বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০১:১৩ অপরাহ্ন

এক চলমান প্রতিষ্ঠান:

শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) 

- হাসিবুর রহমান বুখারী* 


(২য় কিস্তি)  

নাম ও বংশ

আবূ আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু উছমান ইবনু আব্দুল্লাহ্ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু আহমাদ ইবনু মুক্ববিল। তাঁর বংশধারা মুক্ববিল বংশ ও রাঈস বংশ হয়ে বানু তামীম বংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মদীনা মুনাওয়ারার বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও আল্লামা আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কোন এক সভায় বলেন, তাঁর বংশধারার চতুর্থ পিতামহ উছমান ‘উছাইমীন’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। সেখান থেকেই তাঁর পরিবার ‘উছাইমীন’ গোত্রনামে পরিচিত লাভ করে। তাঁর পূর্বপুরুষরা উশাইক্বার অঞ্চল থেকে এসে উনাইযাহ শহরে বসবাস করতে শুরু করেন।[১]

জন্ম তারিখ

তিনি ১৩৪৭ হিজরীতে পবিত্র রামাযান মাসের ২৭ তারিখে জুমু‘আর রাত্রিতে জন্মগ্রহণ করেন (২৭/০৯/১৩৪৭ হি.)। সম্ভবত এটি ছিল লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রি। তাঁর আগমন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বরকতময় ছিল।[২]

জন্মস্থান

তিনি উনাইযাহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। যেটি আল-ক্বাসীম প্রদেশের দক্ষিণে এবং নাজেদর ঐতিহাসিক অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এটি বুরাইদাহ (প্রদেশের রাজধানী) থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং সঊদীর রাজধানী রিয়াদ থেকে ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। উনাইযাহ নাজ্দের উত্তর-মধ্য অঞ্চলে এবং রুম্মা উপত্যকার দক্ষিণে অবস্থিত, যা আরব উপদ্বীপের দীর্ঘতম উপত্যকা। এটির উত্তর এবং পশ্চিম বালির টিলা দ্বারা বেষ্টিত। বিভিন্ন সময়ে এই শহরে অসংখ্য উলামা, বিচারক ও সমাজ সংস্কারক বসবাস করেছেন। আর তিনি হলেন তাঁদের মধ্যকার সর্বশেষ কিংবদন্তী।[৩]

তাঁর পরিবার

মৃত্যু পর্যন্ত শায়খ ইবনি উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অধীনে একটিই স্ত্রী ছিল। তিনি ছাড়া তাঁর দ্বিতীয় কোন স্ত্রী ছিল না। স্ত্রীর নাম- উম্মে আব্দুল্লাহ, কারীমা বিনতে মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম মানসূর আত-তুর্কী। তাঁদের পাঁচটি ছেলে ও তিনটি মেয়ে। ছেলেদের নাম: ১- আব্দুল্লাহ (মালিক সাউদ ইউনিভার্সিটিতে নিয়োজিত। ২- আব্দুর রহমান (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা)। ৩- ইবরাহীম (রয়্যাল গার্ড অফিসার)। ৪- আব্দুল আযীয (পাসপোর্ট অফিসার) এবং ৫- আব্দুর রাহীম (সঊদী এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা)।

তাঁর কোন সন্তানই তাঁর ছাত্র হয়নি বা তাঁর থেকে সরাসরি শিক্ষা নেননি। শাইখ আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শায়খ বলেন যে, তিনি বিসমিল্লাহ-এর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম) এবং সেখান থেকে আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো চয়ন করে তিন ছেলের নামকরণ করেন। যথা আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান ও আব্দুর রাহিম। তাঁর তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের তাঁর-ই দু’জন স্বনামধন্য ও মেধাবী ছাত্রের সঙ্গে বিবাহ হয়। তাঁরা হলেন: শাইখ সামী ইবনু মুহাম্মাদ এবং শাইখ খালিদ ইবনু আব্দুল্লাহ। তাঁরা দু’জনই ক্বাসিম প্রদেশে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাউদ আল-ইসলামিয়্যাহ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। ছেলে ও মেয়েদের পক্ষ থেকে শাইখের মোট ২১ জন নাতী-নাতনী ছিল।[৪]

শাইখের ভাই-বোনদের মধ্যে একজন হলেন- ড. আব্দুল্লাহ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন। তিনি রিয়ায শহরে অবস্থিত মালিক সাঊদ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে তিনি ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিভাগের প্রধান ছিলেন। ‘আন্তর্জাতিক কিং ফাইসাল পুরস্কার’ বিভাগের তিনি মহাসচিব ছিলেন। অনুরূপভাবে তিনি সাঊদী মাজলিসুশ শূরা বা সঊদী পরামর্শ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাঁর আরেকজন ভাই হলেন- আব্দুর রহমান ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন। যিনি কিং আব্দুল আযীয শহরে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিজ্ঞান বিভাগের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়ক পরিচালক ছিলেন। শাইখের একটি মাত্র বোন ছিল। চাচার ছেলে শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু সুলাইমান আল-উছাইমীন-এর সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছিল।[৫]

তদানীন্তন কালে সঊদী আরবের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা

শায়খ ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরব দ্বীপপুঞ্জে স্থিতিশীল পরিস্থিতির শুরুতে বেড়ে উঠেন। পুরো দেশে নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলার পরিবেশ বিরাজমান ছিল। যেখানে একটি রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়েছিল, যাতে সঊদী আরবের রাজ্যের নাম এবং এর বাদশার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাদশা আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জন্য হয়েছিল। সময়টা ছিল ১৩৫১ হি.। তখন শায়খের বয়স মোটামুটি পাঁচ বছরের কাছাকাছি। অতঃপর ১৩৫৭ হিজরীতে তেলের খনি আবিষ্কার হওয়ার পর দেশে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সূচনাকালে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত বা শিক্ষা বিষয়ক অবস্থার উপর গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তখন শায়খের বয়স মোটামুটি দশ বছর। এই সময় শায়খ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা জীবনের সূচনা করেন। যে সম্পর্কে তিনি বলেন, بدأت في تلقي العلم من السنة التاسعة من عمري تقريباً ‘আমি আমার জীবনের মোটামুটি নয় বছর বয়সে জ্ঞানার্জনের সূচনা করি’।[৬]

সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে যে, তদানীন্তন কালের সার্বিক পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও সুখময় ছিল। উন্নতির নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা ক্রমবর্ধমান বর্ধিষ্ণু হচ্ছিল। নিরাপত্তা, শান্তি ও সম্প্রীতির নিরন্তর প্রবাহ এবং জীবনোপকরণের মাধ্যম সমূহ সহজতর হচ্ছিল। স্বাভাবিকভাবেই যা জ্ঞান অন্বেষণকারীর অগ্রসর হওয়া ও সফলতা অর্জনের রাস্তা সমূহ প্রশস্ত করে এবং নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথকে সুগম করে। বিষাক্ত পরিবেশের কালো হাতছানি এবং নানাবিধ প্রলোভন দেখিয়ে এখন আর ছাত্রসমাজকে বিপদগামী করা সহজ নয়। এক সময় অসংখ্য ছাত্র প্রলোভনে পড়ে লক্ষ্যবস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি বিস্মিত হচ্ছি সেই সব লোকদের দেখে যাদের কলিজা, অন্তর, বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তা-চেতনা দুনিয়ার মোহ-মায়া গ্রাস করেছে অথচ তাদের অন্তরে কুরআনের জ্ঞান আছে’। আল্লাহ তা‘আলার কাছে এর থেকে আমরা আশ্রয় কামনা করি। তৎকালীন সময়ে উন্নতির নিরন্তর ধারা অব্যাহত থাকলেও কিন্তু শায়খ ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসায়িক সূত্রে তিনি প্রায়শই উনাইযাহ থেকে রিয়ায এবং রিয়ায থেকে উনাইযাহ যাওয়া আসা করতেন। অতঃপর তিনি উনাইযাহ শহরেই স্থায়ীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যর কাজ শুরু করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি একটি ইয়াতীম খানায় কাজ করতেন। যেমনটি শায়খের সহোদর ভাই বর্ণনা করেছেন।

একদা শায়খকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, ‘আপনি কি কখনো জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি অর্থোপার্জন করার উদ্দেশ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন? উত্তরে তিনি বলেন, না। কেননা বাবা ব্যবসায়িক সূত্রে রিয়াযে থাকতেন। আর আমাদের অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল ছিল।[৭] তবে চাহিদার তুলনায় বিলাসিতা করার সুযোগ তাঁর ছিল না। সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল। শায়খ তাঁর অধ্যয়ন কক্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘একটি মাটির ঘর, গো-জাতি বা গবাদি পশু রাখার খোঁয়াড়ের পার্শ্বে’।[৮] এখানে উঁচু ভবন, আকাশচুম্বী অট্টালিকা, বিলাসবহুল সুদর্শন অফিস, ঘুর্ণায়মান বৃত্ত চেয়ার, পরিপূর্ণ লাইব্রেরী অথবা বিলাসবহুল আকর্ষণীয় গাড়ি কিছুই ছিল না। যদিও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কামনা-বাসনা বা ধারণা যে, জ্ঞানার্জনের জন্য এগুলো খুবই প্রয়োজন বা অত্যাবশ্যক। আদতে কিন্তু এমন ধারণা পোষণকারীরা শিক্ষার্থী হিসাবে বিবেচিত হয় না।[৯]

আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহে শায়খ একটি প্রসিদ্ধ ধার্মিক ও দ্বীনদার পরিবারে লালিত-পালিত হয়েছেন। উছাইমীন বংশ হল: শায়খ সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মামার বংশ। তিনি তাঁর পরিবারের অনেকের কাছ থেকেই ছাত্র হিসাবে জ্ঞানার্জন করেছেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তাঁর নানা বংশের শায়খ আব্দুর রহমান ইবনু সুলাইমান (রাহিমাহুল্লাহ)। শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) উনাইযাহ শহরের মসজিদে খারীযাতে তৎকালীন আরবের প্রসিদ্ধ ইমাম এবং শিক্ষক শাইখ আব্দুর রহমান ইবনু সুলাইমান (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন।[১০] তিনিই শায়খের প্রথম উস্তাদ ছিলেন। তাঁর কাছে তিনি কুরআনুল কারীমের শিক্ষা নিতে শুরু করেন এবং সেখানে নাজেরাহ সম্পূর্ণ করেন। যেমনটা তিনি বর্ণনা করেছেন। নিঃসন্দেহে মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর জ্ঞানার্জনের একেবারে অঙ্কুর কালে আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক্বে প্রথম পর্ব সফলতার সঙ্গে সমাপ্ত করতে না করতেই তিনি অনেক কিছু অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর ও দৃষ্টান্তের প্রমাণ দিয়েছিলেন। যেমন তাঁর অসামান্য মেধা, প্রতিভা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা। তাঁর মধ্যে এমন একটি নিদর্শন ছিল যা শিক্ষক মহাশয়ের কাছে বা পর্যবেক্ষকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতেই সুস্পষ্ট হয়েছিল। অনুরূপভাবে তাঁর বিস্ময়কর মুখস্থকরণ ও স্মরণশক্তি। যাঁরাই তাঁর সহপাঠী ছিলেন কিংবা সহবস্থানকারী ছিলেন তাঁরাই এটি অনুভব করতে পেরেছিলেন। অনুরূপভাবে জ্ঞানার্জনের পথে তাঁর সীমাহীন ধৈর্য্য, বারংবার পুনরাবৃত্তির অসম্ভব চাহিদা, এর জন্য রাত্রি জাগরণ এবং দিনভর পর্যালোচনা ও পুনরাবৃত্তির মধ্যে সময় অতিবাহিত করার চেষ্টা।

অনুরূপভাবে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল আযীযের সান্নিধ্যে এসে তিনি বিভিন্ন গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত মাত্ন (مَتْن) বা মূল পাঠ মুখস্থ করেন। শায়খ ইবনু সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই দুইজন শাইখের কাছ থেকেই জ্ঞানার্জন করতে থাকেন। শিক্ষা অন্বেষণের এই পর্ব সমাপ্তিকরণের পর শায়খ কিতাবা বা লিখন দক্ষতা (ডৎরঃরহম ঝশরষষং) বৃদ্ধিকরণার্থে তা‘লীম নিতে শুরু করেন। যেমনটি তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু আল্লামা শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান আল-বাসাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন।[১১] শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অতঃপর আমি অন্য একটি মাদরাসাতে লিখনি এবং কিছুটা গণিত ও আরবী সাহিত্য শিখি। অতঃপর কুআনুল কারীম হিফয বা মুখস্থকরণার্থে তৃতীয় মাদরাসার দিকে ধাবিত হয় এবং আলহামদুলিল্লাহ সেখানেই হিফয সম্পূর্ণ করি’।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- শায়খ খুবই স্বল্প সময়ে কুরআনুল কারীম হিফয সম্পূর্ণ করেছেন। যেমনটি শায়খ ইবরাহীম ইবনু হামদ আল-জুত্বাইলী বলেছেন। যিনি শায়খের সঙ্গে একই যুগে ৪৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে সহবস্থান করেন এবং ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে শায়খের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেছেন। তিনি শায়খ সম্পর্কে বলেন, শায়খ মাত্র ছয় মাসে অন্ধ শিক্ষক আলী ইবনু আব্দুল্লাহ আশ-শুহাইতান (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে হিফয সম্পূর্ণ করেন।[১২] এই বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তিনি তাঁর নানার কাছে হিফয সম্পূর্ণ করেননি, বরং তাঁর কাছে শুধু নাজেরাহ করেছিলেন, যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

এতো ক্ষুদ্র বয়সে ও স্বল্প সময়ে তাঁর পবিত্র কুরআন মুখস্থ করার বিষয়টি অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং মনোবল বৃদ্ধি করার জন্য যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁর স্মরণশক্তি বৃদ্ধিকরণার্থেও এটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং তা দিনের পর দিন ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তেই ছিল। যারা শায়খের বক্তব্য শুনেছেন, ক্লাসে উপস্থিত থেকেছেন অথবা আলোচনা সভা, বিতর্ক সভা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, প্রমাণ উপস্থাপন সভায় উপস্থিত ছিলেন তাঁরা এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখেছেন। শাইখ খুবই দ্রুত কুরআনুল কারীমের দলীল উপস্থাপন করতে পারতেন। যখনই দলীলের প্রয়োজন হয়েছে তাঁর স্মৃতিশক্তি ও স্মরণশক্তি তাঁকে সাহায্য করেছে। ছালাতের মধ্যে তাঁর তিলাওয়াতের মাধ্যমেও এটি বারংবার প্রমাণিত হয়েছে, সেটি ফরয ছালাত হোক কিংবা নফল ছালাত। শায়খ ইমামতি করার সময় কুরআনুল কারীম তারতীল সহকারে অর্থাৎ কুরআনের শব্দগুলো ধীরস্থিরভাবে মুখে উচ্চারণ করার সাথে সাথে তা উপলব্ধি করার জন্য গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। যথাযথ উপলব্ধি করার জন্য শিক্ষণীয় আয়াতে একটু থামতেন। এই সময়ে শায়খ পড়াশোনা, অধ্যয়ন ও জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর মনোযোগী হন। জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর লোলুপতা, অদম্য ইচ্ছা, প্রবল কামনা ও তীব্র ক্ষুধা ছিল। কিন্তু তাঁর কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রন্থ ছিল না, তাই তিনি শায়খগণ ও বিচারকদের গ্রন্থাগার থেকে উপকৃত হতেন।

এ সম্পর্কে শায়খ আহমাদ কাযী বলেন, যে সমস্ত বিশেষ গুণাবলীর কারণে তিনি কিংবদন্তি বা জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন, সে সমস্ত গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম ছিল, ‘শিক্ষার প্রতি সীমাহীন আগ্রহ’। আমার কাছে শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মানী‘ (রাহিমাহুল্লাহ) (যিনি উনাইযাহ শহরে ১৩৬০ হি. পর্যন্ত বিচারক ছিলেন) বর্ণনা করেন যে, তাঁর কিছু আত্মীয় আমাকে বলেছেন যে, শায়খ তাঁর যৌবনকালে খুবই প্রত্যুষে তাদের বাসার দিকে আসতেন, তাঁর মাথায় থাকত একটি ঝুড়ি যার মাধ্যমে তিনি তাঁর গ্রন্থসমূহ এবং কাগজপত্র বহন করতেন, দরজার সামনে এসে কড়া নেড়ে সালাম দিতেন এবং অনুমতি নিয়ে লাইব্রেরীর দিকে অগ্রসর হতেন, সেখানে তিনি প্রায় যোহর বা দ্বিপ্রহর পর্যন্ত থাকতেন, অতঃপর নেমে আসতেন এবং সালাম দিয়ে ফিরে যেতেন। তখনো তিনি প্রাপ্ত বয়স্কে পৌঁছাননি।[১৩]

 (ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

[১]. উলামায়ে নাজদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২১৯; আল-জামিঊল হায়াতুল আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন, পৃ. ১০।

[২]. মাজাল্লাতুল ইয়ামামাহ, সংখ্যা-৯৫৩, ১৪০৭ হি, আল-জাযিরাহ সংখ্যা ১০৩৩৫।

[৩]. আদ-দুররুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল-আল্লামা ইবনি উছাইমীন, পৃ. ১৯।

[৪]. আল-মাসাঈয়্যাহ, সংখ্যা ৫৭১৬।

[৫]. আল-মাসাঈয়্যাহ, সংখ্যা ৫৭১৬; আল-জামিঊল হায়াতুল আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন, পৃ. ১২-১৩।

[৬]. মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা ১৭৭২।

[৭]. মাজাল্লাতুল ইয়ামামাহ, সংখ্যা ৯৫৩।

[৮]. মাজাল্লাতুল উসরাহ, সংখ্যা ৯২।

[৯]. আদ-দুররুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল-আল্লামা ইবনি উছাইমীন, পৃ. ২২।

[১০]. জারীদাতুর রিয়ায, সংখ্যা ১১৮৯৬।

[১১]. মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা ১৭৭৬।

[১২]. আল-জাজীরাহ, সংখ্যা ১০৩৩৫।

[১৩]. আল-মাজাল্লাতুল ইসলামিয়্যাহ, আদ-দুররুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল-আল্লামা ইবনি উছাইমীন, পৃ. ২৫।




প্রসঙ্গসমূহ »: মনীষী চরিত

ফেসবুক পেজ