এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)
-হাসিবুর রহমান বুখারী*
(৮ম কিস্তি)
শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জীবনী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী ব্যক্তি উপরিউক্ত বিষয়গুলো পরিপূর্ণরূপে দেখতে পাবেন। যদিও শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জীবনীর উপর বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলো পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম নয় এবং গভীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতেও ব্যর্থ হয়। কারণ, সেগুলো তাঁর ইলমিয়্যাহ (জ্ঞান সংক্রান্ত) ও আমালিয়্যাহ (কর্ম সংক্রান্ত) শ্রেষ্ঠত্বের দিকগুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করেনি। মৌলিকভাবে ভিত্তি স্থাপন, মূলনীতি নির্ধারণ, বিধিবদ্ধকরণ অতঃপর উদাহরণ ও প্রমাণ উপস্থাপনের উপর সঠিকভাবে গুরুত্বারোপ করেনি। আমরা এখানে সেই বিষয়গুলোর কিছু ঝলক উল্লেখ করব, যেগুলো সম্পর্কে ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন পূর্বোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে।
আল-মা‘হাদুল ইলমী বা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাঊদ ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিকটে এই শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়া এক বছরের বেশি স্থায়ী না হলেও, তার সুফল সুদূরপ্রসারী ছিল, খুবই ফলপ্রসূ হয়েছিল এই স্বল্প সময়কাল। যদিও পরবর্তীতে এই শিক্ষা অর্জনের ধারাবাহিকতা প্রশ্ন করা, সাক্ষাৎ করা, পরামর্শ নেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে অব্যাহত ছিল। শাইখ ও তাঁর মেধাবী ছাত্রের মধ্যে এমন গভীর পারস্পরিক ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল, যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই ভালোবাসা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সবার-ই দৃষ্টিগোচর হয়েছিল।[১] এ সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন,
كان الشيخ محمد يعني إبن عثيمين رحمه الله تعالى يحب شيخه عبد العزيز بن باز جداً، فقد إتصلت به مرة في مرض الشيخ عبد العزيز وحادثته في هذا، فقال عبارة : لا أرانا الله يوم فقده.... ولما مات الشيخ عبد العزيز إتصلت صباح اليوم التالي بالشيخ محمد، فقلت له: بلغك الخبر؟ فقال نَعم، نِعمَ الرجل
‘শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শিক্ষক শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে সীমাহীন ভালোবাসতেন। একবার শাইখ আব্দুল আযীযের অসুস্থতার সময় আমি তাঁর সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম, তখন তিনি একটি বাক্য বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যেন আমাদের এমন দিন না দেখান, যেদিন তাঁকে হারাতে হবে’। অতঃপর যখন শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) ইন্তেকাল করলেন, পরের দিন সকালে আমি শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে ফোন করলাম এবং তাঁকে বললাম, আপনি কি খবর পেয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি সত্যিই একজন মহৎ মানুষ ছিলেন...’। তিনি আরো বলেন, ‘শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ইন্তিকালের পর একবার আমি শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে একান্তে ছিলাম। তখন তিনি শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পরবর্তী সময়ে কে ফাতাওয়ার স্থানে উপযুক্ত হবেন? সেই বিষয়ে কথা বলছিলেন। তিনি অত্যধিক ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমাকে বললেন, ما عاد لنا رأس ‘শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পর আমাদের আর কোনে নেতা (অগ্রগামী) রইল না’।[২]
তিনি আরো বলেন, ‘আমি দেখেছি জুমু‘আর দিন অর্থাৎ ২৮/০১/১৪২১ হিজরীতে, এটি সেই দিন, যেদিন ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে মক্কার পবিত্র ভূমিতে দাফন করা হয়েছিল। একদিকে আমি আমাদের শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জুমু‘আর ছালাতের আগে দীর্ঘক্ষণ নফল ছালাত আদায় করতে দেখেছি, অন্যদিকে শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে কাফনের চাদরে আবৃত হয়ে কা‘বার সামনে শায়িত অবস্থায় দেখেছি। ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) কুরআনুল কারীমের আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন, ব্যাথাতুর ও বেদনাকান্ত হৃদয়ের শোকে তাঁর নয়নযুগল অশ্রুতে সিক্ত হয়ে উঠেছিল, তাঁর শাইখের জন্য শোকে এবং উম্মাতের উপর যে দুর্দশা আপতিত হয়েছিল তার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা উভয়কে ক্ষমা করুন এবং উভয়কে সুউচ্চ জান্নাতে ফিরদাউস নসীব করুন’।[৩]
শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি ত্বাইফে শাইখ আব্দুল আযীযের মাজলিসে উপস্থিত ছিলাম। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকেরা আসছিলেন এবং শাইখ আব্দুল আযীযকে সালাম দিচ্ছিলেন, ঐ সময় তিনি তাঁর চেয়ারে বসেছিলেন।
فلمّا أخبر بقدوم الشيخ محمد بن عثيمين قام اليه، ولم أره قام لأحد غيره، فاعتنقه، ورأيت وجه الشيخ عبد العزيز يتهلل بالبشر والسرور للقاء الشيخ ابن عثيمين
‘এমতাবস্থায় যখন তাঁকে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর আগমনের খবর দেয়া হল, তিনি তাঁর জন্য চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁকে অন্য কারো জন্য উঠে দাঁড়াতে দেখিনি। তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন এবং ঐ সময় আমি শাইখ আব্দুল আযীযের মুখে শাইখ ইবনু উছাইমীনের সাথে সাক্ষাতের আনন্দ ও উৎফুল্লতা লক্ষ্য করতে পারছিলাম’।[৪] শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর কিছু কিতাবের প্রশংসা করতেন। যেমন ‘আক্বীদাতু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ’-এর ভূমিকায় তিনি বলেন, হামদ্ ও ছানার পর... ‘আমি আমাদের বিদ্বান ভাই, সম্মানিত শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন কর্তৃক সংকলিত মূল্যবান সংক্ষিপ্ত আক্বীদা পর্যালোচনা করেছি এবং এটি সম্পূর্ণ শুনেছি। আমি এটিকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনাকারী হিসাবে পেয়েছি’।
সুধী পাঠক! এই প্রশংসামূলক বাক্যগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন! ছাত্রের প্রশংসায় শিক্ষক কত সুন্দর ও সত্য কথা বলেছেন! শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে আল্লামা বলে সম্বোধন করেছেন! যদিও আমাদের শাইখ ইবনু উছাইমীন এরূপ বলা পসন্দ করতেন না, বরং তিনি এটি অপসন্দ করেন এবং এভাবে ডাকলে তিনি নিষেধ করতেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কিছু বৈশিষ্ট্য
তিনি নিজেকে মানুষের প্রয়োজনে এবং অসহায়, দরিদ্র, মুখাপেক্ষী ও ফক্বীর-মিসকীনদের সাহায্য করার কাজে নিবেদিত করেছিলেন। ডক্টর আব্দুল্লাহ আল-হাকামীর অফিস ম্যানেজার বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন গরীব-দুঃখীদের বন্ধু। তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে, হতাশা ও দুশ্চিন্তা দূর করতে, ঋণ মুক্ত করতে এবং অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে তিনি সদা তৎপর থাকতেন। তিনি তাদের প্রতি দয়া দেখাতেন এবং সদয় ব্যবহার করতেন। তাঁর অফিসের রেজিস্টার খাতাগুলো তাদের আবেদনে পরিপূর্ণ থাকত। তিনি তাদের সাহায্য করার জন্য দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতেন, তাদের আবেদনগুলো পর্যালোচনা করতেন এবং তাদের উপকার করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করতেন। অনেক ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি তাঁর কারণে ঋণমুক্ত হয়েছে, অনেক দরিদ্র মানুষ তাঁর মাধ্যমে দারিদ্র্যের কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছে, আরো অনেক অসহায় মানুষের দুঃখ দূর হয়েছে। তিনি তাদের জন্য তাঁর দস্তরখানা বিছিয়ে দিতেন এবং তাঁর মাজলিসে তাদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান করে দিতেন। এমনকি একবার এক দরিদ্র আফ্রিকান ব্যক্তি, যার পরনে ছিল ময়লা কাপড়, হজ্জের শেষ মৌসুমে তাঁর সন্ধানে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘শাইখ কোথায়’? তাকে বলা হল, ‘তিনি তো এবার হজ্জ করতে পারেননি। আপনি কী চান?’ উত্তরে সে বলল, ‘আমি আপনাদের নিকট কিছু-ই চাই না। আমি একজন মিসকীন মানুষ, আর শাইখ হলেন ‘মিসকীনদের অভিভাবক’।[৫]
শাইখ ছালিহ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু হুমাইদ বলেছেন, ‘এই ইমাম ও মহাপণ্ডিতের অসাধারণ প্রতিভা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ঘরে কাটানো জীবনের মাধ্যমে। যেখানে তিনি দরিদ্র ও অচেনা মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং অবহেলিতদের মধ্যে থেকে জীবন-যাপন করতেন। এ ধরনের জীবনধারা এই যুগে তাঁর মত আর কারো মধ্যে দেখা যায় না। তিনি তাঁদেরকে স্বাগত জানাতেন। সম্মান প্রদর্শন করতেন। আপ্যায়ন করতেন। কাছে টেনে নিতেন। তাঁদের সমস্যাগুলো বুঝতেন এবং তা সমাধানের জন্য সচেষ্ট হতেন, তাই যে সমস্যাই হোক না কেন। অতঃপর যারা উপস্থিত থাকতেন, তারা সকলেই শাইখের মেহমানদারীর মেলায় একত্রিত হতেন। সবাই এক গোল দস্তরখানার চারপাশে জমায়েত হতেন। সেই গোল টেবিলে ধনী ও দরিদ্র, সম্ভ্রান্ত ও সাধারণ, বড় ও ছোট সবাই একসাথে মিলিত হতেন’।[৬]
সম্মানিত শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মাদ ইবনু সা‘আদ আশ-শুওয়াই’ইর বলেন, ‘শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায (আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন) মানুষ তাঁকে চিনেছে ১৩৫৮ হিজরীতে, যখন তিনি খারাজের দালাম-এ ক্বাযী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তখন থেকে শুরু করে সেই রাত পর্যন্ত যে রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি মানুষদের থেকে কখনো গোপন থাকতেন না এবং তাদের প্রয়োজন মেটাতে সচেষ্ট থাকতেন, প্রশ্নের জবাব দিতেন, ফাতাওয়া দিতেন, সাহায্য করতেন এবং সুপারিশ করতেন। তিনি আল্লাহর রহমতে সেই উত্তম চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন, যা কখনো পরিবর্তিত হয়নি এবং তা থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননি, দিনের এক মুহূর্তের জন্যও তা পরিবর্তন করেননি। তাঁর বসার সময়সূচী নির্দিষ্ট ছিল। তাঁর অফিস ও বাসায় তাঁর বৈঠকখানা সবসময় সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তাঁর দস্তরখানা সবসময় বিছানো ও প্রসারিত থাকত। তাঁর ফোন রাত-দিন মানুষের সমস্যার জবাব দিতে ও তাদের সাথে যোগাযোগে ব্যস্ত থাকত। তিনি মানুষের জন্য বিষয়গুলো সহজ করে দিতেন।
কারণ, তিনি রাসূল (ﷺ)-এর হাদীছ ‘তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন কর, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না, মানুষকে সুসংবাদ দাও, বিরক্তি সৃষ্টি করো না’।[৭] তাঁর উত্তম গুণাবলি ছিল স্থায়ী ও অব্যাহত।
এ কারণেই শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও করুণাময়। তিনি ইয়াতীম, মিসকীন, অসহায়, বিধবা, গরিব এবং দরিদ্রদের প্রতি সদয় ছিলেন। তিনি তাদের সাহায্য করতেন, যারা নিজে থেকে উচ্চপদস্ত কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের কথা পৌঁছতে পারত না, তিনি তাদের হয়ে সুপারিশ করে তাদের কথা পৌঁছে দিতেন। আর যাদের জন্য সুপারিশ করা হত তাদের দু‘আ তাঁর হৃদয়কে কোমল করে দিত।[৮]
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. আদ-দুর্রুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল্লামাহ ইবনে উছাইমীন, পৃ. ৬০।
[২]. শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদের ভাষণ: ‘আল্লামা ইবনু উছাইমীন সম্পর্কে ১০০টি উপকারী কথা’ শিরোনামে।
[৩]. আদ-দুর্রুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল্লামাহ ইবনে উছাইমীন, পৃ. ৬১।
[৪]. শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদের ভাষণ: ‘আল্লামা ইবনু উছাইমীন সম্পর্কে ১০০টি উপকারী কথা’ শিরোনামে।
[৫]. ইমামুল আছর, পৃ. ১৯০।
[৬]. আল-মাদীনাহ, সংখ্যা নং-১৩১৯১।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯, ৬১২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৩৪।
[৮]. ইমামুল আছর, পৃ. ৩২১।
প্রসঙ্গসমূহ »:
মনীষী চরিত