উত্তর : হজ্জের প্রস্তুতি বলতে ‘শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও আধ্যাত্মিকভাবে হজ্জ পালনের জন্য প্রস্তুত হওয়াকে বুঝায়’। এটি একটি বিস্তৃত প্রক্রিয়া, যা হজ্জের সফর শুরুর আগেই শুরু করতে হয়। যেমন-
(এক) আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি: (১) বিশুদ্ধ নিয়ত: শারঈ দলীল এবং সালাফে ছালিহীনের মন্তব্যের ভিত্তিতে এটিই প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম ব্যক্তির আমল ক্ববুল হওয়ার জন্য শর্ত হল- (ক) ইখলাছ অর্থাৎ পরিশুদ্ধ নিয়ত। সুতরাং হজ্জ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে, কোন প্রকার প্রদর্শনেচ্ছা বা সামাজিক মর্যাদার জন্য নয়। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ‘নিশ্চয় কাজের (প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/০১, ৫৪, ২৫২৯, ৩৮৯৮)। (খ) সুন্নাতের অনুগত্য: সুন্নাতের অনুগত্য থেকে বিমুখ হয়ে বিদ‘আতী পন্থায় কোন আমল করলে তা ক্ববুল হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয় (মাওক্বিফু আহলিস সুন্নাহ মিন আহলিল আহওয়া ওয়াল বিদা‘, ১/২৯২-২৯৩ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১০৭২৮৬)। (২) তাওবাহ ও ইস্তিগফার করা: তাওবাহ্ অর্থ পাপ থেকে প্রত্যাবর্তন করা এবং গুনাহের কাজকে বর্জন করা (সূরা হূদ: ৩ ও ৫২; সূরা আন-নূহ: ১০-১২)। সুতরাং হজ্জের সফর শুরু করার পূর্বে গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করে পবিত্র মনে হজ্জের সফর শুরু করা। (৩) ইলম (জ্ঞান) অর্জন: হজ্জের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো আয়ত্ত করা। যেমন হজ্জের নিয়ম, তালবিয়্যাহ্, দু‘আ ও মানাসিক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘হে মানব মণ্ডলী! তোমরা আমার নিকট থেকে হজ্জের নিয়ম-কানুন শিখে নাও’ (নাসাঈ, হা/৩০৬২; সনদ ছহীহ, ছহীহুল জামি‘, হা/৭৮৮২)।
(দুই) শারীরিক প্রস্তুতি: (১) স্বাস্থ্য পরীক্ষা: হজ্জ কষ্টসাধ্য ইবাদত, তাই ডাক্তারী পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে শারীরিকভাবে সক্ষম। (২) ফিটনেস বজায় রাখা: সাধারণত হজ্জ খুবই পরিশ্রমী ও কষ্টসাধ্য ইবাদত। তাই নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, স্ট্যামিনা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়া। (৩) প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফার্স্ট এইড সামগ্রী সংগ্রহ করা।
(তিন) আর্থিক প্রস্তুতি: (১) হালাল উপার্জন: হজ্জের খরচ হালাল অর্থ থেকে হতে হবে (সূরা আল-মুমিনূন: ৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫)। (২) পর্যাপ্ত সঞ্চয়: ভিসা, ট্রাভেল, থাকা-খাওয়া ও যরূরী খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রাখা। (৩) দেনা-পাওনা শোধ করা: কারো কাছে ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করে নেয়া (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯, ৬৫৩৪; তিরমিযী, হা/২৪১৯)।
(চার) মানসিক প্রস্তুতি: (১) ধৈর্য ও সহনশীলতা: হজ্জে ভিড়, গরম, ক্লান্তি ও বিভিন্ন অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়, তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৯৭)। (২) সহমর্মিতা: অন্য হাজ্জীদের সাথে ভালো আচরণ ও সহযোগিতার মনোভাব রাখা।
(পাঁচ) প্র্যাকটিক্যাল প্রস্তুতি: (১) ভ্রমণ ব্যবস্থা: ফ্লাইট, ভিসা, হজ্জ প্যাকেজ ও থাকার ব্যবস্থা আগে থেকে নিশ্চিত করা। (২) প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র: যেমন ইহরামের কাপড়, আরামদায়ক জুতা, ছাতা, পানির বোতল, জায়নামাজ ইত্যাদি সংগ্রহ করা। (৩) গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট: পাসপোর্ট, ভিসা, টিকেট, হজ্জ পারমিট ও অন্যান্য কাগজপত্র সুরক্ষিত রাখা।
(ছয়) পারিবারিক ও সামাজিক প্রস্তুতি: (১) পরিবারের দায়িত্ব সেরে নেয়া: হজ্জে যাওয়ার আগে পরিবারের আর্থিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। (২) হজ্জের সময় যাবতীয় কাজের ব্যবস্থা করা: যেমন- ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোন দায়িত্ব কারো উপর সোপর্দ করা।
(সাত) দু‘আ ও আল্লাহর উপর ভরসা: (১) নিয়ত পরিশুদ্ধ করার পর আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। আল্লাহ তা‘আলার উপর পূর্ণাঙ্গ ভরসা ও আস্থা রাখা এবং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকেই সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক মনে করা। ফলস্বরূপ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন (সূরা আত-ত্বালাক্ব: ৩; তিরমিযী, হা/২৩৪৪; ছহীহ ইবনে মাজাহ, হা/৪১৬৪)। (২) হজ্জের যাবতীয় সুন্নাতী দু‘আসমূহ মুখস্থ করা, শেখা ও চর্চা করা।
হজ্জ শুধু একটি আর্থিক ও শারীরিক সফর নয়, বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। তাই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে এই পবিত্র ইবাদত পালন করাই হল একজন আদর্শ মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ্ তা‘আলা সকল হাজ্জীকে সঠিকভাবে হজ্জ পালনের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!
প্রশ্নকারী : রায়হান, মাদারীপুর।