জননিরাপত্তা নিশ্চিত করুন!
জননিরাপত্তা মানুষের মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। শান্তি, নিরাপত্তা ও সুবিচার ছাড়া একটি সমাজ সুস্থভাবে বিকাশ লাভ করতে পারে না। ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম হলো মানবজীবনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এজন্য সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় দমন করার ব্যাপারে আল-কুরআন ও হাদীছে স্পষ্টভাবে অসংখ্য নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের এক অপরিহার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে।
স্মর্তব্য, স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য ছিল না, বরং সর্বত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেতনা ছিল প্রবল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তার অর্জন যেমন হারিয়ে গিয়েছিল, তেমনি জুলাই আন্দোলন পরবর্তী এক বছরেই তার ফলও হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। একদিকে বিচারহীনতা, দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, দুঃশাসন, ক্ষমতার দৌরাত্ম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষবাষ্প, অন্যদিকে দেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা চালু, নারীর ক্ষমতায়ন, গণিকাবৃত্তি কাজের প্রণোদনা প্রদান সহ নানাবিধ ডিফেকটিভ বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রসমূহ জননিরাপত্তার পরিবর্তে যেমন জন-বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বৃদ্ধি করেছে, তেমনি শত শত জীবনের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গভীর এক অন্ধকার খাঁদে পতিত হওয়ার কিনারে পৌঁছেছে। এভাবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর ইন্টেরিম সরকারের আমলেও মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। একের পর এক হত্যা, খুন, গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, লোমহর্ষক ছিনতাই, ডাকাতি ইত্যাদির মত ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। প্রতিটি মুহূর্ত মানুষ নিরাপত্তাহীনতার বিভীষিকা অতিবাহিত করছে। ফ্যাসিজম পতন পরবর্তী দ্বিতীয়বারের মত স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান, ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতা মানে গণঅভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের ধ্বংস হওয়া। আর গণঅভ্যুত্থান ও গণবিপ্লব ধ্বংস হওয়া মানে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। যা দুঃখজনক ও আফসোসের বিষয় ছাড়া কিছুই নয়।
ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূল চেতনাসমূহের অন্যতম ছিল ইসলাম। আন্দোলনরত অবস্থায় রাস্তায় জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায়, ফ্যাসিজমের পতন পরবর্তী শুকরানা সিজদা প্রদান ইত্যাদি তার বাস্তব প্রমাণ বহন করে। বিরাট সংখ্যক মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল- ইন্টেরিম সরকার গঠন কিংবা ঘুণে ধরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে নতুনভাবে পদায়নের ক্ষেত্রে ইসলামী চেতনা ও মূল্যবোধকে প্রাধান্য তো দেয়া হয়নি, বরং সংস্কার কমিশনের নামে ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের দুঃসাহস করেছে। দেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক বাহিনী থাকার পরেও আইনশৃঙ্খলার কোন উন্নয়ন সাধিত হয়নি, বরং ক্রমান্বয়ে তার অবনতি হয়েছে। এভাবে সর্বত্র দেশের জননিরাপত্তা বিঘ্নিত ঘটছে। যা ওপেন সিক্রেট।
পক্ষান্তরে ইসলাম মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়েছে। জীবনের নিরাপত্তা, আত্মরক্ষা, অর্থ-সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার নিশ্চিত করেছে। সমাজে যাতে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি না হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আত্মসাৎ না থাকে, তারও নিশ্চয়তা দিয়েছে। ইসলামে কোন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা বা আঘাত করাকে গুরুতর অপরাধ হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এক কথায় মানব জীবনের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইসলাম সর্বদা ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। এমনকি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করণার্থে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্যও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদায় হজ্জের ভাষণে নবী (ﷺ) বলেছিলেন, ‘তোমাদের জীবন ও সম্পদ তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আর ভূ-পৃষ্ঠে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ান হবে অথবা এক দিকের হাত ও অপর দিকের পা কেটে ফেলা হবে অথবা নির্বাসনে পাঠানো হবে’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩৩)। দুনিয়ায় অন্যায়ভাবে কারও হত্যাকাণ্ড বা প্রাণনাশ করা সামাজিক অনাচার ও অত্যাচারের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে যা চিরতরে নিষিদ্ধ (সূরা আল-আন‘আম : ১৫১)। যখন কোন সমাজে ও রাষ্ট্রে অন্যায় ও অবৈধভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়, তখন সেখান থেকে আল্লাহর রহমত ও বরকত উঠে যায়। পৃথিবীর শান্তি বিনষ্ট হয় এবং ভূ-পৃষ্ঠে একের পর এক শাস্তি ও বিপর্যয় আপতিত হয়।
ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নিরাপদ সমাজ ও দেশ গড়তে হলে আল্লাহর বিধান মেনে চলতে হবে। সাথে সাথে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মৌলিকভাবে দেশের সরকারকে এই দায়িত্বগুলো পালন করা যরূরী। কেননা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা, তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা, সমাজের শান্তি বজায় রাখা, মানুষের জান-মাল রক্ষা করা এবং বিবাদের ক্ষেত্রে বিচারকার্য পরিচালনা করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীন দেশে নিরাপত্তা বিভাগের স্বকীয়তা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠান, বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি, সামাজিক গুজব, সংখ্যালঘু-সহিংসতা ও অপরাধী গ্যাংয়ের আবির্ভাবের কারণে সাধারণ মানুষ নিজ শহর, বাস বা রাস্তায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সামগ্রিকভাবে, শুধু পুলিশ বা সেনা মোতায়েন নয়; বরং একটি সম্মিলিত সংস্কার প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যেখানে আইনসম্মত তদন্ত, স্বয়ংসম্পূর্ণ বিচার, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামাজিক অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারিত করে অপরাধ রোধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। এছাড়া ইসলামী নীতি অনুসরণ করে নিম্নোক্ত কতিপয় বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ যরূরী। যথা: সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, দ্বীনি শিক্ষার বিস্তার, আইনের কঠোর প্রয়োগ, যাকাত ও ছাদাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা তথা দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা ইত্যাদি।
পরিশেষে বলব, ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্বও বটে। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝশক্তি দিন এবং একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার তাওফীক দান করুন- আমীন!
رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ
প্রসঙ্গসমূহ »:
সম্পাদকীয়