সুখময় সৌভাগ্যের মৃত্যু লাভের উপায়
- ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন*
(২য় কিস্তি)
২- তাক্বওয়া অবলম্বন করা
মানবজীবনে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে তাক্বওয়া। আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য করা, তাদের নাফরমানী না করার নামই তাক্বওয়া। দুনিয়াতে মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করে জান্নাত লাভের আশা করবে। আল্লাহর শাস্তির কথা স্মরণ করে জাহান্নামে যাওয়ার ভয় করবে। কখনো আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَ اَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (সূরা আলে ইমরান: ১০২)।
আলোচ্য আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃতার্থেই তাক্বওয়া অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেভাবে আল্লাহকে ভয় করা দরকার ঠিক সেভাবে। অর্থাৎ তাক্বওয়ার ঐ স্তর অর্জন করতে হবেম, যা তাক্বওয়ার হক্ব। হাসান বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তাক্বওয়ার হক্ব হচ্ছে- প্রত্যেক কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা। আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন কাজ না করা। আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করা। সর্বদা তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা। কখনো কৃতঘ্ন না হওয়া’।[১]
আল্লাহ তা‘আলাকে পূর্ণরূপে তাক্বওয়া তথা আল্লাহভীতির অর্থ এই যে, তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা, অবাধ্য না হওয়া। তাকে সদা স্মরণ করা। কোন সময়েই তাকে না ভুলে যাওয়া। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কৃতঘ্ন না হওয়া। সারাজীবন ইসলামের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা; যাতে মৃত্যুও এর উপরেই হয়। মহান রবের নিয়ম হল, মানুষ স্বীয় জীবন যেভাবে চালিত করে ঐভাবেই তার মৃত্যু দিয়ে থাকেন। যার উপরে তার মৃত্যু সংঘটিত হবে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তাকে উঠানো হবে।[২] আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, لَا يَتَّقِي الْعَبْدُ اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ حَتَّى يُخْزَنَ مِنْ لِسَانِهِ ‘মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করার দাবী পূরণ করতে পারে না যতক্ষণ না সে স্বীয় জিহ্বাকে সংযত করে’।[৩]
তাক্বওয়া তথা আল্লাহভীতি অবলম্বনের উপকারিতা
এক: মন্দ, খারাপকর্ম ও পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوا اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّکُمۡ فُرۡقَانًا وَّ یُکَفِّرۡ عَنۡکُمۡ سَیِّاٰتِکُمۡ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ ذُو الۡفَضۡلِ الۡعَظِیۡمِ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি তাক্বওয়া অবলম্বন কর তিনি তোমাদেরকে ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন, তোমাদের পাপ মাফ করে দেবেন। আল্লাহ মহাকল্যাণের অধিকারী’ (সূরা আল-আনফাল: ২৯)।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘জনৈক লোক যে জীবনে কখনো কোনো প্রকার ছাওয়াবের কাজ করেনি, সে মারা যাওয়ার প্রাক্কালে তার পরিবার পরিজনকে ডেকে বলল, মৃত্যুর পর তোমরা আমার লাশ পুড়ে ফেলবে। সেটার অর্ধেক স্থলভাগে বাতাসে উড়িয়ে দিবে এবং অর্ধেক পানিতে নিক্ষেপ করবে। কারণ আল্লাহর কসম! আমাকে যদি আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় একত্রিত করতে পারেন, তাহলে তিনি আমাকে অবশ্যই এমন ‘আযাব দিবেন, যা পৃথিবীর অন্য কাউকে কখনো দেননি। তারপর লোকটি যখন ইন্তেকাল করল, তখন তার পরিবারের লোকেরা তার নির্দেশ অনুযায়ী তদ্রƒপ করল। তখন আল্লাহ তা‘আলা স্থলভাগকে আদেশ দিলে সে তার মধ্যস্থিত যা কিছু আছে তা একত্রিত করলো। এরপর পানিতে মিশ্রিত ভাগকে নির্দেশ দিলে সেও তার মধ্যস্থিত সবকিছু একত্রিত করে দিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি এমনটি কেন করলে? সে বলল, হে আমার রব! আপনার ভয়ে। আপনি তো সর্বজ্ঞ। তখন আল্লাহ তা‘আলা সদয় হয়ে তাকে মাফ করে দিলেন’।[৪]
দুই: বান্দার আমলসমূহ কবুল করা হয়
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰہُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ ‘আল্লাহ তা‘আলা তো কেবল তাক্বওয়াবানদের থেকে কবুল করে থাকেন’ (সূরা আল-মায়িদা: ২৭)।
যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি পূর্ণ ভয়ভীতি, কবুল হওয়ার ভরসা রেখে আমল করে আল্লাহ তা‘আলা তাদের আমল দ্রুত কবুল করে নেন। আর যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে না, তাদের আমল কবুল করা হয় না। বুঝার সুবিধার্থে এ ব্যাপারে সু-পরিচিত একটি উদাহরণ উপস্থাপন করা যেতে পারে।
আদম (আলাইহিস সালাম) ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম) পৃথিবীতে আগমন করেন। তাদের সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার শুরু হয়। হাওয়া (আলাইহিস সালাম)-এর গর্ভ হতে একসাথে একজন ছেলে ও একজন মেয়ে জন্মগ্রহণ করত। তখন আপন ভাইবোন ছাড়া আদম (আলাইহিস সালাম)-এর আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ সহোদর ভাইবোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা সমসাময়িক প্রয়োজন মিটানোর জন্য আদম (আলাইহিস সালাম)-এর শরী‘আতে হুকুম জারি করেন যে, একই গর্ভ হতে একবারে যে ভাইবোন জন্ম হবে তাদের পরস্পরে বিবাহ হারাম। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ হতে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ হতে জন্মগ্রহণকারিনী কন্যার সাথে বিবাহ বৈধ। দেখা গেল, কাবিলে সহজাত সহোদরা বোনটি ছিল পরমাসুন্দরী আর হাবিলের সহজাত সহোদরা বোনটি ছিল এক কম সুন্দরী। নিয়ম অনুযায়ী হাবিলের সহজাত সহোদরা বোনটি কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসন্তোষ প্রকাশ করে হাবিল কাবিলের চোখে শত্রু বনে যায়। কাবিল জিদ ধরে বলল, আমার সহজাত বোনকে আমার সাথেই বিবাহ দিতে হবে। আদম (আলাইহিস সালাম) শরীআ’তের আইন মেনে তার এ দাবী প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর হাবিল ও কাবিলের দূরত্ব ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে তাদেরকে বলেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহ জন্য নিজ নিজ কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী আল্লাহ কবুল করবেন, সে-ই কন্যাকে বিবাহ করবে। আদম (আলাইহিস সালাম) জানতেন, যে সত্যের উপর আছে তার কুরবানীই কবুল করা হবে। তখনকার সময়ে কুরবানী কবুল হওয়া নিদর্শন ছিল- আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীকে জ্বালিয়ে দিত। তারপর তা বিলীন হয়ে যেত। আর যে কুরবানী কবুল করা হতো না তা প্রত্যাখাত বলে মনে করা হত। হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশুপালন করত। তাই সে একটি উৎকৃষ্টমানের দুম্বা কুরবানী করল। কাবিল কৃষিকাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য পেশ করল।
অতঃপর নিয়ম অনুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কুরবানীটিকে ভষ্ম করে দিল আর কাবিলেরটা পড়ে রইল। এ দেখে কাবিলের ক্ষোভ আরো বেড়ে গেল। সে নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সে প্রকাশ্যে তার ভাইকে জানিয়ে দিল, আমি তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ দেখাল না। বরং সে তার সাথে কথা বলল মার্জিতভাবে। এতে কাবিলের প্রতি তার সহানুভূতি ও ভালোবাসা ফুটে উঠেছিল। হাবিল বলেছিল, আল্লাহর নীতি হচ্ছে - তিনি কেবল আল্লাহভীরুদের থেকে কর্ম গ্রহণ করে থাকেন। তুমি তাক্বওয়া অবলম্বন করলে তিনি তোমার কুরবানীও গ্রহণ করতেন। কিন্তু তুমি তা করনি। তাই তোমার কুরবানী কবুল করা হয়নি।[৫]
তিন: সকল ধরণের কষ্ট, সংকীর্ণতা দূরীভূত হয়
কোন ব্যক্তি যে কোন ধরণের দুঃখ-কষ্ট ও সংকটে পড়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে তার কাছে চায়, দু‘আ করে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তা দূর করে দেন। তাই সকল কর্মেই আল্লাহকে ভয় করতে হবে। বিশেষ করে, রিযিকের ব্যাপারে তাক্বওয়া অবলম্বনের প্রয়োজন বেশি। কারণ, রিযিক যদি হালাল না হয় কোন আমলই কবুল করা হবে না। ব্যক্তি হালাল ভক্ষণ করলে যতদিন বাঁচবে, হারাম ভক্ষণ করলেও ততদিনই বাঁচবে। দুনিয়াতে হারাম পন্থায় যেমন সম্পদ অর্জন করা অতীব সহজ, ঠিক তেমনি সহজ হালাল পন্থায় সম্পদ অর্জন করা। জীবিকা নির্বাহ করা। শুধু দরকার প্রকৃত তাক্বওয়ার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَنۡ کَانَ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۬ؕ وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا -وَّ یَرۡزُقۡہُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَحۡتَسِبُ
‘যে কোন ব্যক্তি তাক্বওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দিবেন এবং এমনভাবে তাকে রিযিক দান করবেন; যা সে ধারণাও করতে পারবে না’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব: ২-৩)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করতে তবে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে পাখির ন্যায় রিযিক দান করতেন। পাখি সকাল বেলায় ক্ষুধার্ত অবস্থায় তার নীড় থেকে বের হয়, সন্ধ্যা বেলায় উদরপূর্তি করে ফিরে আসে’।[৬]
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন প্রয়োজনে পড়ে তারপর সে তা জনগণের সামনে তুলে ধরে, খুব সম্ভব সে কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবে, তার কাজ হালকা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন আল্লাহর নিকট সপে দেয়, আল্লাহ অবশ্য অবশ্যই তার প্রয়োজন পুরো করে থাকেন এবং তার উদ্দেশ্য সফল করেন। হয়তো তাড়াতাড়ি এই দুনিয়াতেই পুরো করেন, না হয় মৃত্যুর পর আখিরাতে পুরো করবেন’।[৭]
চার: কঠিন যেকোন কর্ম সহজ হয়ে যায়
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا ‘যে আল্লাহভীতি অবলম্বন করে, আল্লাহ তার কাজকর্ম সহজ করে দেন’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব: ৪)। আল্লাহকে যে ভয় করে, আল্লাহ তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দেন। যে কোন বিপদ আপদ ও কষ্ট হতে তাকে শান্তি দান করে থাকেন। এটা আল্লাহর বিধান যা তিনি বান্দাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহকে যে ভয় করে তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দান করবেন মহাপুরস্কার।[৮]
পাঁচ: কঠিন বিপদস্থল হতে রক্ষা পাওয়া যায়
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اِنۡ مِّنۡکُمۡ اِلَّا وَارِدُہَا ۚ کَانَ عَلٰی رَبِّکَ حَتۡمًا مَّقۡضِیًّا- ثُمَّ نُنَجِّی الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا وَّ نَذَرُ الظّٰلِمِیۡنَ فِیۡہَا جِثِیًّا
‘তোমাদের সকলেই তার (জাহান্নামের) উপর দিয়ে অতিক্রম করবে। এটা আপনার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। অতঃপর, আমরা তাদেরকে উদ্ধার করব যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে। আর জালিমদেরকে সেখানে নতজানু করে রেখে দিব’ (সূরা মারইয়াম: ৭১-৭২)। উপরোল্লিখিত আয়াতে বলা হয়েছে, সকলকেই জাহান্নামের উপর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে। অর্থাৎ জাহান্নামের উপরে পুলছিরাত স্থাপন করা হবে। সেখান দিয়ে পারাপার হতে হবে। ছহীহ হাদিছে বর্ণিত হয়েছে, ‘... জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! পুলটি কেমন হবে? তিনি বললেন, দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর উপরে লাগানো থাকবে শক্ত চওড়া কাঁটাবিশিষ্ট আঙ্টা এবং হুক। দেখতে সাদান বৃক্ষের কাঁটার ন্যায়। সেই পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারদের কেউ কেউ চোখের পলকেই পার হয়ে যাবে। কেউ বিদ্যুতের গতিত। কেউ বাতাসের গতিতে। কেউ পার হবে দ্রুতগামী ঘোড়ার দৌড়ের গতিতে’।[৯]
অন্য এক হাদীছে এসেছে, আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “... তারপর পুল নিয়ে আসা হবে এবং তা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! পুল কী? তিনি বললেন, পিচ্ছিল, তরতরে স্থান। যাতে লোহার হুক, বর্শি, চওড়া ও বাঁকা কাঁটা বাঁধানো থাকবে। এগুলো নাজদের সাদান গাছের কাঁটার সদৃশ। মুমিনগণের মাঝে কেউ তার উপর দিয়ে চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও অন্যান্য বাহনের গতিতে পার হয়ে যাবে। কেউ ছহীহ সালামতে পার হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ পার হতে গিয়ে তার শরীর জাহান্নামে জ্বলসে যাবে। এমনকি সর্বশেষ ব্যক্তি টেনে-হিঁচড়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোন রকমে পার হবে’।[১০]
ছয়: জান্নাত লাভ করা যায়
কারো মাঝে আল্লাহভীতি থাকলে সে জান্নাতে যাবে। তার জন্য জান্নাত অবধারিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, تِلۡکَ الۡجَنَّۃُ الَّتِیۡ نُوۡرِثُ مِنۡ عِبَادِنَا مَنۡ کَانَ تَقِیًّا ‘এটা সেই জান্নাত, যার উত্তরাধিকারী করব আমার মুত্তাকী বান্দাদেরকে’ (সূরা মারইয়াম: ৬৩)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ سِیۡقَ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّہُمۡ اِلَی الۡجَنَّۃِ زُمَرًا ؕحَتّٰۤی اِذَا جَآءُوۡہَا وَ فُتِحَتۡ اَبۡوَابُہَا وَ قَالَ لَہُمۡ خَزَنَتُہَا سَلٰمٌ عَلَیۡکُمۡ طِبۡتُمۡ فَادۡخُلُوۡہَا خٰلِدِیۡنَ
‘আর যারা তাদের রবের তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা জান্নাতের কাছে আসবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভাল ছিলে। সুতরাং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে অবস্থানের জন্য’ (সূরা আয-যুমার: ৭৩)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেছেন,
سَدِّدُوْا
وَقَارِبُوْا، وَأَبْشِرُوْا، فَإِنَّهُ لَا يُدْخِلُ أَحَدًا الْجَنَّةَ
عَمَلُهُ». قَالُوْا وَلَا، أَنْتَ يَا
رَسُوْلَ اللهِ قَالَ «وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِى اللهُ بِمَغْفِرَةٍ
وَرَحْمَةٍ».
‘সততা ও সত্য অবলম্বন কর, মধ্যবর্তী পথ অনুসরণ কর এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহের সুসংবাদ লাভ কর। কারও কর্ম তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না। শ্রোতারা বলল, আপনাকেও নয়কি হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! উত্তর হল: আমার কর্ম আমাকেও জান্নাতে নেবে না। তবে আল্লাহ যদি স্বীয় রহমত দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন’।[১১]
এখানে ভাগ্যবান আল্লাহভীরু ও সৎ লোকদের পরিণামের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে উত্তম ও সুন্দর উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করিয়ে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের বিভিন্ন দল থাকবে। প্রথমে আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বিশিষ্ট লোকদের দল, তারপর পুণ্যবানদের দল, এরপর তাদের চেয়ে কম মর্যাদাপূর্ণ লোকদের দল এবং এরপর তাদের চেয়েও কম মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের দল থাকবে। নবীগণ থাকবেন নবীদের দলে, ছিদ্দীকগণ থাকবেন তাদের সমপর্যায়ের লোকদের দলে, শহীদগণ থাকবেন শহীদদের দলে এবং আলেমগণ থাকবেন আলেমদের দলে।[১২]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৬-৮৭, সূরা আল ইমরানের ১০২ নং আয়াতের তাফসীর দ্র.।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭০০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১০।
[৩]. তাফসীর ইবনু কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৭।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৮১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৫৬।
[৫]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা মায়েদা: ২৭ আয়াতের তাফসীর (সংক্ষেপিত)।
[৬]. তিরমিযী, হা/২৩৪৪; ইবনু মাজাহ, হা/৪১৬৪, সনদ ছহীহ।
[৭]. এ হাদীছটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে।
[৮]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা আত-ত্বালাক্বের ৪ নং আয়াত ।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৩৯।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮১৬।
[১২]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা যুমার এর ৭৩ নং আয়াত দ্র.।