উত্তর : যে ফরয ছালাতগুলো ছুটে গেছে অর্থাৎ ক্বাযা হয়ে গেছে, সেগুলো নিষিদ্ধ সময়সহ সব সময়েই ক্বাযা আদায় করা যাবে। সালাফরা এভাবেই আদায় করতেন। আনাস রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন ওয়াক্তের ছালাত ভুলে যায় অথবা ঘুমের কারণে তা আদায় করতে পারে না, তার কাফ্ফারা হল- যখনই তার ছালাতটির কথা স্মরণ হবে, তখনই তা আদায় করা’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৪)। তাই ক্বাযা ছালাতের জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় নেই, নিষেধাজ্ঞাও নেই। (আল-কাফী, ইবনু আব্দিল বার্র, ১/২২৩; আল-মাজমূঊ, ইমাম নববী, ৪/১৭০; রওযাতুত্ব ত্বলিবীন, ইমাম নাবাবী, ১/১৯৩; আল-মুগনী, ইবনু কুদাম্,া ২/৮০ পৃ.)।
ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ছুটে যাওয়া ফরয ছালাতসমূহ নিষিদ্ধ সময়সহ অন্যান্য সব সময়েই আদায় করা জায়েয। এ ধরনের মত আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং আরও অনেক ছাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। এই মত পোষণ করেছেন আবু আলিয়াহ, নাখাঈ, শা‘বী, হাকাম, হাম্মাদ, ইমাম মালিক, আওযাঈ, শাফিঈ, ইসহাক, আবু ছাওর এবং ইবনুল মুনযির (আল-মুগনী, ২/৮০; আল-আওসাত, ৩/১১০ পৃ.)। ইমাম বাগাভী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আলিমগণ একমত যে, কোন ব্যক্তি ফজরের ছালাত আদায় করার পর সূর্য এক বর্শা পরিমাণ উপরে উঠা পর্যন্ত এমন কোন নফল ছালাত শুরু করতে পারবে না, যার কোন বিশেষ কারণ নেই। একইভাবে, আছরের ছালাত আদায় করার পর সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্তও এমন নফল ছালাত আদায় করা যাবে না, যার কোন কারণ নেই। তবে তাঁরা একমত যে, এই দুই সময়ে ছুটে যাওয়া ফরয ছালাতের ক্বাযা আদায় করা জায়েয। এ মত আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। শা‘বী, নাখাঈ ও হাম্মাদও এ মত পোষণ করেছেন। এটি ইমাম মালিক, আওযাঈ, শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর মাজহাব’ (শারহুস সুন্নাহ, ৩/৩২৬ পৃ.)।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এই মতটি ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ, ইসহাক, আবু ছাওর ও ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর মত। তাঁরা বলেন, ‘যে ছালাত ঘুমিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়ার কারণে ছুটে গেছে, তা নিষিদ্ধ সময়েও ক্বাযা আদায় করতে হবে’। হাদীছ এবং আলিমদের ঐকমত্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, নিষেধাজ্ঞাটি সব ধরনের ছালাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং সেই দিনের আছরের ছালাত নিষিদ্ধ সময়েও আদায় করা যায়- এ বিষয়ে স্পষ্ট দলীল রয়েছে এবং আলিমদের ঐকমত্যও রয়েছে। একইভাবে ফজরের দুই রাকা‘আত সুন্নাতও নিষিদ্ধ সময়ে আদায় করা যায়-এ ব্যাপারে হাদীছে স্পষ্ট দলীল রয়েছে এবং অধিকাংশ আলিমও এ মত পোষণ করেছেন’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৩/১৭৯-১৮২)।
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘নিষিদ্ধ সময়ে ছালাত আদায় করা সম্পর্কিত হাদীছটি সাধারণ ও সার্বিক, তবে এর ব্যতিক্রম আমলও প্রমাণিত হয়েছে। নবী (ﷺ) যোহরের সুন্নাহ আছরের পর ক্বাযা আদায় করেছিলেন। তিনি তাঁদেরকেও অনুমোদন দিয়েছেন, যারা ফজরের সুন্নাহ ফজরের পর ক্বাযা আদায় করেছিলেন এবং তিনি জানতেন যে এটি ফজরের সুন্নাহ। এছাড়া, তিনি আদেশ করেছেন যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করছে আর ইমাম খুত্ববা দিচ্ছেনÑ সে যেন বসার আগে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করে’ (ই‘লামুল মুআক্কিঈন, ২/২৪৫ পৃ.)। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত হাদীছগুলো স্পষ্ট দলীল বহন করে।
(১) আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে আছরের ছালাতের একটি সিজদাহ (অর্থাৎ এক রাকা‘আত) পেয়ে যায়, তাহলে সে যেন তার ছালাত পূর্ণ করে নেয়। আর কেউ যদি সূর্যোদয়ের আগে ফজরের ছালাতের একটি সিজদাহ (অর্থাৎ এক রাকা‘আত) পেয়ে যায়, তাহলে সে যেন তার ছালাত পূর্ণ করে নেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৬০৮)।
(২) আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন ওয়াক্তের ছালাত ভুলে যায় অথবা ঘুমের কারণে তা আদায় করতে পারে না, তার কাফ্ফারা হল- যখনই তার ছালাতটির কথা স্মরণ হবে, তখনই তা আদায় করা’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৪)
(৩) আবূর ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘ঘুমের কারণে ছালাত ছুটে যাওয়ায় কোন গুনাহ্ নেই। গুনাহ হল- ওই ব্যক্তির উপর, যে পরবর্তী ছালাতের সময় এসে যাওয়া পর্যন্ত ক্বাযা আদায় করেনি। সুতরাং যে ব্যক্তি এমনটি করে ফেলেছে, সে যখনই ঘুম থেকে জাগবে বা ছালাতের কথা স্মরণ করবে, তখনই তা আদায় করবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮১)।
এছাড়াও প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী (ﷺ) আছরের ছালাতের পর যোহরের সুন্নাত ছালাত ক্বাযা আদায় করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩৪)। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘এটি ছুটে যাওয়া সুন্নাত ছালাত ক্বাযা আদায় করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমাণ। সুতরাং ক্বাযা হওয়া ফরয ছালাত ক্বাযা আদায় করা তো আরও বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য। অতএব, কোন মুসলিম যদি ঘুমিয়ে যাওয়া বা ভুলে যাওয়ার কারণে কোন ছালাত আদায় করতে না পারে এবং আছরের ছালাত আদায় করার পর তার কথা স্মরণ হয়, তাহলে সেই সময়ই তাকে ছুটে যাওয়া ছালাত ক্বাযা আদায় করতে হবে’ (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২০৩৩৮)।
প্রশ্নকারী : নুরুল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ।