উত্তর : চার মাযহাব, সালাফে ছালিহীন, জমহূর আসহাবে হাদীছ, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতানুযায়ী ‘ছালাত অস্বীকারকারী তো সন্দেহাতীতভাবে কাফির, বরং অবজ্ঞাবশত, অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়েও যে ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে স্বালাত ত্যাগ করবে সেও নিশ্চিতরূপে কাফির ও মুশরিক এবং সে দ্বীন ইসলাম থেকে বহির্ভূত। চার মাযহাবের আলেমগণ বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য করলেও ছালাত ত্যাগকারীর বিধান সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। শাফিঈ ও মালিকী মাযহাবের মতানুযায়ী ছালাত ত্যাগকারীর শাস্তি হত্যা, মৃত্যুর পর তাকে গোসল দেয়া যাবে না, তার উপর জানাযার ছালাত আদায় করা যাবে না এবং তাকে মুসলিমদের ক্ববরে দাফন করা যাবে না’।
হাম্বালী মাযহাবের মতানুযায়ী ‘ছালাত ত্যাগকারীকে তিনদিন দাওয়াত দিতে হবে এবং বলতে হবে যে, ‘ছালাত আদায় না করলে তোমাকে হত্যা করা হবে’ এর পরেও যদি সে ছালাত আদায় না করে, তাহলে তাকে তিনদিন বন্দি করে রাখতে হবে, এর পরেও যদি তাওবাহ না করে তবে তাকে স্বধর্মত্যাগী হিসাবে হত্যা করতে হবে’। হানাফী মাযহাবের মতানুযায়ীও তাকে স্বধর্মত্যাগী হিসাবে হত্যা করতে হবে। (আল-মাউসূ’আতুল ফিক্বহিয়্যাহ্ বা ফিক্বাহ্ বিশ্বকোষ, ২৭/৫৩-৫৪; কাশশাফুল ক্বিনা’, ১/২২৯; আল-মুগনী, ২/১৫৬ ও ৩২৯; আল-মাজমূঊ, ৩/১৪-১৬; হাশিয়াতুল আদাবী, ১/১০২; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ, ২০/৯৭; তা’যীমু ক্বদরীছ ছালাহ, ২/৯৩৬; আছ-ছালাতু ওয়া আহকামু তারিকীহা, পৃ. ৬৪; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল ইবনে উছাইমীন, ১২/৫১)।
কেননা আল্লাহ তা‘আলা ছালাতকে ‘ঈমান’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, وَ مَا کَانَ اللّٰہُ لِیُضِیۡعَ اِیۡمَانَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِالنَّاسِ لَرَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ ‘আর আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি তোমাদের ঈমান (তথা ছালাত)-কে ব্যর্থ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৪৩)। আব্দুল্লাহ বিন শাক্বীক্ব আল-উক্বাইলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ ছালাত ব্যতীত অন্য কোন আমল ছেড়ে দেয়াকে কুফুরী মনে করতেন না। অর্থাৎ ছালাত ত্যাগ করাকে কুফরী মনে করতেন) (তিরমিযী, হা/২৬২২; সনদ ছহীহ)। আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, ‘মুমিন বান্দা ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ছালাত ত্যাগ করা। অতএব যে ব্যক্তি ছালাত ত্যাগ করল, সে অবশ্যই শিরক করল’ (ইবনু মাজাহ, হা/১০৮০, ৮৯২; সনদ ছহীহ)। এ ধরনের আরো অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।
শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি স্ত্রীর মত স্বামীও কাফির হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কে কোন প্রভাব পড়বে না। যেহেতু তারা দু’জনেই কাফির। তাই অন্যান্য কাফির ও মুশরিক দম্পতির মত তারাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারবে। যেমন দু’জন ইয়াহুদী অথবা দু’জন খ্রিষ্টান অথবা দু’জন অগ্নিপূজক পতি-পত্নী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ আছে। কিন্তু যদি তাদের একজন কাফির আর অপরজন মুসলিম হয়, এমতাবস্থায় তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা সঠিক হবে না। বরং তার স্ত্রীকে এক ত্বালাক্ব দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা অপরিহার্য। অথবা কোন ইসলামিক বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করিয়ে নেবে। কেননা ছালাত কাফির স্ত্রী কোন মুসলিম স্বামীর জন্য বৈধ নয়। কিন্তু যদি স্ত্রী তাওবাহ করে এবং ছালাত আদায় করতে আরম্ভ করে, সেক্ষেত্রে স্বামী তাকে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারে। তবে তাওবাহ ছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব ইবনে বায, ২০/৩২৮-৩৩১ ও ২০/৩৪১ পৃ.; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২৮/১০৯ পৃ.)।
শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘স্ত্রী ছালাত ত্যাগকারী হলে বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যদি সে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই তাওবাহ করে এবং ছালাত আদায় করতে আরম্ভ করে তাহলে স্বামী তাকে সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে নিতে পারবে। আর যদি ইদ্দতের সময়কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাওবাহ করে সেক্ষেত্রে কিছু উলামা বলেছেন নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে। আবার কিছু উলামা বলেছেন নতুন বিবাহের প্রয়োজন নেয়। তবে তাওবাহ অপরিহার্য (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন, ১২/৯৩-৯৪ পৃ.)। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘কাফিরদেরকে তুমি বল, ‘যদি তারা (কুফরী ও অবিশ্বাস থেকে) বিরত হয়, তাহলে অতীতে তাদের যা (পাপ) হয়েছে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন। কিন্তু তারা যদি অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে পূর্ববর্তীদের (সাথে আমার আচরিত) রীতি তো রয়েছেই’ (সূরা আল-আনফাল: ৩৮)। রাসূল (ﷺ) বলেন, أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الإِسْلَامَ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ ‘তুমি কি জান না যে, ইসলাম পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১২১, ২২০)। মোটকথা উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে কোন একজন কাফির হয়ে গেলে অটোমেটিক বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
প্রশ্নকারী : শাহিন, কিশোরগঞ্জ।