মঙ্গলবার, ০৯ Jun ২০২৬, ০২:১৯ পূর্বাহ্ন

ইসলামী রাষ্ট্রে আইন ও বিচার ব্যবস্থার স্বরূপ

- হাসিবুর রহমান বুখারী*


[গত সংখ্যার পর থেকে] 

বিচারক নির্বাচনের নীতিমালা (শর্তাবলী)

ইসলামী রাষ্ট্রে বিচারকের দায়িত্ব এমন ব্যক্তিকেই দেয়া হবে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত বিদ্যমান থাকবে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

(ক) ইসলাম, সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্তবয়স্কতা

মুসলিমদের বিচারকার্যে কোন কাফির, পাগল, ফাসিক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। এছাড়া কিতাব ও সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা এবং এমন প্রখর বুদ্ধিমত্তা থাকা যরূরী, যা তাকে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করবে।

(খ) শারঈ জ্ঞান ও ইজতিহাদের যোগ্যতা

বিচারকের উচিত আহকামের আয়াতসমূহ ও সংশ্লিষ্ট হাদীছ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা। ছাহাবীদের মতামত জানা। ইজমা (ঐকমত্য) সম্পর্কে অবহিত থাকা। আলিমদের মতপার্থক্য সম্পর্কে জানা। আরবী ভাষায় দক্ষ হওয়া। ক্বিয়াস ও ইস্তিনবাত (বিধান নির্ণয়) করতে সক্ষম হওয়া।

(গ) ইন্দ্রিয়ের সুস্থতা

শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও বাকশক্তি সুস্থ থাকা আবশ্যকÑ যাতে বিচারক বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে ও নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেন। এসব ছাড়া বিচারকার্য সঠিকভাবে সম্পাদন করা সম্ভব নয়।

(ঘ) ন্যায়পরায়ণতা

বিচারককে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে, বড় গুনাহ্ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং ছোট গুনাহের উপর অটল থাকা যাবে না।

(ঙ) বিচারক পুরুষ হওয়া

ফক্বীহগণের মতে, বিচারকের দায়িত্ব পুরুষের জন্য নির্ধারিত, নারীর জন্য বিচারকার্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের যুক্তি হল- এই দায়িত্বে ধৈর্য, সহনশীলতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। নারীর স্বাভাবিক কোমল আবেগ, দ্রুত আবেগপ্রবণতা এবং হায়িয-নিফাস, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও দুধপানের মত শারীরিক বিষয়সমূহ তাকে এই দায়িত্ব পালনে অসুবিধায় ফেলতে পারে বলে তারা মনে করেন। এছাড়া এই পদে সাধারণ জনগণ, সাক্ষী, বিবাদমান পক্ষ, প্রতিনিধি ও সহকারীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ, মেলামেশা ও কখনও নির্জনে কাজ করার প্রয়োজন হয়- যা নারীর জন্য উপযুক্ত বা জায়েয নয়। রাসূল (ﷺ)-এর কাছে যখন খবর পৌঁছায় যে পারস্যবাসীরা কিসরার কন্যাকে শাসক নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি বলেন, لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُم امْرَأَةً ‘যে জাতি কোন মহিলাকে তাদের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব দিবে তাদের কখনো মুক্তি মিলবে না’।[১]

মামলায় দ্রুত রায় প্রদান

বিচারক তিনটি অবস্থা ছাড়া কোন মামলার রায় বিলম্বিত করতে পারেন না। যথা:

  1. বিবাদমান পক্ষদের মধ্যে আপস-মীমাংসার সুযোগ দেয়ার জন্য।
  2. যদি কোন পক্ষ তার অধিকারের পক্ষে অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য সময় প্রার্থনা করে।
  3. যদি বিচারকের মনে সন্দেহ থাকে, যা দূর করার জন্য আরও অনুসন্ধান, যাচাই ও নির্ভুলতার প্রয়োজন হয়।
বিচারকের সহায়ক সংস্থাসমূহ

(ক) পুলিশ ব্যবস্থা

পুলিশ ইসলামের প্রাচীন প্রশাসনিক দায়িত্বগুলোর একটি। তারা অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারকের প্রদত্ত রায় কার্যকর করতে সহায়তা করত। পুলিশ ব্যবস্থার সূচনা হয় খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগ থেকে। তিনি রাতে নিজে মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন এবং বিপথগামীদের অনুসরণ করতেন।

(খ) হিসবা বিভাগ (আমর বিল-মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার)

এটি এমন একটি বিভাগ, যারা মুসলিম শাসকের নির্দেশে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কার্যকর করতেন। মুহতাসিবের দায়িত্বের মধ্যে ছিল- বাজারে ভেজাল ও প্রতারণা প্রতিরোধ করা। ওজন ও পরিমাপ পর্যবেক্ষণ করা। রুটি প্রস্তুতকারক ও কারিগরদের কাজের মান তদারক করা। বিয়ে, অনুষ্ঠান ও শোকসভায় সংঘটিত অনাচার বন্ধ করা। সূদ (রিবা) প্রতিরোধ করা। ঋণ পরিশোধে তাগিদ দেয়া। মানুষকে সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ে উৎসাহিত করা ইত্যাদি। মুহতাসিবের দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এটি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, লেনদেন নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখত- সহজ ও ন্যায়ভিত্তিক শরী‘আতের আলোকে।

(গ) দিওয়ানুল মাযালিম (অভিযোগ ও অন্যায় নিরসন বিভাগ)

এটি ইসলামী বিচারব্যবস্থার গৌরবময় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এমন সব মামলা, যা সাধারণ বিচারক নিষ্পত্তি করতে অক্ষম হতেন- বিশেষত ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধেÑ সেগুলো এই বিভাগের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হতো। যদি কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচারক রায় কার্যকর করতে না পারেন, তবে মাযালিমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার কাছ থেকে অধিকার আদায় করে প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতেন। তাই এ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির মধ্যে গভীর তাক্বওয়া, প্রজ্ঞা ও মর্যাদা থাকা আবশ্যক ছিল। সময়ের সাথে সাথে দিওয়ানুল মাযালিম বিকশিত হয়। অনেক সময় খলীফারা নিজেরাই এ দায়িত্ব পালন করতেনÑ এটি খুলাফায়ে রাশিদীন, উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে সুপরিচিত ছিল। বর্ণিত আছে,

একদিন আব্বাসীয় খলীফা আল-মামুন মাযালিমের আসরে বসেছিলেন। সবার শেষে একজন মহিলা এসে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তিনি জবাব দিলেন, তোমার উপরও শান্তি বর্ষিত হোক, হে আল্লাহর বান্দী! তোমার প্রয়োজন বল। মহিলাটি জানালেন যে, খলীফার পুত্র তার জমি জোরপূর্বক দখল করেছে। খলীফা নির্দিষ্ট দিনে তাকে ও তার প্রতিপক্ষকে হাজির হতে বললেন। নির্ধারিত দিনে অভিযুক্তকে আনা হলে মহিলাটি উচ্চৈঃস্বরে তার অভিযোগ উপস্থাপন করেন। তখন মন্ত্রী ফযল বললেন, ‘ধীরে বলুন, তিনি তো আমীরুল মুমিনীনের পুত্র!’ খলীফা বললেন, ‘তাকে বলতে দাও; সত্য তাকে বাকশক্তি দিয়েছে, আর মিথ্যা নীরব করে দেয়’। এরপর তিনি মহিলার পক্ষে রায় দিলেন, তার জমি ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং নিজের পুত্রকে কারাবন্দী করলেন’। এভাবেই মাযালিম বিভাগ অত্যাচার দূরীকরণ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং শরী‘আতের বিধান সবার উপর সমভাবে প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত- তারা যে-ই হোক না কেন।[২]

(৫) প্রমাণ ও সাক্ষ্যভিত্তিক বিচারব্যবস্থা

ইসলামী বিচারব্যবস্থায় অধিকার প্রমাণের পদ্ধতি দু’টি। যথা:

>> সাক্ষীর সাক্ষ্য : অধিকার প্রমাণের জন্য এমন দুইজন গ্রহণযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রয়োজন, যাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারীর সাক্ষ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে দু’জন সাক্ষী গ্রহণ কর। আর যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায়, তবে একজন পুরুষ ও দু’জন নারীÑ যাদের তোমরা সাক্ষী হিসাবে গ্রহণযোগ্য মনে করÑ যাতে তাদের একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৮২)। তবে এটি সেই সব মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যেগুলো সম্মান ও সম্ভ্রম (ইজ্জত-আব্রু) সংক্রান্ত, কারণ সেসব ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। ইবনু আবী মুলাইকা (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত যে, দু’জন মহিলা একটি ঘর কিংবা একটি কক্ষে সেলাই করছিল। হাতের তালুতে সুই বিদ্ধ হয়ে তাদের একজন বেরিয়ে পড়ল এবং অপরজনের বিরুদ্ধে সুই ফুটিয়ে দেয়ার অভিযোগ করল। এই ব্যাপারটি ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর নিকট পেশ করা হলে তিনি বললেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যদি শুধু দাবীর উপর ভিত্তি করে মানুষের দাবী পূরণ করা হয়, তাহলে তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা থাকবে না। সুতরাং তোমরা বিবাদীদের আল্লাহর নামে শপথ করাও এবং এ আয়াত তার সম্মুখে পাঠ কর। এরপর তারা তাকে শপথ করাল এবং সে নিজ দোষ স্বীকার করল। ইবনু ‘আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, বাদীর উপর প্রমাণ পেশ করা আবশ্যক, আর অস্বীকারকারীর উপর শপথ’।[৩]

>> লিখিত দলীলপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ : লিখিত নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ, যেগুলো বিচারক প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করে সঠিক রায়ে পৌঁছানÑ এগুলোও অধিকার প্রমাণের অন্যতম উপায়।

(৬) শাস্তি ও দণ্ডবিধির ব্যস্তবায়ন

ইসলামী শাস্তি (হুদুদ, ক্বিছাছ, তা‘যীর) প্রতিশোধ নয়, বরং সমাজে ন্যায় ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীর অধিকার সংরক্ষণ ও মানবসমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ক্বিছাছ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ক্বিছাছের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৭৯)‌।

হদ্দ (حدّ) হচ্ছে সেই অপরাধ যার শাস্তি আল্লাহ কতৃক দুনিয়াতেই নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়। তবে সাধারণভাবে তা তা‘যীর (অর্থাৎ শাসক নির্দেশিত শাস্তি) যোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে। হত্যা যোগ্য পাপ যেমন কোন বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করলে তার শাস্তি রজম বা মৃত্যুদণ্ড।[৪] কোন অবিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করলে তার শাস্তি একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন।[৫] যারা মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী, যারা আল্লাহদ্রোহী বা ইসলাম বিদ্বেষী তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।[৬] কিন্তু ইসলামী শাসকের অনুমতি ব্যতীত কোন পাপের শাস্তি স্বরূপ কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ। যেমন সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি সহ অন্যান্য আলিমগণ বলেন, ‘হদ্দ (মৃত্যুদণ্ড, সাজা, শাস্তি) প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি মুসলিম ইমাম, সুলতান, শাসক অথবা তার স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিনিধির উপর নির্ভরশীল। সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তির বাতাবরণ অপ্রতিহত রাখার জন্য মুসলিম শাসক ও তাঁর প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য কারোর জন্য ‘হদ্দ’ ক্বায়িম করা অনুমোদিত নয়। কোন মুসলিম ব্যক্তি বা সমাজের জন্য হদ্দ ক্বায়িম করা জায়েয নয়। কারণ, এর ফলে যে বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ, অস্থিরতা, অরাজকতা, নৈরাজ্য ও অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তি বা সমাজের নেয়।[৭]

উপরিউক্ত গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী মুসলিম শাসকের নির্দেশে হত্যা করা অনুমোদিত। কিন্তু ইসলামী শাসকের অনুমতি ব্যতীত কোন পাপের শাস্তি স্বরূপ কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ।[৮] যদি রাষ্ট্রের সরকার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বিলম্ব করে তাহলে মুসলিম জনগণ ন্যায়সঙ্গতভাবে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে। আর যদি রাষ্ট্রপক্ষ তাদের শাস্তির বিষয়ে গড়িমসি করে তাহলে ন্যায়ানুগভাবে সরকারকে একাজে বাধ্য করতে পারে। আর এ গুরু দায়িত্ব পালন করবেন সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগণ। আর এটাই মূলত ঈমানের দাবী। কিন্তু কোনভাবেই আইন হাতে তুলে নেয়া যাবে না, সরকারী বা জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করা যাবে না। যেহেতু আমাদের দেশে ইসলামী শাসক নেই তাই ব্যক্তিগতভাবে বা সামাজিকভাবে হদ্দ (অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড, সাজা, শাস্তি) প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভবপর নয়। এক্ষেত্রে গুনাহগার ব্যক্তি দুনিয়াবী তুচ্ছ শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেলেও কিন্তু পরকালের ভয়াবহ শাস্তি থেকে তাওবা ব্যতীত রক্ষা পাবে না।

(৭) আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনে শূরা বা পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের কার্যাবলি পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়’ (সূরা আশ-শূরা : ৩৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তুমি তাদের সাথে পরামর্শ কর’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)।

শূরা হল- ‘দেশ ও জাতির জন্য একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, দায়িত্ব পালনে কার্যকর ও আন্তরিক অংশগ্রহণ, সুশৃঙ্খল আচরণ, নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনশীলতা, স্বাধীনতা, ন্যায় ও সমতার নিশ্চয়তা, সুস্পষ্ট পথ ও সঠিক দিশা; যাতে উম্মাহর উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধিত হয় এবং সঠিক দ্বীনের প্রতিষ্ঠা ঘটে। এটি কেবল অপ্রয়োজনীয় ও নিরর্থক মতবিনিময় বা উপদেশ প্রদান নয়, বরং এই সামষ্টিক শূরা কাঠামো নির্মাণের নিয়মাবলি প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রগঠনের দৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর, যার উপর রাষ্ট্রের সত্তা দাঁড়িয়ে থাকে। এর নির্দেশনায় স্বার্থসমূহ সুসংগঠিত হয়, কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়, ন্যায়, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, কল্যাণ ও শক্তির নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত হয়’।[৯]

রাসূল (ﷺ) যিনি নিষ্পাপ ও অহীর নির্দেশনায় পরিচালিত ছিলেন। তিনিও যেসব বিষয়ে শারঈ দলীল ছিল না, সেসব বিষয়ে ছাহাবায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশিদীনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। খুলাফায়ে রাশিদীনের শাসনামলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শূরার বাস্তব প্রয়োগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হল-

(ক) শাসনভার গ্রহণ

খিলাফতে রাশিদার শাসনব্যবস্থা পরামর্শের ভিত্তিতেই ক্ষমতা গ্রহণের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই নীতি শাসনের প্রতিটি পর্যায়ে বিদ্যমান ছিল। আবূ বকর ছিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাজির ও আনছার ছাহাবীগণের মতামত তাঁর পক্ষে স্থির হয়।[১০] এ প্রক্রিয়া দু’টি বাই‘আতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল- প্রথমটি ছিল সাক্বীফায় উপস্থিত বিশিষ্ট আনছার ও মুহাজির ছাহাবীদের বিশেষ বাই‘আত, দ্বিতীয়টি ছিল মসজিদে সাধারণ মানুষের সমাবেশে সর্বসাধারণের বাই‘আত।[১১] আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন নিজের ইন্তেকাল ঘনিয়ে আসা অনুভব করলেন, তখন তিনি বিশিষ্ট ছাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে এবং মুসলিম জনমতের সমর্থন দেখে উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসাবে মনোনীত করেন। এরপর তিনি উছমান ইবনু আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে সেই অঙ্গীকারনামা লিখে দিতে নির্দেশ দেন।[১২]

উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতও দুই পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছিল- প্রথমতঃ উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মনোনীত ছয়জনের মধ্য থেকে তাঁকে নির্বাচন করা হয়। দ্বিতীয়তঃ মাদীনাবাসী ছাহাবীদের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শের পর জনগণের বাই‘আতের মাধ্যমে তিনি খলীফা হন।[১৩] আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ক্ষেত্রেও অধিকাংশ মুসলিম তাঁর হাতে বাই‘আত করেন। অল্প কিছু লোক উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হত্যাকারীদের ক্বিছাছের বিষয়ে মতভেদের কারণে বিরোধিতা করলেও তাঁর খিলাফতের বৈধতা নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল না।[১৪] শাসন বৈধ হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের বাই‘আতের মাধ্যমে, সকলের বাই‘আত শর্ত নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। ইমাম গাযযালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক যুগের গণ্যমান্য অধিকাংশ মানুষের সমর্থন ছাড়া শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না’।[১৫] শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইমাম হয়েছিলেন ছাহাবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠের বাই‘আতের মাধ্যমে, যারা ছিলেন ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারী। সা‘দ ইবনু উবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিরত থাকা এতে ক্ষতিকর হয়নি, কারণ ইমামতের উদ্দেশ্য হল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, যার মাধ্যমে ইমামতের কল্যাণ সাধিত হয়, আর তা সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতিতে অর্জিত হয়েছিল।[১৬]

শূরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, জনগণকে শাসনে অংশগ্রহণ ও শাসকের জবাবদিহিতায় সম্পৃক্ত করে এবং উম্মাহর কল্যাণ ও নিরাপত্তা রক্ষা করে। আবূ বকর ছিদ্দীক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ নীতির ভিত্তি সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করেন। খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল, ‘আমি সঠিক কাজ করলে আমাকে সাহায্য করবে, আর ভুল করলে আমাকে সংশোধন করবে’।[১৭] এরপর হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছেও তাঁর পিতার অনুগত আমীর ও সাধারণ মানুষ বাই‘আত নেন। পরে তিনি ৪১ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে শাসনভার অর্পণ করেন। এভাবে দেখা যায় যে, শূরার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরই ছিল খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগের বৈশিষ্ট্য।

(খ) রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে শূরার কার্যকারিতা প্রয়োগ করা

খুলাফায়ে রাশিদীন কুরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি নির্দেশ না থাকা রাষ্ট্রের সকল বিষয়ে শূরার উপর নির্ভর করতেন আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত বাণী অনুসরণ করেÑ ‘আর তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়’ (সূরা আশ-শূরা : ৩৮)। এই নীতিতে তারা পরবর্তী বহু শতাব্দীর যুগের চেয়েও অগ্রগামী ছিলেন। কারণ শূরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনে, জনগণকে শাসনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, শাসকের উপর নজরদারি নিশ্চিত করে এবং উম্মাহর স্বার্থ সংরক্ষণ করে। সেই কারণে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জনগণকে পরামর্শ ও সমালোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।[১৮] তিনি এমন বিষয়ে, যার ব্যাপারে কুরআন বা সুন্নাহতে স্পষ্ট নির্দেশ নেই, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও আলিমদের একত্র করতেন এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।[১৯]

উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ও রাষ্ট্রের সব বিষয়ে একই নীতি অনুসরণ করতেন। তিনি গভর্নর ও সামরিক নেতাদের নির্দেশ দিতেন যেন তারা ছাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি আবূ উবাইদাহ আস-সাক্বাফীকে বলেছিলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর ছাহাবীদের কথা শুনবে, তাদেরকে পরামর্শে শরিক করবে এবং বিষয় পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবে না’।[২০] এমনকি তিনি নারীদের সঙ্গেও পরামর্শ করতেন, এটিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।[২১]

উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যায়। তিনি কুরআনের একক মুছহাফে সংকলনের বিষয়ে ছাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘হে লোকসকল! তোমরা উছমান সম্পর্কে বাড়াবাড়ি কর না এবং কুরআনের কপিসমূহ সংকলন ও পোড়ানোর ব্যাপারে তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া কিছু বলো না। আল্লাহর কসম! তিনি যা করেছেন, তা আমাদের সবার পরামর্শেই করেছেন’।[২২] এমনকি কঠিন অবরোধের সময়ও তিনি পরামর্শ ত্যাগ করেননি। যখন অবরোধ তীব্র হয়, তখন তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডেকে তাঁদের দাবির বিষয়ে মতামত চান। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যে খিলাফতের পোশাক পরিয়েছেন, তা তুমি তাদের চাপে খুলে ফেলো না’।[২৩] তিনি এ পরামর্শ মেনে শেষ পর্যন্ত ধৈর্যসহকারে শাহাদতবরণ করেন।

আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ও পূর্বসূরীদের নীতি অনুসরণ করেন। তিনি বিশিষ্ট ছাহাবীদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করতেন। এমনকি তিনি যুবাইর ও তালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে তাঁর কাছে রাখতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা আমার কাছে থাকবে, যাতে আমি তোমাদের সান্নিধ্যে স্বস্তি পাই’।[২৪]

(৮) জবাবদিহিতা ও জনঅধিকার

শাসক জনগণের সেবক ও আমানতদার। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’।[২৫] ইসলামী রাষ্ট্রে মুহাসিবার প্রধান দিকগুলো হল-

>> আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা : চূড়ান্ত জবাবদিহিতা হল আল্লাহর কাছে, যা ঈমান ও পরকালের বিশ্বাসের সাথে সরাসরি যুক্ত।

>> জনগণের কাছে জবাবদিহিতা : রাষ্ট্রের শাসক ও কর্মচারীরা তাদের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। জনগণের অধিকার রক্ষা, সম্পদের ন্যায়বণ্টন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধÑএসব ইসলামী রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

(৯) রাজনৈতিক স্বাধীনতার নীতি

স্বাধীনতা এমন একটি ধারণা, যার নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খল রূপদানে ইসলামের সুস্পষ্ট অবদান রয়েছে। বলা হয়েছে- ‘যেমন উম্মাহর অধিকার আছে ইমাম (শাসক) নির্বাচন করার, তার সাথে মতামত বিনিময় করার এবং প্রয়োজনে তাকে অপসারণ করার, তেমনি তার সমালোচনা করা, উপদেশ দেয়া এবং তার নীতির বিরোধিতা করার অধিকারও তাদের রয়েছে। সুতরাং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ইসলামী রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম ভিত্তি, যা অবতীর্ণ দ্বীনের শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত প্রতিফলিত হয়েছে নবী (ﷺ)-এর জীবন ও খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগে। কুরআনের ভাষায়, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৫৬)। ইসলাম ধর্ম এই নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করেছেÑ যাতে স্বাধীনতার সকল দিক নিশ্চিত হয়’।[২৬]

(১০) শান্তি-শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা (নিয়াম)

খুলাফায়ে রাশিদীন প্রশাসনিকভাবে অঞ্চলসমূহকে সুসংগঠিত করেন। তাঁরা গভর্নর (ওয়ালী) নিয়োগ করতেন যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, তাক্বওয়া ও পরহেযগারিতার ভিত্তিতে। যখন উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আবূ উবাইদাহ ও আমির ইবনুল জাররাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখন তাঁর দুনিয়াবিমুখতা দেখে বলেন, ‘আমার ছাহাবীদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে দুনিয়া থেকে কিছু পায়নি বা দুনিয়া তার থেকে কিছু নেয়নিÑতুমি ছাড়া’।[২৭] উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর এক ভাষণে গভর্নরদের দায়িত্ব নির্ধারণ করে বলেন, ‘হে মানুষ! আমি আমার কর্মচারীদের তোমাদের উপর ন্যায়ের ভিত্তিতে শাসক হিসাবে পাঠিয়েছি। তাদেরকে তোমাদের চামড়া, রক্ত বা সম্পদ ভোগ করার জন্য নিয়োগ করিনি; বরং তাদেরকে পাঠিয়েছি যেন তারা তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীনের বিষয়ে ও ছহীহ সুন্নাহর শিক্ষা দেয়’।[২৮]

গভর্নরদের প্রচেষ্টায় বহু নগর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে উন্নতি ও সমৃদ্ধির কারণে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তারা উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, সেতু নির্মাণ করেন, খাল-নদী খনন করেন এবং যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলেন। প্রকৃতপক্ষে তারা মানবসমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম উদ্দেশ্য।[২৯]

(১১) নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা

খুলাফায়ে রাশিদীন রাষ্ট্র পরিচালনায় সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নীতিকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করেছিলেন। এ বিষয়ে আলোচনা বিস্তৃত; তবে এখানে আমরা নিরাপত্তার একটি বিশেষ দিক, ‘চিন্তাগত নিরাপত্তা’ (বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাপত্তা)- নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।

আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে ইসলামের রিসালাতের মাধ্যমে কুফর ও ভ্রান্ত চিন্তার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়েছেন। মানুষের দ্বীন ও চিন্তাকে সংরক্ষণের জন্য বহু বিধান ও আইন প্রণয়ন করেছেন। খুলাফায়ে রাশিদীনরা নবী (ﷺ)-এর আদর্শ অনুসরণ করে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য দূত পাঠিয়েছেন, শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক নিয়োগ করেছেন, মানুষকে ছালাতে ইমামতি ও দ্বীনের অন্যান্য বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁরা বিদ‘আত ও ভ্রান্ত মতবাদের মোকাবিলা করেছেনÑপ্রথমে ব্যাখ্যা ও স্পষ্টীকরণের মাধ্যমে, তারপর বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তির কারণ দূর করার মাধ্যমে। আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রিদ্দাহ (ধর্মত্যাগ) আন্দোলনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। এটি ছিল ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকিগুলোর একটি। তিনি কঠোরভাবে তা দমন করেন, যাতে মানুষ ইসলামী রাষ্ট্রের ছায়ায় নিজেদের জীবন, ঈমান, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।[৩০]

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সাবীগা ইবনু ‘ইসল আত-তামীমীকে নির্বাসিত করেন, কারণ সে কুরআনের মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট) আয়াত নিয়ে ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তুলছিল। তার তাওবাহ প্রকাশের পরও এক বছর পর্যন্ত মুসলিমদের তাকে বর্জন করতে নির্দেশ দেন। পরে তার তাওবাহ নিশ্চিত হলে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের অনুমতি দেন।[৩১] এ ঘটনা বিভিন্ন সনদে একাধিক ছাহাবী ও তাবিঈ থেকে বর্ণিত)।

উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) চিন্তাগত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত প্রশংসনীয় নীতি গ্রহণ করেন। কুরআনকে একক মুছহাফে সংকলন করে বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণের মাধ্যমে তিনি মুসলিম সমাজের ঐক্য সংরক্ষণ করেন এবং বিভক্তি ও মতভেদের পথ বন্ধ করেন। এ কারণে ছাহাবীগণ তাঁর প্রশংসা করেন। এমনকি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘আল্লাহর ক্বসম! যদি আমি সেই দায়িত্বে থাকতাম, যা তিনি পালন করেছেন, তবে আমিও তাঁর মতই করতাম’।[৩২]

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) লোকদেরকে সাতটি ক্বির’আতের মধ্যে একটি হরফের উপর একত্র করেছিলেন, যেগুলোতে রাসূল (ﷺ) পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেনÑ কারণ তাতে ছিল কল্যাণ। যখন ছাহাবীগণ আশঙ্কা করলেন যে, কুরআন নিয়ে উম্মাহ বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে, তখন তারা দেখলেন যে একটি হরফে একত্র করা অধিক নিরাপদ ও মতভেদ থেকে দূরে রাখবে। তাই তারা তা কার্যকর করেন এবং উম্মাহর স্বার্থে অন্য পদ্ধতিতে পাঠ করা থেকে বিরত রাখেন’।[৩৩]

উপসংহার

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতিভাত হয় যে, কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রে আইন ও বিচারব্যবস্থা হবেÑ আল্লাহর সার্বভৌমত্বভিত্তিক, ন্যায় ও সমতার উপর প্রতিষ্ঠিত, প্রমাণনির্ভর ও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মানবকল্যাণমুখী।



* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪২৫; তিরমিযী, হা/২২৬২, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৬১৩।
[২]. ইসলাম ওয়েব, ফৎওয়া নং-১৪৫২১৯।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৫২, ২৫১৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১১।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭০-৫২৭১, ৬৮২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯১।
[৫]. সুরা আন-নূর : ২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯০; আবূ দাঊদ, হা/৪৪১৫; তিরমিযী, হা/১৪৩৪।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯২২-৬৯২৩।
[৭]. ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২২শ খণ্ড, পৃ. ৫-১০; কিতাবুল উম্ম, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১৫৪; আল-কাফি ইবনে কুদামাহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৩৪; কুয়েতী ফিক্বা বিশ্বকোষ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৮০; তাফসীরে কুরতুবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৫৬; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৬৫; বাদায়ীউছ ছানাঈ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৫৭; মাওয়াহিবুল জালীল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৫৮; ই‘আনাতুত্ব ত্বালিবীন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৫৭; আল-মুগনী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৮; মাজমূঊ রাসাইল ইবনু রজব, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০৮; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনু বায, ৯ম খণ্ড, পৃ. ৩০৩; লিক্বাউল-বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৩১।
[৮]. ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৭-২২; কিতাবুল উম্ম, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১৫৪; আল-কাফি ইবনে কুদামাহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৩৪; কুয়েতী ফিক্বা বিশ্বকোষ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৮০; তাফসীরে কুরতুবী, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৫৬; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৬৫।
[৯]. ফিন নিযামিস সিয়াসী আল-ইসলামী- ফিক্বহুল আহকামিল সুলত্বানিয়্যাহ, পৃ. ৩৩৯।
[১০]. আল-ইবানাহ ‘আন উছূলিদ দিয়ানাহ, পৃ. ৬৬।
[১১]. ছহীহ বুখারী, ৯/১০০ পৃ.।
[১২]. ইবনু সা‘দ, আত্ব-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৯৯।
[১৩]. ইবনু হাজার, ফাৎহুল বারী, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ১৯৩।
[১৪]. আবূ দাঊদ, ৫/৩৬ পৃ.।
[১৫]. ফাযাইহুল বাতিনিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৭।
[১৬]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৩০।
[১৭]. তাখরীজু মুসনাদে আবী বকর, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৯; আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ লিইবনি হিশাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৬; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৮০।
[১৮]. ছহীহ বুখারী, কিতাবুল ই‘তিছাম, باب “وأمرهم شورى بينهم”, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১১৩।
[১৯]. ইবনু রজব, ফাৎহুল বারী, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ৩৪২।
[২০]. তাবারী, তারীখুল উমাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৬১।
[২১]. বাইহাক্বী, সুনানুল কুবরা, ১০ম খণ্ড, পৃ. ১১৩; আব্দুর রাযযাক, আল-মুছান্নাফ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ১৫২।
[২২]. আবূ দাঊদ, কিতাবুল মাছাহিফ, পৃ. ৯৭।
[২৩]. ইবনু শাব্বাহ, তারীখুল মদীনাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২২৬।
[২৪]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ২০৭।
[২৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৩, ২৪০৯, ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫২০০, ৭১৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮২৯; আবূ দাঊদ, হা/২৯২৮; তিরমিযী, হা/১৭০৫।
[২৬]. আল-হুর্রিয়্যাতু আও আত্ব-তূফান, পৃ. ৪৫।
[২৭]. আল-আযদি, ফুতূহুশ শাম, পৃ. ২৫৫।
[২৮]. ইবনুল জাওযী, মানাক্বিব উমার, পৃ. ৯৪।
[২৯]. তারীখুত তাবারী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৪৭-১৪৮।
[৩০]. ইবনুল আছির, আল-কামিল, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৭; ইবনে খালদুন,  আল-মুকাদ্দিমাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৮৫৯; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৮৮।
[৩১]. ইবনুল জাওযী, মানাক্বীব উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১১০।
[৩২]. ইবনে খালদূন, আল-মুকাদ্দিমাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১০১৯; ইবনে শাব্বাহ, তারীখুল মাদীনাহ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৯৯৬।
[৩৩]. ইবনুল ক্বাইয়্যিম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯।




রাজনৈতিক সংস্কার - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম
দারস-তাদরীস ও ইলমী হালাকার পুনর্জাগরণ: বাস্তবতা, সংকট ও দাওয়াতী রূপরেখা - আব্দুল হাকীম বিন আব্দুল হাফীজ
বিদ‘আতীদের ব্যাপারে সালাফীদের অবস্থান - ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন
মুসলিম নারীর সৌন্দর্য ও বিয়েতে পর্দাবিধি - মাহদী হাসান মানিক
শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম
ইসলামী রাষ্ট্রে আইন ও বিচার ব্যবস্থার স্বরূপ - হাসিবুর রহমান বুখারী
ইসলামী রাষ্ট্রে আইন ও বিচার ব্যবস্থার স্বরূপ - হাসিবুর রহমান বুখারী
কোটা নয়, মেধাই হোক প্রকৃত মূল্যায়ন - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মুসলিমদের সাহায্য করা ও তার পদ্ধতি - শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে শাসক ও জনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ধর্মীয় সংস্কারের স্বরূপ ও প্রকৃতি - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ