উত্তর : যদি কোন মহিলা বিবাহের পূর্বেই গর্ভবতী হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে গর্ভস্থ সন্তান প্রসবের পূর্বে অন্য কোথাও তার বিবাহ দেয়া বৈধ নয়। বরং গর্ভবতী অবস্থায় মহিলার বিবাহ হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২০/৪৮৬-৪৮৭ পৃ.; সূরা আত-ত্বালাক্ব : ৪; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৮/২৪৬ পৃ.)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لَا تُوْطَأُ حَامِلٌ حَتَّى تَضَعَ ‘সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত গর্ভবতীর সাথে যৌনসঙ্গম করা যাবে না’ (আবূ দাঊদ, হা/২১৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১২২৮, ১১৫৯৬, ১১৮২৩, সনদ ছহীহ)। অন্যত্র রাসূল (ﷺ) বলেন,
لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَسْقِيَ مَاءَهُ زَرْعَ غَيْرِهِ. يَعْنِي: إِتْيَانَ الْحَبَالَى
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, তার জন্য অন্যের ফসলে নিজের পানি সিঞ্চন করা বৈধ নয়। অর্থাৎ গর্ভবতী মহিলার সাথে যৌনসঙ্গম করা বৈধ নয়’ (আবূ দাঊদ, হা/২১৫৮; তিরমিযী, হা/১১৩১; আহমাদ, হা/১৬৯৯০, সনদ হাসান)। শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমরা আল্লাহ তা‘আলার নিকট এই মহাপাপের শাস্তি ও আযাব থেকে পরিত্রাণ চাই, যেহেতু সে বৈধ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বেই গর্ভবতী হয়েছে, তাই এটি স্পষ্ট ব্যভিচার। শরী‘আত মোতাবেক তার উপর ব্যভিচারের ‘হদ্দ’ (দণ্ডবিধি) প্রয়োগ করা অপরিহার্য। যদি সে বিবাহিত হয় তাহলে তাকে ‘রাজম’ বা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে। পক্ষান্তরে যদি সে অবিবাহিত হয় তাহলে একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন। তার এই বিষয়টি স্থানীয় কাযী বা বিচারকের নিকট উপস্থাপন করতে হবে এবং তিনিই পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২১/৪৫-৪৬ পৃ.)।
দ্বিতীয়তঃ হাম্বালী মাযহাবের আলেমগণ ও ইমাম ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, তাওবাহ করার পূর্বে ব্যভিচারিণী মহিলার বিবাহ দেয়া হারাম। তা সে ব্যভিচারীর সঙ্গে হোক কিংবা অন্য কারোর সঙ্গে হোক। সালাফে ছালিহীনের এ কথাই বলেছেন। যেমন আবূ বাকর ছিদ্দীক্ব, উমার ফারুক, ইবনু উমার, ইবনু আব্বাস, জাবীর, ইবনু মাসঊদ, বারাআ বিন আযীব, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহুম), ক্বাতাদাহ্, ইসহাক্ব, আবু উবাইদ (রাহিমাহুমুল্লাহ) সহ অন্যান্য বিদ্বানগণ (কাশশাফুল ক্বিনা’, ৫/৮২; আল-ইনছাফ, ৮/৯৯; আল-মুগনী, ৭/১৪১; আল-মুহাল্লা, ৯/৬৩ পৃ.)।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তাওবাহ করার পূর্বে ব্যভিচারিণী মহিলার বিবাহ দেয়া যাবে কি-না সে ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে সামান্য মতপার্থক্য রয়েছে। তবে কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে এটিই প্রমাণিত হয় যে, ‘বিবাহ দেয়া জায়েয নয়’ (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ৩২/১৪৫ পৃ.)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তাওবার পূর্বে ব্যভিচারিণীর বিবাহ হারাম। তা সে ব্যভিচারীর সঙ্গে হোক কিংবা অন্য কারোর সঙ্গে হোক। নিঃসন্দেহে এটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতামত। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আলেমগণ এ কথাই বলেছেন। যেমন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও অন্যান্য বিদ্বানগণ (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ৩২/১০৯ পৃ.)।
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা সূরা নূরের মধ্যে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, ‘ব্যভিচারিণী নারীর সঙ্গে বিবাহ হারাম’। কেননা সে কোন মুমিন পুরুষের জন্য জায়েয নয়, বরং সে ব্যভিচারী পুরুষ কিংবা মুশরিক পুরুষের জন্য। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেই বিবাহ করবে এবং ব্যভিচারিণী নারীকে কেবল ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিকরাই বিবাহ করবে। মুমিনদের জন্য এ বিবাহ বৈধ নয় (সূরা আন-নূর : ৩; যাদুল মা‘আদ, ৫/১০৪; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব্ ইবনু উছাইমীন, ১০/২৮ পৃ.)।
আল্লামা শানক্বীত্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আহলুল ইলম বা বিদ্বানগণের কথা থেকে আমি যা বুঝতে পেরেছি তা হল- ব্যভিচারী এবং ব্যভিচারিণী যদি তাওবাহ করে এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে এই ভয়াবহ গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে, সেক্ষেত্রে তাদের বিবাহ বৈধ হবে। অর্থাৎ তাওবার পরে বিবাহ জায়েয হবে (আযওয়াউল বায়ান, ৫/৪২৭ পৃ.)। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, وَّ الزَّانِیَۃُ لَا یَنۡکِحُہَاۤ اِلَّا زَانٍ اَوۡ مُشۡرِکٌ ۚ وَ حُرِّمَ ذٰلِکَ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ‘ব্যভিচারিণী নারীকে কেবল ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিকরাই বিবাহ করবে। মুমিনদের জন্য এ বিবাহ বৈধ নয়’ (সূরা আন-নূর : ৩)। আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, لَا يَنْكِحُ الزَّانِي الْمَجْلُودُ إِلَّا مِثْلَهُ ‘সাজাপ্রাপ্ত ব্যভিচারী তার অনুরূপ কাউকে বিয়ে করবে’ (আবূ দাঊদ, হা/২০৫২; আহমাদ, হা/৮৩০০; ছহীহুল মুসনাদ, হা/১৪৫১, সনদ ছহীহ)।
তৃতীয়তঃ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ), মালিকী মাযহাব ও হাম্বালী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, ব্যভিচারিণী নারী এক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিয়ে করা জায়েয নয় (মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ৩২/১১০; ইগাছাতুল লাহফান, ১/৩৬৬; আল-ইনছাফ, ৯/২১৬-২১৭ পৃ.)। শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ), শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ও সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি বলেন, সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী যদি ব্যভিচারিণী নারী অবিবাহিত হয়, সেক্ষেত্রে তার মাতৃগর্ভ পবিত্রকরণের জন্য এক ঋতুস্রাব পর্যন্ত ইদ্দতকাল অতিবাহিত করতে হবে। আর যদি গর্ভবতী হয়, সেক্ষেত্রে গর্ভস্থ সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অতঃপর যদি সে তাওবাহ করে এবং তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে এই ভয়াবহ গুনাহে লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে, সেক্ষেত্রে তার সম্মতি, অভিভাবকের উপস্থিতি এবং ন্যায্য মোহরানার বিনিময়ে তার বিবাহ বৈধ হবে। অর্থাৎ তাওবার পরে বিবাহ জায়েয হবে’ (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব ইবনে বায, ২১/৯; আশ-শারহুল মুমতি‘, ১৩/৩৮২; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২৪/৩৪৫ পৃ.)।
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لَا تُوطَأُ حَامِلٌ حَتَّى تَضَعَ، وَلَا غَيْرُ ذَاتِ حَمْلٍ حَتَّى تَحِيضَ حَيْضَةً ‘সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত গর্ভবতীর সাথে যৌনসঙ্গম করা যাবে না। আর গর্ভবতী নয় এমন নারীর মাসিক ঋতুস্রাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার সাথেও সঙ্গম করা যাবে না’ (আবূ দাঊদ, হা/২১৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১২২৮, ১১৫৯৬, ১১৮২৩, সনদ ছহীহ)।
চতুর্থতঃ ইমাম বাহুতী (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি স্বামীর কাছে ব্যভিচারিণী স্ত্রীর ব্যভিচার প্রকাশিত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে যতক্ষণ না সে তাওবাহ করবে এবং তার ইদ্দতকাল অতিবাহিত করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ ব্যভিচারিণী স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম’ (কাশশাফুল ক্বিনা’, ৫/৮২ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৪১২৮৬)। ‘ইসলাম ওয়েব’-এর আলেমগণ বলেন, প্রশ্ন হতে পারে যে, এক্ষেত্রে স্বামী কী করবে? স্বীকে রাখবে, না-কি ত্বালাক্ব দিয়ে দেবে? উত্তরে আমরা বলব, স্বামী যে কোন মুহূর্তে স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দেয়ার অধিকার রাখে। তবে যদি স্ত্রী তাওবাহ করে, সেক্ষেত্রে আমরা স্ত্রীকে ক্ষমা করে দিয়ে নিজের রক্ষণাবেক্ষণে রাখার জন্য স্বামীকে পরামর্শ দেবো (ইসলাম ওয়েব, ফৎওয়া নং-১০২৮৪০)।
ব্যভিচার থেকে জন্মানো সন্তান মায়ের সন্তান; ব্যভিচারীর সন্তান নয়। এমনকি পরবর্তীতে তারা তাওবাহ করে বিবাহ করলেও সন্তান প্রথম বীর্য থেকে সৃষ্ট, তাই সে তার সন্তান হবে না এবং সে তার উত্তরাধিকারও হবে না’ (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/৩৭০ পৃ.)। ব্যভিচারের মাধ্যমে জন্ম নেয়া সন্তানের বংশ প্রমাণিত হয় না। তাই ব্যভিচারের সন্তানকে ব্যভিচারীর দিকে যুক্ত করা বৈধ নয়। এমনকি নিশ্চিত জেনে গেলেও- যে সন্তানটি ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তিরই- তবুও তাকে তার দিকে যুক্ত করা যাবে না; বরং সে মায়ের দিকে যুক্ত হবে। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলেমগণ বলেন, আলিমদের সঠিক মত হল, ‘... কিন্তু যদি সহবাসটি ব্যভিচার (যিনা) হয়Ñ তাহলে সন্তানের বংশ ব্যভিচারীর দিকে যুক্ত হবে না এবং তার সাথে উত্তরাধিকার প্রমাণিত হবে না’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২০/৩৮৭ পৃ.)।
অন্যত্র তাঁরা বলেন, ব্যভিচারের সন্তান মায়ের দিকে যুক্ত হবে। যদি তার মা মুসলিম হন- তাহলে তার বিধান অন্যান্য মুসলিমদের মতই হবে। তাকে মায়ের অপরাধ বা যার সঙ্গে ব্যভিচার করা হয়েছে, তার অপরাধে দোষী বা নিন্দিত করা যাবে না। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘কোন ব্যক্তি অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না’ (সূরা আল-আন‘আম : ১৬৪; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমা, ২২/৩৪ পৃ.)।
উল্লেখ্য যে, এ ধরনের তাওবাহ কবুলের জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। যথা: (১) পাপকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। (২) কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। (৩) ঐ পাপ পুনরায় না করার দৃঢ় সঙ্কল্প করতে হবে। সুতরাং যদি এর মধ্যে একটি শর্তও লুপ্ত হয়, তাহলে সেই তাওবাহ বিশুদ্ধ হবে না। পক্ষান্তরে যদি সেই পাপ মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তা কবুলের জন্য চারটি শর্ত আছে। উপরোক্ত তিনটি এবং চতুর্থ শর্ত হল, অধিকারীর অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি অবৈধ পন্থায় কারো মাল বা অন্য কিছু নিয়ে থাকে, তাহলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে (রিয়াযুছ ছলিহীন, পৃ. ১৪-২২ পৃ. ‘তাওবাহ’ অনুচ্ছেদ)।
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ঢাকা।