আগ্রাসী কানূনের কবলে ভারতীয় মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী ওয়াক্বফ সম্পত্তি
-হাসিবুর রহমান বুখারী*
ভূমিকা
‘ওয়াক্বফ সংশোধনী বিল-২০২৫’ পাস হওয়ার পর সারা দেশ আজ ওয়াক্বফ নিয়ে উত্তাল, কী মুসলিম আর কী হিন্দু! মুসলিম সমাজে যেমন একটা গেল গেল রব, তেমনি মুসলিমদের হাত থেকে কিছু একটা চলে যাচ্ছে বলে হিন্দুদের মধ্যে এলো এলো রব! বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো এর বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে এবং ওয়াক্বফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় মুসলিমদের ঐতিহ্যগত অধিকার ক্ষুণ্ন করবে। ওয়াক্বফ বিলের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপ কোন সাধারণ বিষয় না। এটা সরাসরি মুসলিম ধর্মের প্রতি কুঠারাঘাত করে যাওয়ার সমতুল্য। বর্তমান সরকারের অভিপ্রায় একেবারেই ভিন্নতর। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন পেতে যেকোনভাবে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে অসম্মান করে যাওয়া।
বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে, ওয়াক্বফ বোর্ড দেশের তৃতীয় বৃহত্তম ল্যান্ড-ব্যাঙ্ক। তাদের হাতে কমবেশী ৯ লক্ষ একরের মত জমি রয়েছে। বিষয়টি সত্য। কারণ ওয়াক্বফ বোর্ড দেশের একটি একক সংস্থা যেখানে মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের সম্পত্তি দান করে থাকেন। অথচ সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ওয়াক্বফ বোর্ডের প্রায় ৩০% জমি কেন্দ্র অথবা বিভিন্ন রাজ্য সরকার দখল করে রেখেছে। এছাড়া ৩০% জমিতে রয়েছে কবরস্থান, যেখান হতে ইনকাম আসার কোন সম্ভবনা নেই। ১৫% জমিতে রয়েছে বিভিন্ন মাদরাসা, যেখানে বিনা পয়সায় অথবা নামমাত্র টাকার বিনিময়ে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। এছাড়া, ১০% জমিতে রয়েছে বিভিন্ন মসজিদ অথবা মকতব।। অবশিষ্ট রইল মাত্র ১৫% জমি। সেখান হতে নামমাত্র আয় এসে থাকে। পক্ষান্তরে হিন্দু মন্দিরের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারে ভিন্ন, সেক্ষেত্রে এক একটি মন্দিরের ভিন্ন ভিন্ন ট্রাষ্ট্রি বোর্ড রয়েছে। দেশের মাত্র গোটা দশেক মন্দিরের সম্পদ সম্পত্তি গোটা ওয়াক্বফ বোর্ডের সম্পত্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশের সমস্ত মন্দিরের সম্মিলিত জমি একত্রিত করলে সেটা ওয়াক্বফ বোর্ডের জমির চেয়ে কয়েকশ’ গুণ বেশী হবে, এ বিষয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। ধর্ষক জেলবন্দী খুনের আসামী আশারাম বাপুর ট্রাষ্টের নামে ১০ হাজার একরের বেশী জমি রয়েছে। আরেক ধর্ষক বাবারাম রহিমের হাতে রয়েছে ৭.৫ হাজার একরের বেশী জমি। মাত্র দু’টি ট্রাষ্টের জমির বহর দেখে গোটা দেশের পরিস্থিতি অনুভব করে নেয়া যেতে পারে। নিম্নে এ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হল:
(ক) ভারতে ওয়াক্বফ সম্পত্তির আইনি পটভূমি
ভারতে ওয়াক্বফ গঠিত হয় মধ্যযুগে ইসলামের আগমনের পরে। সুলতানী আমলে ও মুঘল আমলে দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও মুলতানে, নিজাম-শাহের আমলে অবিভক্ত অন্ধ্রে, নবাব শাহী আমলে বাংলায় এবং অন্যান্য রাজ্যে বহু ওয়াক্বফ সম্পত্তি গঠিত হয়। এইসব ওয়াক্বফ্ সম্পত্তি ব্যবহৃত হত দাতব্যমূলক কাজে এবং মুসলিম জনগণের সেবায়। ঐ অর্থে তৈরি করা হত মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কবরস্থান এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেই ধারা এখনো অব্যাহত। পরবর্তী পর্যায়ে মুঘল শাসনামলে আওরঙ্গজেবের ‘ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী-এর মাধ্যমে ওয়াক্বফ সংক্রান্ত আইনসহ মুসলিম আইনগুলোকে সংহিতাবদ্ধ করেছিলেন, যা ব্রিটিশ যুগে প্রিভি কাউন্সিলের সময়কাল পর্যন্ত বৈধ ছিল। ভারতে মুসলিম ওয়াক্বফ বৈধকরণ আইন-১৯১৩, মুসলিম ওয়াক্বফ আইন-১৯২৩, ব্রিটিশ আমলে প্রিভি কাউন্সিলের সময় প্রচলিত ছিল। অতঃপর বেঙ্গল ওয়াক্বফ আইন-১৯৩৪ অস্তিত্ব লাভ করে এবং তারপরে ওয়াক্বফ আইন-১৯৫৪ (কেন্দ্রীয় আইন), যা বলবৎ ছিল পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া যেখানে বেঙ্গল ওয়াক্বফ আইন-১৯৩৪ বলবৎ ছিল কেন্দ্রীয় আইন জারি হওয়ার আগ পর্যন্ত। অতঃপর দেশ স্বাধীন হলে ভারত সরকার ঐ আইনের পরিবর্তন ঘটিয়ে ১৯৫৪ সালে ওয়াক্বফ আইন তৈরি করে। পরে ১৯৫৯, ১৯৬৪, ১৯৬৯ ও ১৯৮৪ সালে কিছু কিছু সংশোধন করা হয়। পরে যৌথ সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৯৫ সালে নতুন ভাবে ওয়াক্বফ আইন তৈরি করে। বর্তমানে এই আইনকেই ‘প্রিন্সিপ্যাল’ আইন বলা হয়। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদীয় সিলেক্টেড কমিটির সুপারিশের উপর ভিত্তি করে ঐ আইনের বেশ কিছু সংশোধনী যুক্ত করে। ১৯৫৪ এবং ১৯৯৫ সালের আইনের ভিত্তিতেই দেশের প্রতিটি রাজ্যে একটি ঝঃধঃব ডধয়ভ ইড়ধৎফ এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ঈবহঃৎধষ ডধয়ভ ঈড়ঁহপরষ নামে ওয়াক্বফ বোর্ড গঠিত হয়, যারা এই সম্পত্তির তত্ত্বাবধান করে। বর্তমান বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৯৫ সালের আইনের উপর ৪০টির বেশি সংশোধনী এনেছে।
(খ) পুরনো ওয়াক্বফ্ আইন এবং নতুন ওয়াক্বফ্ আইনের মধ্যে পার্থক্য
১. আইন প্রণয়নের সাল ও কাঠামো: ভারতে প্রথম ওয়াক্বফ আইন চালু হয় ১৯৫৪ সালে জওহরলাল নেহেরুর আমলে (ঞযব ডধশভ অপঃ, ১৯৫৪)। এটি ছিল সীমিত কাঠামোর উপর ভিত্তি করে তৈরি। নতুন ওয়াক্বফ আইন ১৯৯৫ সালে ‘ঞযব ডধশভ অপঃ, ১৯৯৫’ প্রধানমন্ত্রী পি.ভি. নারসিমহা রাও-এর আমলে চালু হয়, যা ১৯৫৪ সালের আইনটি বাতিল করে। পরে ২০১৩ সালে ড. মনমোহন সিংয়ের আমলে এই আইনে বড়সড় সংশোধনী আনা হয়।
২. ওয়াক্বফ বোর্ডের গঠন ও ক্ষমতা: পুরনো আইনে ওয়াক্বফ বোর্ডের ক্ষমতা সীমিত ছিল এবং তাদের প্রতি সরকারী নজরদারি কম ছিল। নতুন আইনে ওয়াক্বফ বোর্ডকে অধিকতর ক্ষমতাবান করা হয়েছে। বোর্ডের সদস্যদের নির্বাচন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন কঠোর হয়েছে।
৩. সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন ও পরিচালনা: পুরনো আইনে ওয়াক্বফ সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক ছিল না। অনেক সম্পত্তি অব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। নতুন আইনে প্রতিটি ওয়াক্বফ সম্পত্তি রেজিস্ট্রারের কাছে নথিভুক্ত হতে হবে। এছাড়া সম্পত্তির ডেটাবেস সংরক্ষণের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৪. দখলদারিত্ব ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: পুরনো আইনে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না। ২০১৩ সালের নতুন সংশোধনী আইনে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান যুক্ত হয়েছে, এমনকি জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৫. স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার: পুরনো আইনে স্বচ্ছতার অভাব ছিল, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না। নতুন আইনে ডিজিটাল রেজিস্ট্রি, জিও ট্যাগিং, অনলাইন তথ্য প্রদান, ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
৬. সুপারিশ ও তদারকির জন্য কাউন্সিল: নতুন আইনে ‘ঈবহঃৎধষ ডধয়ভ ঈড়ঁহপরষ” ও “ঝঃধঃব ডধয়ভ ইড়ধৎফং’ কার্যকরভাবে মনিটরিং ও সুপারিশ প্রদানের জন্য কাজ করে।
(গ) বর্তমান ‘ওয়াক্বফ সংশোধনী বিল ২০২৫’-এর বিভিন্ন আপত্তিকর দিকগুলো কী কী?
১. সংশোধনীতে বলা হয়েছে ওয়াক্বফ আইন ডঅছঋ অপঃ কথাটির পরিবর্তে এই আইনটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘উম্মীদ’ (টসববফ), যার পূর্ণরূপ ‘টহরভরবফ ডধয়ভ গধহধমবসবহঃ ঊসঢ়ড়বিৎসবহঃ, ঊভভরপরবহপু ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ’ অপঃ। বিলের ১৩ (২এ) অংশে বলা হয়েছে, বোহরা সম্প্রদায় এবং আফগানী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব রাখতে পৃথক পৃথক বোর্ড করা হবে। অর্থাৎ বিভাজনের দৃষ্টিভঙ্গি হতে মুসিলম জনসাধারণকে ভাগ করতে চাওয়া হয়েছে। যদিও বর্তমান বোর্ডগুলো সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কাজ করে।
২. বিল অনুযায়ী কেবল একজন মুসলিম যিনি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে ধর্ম পালন করছেন এমন ব্যক্তিই ওয়াক্বফ সম্পত্তি দান করতে পারেন। ১৯৯৫ সালের আইনে বলা ছিল যে, কোনও ব্যক্তি তা করতে পারেন। এটা তার সাংবিধানিক অধিকার। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ হতে সেই অধিকারকে খর্ব করতে চাওয়া হয়েছে, যাতে অমুসলিমরা কেউ ওয়াক্বফে সম্পত্তি দান না করেন। সংশোধিত আইনের ফলে মুসলিম অমুসলিম ভ্রাতৃত্বের এই প্রকাশ আর সম্ভব হবে না।
৩. ১৯৯৫ সালের আইনে বলা আছে কেন্দ্রীয় ওয়াক্বফ কাউন্সিলের সদস্যরা মুসলিম সম্প্রদায়ের হবেন। কিন্তু নতুন বিলে বলা হয়েছে ঐ কাউন্সিলে অন্তন্ত দু’জন অমুসলিম থাকবেন। অথচ হিন্দু মন্দির, খ্রিস্টান গির্জা ট্রাষ্টে তো অন্য ধর্মের মানুষের প্রবেশ অধিকার নেই। ইসলামিক আদেশ অনুযায়ী ওয়াক্বফ সম্পত্তি পরিচালনা থেকে অমুসলিমদের নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও, সংশোধিত আইনে ওয়াক্বফ বোর্ডে অমুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি মুসলিমদের ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারের উপর আক্রমণ। সরকারের দাবি, এই পরিবর্তন স্বচ্ছতা ও বৈচিত্র বাড়াবে এবং দুর্নীতি কমাবে। তবে, সমালোচকরা মনে করেন, এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ ছাড়া কিছুই নয়।
৪. ১৯৯৫ আইনে বলা ছিল ওয়াক্বফ সম্পত্তি বিষয়ে যে সব ট্রাইবুনাল গঠিত হবে সেখানে মুসলিম আইন সম্পর্কে দক্ষতা আছে এমন ব্যক্তিকে রাখতেই হবে। বিলে এই ব্যবস্থা তুলে দেয়া হয়েছে। লক্ষ্যটা কী তা নিশ্চয় বুঝতে অসুবিধা হয় না!
৫. পূর্বের আইন মোতাবেক রাজ্য সরকার ওয়াক্বফ বোর্ডের সদস্য হিসাবে সাংসদ ও বিধায়ক ক্ষেত্র হতে মুসলিম সাংসদ ও বিধায়কদের মধ্য হতে মনোনীত করত। বর্তমান বিলে বলা হয়েছে, মুসলিম হতে হবে এমন নয়, যে কোন সাংসদ, বিধায়ক থাকতে পারবেন। প্রশ্ন হল- মন্দির ট্রাস্ট বডিতে এই ফর্মুলা মেনে নেয়ার বিল কবে আসবে?
৬. এই বিল অনুযায়ী ওয়াক্বফ সম্পত্তি নির্ধারণের ক্ষমতা সার্ভে কমিশনারের কাছ থেকে সরকার নিযুক্ত রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, সরকার ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং বৃত্তিমূলক কেন্দ্রগুলোকে জব্দ করার গভীর ষড়যন্ত্রে মেতেছে। ফলে ওয়াক্বফ সম্পত্তির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা হবে। বিলে আরও বলা হয়েছে, যে কোনও ওয়াক্বফ সম্পত্তির নথিসহ রেজিষ্ট্রকরণ বাধ্যতামূলক এবং তা করতে হবে জেলাশাসকের কাছে। কেন এটা হবে? মৌখিক অনুমতির ভিত্তিতে বহু ওয়াক্বফ সম্পত্তি তৈরি (ডধশভ নু ঁংব) হয়েছে এবং তা লাগু আছে। সেগুলোর তাহলে কী হবে? দীর্ঘ-মেয়াদী ব্যবহারের মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হাজার হাজার ওয়াক্বফ সম্পত্তির নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতামূলক নতুন আদেশটি সরকারের গোপন কর্মসূচিকেই উন্মোচিত করে, সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে ক্ষমতা লাভের মাধ্যমে।
৭. ১৯৯৫ সালের আইনে বলা আছে ওয়াক্বফ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে রাজ্য সরকারগুলো ওয়াক্বফ ট্রাইবুনাল তৈরি করবে এবং ৭(১) ধারায় বলা আছে, সেই ট্রাইব্যুনালের রায় চূড়ান্ত। বর্তমান বিলে ৭(১) ধারাকে তুলে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতা দেয়া হয়েছে জেলাশাসকদের। এক্সিকিউটিভদের এই জুডিশিয়ারি ক্ষমতাদানের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হচ্ছে। এই আইন প্রনয়নের মাধ্যমে ওয়াক্বফ বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। সরকার ইচ্ছা মত তার এজেন্সি দিয়ে বোর্ডকে অকার্যকর করতে উদ্যোগী।
৮. সংশোধিত আইনে সরকারী মালিকানাধীন, পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত সম্পত্তিকে ওয়াক্বফ হিসাবে দাবি করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিল অনুযায়ী কোনও ওয়াক্বফ সম্পত্তি সরকারের অধীনে থাকলে তা আর ওয়াক্বফ সম্পত্তি থাকবে না। তা কেন হবে? ওয়াক্বফ বোর্ড মালিকানা কেন হারাবে? ওয়াক্বফ সম্পত্তি আমাদের নিজস্ব সম্পদ। সরকার দান করেনি। অন্য কোন ধর্মের লোক দান করেনি। সেই জন্য ওয়াক্বফ্ সম্পত্তি যে উদ্দেশ্যে দান করেছেন শুধু সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে। তাই সরকারের দেখা উচিত যেসব সরকারী সম্পত্তির মালিকানা ওয়াক্বফের নামে আছে অথচ সরকার ভোগ করছে তার মধ্যে যেগুলো ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব সেগুলো ফিরিয়ে দেয়া।
৯. এই বিল অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার রেজিস্ট্রিকৃত ওয়াক্বফ সম্পত্তির হিসাব পরীক্ষা করার বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারবে। ১৯৯৫ সালের আইনে ওয়াক্বফ্ বোর্ড এবং রাজ্য সরকার এই কাজ করত। এটা রাজ্য সরকারের কাজের উপর এবং ওয়াক্বফ বোর্ডগুলোর ক্ষমতার উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ওয়াক্বফ বোর্ডগুলো তদারকি করে রাজ্য সরকার। এই বিল প্রণয়নের সময়ে কেন্দ্র সরকার রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেনি। কৃষিনীতি (বর্তমানে বাতিল), শ্রমনীতি, এমন কি শিক্ষানীতি রচনায় কেন্দ্র একই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। এই পদক্ষেপে আসলে ভারতের সংবিধান স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপরেই আঘাত।
১০. সর্বশেষে ওয়াক্বফ আইনের ৪০ ধারা বাতিল করার মাধ্যমে, ‘ওয়াক্বফ বোর্ড’ ওয়াক্বফ সম্পত্তির প্রকৃতি নির্ধারণের কর্তৃত্ব হারাবে। ওয়াক্বফ সম্পত্তিগুলো মূলত চারটি বিভাগে পড়ে। যথা: দলীল অনুসারে ওয়াক্বফ (নথিভুক্ত), মৌখিক ঘোষণা অনুসারে ওয়াক্বফ (মৌখিকভাবে ঘোষিত), ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াক্বফ (দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত) এবং সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জমি। নতুন সংশোধনীর অধীনে দেশের বেশিরভাগ ওয়াক্বফ সম্পত্তি যা মৌখিকভাবে বা ব্যবহারের মাধ্যমে ঘোষিত, সেগুলো সরকারী দখলের ঝুঁকিতে পড়বে। উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং কেরালার মত বৃহত্তম ওয়াক্বফ হোল্ডিং সহ অন্যান্য রাজ্যগুলো এই ঝুঁকির সামনে। শত শত বছর ধরে যেসব মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান ইত্যাদি আছে তার ডকুমেন্ট দেখানো সম্ভব নয়। ডকুমেন্ট দেখাতে না পারলে সেগুলো সরকার দখল করতে চায়। অন্যদিকে, অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মস্থানের বৈধতা নিয়ে ডকুমেন্ট দেখানোর প্রয়োজন নেই কেন?
পরিশেষে যেটা বলার তা হল- বিষয়টি মোটেই এমন নয় যে, এই বিল আসার আগে ওয়াক্বফ নিয়ে যা চলেছে সেটা খুব গ্রহণযোগ্য। ভারতে ওয়াক্বফ সম্পত্তির সংখ্যা এবং পরিমাণ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। কেননা দেশে সে ধরনের বিজ্ঞানসম্মত কোনও সমীক্ষা হয়নি। নিবন্ধিত হয়নি এমন বহু ওয়াক্বফ সম্পত্তি আছে। তবে সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ওয়াক্বফ কাউন্সিল সূত্রে জানা যায় যে, সারা দেশে কমবেশি ৮ লক্ষ ৭০ হাজার ওয়াক্বফ সম্পত্তি আছে এবং সেগুলোতে মোট জমির পরিমাণ ৯ লক্ষ ৪০ হাজার একরের মত। এর বাজার মূল্য ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। ‘ওয়াক্বফ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অব ইন্ডিয়া’-এর তথ্য অনুযায়ী দেশের স্থায়ী সম্পদ বিশিষ্ট ওয়াক্বফের সংখ্যা ৮ লক্ষ ৭২ হাজার ৩২৮ টি এবং অস্থায়ী সম্পদ বিশিষ্ট ওয়াক্বফ সংখ্যা হল ১৬,৭১৩ টি। এর মধ্যে ডিজিটাল রেকর্ডভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে ৩ লক্ষ ২৯ হাজার ৯৯৫ টি ওয়াকফের। শুধু পশ্চিমবাংলায় ১ লক্ষের বেশি ওয়াক্বফ সম্পত্তি আছে। যার মধ্যে রেকর্ড ভুক্ত ৮০ হাজারেরও বেশি। যেটা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে দেশে প্রতিরক্ষা ও রেল দপ্তরের পরে সবচেয়ে বড় জমির মালিকানা হল- ওয়াক্বফ সম্পত্তি। এই বিপুল সম্পত্তির অনেকটাই বেআইনি ভাবে ব্যক্তিস্বার্থে ভোগ দখল করছেন এমন কিছু মানুষ যাদের প্রভাব প্রতিপত্তি আছে। প্রকৃতপক্ষে ঐ সম্পত্তি সাধারণ গরীব মানুষের কাজে লাগছে না। কিন্তু আইন সংশোধন ও সংস্কারের নামে সংবিধান প্রদত্ত ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তরাষ্ট্রীয় এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করার চেষ্টা হলে সমস্ত শুভুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই বিভাজনকারী ওয়াক্বফ সংশোধনী আইন প্রত্যাহারের দাবি জানাতে হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে।
(ঘ) ‘ওয়াক্বফ্ সংশোধনী আইন ২০২৫’ নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে এত অসন্তুষ্টি কেন?
১. অমুসলিম সদস্যদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্তি: মুসলিমদের দাবি, ওয়াক্বফ একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যার সম্পত্তি শুধু ইসলামী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়। তাই, বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদের থাকা ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রতি হস্তক্ষেপ এবং ইসলাম ধর্মের অন্তর্গত বিষয়কে সর্বধর্ম করার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়াও বোর্ডের সদস্য ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (ঈঊঙ) নিয়োগে রাজ্য সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং ঈঊঙ মুসলিম হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয়েছে। অনেক মুসলিম নেতারা একে ধর্মীয় অধিকার হরণ বলে দাবি করেছেন। আমাদের আশঙ্কা, বিজেপি এই সম্পদ যেকোন মূল্যে অধিগ্রহণ করার জন্য এই আইন প্রণয়ন করেছে।
২. সরকারী জমিকে ওয়াক্বফ হিসাবে ঘোষণার নিষেধাজ্ঞা: বহু পুরোনো মসজিদ, কবরস্থান বা মাদরাসা এমন জমিতে তৈরি হয়েছে যেগুলো এখন সরকারী মালিকানায় চলে গেছে, কিন্তু সেগুলো ঐতিহাসিকভাবে মুসলিমদের ওয়াক্বফ সম্পত্তি ছিল। নতুন আইনে এসব জমিকে আর ওয়াক্বফ হিসাবে দাবি করা যাবে না, যার ফলে মুসলিমদের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জমি হাতিয়ে নেয়ার চক্রান্ত করা হবে।
৩. ধর্মান্তরিত মুসলিমদের জন্য ৫ বছরের অপেক্ষা: ইসলামে ধর্মান্তর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একজন মুসলিম হয়ে যায়। কিন্তু এই আইন অনুযায়ী, কাউকে ওয়াক্বফ ঘোষণার আগে কমপক্ষে ৫ বছর মুসলিম হিসাবে জীবন-যাপন করতে হবে। যা অনেকের কাছে ধর্মীয় অবমাননা ও বৈষম্যমূলক মনে হচ্ছে।
৪. সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি: মুসলিমদের দাবি, সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সরকার ওয়াক্বফ বোর্ডের উপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। এতে করে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বাড়ছে।
৫. পরামর্শ না নিয়েই আইন পাশ: অনেক মুসলিম সংগঠন অভিযোগ করেছে যে, এই আইন প্রণয়নের সময় তাঁদের সঙ্গে কোনও রকম পরামর্শ করা হয়নি। ফলে এটি নিশ্চিতরূপে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত, যার ভবিষ্যৎ খুবই ভয়াবহ।
মোদ্দাকথা হল- মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, এই সংশোধনীগুলো কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং ধর্মীয় অধিকার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর সরাসরি আক্রমণ। তাই তারা এটিকে তাদের ধর্মীয় ও সম্পত্তিগত অধিকার হরণের চেষ্টা বলে দাবি করছেন।
(ঙ) ভারতের সংবিধান অনুসারে এই সংশোধনী আইন যেহেতু নির্দিষ্ট একটি ধর্ম বা সম্প্রদায়কে আঘাত করছে! সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই আইন কি সাংবিধানিক বৈধতা পাওয়ার অধিকার রাখে?
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবিধান, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে বিচারযোগ্য। নিচে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যা করা হল:
ভারতের সংবিধানের দৃষ্টিকোণ
(১) ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার (অৎঃরপষব ২৫-২৮)
অৎঃরপষব ২৫: নাগরিকদের ধর্ম পালন, প্রচার এবং ধর্ম অনুযায়ী চলার পূর্ণ অধিকার প্রদান করে, যতক্ষণ তা জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জনস্বাস্থ্যের পরিপন্থী না হয়।
অৎঃরপষব ২৬: প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়কে তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার দেয়।
অৎঃরপষব ২৭-২৮: কর দ্বারা ধর্মীয় কার্যকলাপকে বাধ্যতামূলকভাবে সমর্থন করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো মুসলিম সম্প্রদায়কেও ওয়াক্বফ সম্পত্তি পরিচালনা ও সংরক্ষণের অধিকার দেয়। সেক্ষেত্রে সংশোধনী আইনে কয়েকটি সম্ভাব্য সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যেমন
ক্স ওয়াক্বফ্ বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিকে সাধারণ মুসলিমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অৎঃরপষব ২৬(ন) অনুযায়ী, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার রয়েছে, তাই এটি একটি সংবিধানিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
ক্স ধর্মান্তরের পরও মুসলিমকে পূর্ণ মুসলিম হিসাবে স্বীকৃতি না দিয়ে পাঁচ বছর অপেক্ষা করানোর শর্ত ধর্মীয় বৈষম্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। যা অৎঃরপষব ১৪ (সমতা) এবং অৎঃরপষব ২৫ (ধর্ম পালনের অধিকার)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ক্স সরকারি সম্পত্তিকে ওয়াক্বফ দাবির উপর নিষেধাজ্ঞার ফলে যদি কিছু প্রাচীন মসজিদ ও কবরস্থান যেগুলো এখন সরকারি বলে ধরা হয়, সেগুলো ঐতিহাসিকভাবে মুসলিমদের ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর ওপর নিষেধাজ্ঞা সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে। এই বিতর্কিত আইন শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার সংকুচিত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন সংবিধানের ২১-৩০ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। তবে এই সংশোধনী আইন সংবিধানিক বৈধতা পাবে কি না, তা নির্ভর করবে আদালতের বিচারিক ব্যাখ্যার উপর। যদি প্রমাণ হয় যে, এই আইন নির্দিষ্টভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার খর্ব করছে বা বৈষম্যমূলক আচরণ করছে, তাহলে আদালত এটি আংশিক বা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে এবং তখন এই সংশোধনী বাতিল হয়ে যেতে পারে।
মোটামুটিভাবে এই হল- ওয়াক্বফ এবং ওয়াক্বফ্ সম্পর্কিত আইন। সেই আইন যদি গ্রহণযোগ্য না মনে হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অবশ্যই জানানো যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে সেই প্রতিবাদ জানানোর অনেক রাস্তা এবং পন্থা আছে। কিন্তু যারা আন্দোলনকেই একমাত্র উপায় হিসাবে দেখছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলব- আন্দোলনে নামার আগে মাথায় রাখতে হবে এটি একটি বিভাজনের রাজনীতির চাল মাত্র। ফলে সেই চালকে ভঙ্গ করতে গেলে ঠাণ্ডা মাথায় চাল দিতে হবে। যেহেতু সংবিধানে মৌলিক অধিকার অলঙ্ঘনীয় বলা হয়েছে। অথচ এই বিতর্কিত আইনে আমাদের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে তাই শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ স্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করতে হবে।
(২) হতাশা ও আহ্বান
আমাদের জানা মতে কলকাতার এক ওয়াক্বফ সম্পত্তির উপর বেশকিছু দোকান রয়েছে। একেবারে কলকাতা হার্ট হিসাবে পরিচিত ধর্মতলা চত্ত্বরে। যেখানে আজকের দিনে এক একটি দোকানের ভাড়া বাবদ ওয়াক্বফ বোর্ড মাত্র ৪০/৫০/৬০ টাকা পেয়ে থাকে। সম্পত্তির দখলদার অর্থাৎ যার নামে সম্পত্তি রয়েছে, তিনি উক্ত সম্পত্তি তৃতীয় পক্ষকে ভাড়া দিয়ে মাসিক ২৫/৩০ হাজার পর্যন্ত আদায় করে থাকে। কোন মুসলিম তাঁর জীবদ্দশায় অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ধর্মীয় কাজে বা নিজস্ব সম্প্রদায়ের কল্যাণসাধনের জন্য আল্লাহর নামে দান করে দেন। এই দান করাকেই ইসলামী আইনে বলা হয় ‘ওয়াক্বফ করা’! আর দান করে দেয়া সেই সব সম্পত্তিকে বলা হয় ‘ওয়াক্বফ সম্পত্তি’! এই ওয়াক্বফ সম্পত্তির দেখভালের জন্য এবং সেই সম্পত্তি থেকে ইনকাম জেনারেট করার জন্য ম্যানেজার হিসাবে যিনি বা যাঁরা থাকেন তাঁদের বলা হয় ‘মুতাওয়াল্লি’! মুতাওয়াল্লির কিন্তু কোনভাবেই ওয়াক্বফের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য পাল্টে ফেলার কোনও অধিকার থাকে না! আর নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নিজ ইচ্ছায় কোনও দিন বিক্রি করতেও পারবেন না।
বর্তমানে ভারতবর্ষে ৯.৪ লাখ একর জমি ওয়াক্বফের আর ৮.৪ লাখ একর অস্থাবর জমি আছে ওয়াক্বফের অধীনে! এগুলোর মধ্যেই আছে কবরস্থান, মসজিদ, দোকান আর কৃষি জমি। কাজেই মুসলিমদের মনে হতেই পারে এত বেশি ওয়াক্বফ সম্পত্তির আয়ও তো বিশাল পরিমাণে হওয়ার কথা। কিন্তু আফসোস! এই জায়গাতেই ওয়াক্বফের ব্যর্থতা! ২০০৬ সালের সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী যদি ওয়াক্বফ সম্পত্তির ১০০ শতাংশ যথাযথ ভাবে ব্যবহার করা যেত, তাহলে প্রায় ১২ হাজার কোটি ইনকাম হওয়ার কথা! কিন্তু জানেন প্রাক্টিকালি কত আয় দেখানো হয়েছিল? মাত্র ১৬৩ কোটি! এত বড় পার্থক্য! এত বড় ব্যর্থতা! ১২ হাজার কোটির পরিবর্তে মাত্র ১৬৩ কোটি! কী করে হয়? কারণগুলো হল- মুতাওয়াল্লি বা ম্যানেজারদের মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ওয়াক্বফ সম্পত্তির ব্যবহার, সাধারণ মানুষদের কল্যাণসাধনকে দূরে রেখে নিজেদের কল্যাণসাধনের দিকে মনোনিবেশ, ওয়াক্বফ সম্পত্তিতে নিজেরাই দোকান করে নেয়া, ভাড়ায় দিয়ে দেয়া, ঘুষ নিয়ে খুব দামি প্রোপার্টি অল্প ভাড়ায় দিয়ে দেয়া হয়! রাজ্য ওয়াক্বফ বোর্ডের সদস্যরা এই মুতাওয়াল্লিদের হাতে করে নিজেরাই ওয়াক্বফের অর্থ আত্মসাৎ করে। অর্থাৎ মোদ্দা কথা দাঁড়ালো, যে সমস্ত চ্যারিটেবল্ উদ্দেশ্যে প্রোপার্টিগুলো ওয়াকফ করা হয়েছিল সেই উদ্দেশ্য সার্থক কোনও দিন হয়ই নি!
‘সাচার’ কমিটি তার আরেকটি রিপোর্টে বলেছে, ‘ওয়াক্বফের জমিগুলো আস্তে আস্তে এনক্রোচ করে নিয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা! প্রথমে দখল, কিছু বললে ভাড়া! আর ভাড়া পরিমাণও যৎসামান্য! কিন্তু অবজেকশন দেয়ার কেউ নেই।
এইভাবে যায় যতদিন! যদি সঠিক ভাবে হ্যান্ডেল করা যেত, শক্ত হাতে সমস্ত সম্পত্তি দখলমুক্ত করা যেত এবং বর্তমান রেটে ভাড়া আদায় করা যেত, তাহলে ওয়াক্বফ থেকে আয় অনেকগুণ বাড়ানো যেত যা খরচ করে ভারতীয় মুসলিমদের সত্যি সত্যিই উন্নয়ন করা যেত। চেষ্টা হয়নি তা নয়! কিন্তু দুর্নীতির শেকড় এত গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল যে, সৎ মানুষ বোর্ডের দায়িত্বে এলে বেশিদিন টিকতেই পারতেন না। মুতাওয়াল্লিদের করাপশনের কাছে হারতেই হতো! পশ্চিমবঙ্গ ওয়াক্বফ প্রোপার্টির বিচারে ভারতবর্ষের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য। উত্তর প্রদেশের পর। পশ্চিমবঙ্গে ৮০,৪৮০টি ওয়াকফ সম্পত্তি আছে এবং সরকারী বিধিসম্মত একটি বোর্ড রয়েছে, যার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সমস্ত সদস্য সরকার দ্বারা মনোনীত। পশ্চিমবঙ্গে ওয়াকফ বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত হয় চারটি হোস্টেল যার সর্বমোট আসন সংখ্যা মাত্র ৬২০টি। ইমাম মুয়াজ্জিনদের ভাতাগুলো আসে ওয়াক্বফ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পত্তির আয় থেকে। মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু কিছু স্কলারশিপ দেয়া হয় এই ওয়াক্বফের আয় থেকে!
উপসংহার
অতএব যাদের উপকারের জন্য মানুষ নিজের জীবনের সমস্ত সম্পত্তি ওয়াক্বফ্ করেছেন, আজ পর্যন্ত সেই পিছিয়ে পড়া মুসলিম কী লাভ পেয়েছে এই ওয়াক্বফ সম্পত্তি থেকে? প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এই ওয়াক্বফ সম্পর্কে অজ্ঞ করে রাখা হয়েছে! যুগ যুগ ধরে সাধারণ মুসলিম বঞ্চিত থেকেছে এর উপকারিতা থেকে! তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের জোরালো অনুরোধ, ভায়েরা আমার আল্লাহকে ভয় করুন এবং অধিকারীদের নিকট তাদের প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে দিন।
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।