধেরা করে থাকে। অনুরূপভাবে মাথার অগ্রভাগ কেটে পশ্চাৎদেশ অবশিষ্ট রাখা। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এগুলো অগ্নিপূজকদের কর্ম, আর যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুতারাং বুঝা গেল যে, চুলের কিছু অংশ কাটা ও কিছু অংশ বাকি রাখা নাজায়েয’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৫/১৭১ পৃ.)।
উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে মারফূ‘ হাদীছে এসেছে- ‘হিজামা ছাড়া শুধু ঘাড়ের পেছনের চুল মুণ্ডন করা অগ্নিপূজকদের কাজ’। আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি তার এক গোলামকে দেখলেন, যার মাথায় দুই পাশে ঝুঁটি বা চুলের গোছা ছিল। তখন তিনি বললেন, ‘এই দুটো মুণ্ডন করে দাও অথবা ছোট করে কেটে দাও। কারণ এটা ইয়াহুদীদের বেশভূষা’। আর মারূযী বলেন- আমি আবূ আব্দুল্লাহ (অর্থাৎ ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল)-কে ঘাড়ের পেছনের চুল মুণ্ডন করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘এটা মাজূসীদের কাজ। আর যে কোন জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’ (ফাতাওয়া আল-মারআতিল মুসলিমাহ, ২/৫১০ পৃ.)।
উল্লেখ্য যে, উপমহাদেশে রাসূল (ﷺ)-এর চুল রাখার পদ্ধতিকে বাবরী চুল বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এই পরিভাষাটি সঠিক নয়। অভিধানে বাবরী শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দ বাবর বা বাব্বার থেকে- যার অর্থ সিংহ। বাবরী মানে সিংহ সদৃশ বা সিংহের কেশরের মত কাঁধে ছাড়ানো চুল। কাঁধ পর্যন্ত প্রলম্বিত কুঞ্চিত কেশদাম, বড় কোঁকড়া চুল।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূল (ﷺ) অধিকাংশ সময় চুল লম্বা রাখতেন (ফাৎহুল বারী, ১০/৩৬০; ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ র্দাব, ২২/০২ পৃ.)। এমনকি কোন কোন সময় তাঁর চুলে চারটি বেণী করা যেত (আবূ দাঊদ, হা/৪১৯১; তিরমিযী, হা/১৭৮১)। হাদীছের পরিভাষায় রাসূল (ﷺ)-এর লম্বা চুল রাখার পদ্ধতিকে তিনটি শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। যথা : (১) ‘ওয়াফরাহ’ তথা কানের লতি পর্যন্ত লম্বা চুল। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ)-এর চুল তাঁর দুই কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল (আবূ দাঊদ, হা/৪১৮৫, ৪১৮৭; তিরমিযী, হা/১৭৫৫)।
(২) ‘লিম্মাহ’ তথা গর্দান ও কানের লতির মাঝামাঝি বরাবর লম্বা চুল। বার’আহ ইবনু আযীব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি কোন ব্যক্তিকে ‘লিম্মা’ অর্থাৎ কান পর্যন্ত বাবরীধারী চুলে ও লাল ইয়ামানী চাদরের আবরণে রাসূল (ﷺ) থেকে অধিক সুন্দর দেখিনি। রাবী মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ) অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেন, তাঁর চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ছিল (ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩৭; আবূ দাঊদ, হা/৪১৮৩; তিরমিযী, হা/১৭২৪, ৩৬৩৫)।
(৩) ‘জুম্মাহ’, তথা ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত বা ঘাড় পর্যন্ত আলম্বিত চুল (নাসাঈ, হা/৫০৬৬; আবূ দাঊদ, হা/৪১৮৫, ৪১৮৭; তিরমিযী, হা/১৭৫৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৩৫)। অতএব রাসূল (ﷺ) কখনো তাঁর চুল কাঁধ সমান লম্বা রাখতেন আবার কখনো ছোট করতেন। দুটোই বৈধ, এমন নয় যে, লম্বা চুল রাখলে ছাওয়াব পাওয়া যাবে, আর ছোট চুল রাখলে গুনাহ হবে, কিংবা এর বিপরীত। তবে তিনি চুলের যত্ন নিতে বলেছেন। রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ كَانَ لَهُ شَعْرٌ فَلْيُكْرِمْهُ ‘যার মাথায় চুল আছে সে যেন এর যত্ন নেয়’ (আবূ দাঊদ, হা/৪১৬৩; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫০০)। আনাস (ﷺ) বলেন, নবী (ﷺ)-এর মাথার চুল (কখনও) কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হত (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯০৩-৫৯০৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (ﷺ)-এর চুল মধ্যম ধরনের ছিল না একেবারে সোজা, না বেশি কোঁকড়ানো। আর তা ছিল দু’কান ও দু’কাঁধের মাঝ পর্যন্ত (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯০৫; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৬৯৮২২)।
প্রশ্নকারী : মাসুম বিল্লাহ, আটুয়া দক্ষিণপাড়া, পাবনা।