রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ন
উত্তর : প্রথমতঃ ছালাত আদায়কারীর জন্য ছালাতের সময় নিজের কাপড় গুটিয়ে রাখা এবং মাথার চুল পেছনে একত্র করে বেঁধে রাখা (খোঁপা বা গিঁট দেয়া) মাকরূহ। এ বিষয়ে চারটি ফিক্বহী মাযহাব অর্থাৎ হানাফী মাযহাব, মালিকী মাযহাব, শাফিঈ মাযহাব ও হাম্বালী মাযহাবের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে এবং এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার যে বিধান এসেছে, এর ফলে ছালাত নষ্ট না হওয়ার বিষয়েও ইজমা (ঐকমত) বর্ণিত হয়েছে (মারাক্বিউল ফালাহ, ১/১২৮; বুহূতী, কাশশাফুল কিনা‘, ১/৩৭২; ইবন কুদামাহ, আল-কাফী, ১/২৮৫ পৃ.)। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ، وَلَا أَكُفَّ ثَوْبًا وَلَا شَعْرًا ‘আমাকে সাতটি অঙ্গের উপর সাজদাহ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমাকে কাপড় ও চুল গুটিয়ে রাখতে নিষেধ করা হয়েছে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮১০; ছহীহ মুসলিম হা/৪৯০)।
অন্যত্র ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছকে এমন অবস্থায় ছালাত আদায় করতে দেখলেন যে, তাঁর মাথার চুল পেছনের দিকে গুটিয়ে/বেঁধে রাখা ছিল। তখন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) দাঁড়িয়ে তা খুলে দিলেন। ছালাত শেষ হলে আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ ইবনু আব্বাসের কাছে এসে বললেন, ‘আপনি আমার মাথার চুল নিয়ে এমন করলেন কেন?’ তখন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, إِنَّمَا مَثَلُ هَذَا مَثَلُ الَّذِى يُصَلِّى وَهُوَ مَكْتُوفٌ ‘এর দৃষ্টান্ত হল এমন ব্যক্তির মত, যে হাত বাঁধা অবস্থায় বা হাতকড়া পরা অবস্থায় ছালাত আদায় করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯২)। এ নিষেধের হিকমত হল- ‘কাপড় ও চুলকে সাজদার সময় তার সঙ্গে সাজদা করা থেকে বিরত রাখা হয়। তাছাড়া কাপড় বা চুল গুটিয়ে রাখা এমন একটি অবস্থা, যা খুশূ‘ ও বিনয়ের পরিপন্থী’ (তুহফাতুল মুহতাজ, ২/১৬২ পৃ.)।
ইবনুল আছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘চুল পাকানো এবং চুলের প্রান্তভাগকে চুলের গোড়ার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া জায়েয নয়’ (ইবনুল আছীর (রাহিমাহুল্লাহ), আন-নিহায়াহ, ৩/২৭৫ পৃ.)। অধিকাংশ আলিমের মত হল, ‘ছালাতের মধ্যে চুল ও কাপড় গুটিয়ে রাখা মাকরূহ, চাই তা ছালাতের মধ্যেই করা হোক অথবা ছালাত শুরু করার আগেই করা হোক’ (ইবনু রজব, ফাৎহুল বারী, ৫/১২৯ পৃ.)।

হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কাফত’ (الكفت) শব্দটির অর্থ হল- একত্র করা বা গুটিয়ে নেয়া। এটি ‘কাফ’ (الكفّ) শব্দেরই অর্থবোধক। এখানে উদ্দেশ্য হল- কোন ব্যক্তি যেন তার কাপড় কিংবা চুল একত্র করে গুটিয়ে না রাখে। বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী, ছালাতের অবস্থায় এ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে... আর আলিমগণ এ বিষয়ে একমত যে, তবে এর কারণে ছালাত নষ্ট হয় না’ (ফাৎহুল বারী, ২/২৯৬ পৃ.)।

ইবনুল আছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কাফত’ (الكفت) অর্থ হল- ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোন কিছুকে একত্র করা বা গুটিয়ে নেয়া। এখানে এর উদ্দেশ্য হল- রুকু ও সিজদাহ করার সময় দুই হাত দিয়ে কাপড় ও চুল একত্র করে গুটিয়ে রাখা (ইবনুল আছীর, আন-নিহায়াহ, ৪/১৮৪ পৃ.)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আলিমগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, এমন অবস্থায় ছালাত আদায় করতে নিষেধ করা হয়েছে, যখন কারও কাপড় গুটানো থাকে অথবা তার জামার হাতা গুটানো থাকে, কিংবা এ ধরনের অন্য কিছু থাকে, অথবা তার মাথার চুল পেছনে একত্র করে বাঁধা থাকে, কিংবা চুল পাগড়ির নিচে গুঁজে রাখা থাকে, অথবা এ ধরনের অন্য কোন অবস্থা থাকে। এসব কাজ আলিমদের ঐকমত্য অনুসারে নিষিদ্ধ। তবে এটি মাকরূহে তানযীহী (অপসন্দনীয়, তবে হারাম নয়)। অতএব, কেউ এ অবস্থায় ছালাত আদায় করলে সে অবশ্যই অনুচিত কাজ করেছে, কিন্তু তার স্বালাত সহীহ হবে। এ বিষয়ে আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনু জারীর আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) আলিমদের ইজমা দ্বারা দলীল পেশ করেছেন (শারহুন নাবাবী ‘আলা মুসলিম, ৪/২০৯ পৃ.)।

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘বাহু/কনুইয়ের নিচের অংশ থেকে হাতা গুটিয়ে নিয়ে ছালাত আদায় করা মাকরূহ’ (ফাৎহুল ক্বাদীর, ১/৪১৮ পৃ.)। ‘তুহফাতুল ‘কাশশাফুল কিনা‘ গ্রন্থে এসেছে, ‘নিজের কাপড় গুটিয়ে রাখা মাকরূহ। কিছু আলিম নিষেধের হিকমত হিসাবে বলেছেন, ‘চুল ইত্যাদি যেন তার সঙ্গে সিজদাহ করে অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যায় এই কারণে কাপড় বা চুল গুটিয়ে নেয়া নিষেধ করা হয়েছে’ এবং বলা হয়েছে, ‘হাতার অংশ গুটিয়ে রাখাও মাকরূহ’। এটি ‘আর-রি‘আয়াহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। আর যদি কেউ ছালাতের আগে কোন কাজ করার কারণে চুল বেঁধে রাখে বা কাপড় গুটিয়ে রাখে, তবুও ছালাতের সময় সেগুলো সেই অবস্থায় রাখা মাকরূহ পূর্বোক্ত দলীলের কারণে’ (কাশশাফুল কিনা‘, ১/৩৭৩ পৃ.)।

দ্বিতীয়তঃ ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম ইরাকী বলেছেন, এ বিধানটি নারীদের পরিবর্তে শুধু পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। কারণ নারীদের চুল সতরের অন্তর্ভুক্ত, যা ছালাতে ঢেকে রাখা আবশ্যক। সুতরাং নারী যদি তার চুলের বেণি খুলে দেয়, তাহলে চুল ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা ঢেকে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। ফলে তার ছালাত বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ছালাতের জন্য বেণি খুলে রাখার মধ্যে নারীর জন্য কষ্টও রয়েছে। অথচ রাসূল (ﷺ) নারীদের গোসলের সময় বেণি না খোলার অনুমতি দিয়েছেন, যদিও গোসলের সময় সমস্ত চুল ভেজানো আবশ্যক’ (নাইলুল আওতার, ২/৩৯৩ পৃ.)।

ইমাম যারকশি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘চুল গুটিয়ে রাখার বিধানটি পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট করা উচিত। কারণ নারীর চুলের বেণি খুলে দেয়ার নির্দেশ দিলে তার জন্য কষ্টকর হবে এবং সৌন্দর্যবর্ধনের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তিত হবে। যা সৌন্দর্য রক্ষার পরিপন্থী’ (আসনাল মাত্বালিব, ১/১৬২-১৬৩ পৃ.)। ইমাম গাযালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কেউ যেন চুল পেছনে একত্র করে বেঁধে রেখে ছালাত আদায় না করে। আর এই নিষেধাজ্ঞা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/১৫৬ পৃ.)।

শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘এই বিধানটি পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট, নারীদের জন্য নয়। কারণ ছালাতের সময় নারীকে শরীর ঢেকে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদি পুরুষদের মত নারীদেরও চুল খুলে দিতে বা বেণি খুলে রাখতে বলা হত, যাতে সিজদার সময় চুলও তাঁর সঙ্গে নিচে নেমে আসে, তাহলে এর ফলে ছালাতের মধ্যে নারীর চুলের কিছু অংশ প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। অথচ ছালাতে নারীর চুল প্রকাশ করা বৈধ নয়, কারণ তা সতরের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে পুরুষের চুল সতরের অন্তর্ভুক্ত নয় যেমনটি স্পষ্ট (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৯১৩৯০)।

প্রশ্নকারী : সেলিম, মাদারীপুর।





প্রশ্ন (৪) : বর্তমান যুগের ইহুদী ও খ্রিষ্টান রমণীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৭) : আছরের ফরয ছালাতের পরে ক্বাযা ছালাত আদায় করার বিধান কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১) : কেউ যদি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে জমি কিনে এবং তার উপর বাড়ি করে বাসা ভাড়া তুলে ইবাদত করে, তাহলে তার ইবাদত কবুল হবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১০): মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালে ডিজিটাল ঘড়ি লাগানো যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৫): ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৯) : যাকাত ইংরেজী মাস হিসাবে দিতে হবে, না-কি আরবী মাস হিসাবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১২) : সূরা আল-বাক্বারার ২৫৬ নম্বর আয়াতে ত্বাগূত অস্বীকার করার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ত্বাগূত অর্থ কি? এবং ত্বাগূতের ফায়ছালা নেয়ার পরিণাম কী হতে পারে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২৩) : রাসূল (ﷺ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে সমস্ত নবীর ক্বিবলাহ বাইতুল মাক্বদিছ ছিল এই কথাটি কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২২) : জনৈক ব্যক্তি মানত করেছিল যে, পুত্র সন্তান হলে একটি ইসলামী জালসা করবে। প্রশ্ন হল- গ্রামের ইসলামী জালসায় টাকা দিয়ে অংশগ্রহণ করলে উক্ত মানত পূর্ণ হবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১২) : কতদিনে আক্বীক্বা দিতে হয় এবং ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য কয়টি করে আক্বীক্বা দিতে হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৭) : যেসব মুসলিম দাবীদারদের আক্বীদাগত বিরাট ভুল-ভ্রান্তি আছে। ক্বিয়ামতের দিন তাদের পাপপুণ্যের ওযন করা হবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৪) : স্বামী-স্ত্রী একসাথে জামা‘আতে ছালাত আদায় করতে পারবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ

ফেসবুক পেজ