দু‘আ দাসত্বের অকাট্য প্রমাণ
- খত্বীব : ড. আব্দুল মুহসিন বিন মুহাম্মাদ আল-কাসেম
- অনুবাদ : ড. হারুনুর রশীদ ত্রিশালী*
[গত ১৯ সফর ১৪৪৪ হি. মোতাবেক ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তারিখের ‘মসজিদে নববী, মদীনাতুল মুনাওয়ারা’-এর জুমু‘আর খুত্ববার বঙ্গানুবাদ]
আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ছালাত ও সালামের পরে সম্মানিত খত্বীব বলেছেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা আল্লাহর যথাযথ তাক্বওয়া অবলম্বন করুন এবং গোপনে ও নিভৃতে তাকে ভয় করুন।
হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র মানব জাতির জন্য তাদের সূচনালগ্ন থেকে সমাপ্তিলগ্ন পর্যন্ত ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মনোনিত করেছেন। ইসলামের বার্তা নিয়েই সকল নবীগণ দুনিয়াতে আগমন করেছেন এবং তার নিশান সকল রাসূলগণ বহন করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ الدِّیۡنَ عِنۡدَ اللّٰہِ الۡاِسۡلَامُ ‘নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৯)। ইসলাম হল ইখলাছের সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। তাঁকে প্রতিপালক, একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক ও অন্যদের অস্বীকার করতঃ তাঁকে একক উপাস্য হিসেবে মেনে নিয়ে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করা এবং অন্তর ও মস্তিষ্কসমূহ তার অভিমূখী করার নাম। আর এটিই হল আমাদের পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর শিরকমুক্ত একনিষ্ঠ মিল্লাত বা আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন,
ثُمَّ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡکَ اَنِ اتَّبِعۡ مِلَّۃَ اِبۡرٰہِیۡمَ حَنِیۡفًا ؕ وَ مَا کَانَ مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ
‘তারপর আমি আপনার প্রতি অহি করলাম যে, আপনি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করুন; এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না’ (সূরা আন-নাহাল : ১২৩)। ইসলাম হল আক্বীদা ও শারঈ বিধিবিধান, ইলম ও আমল এবং সুপ্ত বিশ্বাসের আলোকে বাহ্যিক আচার-আচরণের সমষ্টি।
আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হল ইসলামের মূলভিত্তি এবং এটি ইসলাম নামক প্রাসাদের সুরম্য গম্বুজ সদৃশ যাতে তার পূর্ণতা ও সৌন্দর্য্য নিহিত রয়েছে, এটিই তার সূচনা ও সমাপ্তি এবং তার কারণ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। উক্ত কালেমার শব্দের সাথে তার অর্থের সম্পর্ক এমন, যেমন রূহের সাথে শরীরের সম্পর্ক। রূহবিহীন শরীরের দ্বারা কোন উপকার অর্জিত হয় না, তেমনি কালেমার মর্ম উপলব্ধি ব্যতীত শুধু শব্দ উচ্চারণ পাঠকারীকে কোন উপকার করে না। সুতরাং যে ব্যক্তি কালেমার অর্থ জেনে-বুঝে পাঠ করল, কালেমার দাবী অনুযায়ী আমল করল এবং তার হকসমূহ পূরণ করল, সে মূলত তাওহীদ বাস্তবায়ন করল। আর বান্দার তাওহীদের উপর অবিচল থাকার সঠিক প্রমাণ এবং সৃষ্টিকারী আল্লাহর একক বিশেষণে বিশেষিত হওয়ার মযবুত দলীল হল; শুধুমাত্র আল্লাহকে ডাকা এবং তিনি ব্যতীত অন্যকে না ডাকা। নবী (ﷺ) বলেছেন, وَإِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ ‘যখন কোন কিছু চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে’।[১]
আল্লাহকে এককভাবে আহ্বান করা ব্যতীত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। আর এ বার্তাসহ তিনি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করেছেন। বান্দাদের দ্বারা এ দ্বীনকে বিজয়ী করা আল্লাহ পছন্দ করেন, যদিও তাতে দ্বীনবিরোধীরা নাখোশ হয় না কেন। মহান আল্লাহ বলেন, فَادۡعُوا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ وَ لَوۡ کَرِہَ الۡکٰفِرُوۡنَ ‘সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফিররা অপছন্দ করে’ (সূরা আল-গাফির : ১৪)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন স্ব-জাতির নিকট এ ঘোষণা প্রদানের জন্য যে, তাঁর রিসালাতের মূলভিত্তি দু‘আয় এককভাবে আল্লাহকে ডাকার উপর প্রতিষ্ঠিত। মহান আল্লাহ বলেন, قُلۡ اِنَّمَاۤ اَدۡعُوۡا رَبِّیۡ وَ لَاۤ اُشۡرِکُ بِہٖۤ اَحَدًا ‘বলুন, আমি তো কেবল আমার রবকেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেই শরীক করি না’ (সূরা আল-জিন : ২০)। আর যে ব্যক্তি অহংকার বশতঃ আল্লাহর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো এবং লাঞ্ছনার সম্মুখীন হওয়ার ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ ‘নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার ইবাদত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে’ (সূরা আল-গাফির : ৬০)। যার অন্তর আল্লাহকে এককভাবে ডাকতে অপছন্দ করে এবং সৃষ্টিজীবকে ডাকা ব্যতীত তৃপ্ত হয় না; এটা তার গোমরাহি এবং আখেরাত বিমুখতার লক্ষণ। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَحۡدَہُ اشۡمَاَزَّتۡ قُلُوۡبُ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ ‘আর যখন শুধু এক আল্লাহর কথা বলা হয় তখন যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয়’ (সূরা আয-যুমার : ৪৫)।
অন্তরসমূহ বা মানুষের উপর আল্লাহর আরোপিত প্রতিটি ঈমানী অবস্থানের যরূরী অনুসঙ্গ হল দু‘আ। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল ইবাদতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও মর্মকথা হল দু‘আ। সুতরাং যে ব্যক্তি ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ সম্পাদন অথবা দান-ছাদাক্বাহ করল প্রকারান্তে বাহ্যিকভাবে সে তাঁর রবের আহ্বানকারী। বান্দা কর্তৃক তাঁর ইবাদত, তাঁর নিকট অবনত হওয়া ও একমাত্র তাকেই ভালোবাসা এ আহ্বান করে যে, যেন সে তার রবের নিকট ইবাদতগুলো কবুল হওয়ার জন্য প্রার্থনা করে এবং তাঁর নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের প্রত্যশা করে। সুতরাং ইবাদতের মূল, শ্রেষ্ঠাংশ ও হাকীকত হল দু‘আ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,إِنَّ الدُّعَاءَ هُوَ الْعِبَادَةُ ثُمَّ قَرَأَ (وَ قَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ). ‘নিশ্চয় দু‘আই হল ইবাদত। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন ‘আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (সূরা আল-গাফির : ৬০)।[২]
দু‘আর শ্রেষ্ঠত্ব ও তার বিরাট মর্যাদার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাব সূচনা করেছেন দু‘আর আয়াতের মাধ্যমে; তিনি বলেন, اِہۡدِ نَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ‘আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন’ (সূরা আল-ফাতিহা : ৬)। আর তাঁর কিতাব সমাপ্ত করেছেন দু‘আর বাক্য সম্বলিত সূরা আল-ফালাক্ব ও আন-নাস এর মাধ্যমে। আল্লাহ তা‘আলা কখনো দু‘আকে দ্বীন হিসেবে নামকরণ করে বলেন,فَادۡعُوا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ‘সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর দ্বীনে একনিষ্ঠ হয়ে’ (সূরা আল-গাফির : ১৪)। কখনো বা ইবাদত হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ ‘নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার ইবাদত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে’ (সূরা আল-গাফির : ৬০)।
দু‘আতে এক আল্লাহর ইখলাছ অবলম্বন করা পূর্ণ ঈমানের আলামত, দৃঢ় বিশ্বাসের দলীল, নাজাতের মাধ্যম এবং বিজয় ও সফলতার অসীলা। এটি আম্বিয়ায়ে কেরাম ও মুমিনদের প্রতীক। সুতরাং দু‘আতে এক রবকে আহ্বানকারী ব্যক্তিই প্রকৃত ইবাদতকারী এবং সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ রাস্তার সঠিক পরিচয় লাভকারী। সুতরাং দু‘আ হল শক্তিশালী স্তম্ভ যার নিকট মুসলিমগণ আশ্রয় নেয় এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল যেখানে অসহায় ও মুখাপেক্ষীরা অবস্থান নেয়। আর বান্দা যখন ইখলাছের সাথে আল্লাহর নিকট দু‘আ করে, তখন তার অঙ্গ- প্রত্যঙ্গসমূহ সত্যায়নে সক্রিয় হয়ে ওঠে; ফলে সেগুলো তাদের রবের নিকট অবনত হয় এবং নীচুতা প্রদর্শন করে। দুর্বিপাকে অন্তর রবের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় এবং বিপদ-আপদে জবান উচ্চৈঃস্বরে দু‘আ করতে থাকে। আর বিপদাপদ ও দুর্যোগ মূলত বান্দাকে তার রবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং বান্দার হাত ধরে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর নিকট দু‘আ করার পথে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِذَا مَسَّ الۡاِنۡسَانَ الضُّرُّ دَعَانَا لِجَنۡۢبِہٖۤ اَوۡ قَاعِدًا اَوۡ قَآئِمًا ‘আর মানুষকে যখন দুঃখ- দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে আমাকে ডেকে থাকে’ (সূরা ইউনুস : ১২)।
আর আমাদের মহান রবকে প্রতিটি মুহূর্তে ও সর্বাবস্থায় এককভাবে ডাকতে হবে; তিনি এমন সৃষ্টিকারী যিনি কোন বিষয়ে অপারগ নন, এমন সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী যিনি সবকিছুর উর্দ্ধে অবস্থান করেন, রিযিক তাঁরই হাতে এবং কাউকে কোন কিছু দেয়া বা না দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই। পূর্ণতা, সৌন্দর্য এবং মহত্বের গুণাবলিসমূহ এমন উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য যা তাঁর থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম ও গুণাবলিসমূহকে অসীলা করে তাঁর নিকট চাইবে, তিনি তাকে তার কাঙ্খিত বস্তু দিবেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لِلّٰہِ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی فَادۡعُوۡہُ بِہَا ‘আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক’ (সূরা আল-আ’রাফ : ১৮০)। তিনি নিকটে বা দূরের সবার দু‘আ সমানভাবে শুনতে পান; তিনি তাঁর নিকট যাচনাকারী ও ইবাদতকারীর অতি নিকটে। যে তাঁর নিকট নিজের প্রয়োজন ও অভাব পেশ করে, তিনি তার প্রয়োজন ও অভাব পূর্ণ করে দেন। তিনি বলেন, وَ اِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ‘আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দিন যে, নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে তখন আমি তার আহ্বানে সাড়া দেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৬)। যে তাঁর রহমত পেতে চায়, তিনি তাকে নিজ রহমত দ্বারা সিক্ত করেন, যে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি তাকে ক্ষমা করেন, যে তাঁর নিকট কোন কিছু চায় তিনি তাকে তা দান করেন এবং যে তার মুখাপেক্ষী হয়, তিনি তাকে অভাবমুক্ত করে দেন। তিনি বলেন,وَ لِلّٰہِ خَزَآئِنُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ‘আর আসমানসমূহ ও যমীনের ধন-ভাণ্ডার তো আল্লাহরই’ (সূরা আল-মুনাফিকূন : ০৭)। তিনি মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন এবং তাঁর সৃষ্টিকূলের মাঝে ন্যায়সংগতভাবে ফায়সালা করেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اللّٰہُ یَقۡضِیۡ بِالۡحَقِّ ؕ وَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖ لَا یَقۡضُوۡنَ بِشَیۡءٍ ؕ اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ ‘আর আল্লাহ ফায়সাল করেন যথাযথভাবে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তারা যাদেরকে ডাকে তারা কোন কিছুর ফায়সালা করতে পারে না’ (সূরা আল-গাফির : ২০)।
তিনি চিরঞ্জীব ও সর্বসত্তার ধারক, যাকে কেউ ডাকলে তার প্রয়োজন থেকে তিনি উদাসীন নন ও তার বিপদ দূর করতেও অক্ষম নন। মহান আল্লাহ বলেন,ہُوَ الۡحَیُّ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ فَادۡعُوۡہُ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ‘তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। কাজেই তোমরা তাঁকেই ডাক, তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে’ (সূরা আল-গাফির : ৬৫)। একমাত্র তাঁরই দু‘আর হক্বদার হওয়ার মাঝে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, তিনিই একমাত্র সত্য আর তাঁকে ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকলে তা কবুল হয় না। মহান আল্লাহ বলেন, ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡحَقُّ وَ اَنَّ مَا یَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖ ہُوَ الۡبَاطِلُ ‘এজন্যেও যে, নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা তো অসত্য’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৬২)। তাঁর দান বিবেককে অবাক করে, তাঁর উদারতা বুদ্ধিকে বিস্মৃত করে, তিনি অল্প ভাল কাজের বিনিময়ে অগণিত কল্যাণ দান করেন, যে তাঁর প্রশংসা করে ও উত্তমরূপে তাঁর নিকট চায় তাকে তিনি অঢেল কল্যাণ দান করেন। তিনি ঐ ব্যক্তির বড় গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন যার দ্বীন ও তাওহীদ বিশুদ্ধ হয় এবং তার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে না। এ মর্মে মহান আল্লাহ হাদীছে কুদসীতে বলেন, يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِى بِقُرَابِ الأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِى لاَ تُشْرِكُ بِى شَيْئًا لأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً ‘যে ব্যক্তি আমার সাথে কোন কিছু শরীক করা ব্যতীত পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়ে মিলিত হবে, আমি তার সাথে অনুরূপ পরিমাণ ক্ষমাসহ মিলিত হব’।[৩]
সেই ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়, যে তাঁর নিকট অধিক পরিমাণে চায় ও মিনতি করে। বান্দার ঈমান, তার দ্বীনের ব্যাপারে উপলদ্ধি ও রবের সাথে সম্পর্ক যত বৃদ্ধি পাবে, সর্বাস্থায় দু‘আর প্রতি তার আগ্রহ তত বৃদ্ধি পাবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, لِيَسْأَلْ أَحَدُكُمْ رَبَّهُ حَاجَتَهُ كُلَّهَا حَتَّى يَسْأَلَهُ شِسْعَ نَعْلِهِ إِذَا انْقَطَعَ ‘তোমাদের প্রত্যেকেই যেন তার প্রতিটি অভাব পূরণের উদ্দেশ্যে তার রবের নিকট প্রার্থনা করে, এমনকি তার জুতার ফিতা ছিড়ে গেলে তাও যেন তাঁর নিকটে চায়’।[৪] শাইখুল ইসলাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নবীগণ ও তাদের অনুসারীবৃন্দ সর্বদায় আল্লাহর নিকট তাদের দ্বীন, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করতেন। এমন কে আছে, যার আল্লাহর নিকট প্রার্থনার প্রয়োজন নেই? অতঃপর বান্দার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার রবের নিকট চাওয়া, আর রবের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বান্দার ডাকে সাড়া দেয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি ধারণা করবে যে, তার স্বীয় রবের নিকট প্রার্থনার প্রয়োজন নেই, সে দাসত্বের গন্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে’।
নবীদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যেকোন অবস্থায় আল্লাহর নিকট অধিক পরিমাণে দু‘আ করা। মহান আল্লাহর বাণী :
اِنَّہُمۡ کَانُوۡا یُسٰرِعُوۡنَ فِی الۡخَیۡرٰتِ وَ یَدۡعُوۡنَنَا رَغَبًا وَّ رَہَبًا ؕوَ کَانُوۡا لَنَا خٰشِعِیۡنَ
‘তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত, আর তারা আমাকে ডাকত আগ্রহ ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট ভীত-অবনত’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ৯০)। যাকারিয়া (আলাইহিস সালাম)-এর অন্তরে সন্তান লাভের আগ্রহ জাগে। ফলে তিনি তার রবের নিকট একটি সৎসন্তানের জন্য দু‘আ করেন, স্বীয় রবের প্রশংসা করেন এবং বলেন, اِنَّکَ سَمِیۡعُ الدُّعَآءِ ‘আপনিই দু‘আ শ্রবণকারী’ (সূরা আলে ইমরান : ৩৮)। অতঃপর তিনি তার মেহরাবে গিয়ে ছালাতে দাঁড়িয়ে যান। তখনি ফেরেশতা এসে তাকে তার বার্ধক্য ও দুর্বল অস্থি হওয়া সত্ত্বেও ঔরসজাত নবীর সুসংবাদ দেন। নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায় তাকে অমান্য ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। ‘তখন তিনি তাঁর রবকে আহ্বান করে বলেছিলেন, فَدَعَا رَبَّہٗۤ اَنِّیۡ مَغۡلُوۡبٌ فَانۡتَصِرۡ ‘নিশ্চয় আমি অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন’ (সূরা আল-কামার : ১০)। ফলে আল্লাহ তা‘আলা মহাপ্লাবন দিয়ে তার অনুসারী ব্যতীত পৃথিবীর সকলকে ডুবিয়ে দিলেন। আল্লাহ তা‘আলা আছহাবে কাহাফের ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, তারা একত্ববাদী কতিপয় যুবক যারা জেনেছিলেন এককভাবে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করাই তাঁর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন। তারা স্বজাতির কাছে গিয়ে বলল, رَبُّنَا رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ لَنۡ نَّدۡعُوَا۠ مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اِلٰـہًا لَّقَدۡ قُلۡنَاۤ اِذًا شَطَطًا ‘আমাদের রব। আসমানসমূহ ও যমীনের রব। আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য ইলাহকে ডাকব না; যদি ডাকি, তবে তা হবে খুবই গর্হিত কথা’ (সূরা আল-কাহফ : ১৪)।
সকাল-সন্ধ্যা ও শেষ রাতে দু‘আ করা মুমিনদের অযীফা। মহান আল্লাহ বলেন, تَتَجَافٰی جُنُوۡبُہُمۡ عَنِ الۡمَضَاجِعِ یَدۡعُوۡنَ رَبَّہُمۡ خَوۡفًا وَّ طَمَعًا ۫ وَّ مِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ‘পার্শ্বদেশ শয্যা হতে দূরে থাকে তারা তাদের রবকে ডাকে আশংকা ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে’ (সূরা আস-সাজদা : ১৬)। যারা অধিক পরিমাণে আল্লাহকে ডাকে ও আমলে একনিষ্ঠ তাদের সাথে বসতে আল্লাহ তা‘আলা নবী (ﷺ)-কে নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহর বাণী : وَ اصۡبِرۡ نَفۡسَکَ مَعَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ رَبَّہُمۡ بِالۡغَدٰوۃِ وَ الۡعَشِیِّ یُرِیۡدُوۡنَ وَجۡہَہٗ ‘আর আপনি নিজকে ধৈর্যের সাথে রাখবেন তাদেরই সংসর্গে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় ডাকে তাদের রবকে তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে’ (সূরা আল-কাহফ : ২৮)।
দু‘আর উপকারিতা বিশাল ও তার কল্যাণ ব্যাপক। এর মাধ্যমে জীবিত-মৃত সকলেই উপকৃত হয় এবং এর বরকত দু‘আকারী ও যার জন্য দু‘আ করা হয় উভয়েই লাভ করে। এটি অন্যান্য মাধ্যমের মতই একটি ফলপ্রসূ মাধ্যম। বান্দা তার রবকে ডাকে আল্লাহ নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ী এবং আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তা কবুল করা হয়। সুতরাং দু‘আ বিপদ দূর করে (যদি তা পূর্ব হতে আল্লাহর ইলমে নির্ধারিত থাকে), কল্যাণ আনায়ন করে এবং (আল্লাহর অনুমতিতে) ধ্বংস থেকে মুক্তি দেয়। সকল বিষয় আল্লাহর পক্ষ হতে এবং তার নিকটই ফিরে যায়। এতে মাখলুকের কোন হাত নেই ।
আল্লাহর নিকট একনিষ্ঠ দু‘আ উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা যা এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন সমকক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী, শরীক, সাহায্যকারী, উপাস্য ও প্রতিপালক অবশিষ্ট রাখে না। এর মাধ্যমেই প্রার্থনাকারী আল্লাহর বান্দায় পরিণত হয়। ফলে এককভাবে তাঁর নিকট ইচ্ছা, সম্মান, ভালোবাসা, ভয় ও আশা ব্যক্ত করে। আনন্দ ও দুঃখের সময় তাঁর সাথেই অন্তর সম্পৃক্ত হয়। স্বচ্ছল ও বিপদের সময় তাকেই ডাকে।
যে ব্যক্তি তার তাওহীদের প্রকৃত অবস্থা জানতে চায়, সে যেন লক্ষ্য করে- সে কাকে ডাকছে। যে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে সেই তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত, আর যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকে সেই শিরকে নিমজ্জিত। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَنۡ یَّدۡعُ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ ۙ لَا بُرۡہَانَ لَہٗ بِہٖ ۙ فَاِنَّمَا حِسَابُہٗ عِنۡدَ رَبِّہٖ ؕ اِنَّہٗ لَا یُفۡلِحُ الۡکٰفِرُوۡنَ ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোন প্রমাণ নেই; তার হিসাব তো তার রব-এর নিকটই আছে; নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না’ (সূরা আল-মুমিনূন : ১১৭)।
পূর্ণতা ও গৌরব একমাত্র আল্লাহরই। আর তিনি ছাড়া কেউ ইবাদতের যোগ্য নয় এবং কেবলমাত্র তাঁর মহত্বের সাথেই প্রভুত্বের গুণ মানানসই। যতই উচ্চ মর্যদাসম্পন্ন হোক না কেন মানুষের মধ্যে কেউ সামান্যতমও দু‘আর যোগ্য নয়। যে ব্যক্তি নগণ্য প্রাণীও সৃষ্টি করতে পারে না, সে মোটেও ইবাদত বা দু‘আর হক্বদার হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ لَنۡ یَّخۡلُقُوۡا ذُبَابًا وَّ لَوِ اجۡتَمَعُوۡا لَہٗ ‘তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৭৩)। আল্লাহ তা‘আলা মানুষদের মধ্য থেকে অনেক রাসূল মনোনীত করেছেন এবং তাদেরকে অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই প্রভুত্বের দাবী করেননি অথবা মানুষকে তাদের নিকট দু‘আ করতে নির্দেশ দেননি বা এমন কাজে তারা সন্তুষ্টও হননি। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ اِذۡ قَالَ اللّٰہُ یٰعِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ ءَاَنۡتَ قُلۡتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُوۡنِیۡ وَ اُمِّیَ اِلٰہَیۡنِ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ ؕ قَالَ سُبۡحٰنَکَ مَا یَکُوۡنُ لِیۡۤ اَنۡ اَقُوۡلَ مَا لَیۡسَ لِیۡ ٭ بِحَقٍّ
‘আর আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর? সে বলবে, আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য শোভন নয়’ (সূরা আল-মায়েদা : ১১৬)। তারা কিভাবেই বা এমন দাবী করবেন অথচ নিজেরাই বিপদ, রোগ-বালাই, দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির সম্মুখীন হয়েছেন; তাদের মধ্যে কেউ নিহত, কেউ রোগাক্রান্ত, আবার কেউ যাদুগ্রস্থও হয়েছেন!
গায়রুল্লাহর কাছে দু‘আ করা মহা অপরাধ। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন,
وَ لَا تَدۡعُ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَنۡفَعُکَ وَ لَا یَضُرُّکَ ۚ فَاِنۡ فَعَلۡتَ فَاِنَّکَ اِذًا مِّنَ الظّٰلِمِیۡنَ
‘আর আপনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবেন না, যা আপনার উপকারও করে না, অপকারও করে না, কারণ এটা করলে তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (সূরা ইউনুস : ১০৬)। আল্লাহ তাকে শাস্তির হুমকি দিয়েছেন, যদি তিনি তাঁর সাথে অন্য কাউকে ডাকেন। এ মর্মে তিনি বলেছেন, فَلَا تَدۡعُ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ فَتَکُوۡنَ مِنَ الۡمُعَذَّبِیۡنَ ‘অতএব আপনি অন্য কোন ইলাহকে আল্লাহর সাথে ডাকবেন না, ডাকলে আপনি শাস্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (সূরা আশ-শুআ‘রা : ২১৩)।
আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডাকা পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় পাপ। ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কোন পাপটি সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, أَنْ تَجْعَلَ لِلهِ نِدًّا وَهْوَ خَلَقَكَ ‘তুমি আল্লাহর সাথে সমকক্ষ স্থির করবে, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।[৫]
ছালাত, রুকূ‘, সাজদাহ শরী‘আতসিদ্ধ করা হয়েছে এবং যমীনে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে শুধুমাত্র এককভাবে আল্লাহকে ডাকার জন্য, অন্য কাউকে ডাকার জন্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, وَّ اَنَّ الۡمَسٰجِدَ لِلّٰہِ فَلَا تَدۡعُوۡا مَعَ اللّٰہِ اَحَدًا ‘আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না’ (সূরা আল-জ্বিন : ১৮)।
দু‘আকারী একমাত্র স্রষ্টাকে ডাকবে, তার মত কোন সৃষ্টিকে ডাকবে না এবং তার মত কোন বান্দার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করবে না। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ عِبَادٌ اَمۡثَالُکُمۡ فَادۡعُوۡہُمۡ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لَکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ‘আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে আহবান কর, তারা তো তোমাদেরই মত বান্দা; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাক, অতঃপর তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৯৪)। কবরবাসী তার নিকট দু‘আকারীর দু‘আ শুনতে পায় না, যদিও তাকে প্রভুত্বের আসনে উন্নীত করা হয় না কেন। অনুরূপভাবে সে তার নিকট সাহায্যপ্রার্থীর জন্য কিছু করার ক্ষমতা রাখে না, যদিও তার মধ্যে ইলাহী বৈশিষ্ট্য রয়েছে মর্মে দাবী করা হয় না কেন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖ مَا یَمۡلِکُوۡنَ مِنۡ قِطۡمِیۡرٍ . اِنۡ تَدۡعُوۡہُمۡ لَا یَسۡمَعُوۡا دُعَآءَکُمۡ ۚ وَ لَوۡ سَمِعُوۡا مَا اسۡتَجَابُوۡا لَکُمۡ
‘আর তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো খেজুর আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না’ (সূরা ফাতির : ১৩-১৪)।
বস্তুত গাইরুল্লাহকে আহ্বানকারী জানে যে, সে যাকে ডাকছে সে তার কথা শুনে না ও তার উপকারও করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন,
قَالَ ہَلۡ یَسۡمَعُوۡنَکُمۡ اِذۡ تَدۡعُوۡنَ . اَوۡ یَنۡفَعُوۡنَکُمۡ اَوۡ یَضُرُّوۡنَ . قَالُوۡا بَلۡ وَجَدۡنَاۤ اٰبَآءَنَا کَذٰلِکَ یَفۡعَلُوۡنَ
‘তিনি বললেন, ‘যখন তোমরা ডাক তখন তারা কি তোমাদের সে ডাক শুনতে পায়? অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে? তারা বলল, না, তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এরূপই করতে দেখেছি’ (সূরা আশ-শুয়ারা : ৭২-৭৪)। ইবনে কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, (অর্থাৎ তারা স্বীকার করেছে যে, তাদের মূর্তীগুলো এসবের কিছুই করতে পারে না। বরং তারা তাদের পূর্বপুরুষদেরকে এরূপ করতে দেখেছিল।
মৃতরা নিজেদেরকেই সাহায্য করতে অক্ষম, কাজেই তাদের নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করা অসম্ভব ব্যাপার। মহান আল্লাহ বলেন, وَ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِہٖ لَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ نَصۡرَکُمۡ وَ لَاۤ اَنۡفُسَہُمۡ یَنۡصُرُوۡنَ ‘আর আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাক তারা তো তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং তারা তাদের নিজেদেরকেও সাহায্য করতে পারে না’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৯৭)। যে কোন মৃত ব্যক্তিকে ডাকে ও তার নিকটে উপকার চায় বা অকল্যাণ থেকে রেহাই কামনা করে; সে তার দ্বীন বিনষ্টের পাশাপাশি ক্লান্তি ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
یَدۡعُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ مَا لَا یَضُرُّہٗ وَ مَا لَا یَنۡفَعُہٗ ؕ ذٰلِکَ ہُوَ الضَّلٰلُ الۡبَعِیۡدُ . یَدۡعُوۡا لَمَنۡ ضَرُّہٗۤ اَقۡرَبُ مِنۡ نَّفۡعِہٖ ؕ لَبِئۡسَ الۡمَوۡلٰی وَ لَبِئۡسَ الۡعَشِیۡرُ
‘সে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা তার কোন অপকার করতে পারে না আর যা তার উপকারও করতে পারে না; এটাই চরম পথভ্রষ্টতা! সে এমন কিছুকে ডাকে যার ক্ষতি তার উপকার অপেক্ষা নিকটতর। কতইনা নিকৃষ্ট এই অভিভাবক এবং কতই না নিকৃষ্ট এই সঙ্গী!’ (সূরা আল-হাজ্জ : ১২-১৩)।
দু‘আকারীর মাখলুকের শরণাপন্ন হওয়া এবং জীবিত ও মৃতদের কাছে সহযোগিতা কামনা করা; বস্তুত নিজের নফসকে লাঞ্চিত করার শামিল। ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘হে আল্লাহ! অন্যের সিজদা করা হতে যেমন আমার চেহারাকে রক্ষা করেছেন, তেমনি আপনি ব্যতীত অন্যের কাছে চাওয়া থেকে আমার চেহারাকে হেফাযত করুন। আপনি ছাড়া কেউ অকল্যাণ দূর করতে ও কল্যাণ আনতে পারে না’।
যে বান্দা গাইরুল্লাহকে ডাকে অথবা তার হৃদয় অন্যের দ্বারস্ত হয় বা রবকে বাদ দিয়ে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত হতে শয়তান যাকে কুমন্ত্রণা দেয়; সে এমন বিপদ ও কষ্টে পতিত হবে যা তাদের অক্ষমতা, দুর্বলতা ও হীনতা প্রকাশ করে দিবে যাদেরকে সে ডাকে। মহান আল্লাহ বলেন,
قُلۡ اَرَءَیۡتَکُمۡ اِنۡ اَتٰىکُمۡ عَذَابُ اللّٰہِ اَوۡ اَتَتۡکُمُ السَّاعَۃُ اَغَیۡرَ اللّٰہِ تَدۡعُوۡنَ ۚ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ . بَلۡ اِیَّاہُ تَدۡعُوۡنَ فَیَکۡشِفُ مَا تَدۡعُوۡنَ اِلَیۡہِ اِنۡ شَآءَ وَ تَنۡسَوۡنَ مَا تُشۡرِکُوۡنَ
‘বলুন, তোমরা আমাকে জানাও, যদি আল্লাহর শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হয় বা তোমাদের কাছে ক্বিয়ামত উপস্থিত হয়, তবে কি তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও ডাকবে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও? না, তোমরা শুধু তাকেই ডাকবে, তোমরা যে দুঃখের জন্য তাকে ডাকছ তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদের সে দুঃখ দুর করবেন এবং যাকে তোমরা তার শরীক করতে তা তোমরা ভুলে যাবে’ (সূরা আল-আন‘আম : ৪০-৪১)।
যে ব্যক্তি জানবে যে, রাজত্বের মালিক কেবলই আল্লাহ এবং তিনি সৃষ্টিকুলের মুখাপেক্ষী নন; সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট থেকে উপকার লাভের বিষয়ে নিরাশ হয়ে যাবে এবং একমাত্র আল্লাহর নিকটই আশাবাদী হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
قُلِ ادۡعُوا الَّذِیۡنَ زَعَمۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ ۚ لَا یَمۡلِکُوۡنَ مِثۡقَالَ ذَرَّۃٍ فِی السَّمٰوٰتِ وَ لَا فِی الۡاَرۡضِ وَ مَا لَہُمۡ فِیۡہِمَا مِنۡ شِرۡکٍ وَّ مَا لَہٗ مِنۡہُمۡ مِّنۡ ظَہِیۡرٍ
‘বলুন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, যমীনেও নয়। আর এ দু’টিতে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়’ (সূরা সাবা : ২২)।
গাইরুল্লাহর ইবাদতকারীর নিকট যখন মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন সে তার কৃতকর্মকে অস্বীকার করবে। মহান আল্লাহ বলেন, الَّذِیۡنَ تَتَوَفّٰىہُمُ الۡمَلٰٓئِکَۃُ ظَالِمِیۡۤ اَنۡفُسِہِمۡ ۪ فَاَلۡقَوُا السَّلَمَ مَا کُنَّا نَعۡمَلُ مِنۡ سُوۡٓءٍ ‘যাদের মৃত্যু ঘটায় ফেরেশতাগণ তারা নিজেদের প্রতি যুলুম করা অবস্থায়; তখন তারা আত্মসমর্পণ করে বলবে, আমরা কোন মন্দ কাজ করতাম না’ (সূরা আন-নাহাল : ২৮)।
যখন মানুষের মৃত্যু সংঘটিত হবে তখন প্রত্যেকের চক্ষুদয়ের সামনে থেকে পর্দা সরে যাবে, মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করবে যা থেকে সে উদাসীন ছিল। ফলে সে নিশ্চিতভাবে সৃষ্টিজীবের অক্ষমতা প্রত্যক্ষ করবে, আর যাদেরকে তারা উপাসনা করত, এদের থেকে তাদের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেখবে। মহান আল্লাহ বলেন, حَتّٰۤی اِذَا جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُنَا یَتَوَفَّوۡنَہُمۡ ۙ قَالُوۡۤا اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ ؕ قَالُوۡا ضَلُّوۡا عَنَّا ‘অবশেষে যখন আমাদের ফেরেশতাগণ তাদের জান কবজের জন্য তাদের কাছে আসবে, তখন তারা জিজ্ঞেস করবে, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকতে তারা কোথায়? তারা বলবে, তারা আমাদের কাছ থেকে উধাও হয়েছে’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ৩৭)। অর্থাৎ তারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ফলে আমরা তাদের থেকে কোন উপকার ও কল্যাণ প্রত্যাশা করি না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকে আল্লাহ তার উপর ক্রোধান্বিত হন এবং তিনি তাকে জাহান্নামের চিরস্থায়ী অধিবাসী করবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ مَاتَ وَهْوَ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে তাঁর সমকক্ষ স্থাপন করতঃ মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে যাবে’।[৬]
অতঃপর হে মুসলিমগণ! কাজেই দু‘আ হল শক্তিশালী ইবাদত যার মাধ্যমে এক আল্লাহতে বিশ্বাসী বান্দা অন্যের উপর বিজয় লাভ করে। আর এটি হল বান্দার দ্বীন ধ্বংস করার জন্য শয়তানের নিকট সবচেয়ে সহজ প্রবেশদ্বার। ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মৃতদের কাছে অভাব অভিযোগ পেশ করা, তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাদের অভিমুখী হওয়া বিশ্বের শিরকের উৎসমূল’। একজন মুসলিম তার অন্তর, ইবাদত, আচার-আচরণ ও লেনদেন একমাত্র তার রবের জন্য স্থির রাখে। সে তার জ্ঞান, ইচ্ছা, মনোবাসনা এবং ভালোবাসায় স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে পার্থক্য করে। সে জানতে পারে উভয়ের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে; ফলে সে একের অধিকার ও মর্যাদা অন্যকে দেয় না। সুতরাং ইবাদত, দু‘আ, ভয় ও কল্যাণ প্রত্যাশা করা মহান রব আল্লাহর নিকটেই করতে হবে। পক্ষান্তরে সৎ মানুষদেরকে ভালোবাসা, নেককাজে তাদের অনুসরণ করা, তাদের মান-সম্মান রক্ষা করা এবং উত্তম প্রশংসা করা। মহান আল্লাহর বাণী :
فَاَقِمۡ وَجۡہَکَ لِلدِّیۡنِ حَنِیۡفًا ؕ فِطۡرَتَ اللّٰہِ الَّتِیۡ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیۡہَا ؕ لَا تَبۡدِیۡلَ لِخَلۡقِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ٭ۙ وَ لٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ
‘কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম) যার উপর চলার যোগ্য করে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’ (সূরা আর-রুম : ৩০)।
হে মুসলিমগণ! বান্দাকে সবচেয়ে মূল্যবান যা প্রদান করা হয়েছে তা হল : তার রবকে একক হিসেবে স্বীকার করে নেয়ার জ্ঞান এবং সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ যে নে‘মত প্রদান করা হয়েছে তা হল মৃত্যুবধি তাওহীদের উপর অবিচলতা। বিশুদ্ধভাবে তাওহীদের সামান্য অংশ লালন করলেও তা তাকে জাহান্নামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া থেকে মুক্তি দেবে। আর পূর্ণাঙ্গ তাওহীদ লালন করলে তাকে জাহান্নামে প্রবেশে বাধা দেবে। শয়তানের অসংখ্য কলা-কৌশল ও সন্দেহ-সংশয় রয়েছে, যা দ্বারা সে বান্দাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বান্দা যে কোন সন্দেহ- সংশয়ের সম্মুখিন হোক না কেন তাতে উক্ত সংশয়ের অনুগামী হওয়ার প্ররোচনা নিহিত থাকে। শয়তান তাকে সন্দেহ-সংশয় বিশ্বাস করার প্রতি আহ্বান করতে থাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি নিরাপদ থাকতে চায়, সে যেন তার তাওহীদ ও ঈমানকে আঁকড়ে ধরে এবং নিজেকে সন্দেহ-সংশয়ের স্থানগুলো থেকে দূরে রাখে ।
অতঃপর আপনারা জেনে রাখুন! আল্লাহ তা‘আলা আপনাদেরকে তাঁর নবীর উপর ছালাত ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহর বাণী : اِنَّ اللّٰہَ وَ مَلٰٓئِکَتَہٗ یُصَلُّوۡنَ عَلَی النَّبِیِّ ؕ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا صَلُّوۡا عَلَیۡہِ وَ سَلِّمُوۡا تَسۡلِیۡمًا ‘নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দু‘আ- ইস্তিগফার করেন । হে ঈমানদারগণ! তোমারাও নবীর উপর ছালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’ (সূরা আল-আহযাব : ৫৬)।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর ছালাত, সালাম এবং বরকত নাযিল করুন। হে আল্লাহ! আপনি তার খোলাফায়ে রাশেদা আবূ বকর, ওমর, উছমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান; যারা হক্বের মানদণ্ডে বিচার-ফায়সালা করেছেন এবং এর মাধ্যমে ইনসাফ করেছেন। আর আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যান সকল ছাহাবাদের উপর। হে মহা-সম্মানিত আল্লাহ! আপনার বদান্যতা ও অনুগ্রহের মাধ্যমে ছাহাবাগণের সঙ্গে আমাদের প্রতিও রাজি-খুশি হয়ে যান।
হে আল্লাহ! আপনি ইসলাম ও মুসলিমদের গৌরবান্বিত করুন এবং শিরক ও মুশরিকদের অপদস্থ করুন। দ্বীন ইসলামের শত্রুদের ধ্বংস করুন। হে আল্লাহ! আপনি এ দেশসহ সকল মুসলিম দেশকে নিরাপদ, স্থিতিশীল রাখুন এবং এগুলোতে সমৃদ্ধি দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের শাসক ও তার নায়েবকে আপনার পছন্দনীয় এবং সন্তোষজনক কর্মসম্পাদনের তাওফীক্ব দান করুন। তাদেরকে পূণ্যকাজ ও তাক্বওয়ার প্রতি পরিচালিত করুন। হে বিশ্বপালনকর্তা! আপনি তাদের দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমদের উপকৃত করুন। হে বিশ্বপালনকর্তা! আপনি মুসলিমদের সকল শাসককে আপনার কিতাব অনুযায়ী আমল ও শরী‘আহ বাস্তবায়ন করার তাওফীক্ব দান করুন।
হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।
আল্লাহর বান্দাগণ! নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর। কাজেই আপনারা মহামহিম আল্লাহকে স্মরণ করুন তিনিও আপনাদেরকে স্মরণ করবেন এবং তাঁর নে‘মতের শুকরিয়া আদায় করুন তাহলে তিনি আপনাদের নে‘মতকে বৃদ্ধি করে দিবেন। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।
* পি-এইচ.ডি, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র :
[১]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৮০৪, সনদ ছহীহ।
[২]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৪১০, সনদ ছহীহ।
[৩]. তিরমিযী, হা/৩৫৪০, সনদ ছহীহ।
[৪]. তিরমিযী, হা/৩৯৬২, সনদ হাসান।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৬।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৯৭।