শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:১৪ অপরাহ্ন

কে ছিলেন আব্দুল মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ)

-মুহাম্মাদ ওমর ফারুক মিল্কি


কে ছিলেন আব্দুল মতীন সালাফী?

১৯৮০-এর দশকের বেশ কিছু আক্বীদার বই অনুবাদ হওয়ার কারণে অনেকেই জানতে চাইছেন, কে ছিলেন আব্দুল মতীন সালাফী? যিনি আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে এত চমৎকার চমৎকার বই বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু আমরা তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। আব্দুস সবুর নাদভী ঝাণ্ডানগরী বলেন, শনিবার দিন ছিল, জানুয়ারী ২০১০ সালের ১৬ তারিখ, সকাল এগারোটা বাজছিল। কে জানতো, আল্লাহর এই নেক বান্দা, যাকে দুনিয়া শায়খ আব্দুল  মতীন সালাফী নামে চিনত, আপনজন এবং অচেনা সবার হৃদয়ে শোকের ঢেউ তুলে দিয়ে চলে যাবে? প্রতিদিনের মতো নিজের অফিসে বসে বিভিন্ন কাগজপত্র অধ্যয়ন করছিলেন। হঠাৎ পেশাবের তাকীদ অনুভব করেন। কাজ সেরে বাইরে আসতেই তাঁর শরীর কাঁপতে শুরু করে। উপস্থিত লোকেরা তাঁকে ধরেন এবং দ্রুত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে রাস্তার মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর রূহ দেহ ছেড়ে চলে যায়। তখন ঘড়ির কাঁটা ১১:৪৫-এ থেমে ছিল।

ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে তাঁর মৃত্যু সংবাদ বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে। তাঁর অনুগামী, ছাত্র এবং শুভাকাক্সক্ষীদের সংখ্যা এতটাই বেশী ছিল, যা খুব কম মানুষই অর্জন করতে পারে। এই দুঃখজনক ঘটনার পর সবাই হতবাক, নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে, আল্লাহ তাঁর এই একান্ত প্রিয় বান্দাকে এত তাড়াতাড়ি ডেকে নেবেন।

একজন মহান আলীম এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যু বিশেষত বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য এক বড় ক্ষতি। সালাফী প্রচারে এবং শিরক ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে সংগ্রামে যিনি সাহসিকতার সঙ্গে সমস্ত কষ্ট সহ্য করেছিলেন, এই মহান বীর অনেক দিন পর্যন্ত মানুষের চোখে অশ্রু ফেলে যাবেন। ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী এই বীর সৈনিক তাঁর পেছনে অনেক মূল্যবান এবং অমলিন ছাপ রেখে গেছেন, যা সালাফী দাওয়াহর সঙ্গে যুক্ত দাঈদের জন্য ইনশাআল্লাহ অমূল্য নিদর্শন হিসেবে রয়ে যাবে। এই ছাপসমূহ জামিয়াতুল ইমাম আল-বুখারীর বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য শিক্ষণীয় হবে, ইনশাআল্লাহ। তাওহীদ এডুকেশনাল ট্রাস্টের অগ্রগতির জন্যও পথপ্রদর্শক হবে।

আল্লাহ তাঁকে দিয়ে অনেক বড় বড় কাজ করিয়েছেন, দাওয়াহ, শিক্ষা এবং সমাজসেবামূলক কাজ। বাংলার মালদার বালাপাথরে একটি বিশাল ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন, যা আজ ‘জামিয়াতুল ইমাম আল-বুখারী’ নামে পরিচিত এবং দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছে। নারীদের জন্য আলাদা কলেজ ‘কুল্লিয়্যাহ আয়েশা সিদ্দিকা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এলাকার একটি বড় চাহিদা পূরণ করেছেন। আশেপাশের গ্রামে মক্তব, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং বহু ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, এসবই তাঁর মহানতা প্রমাণ করে।

আমার মনে আছে, ২০০৪ সালে পাকুড় কনফারেন্সে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যা শেষ সাক্ষাৎ প্রমাণিত হয়। তিনি ‘মারকাজুত তাওহীদ’-এর প্রতিনিধি দল (যার মধ্যে আমি ছিলাম) কে কিশনগঞ্জে আসার আমন্ত্রণ দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে একটি সফরের আয়োজন করেন। কনফারেন্স শেষে আমরা কিশনগঞ্জ পৌঁছাই। শহরের কাছে অবস্থিত ‘মাহদ আবাদ’ একটি জ্ঞান সম্পন্ন এলাকা মনে হলো, যেখানে বিস্তীর্ণ জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে ‘জামিয়াতুল ইমাম আল-বুখারী’-এর দৃষ্টিনন্দন ভবনসমূহ এবং কিছুটা দূরে ‘কুল্লিয়্যাহ আয়েশা সিদ্দিকা’-এর আকর্ষণীয় বিল্ডিংসমূহ। ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়ে একটি চমৎকার জ্ঞানমূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

একদিন এশার ছালাতের পর জামিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মুযাম্মিল হক মাদানী সাহেবের অনুরোধে আমি এবং আমার শ্রদ্ধেয় চাচা জনাব জাহিদ আজাদ ঝাণ্ডানগরী ছাত্রদের সামনে বক্তব্য রাখি। আমার প্রিয় পিতা হযরত মাওলানা আব্দুন নূর সিরাজী (হাফিযাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যা আজীবন বজায় ছিল। নেপালের বহু দাওয়াহ সফরে তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। বাবা যখনই তাঁর কৃতিত্ব স্মরণ করেন, তখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং বলেন, আল্লাহ তাঁকে খুব শিগগিরি ডেকে নিলেন।

আরব মাশায়েখগণ তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর দাওয়াতী ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার স্বীকৃতি দিতেন। তাই তাঁর মৃত্যুসংবাদ ২৫টি আরবী ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। কুয়েতের  ‘আহলেহাদীছ’ ওয়েবসাইটে শায়খ আবু মারওয়ান হাশেম লিখেছেন,

‘শায়খ আব্দুল  মতীন সালাফী জামিয়া সালাফিয়া, বানারস এবং জামিয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারা থেকে পড়াশোনা করেছেন। প্রজন্ম গঠনে ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি মুসলিম তরুণদের শুধু জ্ঞানেই নয়, আর্থিকভাবেও শক্তিশালী দেখতে চাইতেন। দাওয়াতী ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী এই ব্যক্তিত্ব তাঁর অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জাল বিছিয়ে দিয়েছিলেন। ‘জামিয়াতুল ইমাম আল-বুখারী’ প্রতিষ্ঠা করে উলামা ও দাঈদের দল গঠন করেছেন, ‘কুল্লিয়্যাহ আয়েশা সিদ্দিকা’ স্থাপন করে নারী দাঈ তৈরীর কাজ করেছেন, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করে মুসলিম তরুণদের কারীগরী শিক্ষায় সংযুক্ত করেছেন, শিশুদের জন্য আধুনিক প্রতিষ্ঠান গঠন করেছেন। তাওহীদের দাওয়াহ প্রচারে ‘পায়াম এ তাওহীদ’ নামে উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। জ্ঞান ও দাওয়াতের ময়দানে তিনি এমন কিছু ছাপ রেখে গেছেন, যা অম্লান। আজ বাংলাদেশের আহলে হাদীছের উজ্জ্বল উপস্থিতির পেছনে তাঁর অবদান অনেক’।

শায়খ আব্দুল মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

আব্দুল মতীন সালাফী ছিলেন উপমহাদেশের ক্ষণজন্মা এক সালাফী দাঈ। তিনি উপমহাদেশের আরেক প্রাণপুরুষ শায়খ মতিউর রহমান মাদানীর শ্যালক। তার নাম আব্দুল মতীন বিন আবদুর রহমান সালাফী। পিতার নাম মাওলানা আবদুর রহমান মাজাহিরী। তিনি ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১লা জানুয়ারীতে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার বালাপাথর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের কান্তিরপা ‘মাদরাসা নূরুল ক্বামার’-এ তার শিক্ষা জীবন শুরু। তিনি পাটনার ‘জামিয়া মাজহারুল উলূম’ থেকে মাওলভী ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে ‘জামিয়া সালাফিয়া বারাণসী (বানারস) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। অতঃপর ১৯৭৯ সালে ‘জামিয়া ইসলামিয়া, মদীনা মুনাওয়ারা থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ বাংলাদেশ থেকে এম. এ শেষ করেন।

পদ ও দায়িত্ব

তিনি ছিলেন সঊদী আরবের ‘ইসলামী দাওয়াহ ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়’-এর মনোনীত দাঈ। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন দাওয়াতি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন। ১৯৯০ সালে ‘তাওহীদ এডুকেশনাল ট্রাস্ট’, বিহার-এর সভাপতি নির্বাচিত হন। ‘জামিয়াতুল ইমাম আল বুখারী’-এর প্রধান এবং ১৯৯৩ সালে ‘জামিয়া আয়েশা ইসলামিয়া’-এর ভিত্তি স্থাপন করেন।

মাদ্রাসা আলিয়া, রাহতপুর-এর ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি। সঊদী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভারত-নেপাল প্রাক্তন ছাত্র সংগঠনের সভাপতি। প্রাদেশিক জমঈয়তে আহলেহাদীছ বিহারের সদস্য। মাসিক ‘পায়াম এ তাওহীদ’ (উর্দু) ও ‘তাওহীদের ডাক’ (বাংলা) পত্রিকার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

কার্যক্রম ও উদ্যোগ

১৯৮০ সাল থেকে দাওয়াতী কাজ শুরু। বহু মাদ্রাসায় পড়িয়েছেন, বহু ভাষায় গবেষণা ও বই রচনা করেছেন। সঊদী ও কুয়েতের রেডিওতে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশ বেতারে প্রবন্ধ পাঠ করেছেন। ইসলামী সেন্টার স্থাপন, দরিদ্রদের সহায়তা, যুবকদের জন্য সংগঠন গঠন এবং দেশ-বিদেশে সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন। ইলমি পদচারণায় তার খেদমত ছিল অসামান্য। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করেছেন। তার রচিত গ্রন্থ ও অনুবাদ সংখ্যা প্রায় ১৭টি।

শায়খ আব্দুল  মতীন সালাফী যার নাম থাকবে স্মৃতির অমর খতিয়ানে লিখেছেন মাওলানা মুহাম্মাদ আশফাক সালাফী, দরভাঙ্গা। ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো বান্দার জন্য কল্যাণ কামনা করেন, তখন তাকে কাজে লাগান। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ), কীভাবে? তিনি বললেন, মৃত্যুর পূর্বে তাকে নেক আমলের তাওফীক্ব দান করেন। আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের শায়খ আব্দুল  মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ) তেমনি কিছু সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাঁদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কল্যাণের তাওফীক্ব দান করেন এবং স্বল্প সময়ে তাঁর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে অসাধারণ কাজ সম্পন্ন করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। ফলে মানুষ তাদের সৎ কাজের মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণ করে, দু‘আ করে রহমত ও মাগফিরাত কামনা করে।

নিশ্চয়ই এইরূপ মানুষগণ তাদের সৎ আমল ও ছাদাক্বায়ে জারিয়ার মাধ্যমে চিরঞ্জীব থেকে যান, যদিও দেহ গতভাবে তারা মাটির নিচে শায়িত থাকেন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এই একনিষ্ঠ, দরদী, হিতাকাক্সক্ষী, উপদেশদাতা এবং বিশ্বস্ত আলেম ফযীলাতুশ শায়খ আব্দুল মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ)-কে তাঁর রহমতের ছায়ায় স্থান দান করুন, তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে পরিণত করুন, জান্নাতুল ফিরদাউসকে তাঁর আত্মার আবাসস্থল করুন এবং তাঁর বৈপ্লবিক দাওয়াতী, ইলমি ও কল্যাণময় কার্যক্রমগুলোকে কবুল করে তা ছাদাক্বায়ে জারিয়ার মর্যাদা দিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতি দয়ালু ও মেহেরবান।

এই সমস্ত কিছু ছিল আল্লাহর দয়ায় আমাদের প্রিয় শায়খের জন্য তাওফীক্ব ও কল্যাণের প্রতিফল। মাত্র ২০-২২ বছরের অল্প সময়ে তিনি অসংখ্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মক্তবের জাল বিস্তার করে দেন। শত শত মসজিদ ও মক্তব তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয়। বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ তাঁর দাওয়াতী ও ইলমি সেবার উপকারভোগী হয়েছে। কিশনগঞ্জের মতো পশ্চাদপদ এলাকায় তিনি তাঁর কার্যক্ষেত্র স্থাপন করেন এবং ‘তাওহীদ এডুকেশনাল ট্রাস্ট’-এর ব্যানারে ‘জামিয়া ইমাম বুখারী’ (ছাত্রদের জন্য) এবং ‘জামিয়া আয়েশা সিদ্দিকা’ (ছাত্রীদের জন্য) প্রতিষ্ঠা করেন, যা উচ্চ মানের শিক্ষা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং মনোরম স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য।

বর্তমানে এই জামিয়াগুলো একটি সুবৃহৎ ইলমি বৃক্ষরূপে বিকশিত হয়েছে, যা সর্বদা ফলদান করে চলছে। এছাড়াও প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য ‘তাওহীদ টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’, শিশুদের জন্য ‘তাওহীদ একাডেমি’ এবং আরও অনেক শিক্ষা, প্রকাশনা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তিনি চালু করেন।

আল্লাহ এই ইলমি বাগানকে চিরসবুজ রাখুন এবং এর বরকতকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখুন, যাতে মানুষ দ্বীন ও দুনিয়ার পিপাসা মিটাতে পারে এবং এটি শায়খ ও তাঁর সাথীদের জন্য ছাদাক্বায়ে জারিয়া হয়ে থাকে।

শায়খ আব্দুল  মতীন আব্দুর রহমান সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ) শুধু একজন দক্ষ প্রশাসক ও সংগঠকই ছিলেন না, বরং কিতাব ও সুন্নাহর একজন গভীর জ্ঞানসম্পন্ন আলেম ছিলেন। গভীর ইলমি বিষয়গুলোতে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। আমি নিজেও বহুবার বিভিন্ন জটিল বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিয়েছি এবং তাঁর জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়েছি। বিশেষ করে হাদীছ বিজ্ঞান (মুস্তালাহুল হাদীছ) এর প্রতি তাঁর দখল ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

তিনি ছিলেন সুন্নাতের অনুসারী, ফরয-ওয়াজিব ও ইসলামী নিদর্শনের যত্নবান। তাঁর তাওহীদের স্পষ্টতা ও সালাফিয়াতের দৃঢ়তা ছিল ঈর্ষণীয়। শান্ত স্বভাব, ধৈর্যশীলতা, কম কথা বলা, দূরদর্শিতা, নির্ভুল মতামত, প্রখর বুদ্ধি, মিষ্টভাষিতা এবং উত্তম চরিত্র ছিল তাঁর বিশেষ গুণ। কখনো উত্তেজিত হতেন না, এমনকি বিরোধীদের সাথেও সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন। ছোট-বড় সবার প্রতি সমান সদ্ভাব রাখতেন। তিনি নতুন ছাত্র ও তরুণ আলেমদের সম্মান করতেন এবং তাঁদেরকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতেন। যা সচরাচর বড়দের মাঝে দেখা যায় না। তিনি ছিলেন এক অনন্য মেহমানদার। যিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে যেতেন, তিনিই দেখতেন, শায়খ নিজ হাতে আতিথ্য করছেন।

দ্বীনী মজলিসে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল গুরুত্ব ও মর্যাদা। যখন আরবিতে কথা বলতেন, তখন তাঁর বিশুদ্ধ উচ্চারণ সকলকে আকৃষ্ট করত। বাংলা ভাষায় তিনি ছিলেন অসাধারণ ভাষণদাতা। তাঁর বক্তব্য ছিল মাধুর্যময়, প্রাঞ্জল এবং অন্তর ছুঁয়ে যেত। শ্রোতারা একত্রিত হয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সুন্দর উপমা ব্যবহার করে বক্তব্য বোঝাতেন। মাঝে মাঝে হালকা রসিকতা করে পরিবেশকে প্রাণবন্ত করতেন।

তিনি ছিলেন কর্মপ্রিয়, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং লক্ষ্য অর্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। অলসতা তাঁর ধারে কাছেও ছিল না। ‘আব্দুল মতীন সালাফী’ যেন কর্ম ও উদ্যমের অপর নাম। তিনি ছিলেন রুচিসম্পন্ন, মার্জিত, খাদ্যপ্রিয়, পরিচ্ছন্ন, আলেমসুলভ ব্যক্তিত্ব ও ভদ্রতা সম্পন্ন একজন মহান ব্যক্তি। দেশ-বিদেশের আলেমদের মাঝে সম্মানিত ছিলেন।

ইয়া শায়খ, আমরা আপনার বিচ্ছেদে গভীরভাবে শোকাহত, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, কারণ তিনি হিকমতের মালিক। আমি প্রায় ১৮ বছর আপনাকে কাছ থেকে দেখেছি, আপনার ইলমি, দাওয়াতি, প্রশাসনিক জীবনের সফলতা পর্যবেক্ষণ করেছি। এমনকি মৃত্যুর মর্মন্তুদ দৃশ্য এবং হাজারো মানুষের জানাযা দেখে নিজেই কেঁদেছি। আমি নির্দ্বিধায় বলি, জীবন যদি হয়, তবে যেন আপনার মতো হয়, মৃত্যু যদি আসে, তবে যেন আপনার মতো হয়। ৪০-৫০ হাজার মানুষের জানাযা কেবল সৌভাগ্যবানদেরই ভাগ্যে জোটে। আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, ইয়া শাইখ!


(সংগৃহীত)




প্রসঙ্গসমূহ »: মনীষী চরিত
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) (৩য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৪র্থ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৮ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৫ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৭ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
কে ছিলেন আব্দুল মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৬ষ্ঠ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (২য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৯ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ