উত্তর : রাসূল (ﷺ)-এর শাসনব্যবস্থা থেকে যে সমস্ত মৌলিক মূলনীতি পাওয়া যায়, তার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল, (১) শরী‘আতের সার্বভৌমত্ব : কুরআন ও সুন্নাহই আইন প্রণয়নের উৎস এবং শাসন সংবিধান, যার কাছে বিচার-ফায়সালা গ্রহণ করতে হবে। এই সংবিধানের অধীনে শাসক ও শাসিত সবাই সমানভাবে বাধ্য, কোন ব্যতিক্রম নেই (আল-হুর্রিয়্যাতু আও আত্ব-তুফান, পৃ. ৬২)। আইন প্রণয়নের পূর্ণ অধিকার কেবল আল্লাহর। নিঃশর্ত আনুগত্য পাওয়ার অধিকারও তাঁরই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয় হুকুম কেবল আল্লাহরই; তিনি আদেশ করেছেন যে তোমরা তাঁকেই ইবাদত কর’ (সূরা ইউসুফ : ৪০)। সুতরাং আল্লাহ্র শাসনাধিকারের একত্বে বিশ্বাস করা হলো তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যে তাওহীদের ভিত্তি। আয়াতে উল্লেখিত ‘আদেশ’ (أمر) শব্দটি ‘হুকুম’-এর একটি অংশ ও ধরন। যেহেতু শাসনাধিকার আল্লাহরই এবং এটি তাঁর এমন অধিকার, যাতে কেউ শরীক হতে পারে না- তাই তিনি আদেশ করেছেন, কেবল তাঁরই ইবাদত করতে। আল্লাহর বিধান ছাড়া তাওহীদ ও শিরক, আনুগত্য ও অবাধ্যতা, ঈমান ও কুফরের পার্থক্য নির্ণয় করা যায় না। যে ব্যক্তি এই মহান ঈমানী মূলনীতি অর্থাৎ আল্লাহর একচ্ছত্র শাসনাধিকারে বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে না, তার ইবাদত ও আনুগত্যে তাওহীদও শুদ্ধ হয় না। কারণ ইবাদত ও আনুগত্য কেবল আল্লাহর বিধান ও শরী‘আতের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। আল্লাহর হুকুম মান্য করার উপায় হল- এ কথা স্বীকার ও বিশ্বাস করা যে, আইন প্রণয়ন, বিধান ও আদেশের অধিকার একমাত্র তাঁরই, যেমন সৃষ্টির অধিকারও তাঁরই। ‘জেনে রাখো, সৃষ্টি ও আদেশ তাঁরই’। (সূরা আল-আ‘রাফ : ৫৪; আল-হুর্রিয়্যাতু আও আত্ব-তুফান, পৃ. ৬৩)। এ কথাও উল্লেখ করা আবশ্যক যে, ‘শরী‘আতের সার্বভৌমত্বের নীতি সরকারকে প্রশাসনিক বিধি-বিধান প্রণয়নের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। কারণ শারঈ দলীলগুলো সীমিত, কিন্তু ঘটনা অসীম; মানুষের জীবন বিভিন্ন ধরনের নিয়ম-শৃঙ্খলা দাবি করে। যেমন বিদেশ ভ্রমণ, যানবাহন চলাচল, পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব, শিকার, চাকরী ইত্যাদি জীবনের নানা বিষয়ে শৃঙ্খলা প্রয়োজন, যাতে বিশৃঙ্খলা ও অপব্যবহার রোধ করা যায়। তাই সরকারের অধিকার আছে প্রয়োজনীয় নিয়ম প্রণয়নের- শর্ত একটাই, তা যেন কোন শারঈ দলীলের বিরোধী না হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সৈন্যবাহিনীর জন্য ‘দিওয়ান’ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা আগে প্রচলিত ছিল না। তেমনি কিছু খলীফা মুদ্রা প্রবর্তনসহ অন্যান্য প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন’ (আন-নিযামুস সিয়াসী ফিল ইসলাম, পৃ. ১৬)।
(২) ন্যায়নীতির (আদল ওয়া ইনছাফ) মূলনীতি : এটি আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশ এবং শাসনের একটি মৌলিক দাবি, বরং রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও স্থায়িত্বের প্রধান ভিত্তি। ন্যায়বিচার হারিয়ে গেলে রাষ্ট্রের আর কোন অর্থ থাকে না। আর যদি শাসক নিজেই অত্যাচারী হয়ে ওঠে, তবে তার শাসনের সমাপ্তি ঘোষণা করাই যথাযথ। বিচারে ন্যায়পরায়ণতা এবং বণ্টনে সমতা ইসলামী রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বহু আয়াতে এই নীতিকে জোরালোভাবে নিশ্চিত করেছে, যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘কোন সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার করতে বিরত না রাখে; ন্যায়বিচার করো, এটিই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮; আল-হুর্রিয়্যাতু আও আত্ব-তুফান, পৃ. ৭৪)। আরও বলা হয়েছে, ‘শরী‘আত সামগ্রিকভাবে ও সার্বিকভাবে প্রত্যেক কল্যাণ, ন্যায় ও মঙ্গলের নির্দেশ দেয় এবং প্রত্যেক অনাচার, যুল্ম ও অকল্যাণ থেকে নিষেধ করে। অতএব, রাজনীতি যদি এই দিকেই অগ্রসর হয়, তবে তা শারঈ রাজনীতি, আর যে কোন পদক্ষেপ যদি এই নীতি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তবে তা শারঈ কাজ হিসাবে গণ্য হবে’ (মাক্বাছিদুল মাক্বাছিদি, পৃ. ১৩৪)। (৩) শূরা (পরামর্শ) নীতি : আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের কার্যাবলি পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়’ (সূরা আশ-শূরা : ৩৮)।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তুমি তাদের সাথে পরামর্শ কর’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)। শূরা হল- ‘দেশ ও জাতির জন্য একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, দায়িত্ব পালনে কার্যকর ও আন্তরিক অংশগ্রহণ, সুশৃঙ্খল আচরণ এবং স্বাধীনতা, ন্যায় ও সমতার নিশ্চয়তা, সুস্পষ্ট পথ ও সঠিক দিশায় যাতে উম্মাহ্র উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধিত হয় এবং প্রকৃত দ্বীনের প্রতিষ্ঠার পরামর্শ নীতি। এটি কেবল অপ্রয়োজনীয় ও নিরর্থক মতবিনিময় বা উপদেশ প্রদান নয়, বরং এই সামষ্টিক শূরা কাঠামো রাষ্ট্রগঠনের দৃঢ় ভিত্তি, যার ওপর রাষ্ট্রের সত্তা দাঁড়িয়ে থাকে। এর নির্দেশনায় স্বার্থসমূহ সুসংগঠিত হয়, কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয় এবং ন্যায়, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, কল্যাণ ও শক্তির নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত হয়’ (ফিন নিযামিস সিয়াসী আল-ইসলামী- ফিক্বহুল আহকামিল সুলত্বানিয়্যাহ, পৃ. ৩৩৯)। রাসূল (ﷺ) যিনি নিষ্পাপ ও অহীর নির্দেশনায় পরিচালিত ছিলেন- তিনিও যেসব বিষয়ে শারঈ দলীল ছিল না, সেসব বিষয়ে ছাহাবায়ে কিরামের সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশিদীনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। সুতরাং শূরা ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম ভিত্তি ও বৈশিষ্ট্য।
(৪) রাজনৈতিক স্বাধীনতার নীতি : স্বাধীনতা এমন একটি ধারণা, যাকে নিয়ন্ত্রণ করার নীতি ইসলামে সুস্পষ্টভাবেই রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘যেমন উম্মাহর অধিকার আছে শাসক নির্বাচন করার, তার সাথে মতামত বিনিময় করার এবং প্রয়োজনে তাকে অপসারণ করার, তেমনি তার সমালোচনা করা, উপদেশ দেয়া এবং তার নীতির বিরোধিতা করারও অধিকার তাদের রয়েছে। সুতরাং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ইসলামী রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি। রাজনৈতিক স্বাধীনতার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত প্রতিফলিত হয়েছে নবী (ﷺ)-এর জীবন ও খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগে। কুরআনের ভাষায়, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই’ (সূরা আল-বাক্বারা : ২৫৬)। ইসলাম ধর্ম এই নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করেছে- যাতে স্বাধীনতার সকল দিক নিশ্চিত হয়’ (আল-হুর্রিয়্যাতু আও আত্ব-তূফান, পৃ. ৪৫)। (৫) সমতার নীতি : মানবজাতির মূল একক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাক্বওয়াবান’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১৩)। মানুষ চিরুনির দাঁতের মত সমান। তাই বিচারালয়ের সামনে সকল মানুষ সমান। ইসলাম তাদের সম্পদের অধিকার সংরক্ষণ করেছে এবং তাদের রক্তপণ সমান নির্ধারণ করেছে। অতএব ন্যায়বিচারই সমতা নিশ্চিত করে, বরং সেটিই সমতার শর্ত। ন্যায়বিচার ছাড়া প্রকৃত সমতা সম্ভব নয় (আন-নিযামুস সিয়াসী ফিল ইসলাম, পৃ. ২০৭)।
প্রশ্নকারী : তারেক, বায়া, রাজশাহী।