উত্তর : যদি প্রশ্নকারীর ‘রাজনীতি’ বলতে যদি উদ্দেশ্য হয়- রাসূল (ﷺ)-এর নেতৃত্বের যোগ্যতা, মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ক্ষমতা, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এসমস্ত গুণাবলী দান করেছেন এবং এর দ্বারা তিনি সকল রাজনীতিবিদ ও নেতার উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। কারণ আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াতের জন্য নির্বাচন করেছেন এবং রিসালাতের জন্য মনোনীত করেছেন, যাতে তিনি সমগ্র মানবজাতির নেতৃত্ব দেন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণ নিজেদের জাতিকে পরিচালনা করতেন। যেমন আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের উম্মতকে শাসন করতেন। যখন কোন একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী নেই। তবে অনেক খলীফা হবে। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ করছেন? তিনি বললেন, তোমরা একের পর এক করে তাদের বাই‘আতের হক্ব আদায় করবে। তোমাদের উপর তাদের যে হক্ব রয়েছে তা আদায় করবে। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করবেন ঐ সকল বিষয়ে যে সবের দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল (ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪২)। সুতরাং যে কেউ তাঁর অনুসরণ করে এবং তাঁর নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্ব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, সে তার নেতৃত্ব ও পরিচালনায় সফলতার অধিক নিকটবর্তী হয়। এ কারণেই যারা নেতৃত্ব ও রাজনীতি নিয়ে যারা চিন্তিত, তাদের উচিত রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করা, তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন করা এবং তাঁর নেতৃত্ব ও নীতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তিনি কল্যাণপ্রত্যাশীদের জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন. নিশ্চয় তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে’ (সূরা আল-আহযাব : ২১; ইসলাম ওয়েবসাইট, ফৎওয়া নং-৬৬২৮৪)। সুতরাং তিনি আধ্যাত্মিক নেতা হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বও দিয়েছেন। ইসলামী ঐতিহ্যে নবুওয়াত ও নেতৃত্ব তাঁর জীবনে একত্রে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
আব্দুশ শাফী মুহাম্মাদ আব্দুল লতীফ নবী (ﷺ)-এর যুগে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বলেন, ‘ইসলাম একটি দ্বীন ও রাষ্ট্র; অন্যভাবে বললে, ইসলাম একটি ঐশী আক্বীদা, যেখান থেকে শরী‘আত উদ্ভূত হয়েছে। এই শরী‘আতের নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ ও উৎকৃষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা, যা দুনিয়া ও আখিরাতে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ নিশ্চিত করে। এ সত্য অস্বীকার করে কেবল সে-ই, যে ইসলামের প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ, অথবা ইসলামবিরোধী অন্ধ পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তি, যার দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টি উভয়ই আচ্ছন্ন। ইতিহাস আমাদের এমন বহু ব্যক্তির কথা জানায়, যারা আসমানী বার্তা নিয়ে এসেছেন, আবার এমন লোকদের কথাও জানায়, যারা জাতি গড়েছেন, এবং আরও অনেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু ইতিহাস এমন একজন ব্যক্তির কথা জানায় না- যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে এসে, তারপর একটি জাতি গঠন করে, অতঃপর একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন- নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ব্যতীত। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসাবে প্রেরণ করেছি’ (সূরা সাবা : ২৮)। তিনি তাঁর রিসালাত পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন; আর যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তাঁর বার্তা পৌঁছে দিলেন না। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৬৭)। পবিত্র কুরআন যেমন নবী (ﷺ)-কে রিসালাত প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছে, তেমনি মুসলিমদের মধ্যে এই রিসালাতের নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার-ফায়সালা করার দায়িত্বও দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে আল্লাহ যা আপনাকে দেখিয়েছেন তা অনুযায়ী বিচার করতে পারেন’ (সূরা আন-নিসা : ১০৫)।
মুমিনদের ঈমানের স্বীকৃতি বাতিল হয়ে যায় যদি তারা তাদের বিষয়াবলিতে রাসূলকে বিচারক হিসাবে গ্রহণ না করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘অতএব, আপনার প্রতিপালকের ক্বসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিরোধে আপনাকে বিচারক মানবে, অতঃপর আপনার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোন সংকীর্ণতা অনুভব করবে না এবং পূর্ণ সমর্পণের সঙ্গে তা মেনে নেবে’ (সূরা আন-নিসা : ৬৫)। এই ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, ইসলামী শরী‘আতের ভিত্তিতে যার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে- এমন একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল রাসূল (ﷺ)-এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। হিজরতের পরপরই মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন মুসলিমদের নেতা ও ইমাম, তিনি তাদের মাঝে শরী‘আত বাস্তবায়ন করতেন, তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতেন এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করতেন। এছাড়াও তিনি অন্যান্য জাতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও নির্ধারণ করতেন সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে। মুসলিম উম্মাহর অন্য জাতিসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক যে নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত, তা সর্বজনীন নীতিমালা। কারণ ইসলামী রাষ্ট্রের চরিত্রই হল ইসলামী দাওয়াতের মত একটি সর্বজনীন মানবিক চরিত্র- যা কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা এভাবে নির্ধারণ করেছেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৫৮)। অতএব, ইসলামী দাওয়াত সমগ্র মানবজাতির জন্য। সেই কারণে ইসলামে রাষ্ট্রের ধারণাও একটি বিশ্বজনীন ধারণা এবং এর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতিমালাও সর্বজনীন (ড. মুহাম্মাদ আল-বাহী, আদ-দ্বীন ওয়াদ-দাওলা ফী তাওযীহিল কুরআনিল কারীম, পৃ. ৪৯০)।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ধর্মের ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নীতিমালা ও লক্ষ্য ছিল বিশ্বজনীন এবং যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসমানী আক্বীদা ও শরী‘আতের ভিত্তিতে (হাসান খালিদ, আশ-শাহীদ ফিল ইসলাম, পৃ. ৩৩)।
প্রশ্নকারী : সামিঊল, কুলপাড়া, রাজশাহী।