সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন

 বন্যার দুর্যোগে মানবিক দায়িত্ব : জাতীয় বিবেকের জাগরণ ও ঈমানের পরীক্ষা 


বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বর্ষা এ দেশের প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কখনো কখনো এই বর্ষাই পরিণত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না, দীর্ঘশ্বাস ও অসহায়ত্বের প্রতীকে। বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে টানা ভারী বর্ষন ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। বৃষ্টির পানি, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর উত্তাল স্রোত এবার শুধু জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি; ভাসিয়ে নিয়েছে লাখো মানুষের স্বপ্ন, নিশ্চিন্ত ঘুম, জীবিকার অবলম্বন এবং আগামী দিনের আশা ও অবলম্বন। এ বন্যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দী। অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিশুদের মুখে খাবার নেই, মায়েদের চোখে অনিশ্চয়তার অশ্রু, বৃদ্ধদের দেহে চিকিৎসার অভাব, গবাদিপশু ভেসে গেছে, ফসলের মাঠ পানির নিচে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। প্রাথমিক হিসাবেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা।

এমন সময় একজন মুমিনের অন্তর কি নীরব থাকতে পারে? ইসলামের উত্তর সুস্পষ্ট, না। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি ঈমানের দাবি, তাক্বওয়ার পরিচয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, وَ تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ‘তোমরা নেককাজ ও তাক্বওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করো’ (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫ : ২)। এই আয়াত আমাদের জাতীয় ও সামাজিক দায়িত্বের ভিত্তি স্থাপন করে। বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়া, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া, অসুস্থকে চিকিৎসা দেওয়া, বিপন্ন মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া, এসবই নেককাজের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ ‘আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৯৯)। বান্দার সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামের নির্দেশের পাশাপাশি এটি জাতীয় দায়িত্ববোধেরও ভিত্তি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুমিন সমাজকে একটি জীবন্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন,مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ، مَثَلُ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ، تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত একটি দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে সমগ্র দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে তার কষ্ট অনুভব করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৬)।

প্রশ্ন হলো, আজ কি বাংলাদেশের সেই ব্যথিত অঙ্গের যন্ত্রণা আমরা অনুভব করছি? নাকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকটি সহানুভূতির বাক্য লিখেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে? মনে রাখতে হবে, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল দানশীলতার পরিচয় নয়; এটি একজন ঈমানদারের পরিচয়। একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার দেওয়া, একটি শিশুর হাতে খাবার তুলে দেওয়া, একটি অসহায় পরিবারের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা কিংবা সামান্য অর্থ দিয়ে একটি জীবনকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা, এসবের প্রতিটিই আল্লাহর কাছে মহামূল্যবান আমল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সেই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে’ (আল-মু‘জামুল আওসাত, হা/৬০২৬, সনদ হাসান লি গাইরিহি)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন, ابغُوني الضعفاءَ، فإنما تُرزَقُون وتُنْصَرون بضعفائِكم ‘তোমরা দুর্বল ও অসহায় মানুষদের প্রতি যত্নবান হও। কারণ, তোমাদের দুর্বলদের বরকতেই আল্লাহ তোমাদের রিযিক দান করেন এবং তাদের কারণেই তোমরা আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় লাভ কর’ (আবূ দাঊদ, হা/২৫৯৪, সনদ ছহীহ)।

আজ তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা এবং এই মানবিক বিপর্যয়ে অংশীদার হওয়া। কেননা এমন সংকট আমাদের আত্মসমালোচনারও সুযোগ এনে দেয়। আমরা কি আল্লাহর দেওয়া নে‘মতের যথার্থ কদর করেছি? আজ যারা নিরাপদ আশ্রয়ে বসে আছি, তাদের এক মুহূর্তের জন্য ভাবা উচিত, যদি এই বন্যার পানিতে আমাদের অবস্থা তাদের মত হতো? তখন আমরা কী প্রত্যাশা করতাম? নিশ্চয়ই আমরা চাইতাম কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াক। সুতরাং, আজ অন্যের পাশে দাঁড়ানোই আগামী দিনের জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ, মানুষের কাছেও, আল্লাহর কাছেও। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দুর্যোগের সময় একটি জাতির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। বিপদের মুহূর্তে যে জাতি পরস্পরের হাত ধরে, আল্লাহ সেই জাতিকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দান করেন। কিন্তু যে সমাজ উদাসীন থাকে, অন্যের কান্নাকে নিজের কান্না মনে করে না, সে সমাজ নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

অতএব, আসুন! আমরা প্রত্যেকে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি। আমাদের ঘরের অতিরিক্ত খাদ্য, অব্যবহৃত পোশাক, সঞ্চয়ের একটি অংশ কিংবা কিছু সময়, এসবই আজ বন্যাদুর্গত মানুষের জীবন বাঁচানোর উপায় হতে পারে। হয়তো আমাদের ক্ষুদ্র সহযোগিতাই কোনো শিশুর ক্ষুধা নিবারণ করবে, কোনো মায়ের চোখের পানি মুছে দেবে, কোনো বৃদ্ধের মুখে আবারও বেঁচে থাকার হাসি ফিরিয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ।

মহান আল্লাহ আমাদের এমন হৃদয় দান করুন, যা মানুষের কান্নায় কাঁদে; এমন হাত দান করুন, যা বিপন্ন মানুষের দিকে প্রসারিত হয়; এমন ঈমান দান করুন, যা কেবল মুখের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের সেবায় প্রতিফলিত হয়। তিনি আমাদের দেশকে এই ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে দ্রুত মুক্তি দান করুন, নিহতদের ক্ষমা করুন, আহতদের সুস্থতা দান করুন, ক্ষতিগ্রস্তদের উত্তম প্রতিদান দিন এবং আমাদের সবাইকে মানবতার এই কঠিন পরীক্ষায় সফল হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!

رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ



 

 




প্রসঙ্গসমূহ »: সম্পাদকীয়
কুরআনে কারীমের মর্যাদা - সম্পাদকীয়
আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে বিষোদগার : চরম অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ - সম্পাদকীয়
লৌকিকতামুক্ত কুরবানী: তাওহীদ বাস্তবায়নের উপায় - সম্পাদকীয়
আলেমের মর্যাদা - সম্পাদকীয়
কুরআন মাজীদের হক্ব আদায় করুন! - সম্পাদকীয়
জাতীয় ঐক্য: ভিত্তি হোক ইসলাম - সম্পাদকীয়
নারী বিষয়ে ইসলামবিরোধী সংস্কার প্রস্তাব বাতিল করুন - সম্পাদকীয়
মানুষের চরম সংকট! - সম্পাদকীয়
মহামারীর কারণ ও পরিত্রাণের উপায় - সম্পাদকীয়
উত্তম চরিত্রের দুর্ভিক্ষ ও পরিত্রাণের উপায় - সম্পাদকীয়
পাশ্চাত্য দর্শন: সমাজ বিপ্লবের পথে চরম অন্তরায়! - সম্পাদকীয়
প্রচলিত কুসংস্কার : মুসলিমদের জন্য মরণব্যাধি ক্যান্সার - সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ