উত্তর : গণতন্ত্র ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক একটি তন্ত্র। এই তন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জনগণের হাতে বা তাদের নিযুক্ত প্রতিনিধি (সংসদ সদস্য)-এর হাতে অর্পণ করা হয়। ফলে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যায়। তাই এ তন্ত্রের মাধ্যমে গাইরুল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ তন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের সকলে একমত হওয়ার দরকার নেই। বরং অধিকাংশ সদস্য একমত হওয়ার মাধ্যমে এমন সব আইন জারী করা হয়, যেসব আইন জনগণ মেনে চলতে বাধ্য, যদিও এই আইন মানব প্রকৃতি, ধর্ম, বিবেক ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবুও। উদাহরণস্বরূপ এই তন্ত্রের অধীনে গর্ভপাত করা, সমকামিতা, সূদী মুনাফার বিধান ইত্যাদি জারী করা হয়েছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়েছে। ব্যভিচার ও মদ্যপানকে বৈধ করা হয়েছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে জানিয়েছেন, ‘হুকুম বা শাসনের মালিক একমাত্র তিনি এবং তিনিই হচ্ছেন- উত্তম হুকুমদাতা বা শাসক’ (সূরা আল-মুমিন : ১৩)। পক্ষান্তরে অন্যকে তাঁর শাসনে অংশীদার করা থেকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান দেয়ার অধিকার নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (সূরা ইউসুফ : ৪০)।
পক্ষান্তরে ইসলামী ব্যবস্থায় শূরা শরী‘আতের সার্বভৌমত্ব দ্বারা সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের কার্যাবলি পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়’ (সূরা আশ-শূরা : ৩৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তুমি তাদের সাথে পরামর্শ কর’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)। শূরা হল- ‘দেশ ও জাতির জন্য একটি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, দায়িত্ব পালনে কার্যকর ও আন্তরিক অংশগ্রহণ, সুশৃঙ্খল আচরণ, স্বাধীনতা, ন্যায় ও সমতার নিশ্চয়তা, সুস্পষ্ট পথ ও সঠিক দিশায় যাতে উম্মাহর উন্নতি ও সমৃদ্ধি সাধিত হয় এবং সঠিক দ্বীনের প্রতিষ্ঠা পরামর্শ নীতি। এটি কেবল অপ্রয়োজনীয় ও নিরর্থক মতবিনিময় বা উপদেশ প্রদান নয়, বরং এই সামষ্টিক শূরা কাঠামো রাষ্ট্রগঠনের দৃঢ় ভিত্তি, যার ওপর রাষ্ট্রের সত্তা দাঁড়িয়ে থাকে। (ফিন নিযামিস সিয়াসী আল-ইসলামী- ফিক্বহুল আহকামিল সুলত্বানিয়্যাহ, পৃ. ৩৩৯)। তাই রাসূল (ﷺ) যিনি নিষ্পাপ ও অহীর নির্দেশনায় পরিচালিত ছিলেন- তিনিও যেসব বিষয়ে শারঈ দলীল ছিল না, সেসব বিষয়ে ছাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশিদীনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। এই নীতি শাসনের প্রতিটি পর্যায়ে বিদ্যমান ছিল। আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাজির ও আনছার ছাহাবীগণের মতামত তাঁর পক্ষে স্থির হয় (আল-ইবানাহ ‘আন উছূলিদ দিয়ানাহ, পৃ. ৬৬ পৃ.)। আবূবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন নিজের ইন্তেকাল ঘনিয়ে আসা অনুভব করলেন, তখন তিনি বিশিষ্ট ছাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে এবং মুসলিম জনমতের সমর্থন দেখে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসাবে মনোনীত করেন। এরপর তিনি উছমান ইবনে আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে সেই অঙ্গীকারনামা লিখে দিতে নির্দেশ দেন (ইবনু সা‘দ, আত্ব-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা, ৩/১৯৯ পৃ.)।
উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতও দুই পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছিল- প্রথমতঃ উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মনোনীত ছয়জনের মধ্য থেকে তাঁকে নির্বাচন করা হয়, দ্বিতীয়তঃ মদীনাবাসী ছাহাবীদের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শের পর জনগণের বাই‘আতের মাধ্যমে তিনি খলীফা হন (ইবনে হাজর, ফাৎহুল বারী, ১৩/১৯৩ পৃ.)। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ইমাম হয়েছিলেন ছাহাবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠের বাই‘আতের মাধ্যমে, যারা ছিলেন ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারী। সা‘দ ইবনু উবাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বিরত থাকা এতে ক্ষতিকর হয়নি, কারণ ইমামতের উদ্দেশ্য হল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, যার মাধ্যমে ইমামতের কল্যাণ সাধিত হয়, আর তা সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতিতে অর্জিত হয়েছিল’ (মিনহাজুস সুন্নাহ, ১/৫৩০ পৃ.)। শূরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, জনগণকে শাসনে অংশগ্রহণ ও শাসকের জবাবদিহিতায় সম্পৃক্ত করে এবং উম্মাহর কল্যাণ ও নিরাপত্তা রক্ষা করে। আবূ বকর ছিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ নীতির ভিত্তি সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করেন। খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল : ‘আমি সঠিক কাজ করলে আমাকে সাহায্য করবে, আর ভুল করলে আমাকে সংশোধন করবে’ (তাখরীজু মুসনাদে আবী বকর ১/১৫৯; আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ইবনু হিশাম, ৪/৬৬; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৫/২৮০ পৃ.)।
রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে শূরার কার্যকারিতা প্রয়োগ করা হয়েছিল। খুলাফায়ে রাশিদীন (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) কুরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি নির্দেশ না থাকা রাষ্ট্রের সকল বিষয়ে শূরার উপর নির্ভর করতেন আল্লাহ তা‘আলার বাণী অনুসরণ করে, ‘আর তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়’ (সূরা আশ-শূরা : ৩৮)। সেই কারণে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জনগণকে পরামর্শ ও সমালোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, কিতাবুল ই‘তিছাম, باب “وأمرهم شورى بينهم” ৯/১১৩ পৃ.)। তিনি এমন বিষয়ে, যার ব্যাপারে কুরআন বা সুন্নাহতে স্পষ্ট নির্দেশ নেই, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও আলিমদের একত্র করতেন এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন (ইবনু রজব, ফাৎহুল বারী, ১৩/৩৪২ পৃ.)। উমার ফারুক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ও রাষ্ট্রের সব বিষয়ে একই নীতি অনুসরণ করতেন। তিনি গভর্নর ও সামরিক নেতাদের নির্দেশ দিতেন যেন তারা ছাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি আবূ উবাইদাহ সাক্বাফীকে বলেছিলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর ছাহাবীদের কথা শুনবে, তাদেরকে পরামর্শে শরিক করবে এবং বিষয় পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবে না’ (তাবারী, তারীখুল উমাম, ২/৩৬১ পৃ.)। এমনকি তিনি নারীদের সঙ্গেও পরামর্শ করতেন, এটিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত (বাইহাক্বী, আস-সুনান, ১০/১১৩ পৃ. আব্দুর রাযযাক, আল-মুছান্নাফ, ৭/১৫২ পৃ.)।
প্রশ্নকারী : মেসবাহুল ইসলাম, উত্তরা, ঢাকা।