শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০৫ অপরাহ্ন

এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)

-হাসিবুর রহমান বুখারী*


(৭ম কিস্তি) 

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাঊদ ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর দ্বিতীয় শিক্ষক আল্লামা মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ ও আল্লাহ্ভীরু আবূ আব্দুল্লাহ আব্দুল আযীয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) (১৩৩০-১৪২১ হিঃ)-এর তত্ত্বাবধানে

সংক্ষিপ্ত জীবনী

আমাদের শাইখ আল্লামা, ইমাম, সমুদ্র সমতুল্য জ্ঞানী আব্দুল আযীয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) রিয়ায শহরে ১৩৩০ হিজরীর ১২ই জিলহজ্জ জন্মগ্রহণ করেন। বায পরিবার সম্পর্কে বলা হয় যে, তারা পিহামাহ (হিজাযের একটি উপকূলীয় অঞ্চল, নিম্নভূমি) বা ইয়ামানের বাসিন্দা ছিলেন। তবে শাইখ এই বংশ পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে বিরত ছিলেন।

তিনি জীবনের প্রথম অধ্যায়ে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ছিলেন, কিন্তু ১৩৪৬ হিজরীতে তার চোখ রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হতে থাকে এবং অবশেষে ১৩৫০ হিজরীর মুহাররাম মাসের শুরুতে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান।

তিনি রিয়াযের অসংখ্য আলেমের কাছ থেকে শারঈ ইলম্ বা জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনঃ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল লাত্বীফ আলে শাইখ, রিয়াযের বিচারক শাইখ ছালিহ বিন আব্দুল আযীয আলে শাইখ, শাইখ সা‘দ বিন আত্বীক্ব, শাইখ হামদ বিন ফারিস, শাইখ সা‘দ বিন ওয়াক্কাস আল-বুখারী, যার কাছ থেকে তিনি কুরআন ও তাজবীদ লিখেছেন, শাইখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলে শাইখ, যাকে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করা এবং সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করা শাইখ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তিনি যখনই তাঁর কথা উল্লেখ করেছেন, স্তুতি, গুণকীর্তন, সুখ্যাতি ও ভালো কথাই বলেছেন। সকলের উপর আল্লাহ তা‘আলা রহমত বর্ষণ করুন।

তিনি জ্ঞানার্জনের পথে সীমাহীন সংগ্রাম ও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, যার ফলে তিনি বিভিন্ন পদে নিযুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে, তিনি ১৩৫৭ হিজরী থেকে ১৩৭১ হিজরীর শেষ পর্যন্ত আল-খারজ (সঊদী আরবের রিয়ায অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। রিয়ায থেকে প্রায় ৭০-৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত) নামক স্থানে একজন বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।[১]

তারপর তিনি ১৩৭২ হিজরীতে রিয়াযের আল-মা‘হাদুল ইলমী বা ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে এক বছরের জন্য শিক্ষকতা করেন। অতঃপর ১৩৭৩ হিজরীতে তিনি শরী‘আহ কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং সেখানে সাত বছর অতিবাহিত করেন, অর্থাৎ ১৩৮০ হিজরী পর্যন্ত। অতঃপর ১৩৮১ হিজরীতে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে নিযুক্ত হন এবং ১৩৯০ হিজরী পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি ১৩৯৫ হিজরী পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসাবে কাজ করেন। পরে ১৩৯৫ হিজরীর ১৪ই অক্টোবর তিনি ইলমী গবেষণা, ফাতাওয়া, দাওয়াহ ও ইরশাদ (নির্দেশনা) বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

অতঃপর ১৪১৪ হিজরীতে তাঁকে সঊদী আরবের প্রধান মুফতী (Grand Mufti) নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি বিজ্ঞ উলামা পরিষদ (হাইয়াতু কিবারিল উলামা অর্থাৎ Council of Senior Scholars) ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষণা ও ফাতাওয়া বিভাগের প্রধান হিসাবে মৃত্যু পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর উপর রহম করুন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে (রাহিমাহুল্লাহ) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

১. মুসলিম বিশ্ব লীগ (রাবিত্বাতুল আলামিল ইসলামী) -এর প্রতিষ্ঠাতা পরিষদের সভাপতি।
২. বিশ্ব মাসজিদ কাউন্সিল (মাজলিসুল আলা আল-আলামী লিল-মাসাজিদ)-এর সর্বোচ্চ পরিষদের সভাপতি।
৩. মক্কাতুল মুকাররামায় অবস্থিত ইসলামিক ফিক্বহ একাডেমি (আল-মাজমাউল ফিক্বহিল ইসলামী) -এর সভাপতি।
৪. মদীনাতুল মুনাওয়ারায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আল-জামি‘আতুল ইসলামিয়্যা) সর্বোচ্চ পরিষদের সদস্য।
৫. ইসলামী দাওয়াহ সর্বোচ্চ পরিষদ (আল-হাইয়াতুল উলিয়া লিদ-দাওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ)-এর সদস্য।  এছাড়াও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

আর ‘আদ-দাওয়াহ ইলাল্লাহ’ বা আল্লাহর দিকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে শাইখের প্রচেষ্টা, শিক্ষাদান, পাঠদান, ফাতাওয়া প্রদান, রচনাবলী, উপদেশ এগুলো এত বেশি যে তা সংশ্লিষ্ট স্থানেই দেখানো সম্ভব, এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। শাইখের ছাত্ররা বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাওফীক্ব দান করেছিলেন যে আমরা রিয়াযের বড় মসজিদে, বাদি‘আয় অবস্থিত সারাহ মসজিদে এবং মক্কাতুল মুকাররামায় মসজিদুল হারামে শাইখের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের মাজলিসে একাগ্রতার সাথে নতজানু হয়ে বসতাম। আমরা সেখানে ছহীহাইন তথা বুখারী ও মুসলিম এবং সুনানে আরবা‘ অর্থাৎ আবূ দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ অধ্যয়ন করতাম, তাফসীরে ইবনে কাছীর ও ‘যাদুল মা‘আদ’ গ্রন্থের উপর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লাভ করেছিলাম, এবং তাওহীদের মূলনীতিগুলো শেখার জন্য ইবনু খুজাইমার ‘কিতাবুত তাওহীদ’, দাঈ ইমাম শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব ও তাঁর দ্বিতীয় সংস্কারক নাতির ‘কিতাবুত তাওহীদ ও তার ব্যাখ্যা ফাৎহুল মাজীদ সহ তাওহীদ বিষয়ক বিভিন্ন কিতাব অধ্যয়ন করতাম। এছাড়াও আরো অনেক গ্রন্থ রয়েছে যার সব উল্লেখ করতে গেলে দীর্ঘ হয়ে যাবে।

শাইখ তাঁর শিক্ষাদানের প্রাঙ্গণে পাহাড় সমতুল্য ধৈর্য, সীমাহীন সহনশীলতা, অনন্য শিষ্টাচার, কার্যকারী উপদেশ ও মহামূল্যবান নছীহাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার এক বিশেষ নিদর্শনস্বরূপ ছিলেন। তিনি ছিলেন ইমামুস সুন্নাহ অর্থাৎ সুন্নাহর ইমাম ও হাদিউল উম্মাহ অর্থাৎ উম্মতের পথপ্রদর্শক। আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুন।[২]

তাঁর গ্রন্থসমূহ

তাঁর রচনাবলী অসংখ্য। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল: ফাৎহুল বারীর উপর তাঁর লিখিত হাশিয়াহ (টীকা) এবং সর্বাধিক প্রচলিত হল: হজ্জ ও উমরাহর বহু মাসআলা নিয়ে রচিত তাঁর গ্রন্থ ‘আত-তাহক্বীক্ব ওয়াল-ঈ‘যাহ’। এছাড়াও রয়েছে ‘আল-ফাওয়ায়িদুল জালিয়্যাহ ফিল মাসায়িলিল ফারদিয়্যাহ’ এবং আরো অনেক কিছু। এছাড়া তাঁর আরো একটি অসাধারণ অবদান রয়েছে ‘নূরুন আলাদ-দারব বা পথের আলো’ প্রোগ্রামে। এটি একটি জনপ্রিয় ইসলামিক প্রোগ্রামের নাম, যেখানে ধর্মীয় প্রশ্নোত্তর ও দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। যা থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিমরা উপকৃত হয়েছে। তাঁর আরো একটি অসাধারণ আধুনিক প্রোগ্রাম ছিল। এটি ছিল আবুল বারাকাত ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর লেখা ‘আল-মুনতাক্বা’ বইয়ের ব্যাখ্যা। তবে তিনি এটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর উপর রহম করুন।

তাঁর মসজিদে, সমাবেশে ও ছালাতের পরের দাওয়াতের কথা তো বলাই বাহুল্য। খাঁটি ও নির্মল আক্বীদার দিকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন এবং বিদ‘আত ও কুসংস্কারমুক্ত। তিনি ধর্মে নতুন বিষয় প্রবেশ করানো থেকে সতর্ক করতেন এবং শাসক, জনগণ ও সাধারণ উম্মাহকে নাছীহাত করতেন, ভালো কাজের আদেশ দিতেন ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতেন। এই সবকিছু এবং অন্যান্য কার্যক্রম তাকে ১৪০২ হিজরীতে ইসলামের অসামান্য সেবার জন্য ‘কিং ফয়সাল ফাউন্ডেশন’ পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য প্রার্থী করে তোলে, এক্ষেত্রে ইসলামের খিদমাত ও তাঁর অবদানের জন্য।

আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে এই পুরস্কার দেয়ার পর তিনি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এটি মক্কাতুল মুকাররামার ‘দারুল হাদীছ খাইরিয়্যাহ’ প্রতিষ্ঠানকে দান করেন, কারণ তাদের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল বিশেষ করে বিদেশী ও জ্ঞানার্জনে নিবেদিত শিক্ষার্থীদের জন্য। এই মহানুভবতা মানুষের দৃষ্টিতে তাঁর মর্যাদা ও সম্মান আরও বৃদ্ধি করে। এই সকল গুণের কারণে তিনি ‘মুজাদ্দিদ’ (সংস্কারক) হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এবং ইমামাতের সম্মাননা লাভের যোগ্য হয়েছিলেন। তাঁকে একজন উম্মাহর মাঝে একক ব্যক্তিত্ব হিসাবে আখ্যায়িত করা হত। অর্থাৎ তিনি নিজেই একটি উম্মাহ ছিলেন। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে রহমত করুন, ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে সুউচ্চ মাক্বাম দান করুন।[৩]

তার মৃত্যুর শোকে অনেক শোকগাথা মূলক কথা ও কবিতা লেখা হয়েছে এবং তাঁকে বর্ণনা করতে যা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে যাহরানির কথা:

يَا دُرَّة العَصرِ يَا بَحرَ العُلُومِ فَمَا --- رَأت لَكَ العَينُ مِن نِد وأمثَال
حقاً فقد عرفَ التَّاريخُ كوكَبَةً --- مضيئة من صَنَادِيدِ وأبطَالِ
مِثل ابن حَنبل أو مِثل ابن تَيمية --- أوِ البُخاري في إسنَاده العالي
لكنَّنا يَا حَبيبَ القَلبِ نُبصِرُهُم --- كأَنَّما مُثلوا في شَخصِكَ الغَالي

‘হে যুগের মণি! হে জ্ঞানের মহাসাগর! চোখ তোমার মত ও সমতুল্য আর কাউকে দেখেনি’।
‘ইতিহাস সত্যিই জেনেছে এক ঝলমলে তারকাপুঞ্জ এবং সেই সব মহান বীর ও সাহসী পুরুষদের’।
‘যেমন, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল অথবা ইবনু তাইমিয়্যার মত অথবা বুখারীর মত, তার সুউচ্চ সনদসমূহের কারণে’।
‘তবে হে হৃদয়ের প্রিয়! আমরা তাঁদের দেখি যেন তোমার-ই মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব তাঁদের সবাই প্রতিফলিত’।[৪]

শাইখ ১৪২০ হিজরীর ২৭শে মুহাররাম বৃহস্পতিবার মৃত্যুবরণ করেন। মসজিদুল হারামে জুমু‘আর ছালাতের পর তাঁর জানাযার ছালাত আদায় করা হয়, যেখানে মোটামুটি দশ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। মক্কাতুল মুকাররামার আদল ক্ববরে তাঁকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে রহমত করুন, ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে সুউচ্চ মাক্বাম দান করুন।

শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) কীভাবে তাঁর উস্তায শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শিক্ষক ও মুফতী শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই প্রভাব কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট হয়। যেমন:

  • ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন সালাফী মানহাজের অগ্রগামী প্রচারক। ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর কাছ থেকে সুস্পষ্ট সালাফী মানহাজ ও ছহীহ আক্বীদা গ্রহণ করেছিলেন।
  • ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মত ইবনু উছাইমীনও (রাহিমাহুল্লাহ) কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ফিক্বহ ও ভারসাম্যপূর্ণ ইজতিহাদের পথ অনুসরণ করতেন।
  • ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নম্রতা, ধৈর্য ও জ্ঞানের গভীরতা ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর শিক্ষাদান ও দাওয়াহর শৈলীতে প্রতিফলিত হয়েছিল।
  • ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অত্যন্ত বিনয়ী ও সহজ-সরল জীবনযাপন ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যক্তিত্বেও ফুটে উঠেছিল। এই প্রভাব শুধু ইলমী ক্ষেত্রেই নয়, বরং ব্যক্তিগত আচরণ ও দ্বীনি প্রতিফলনেও দেখা যায়।

ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) প্রায়ই তাঁর বক্তৃতা ও লেখনীতে ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উদ্ধৃতি দিতেন এবং তাঁকে ‘আমাদের শাইখ’ বলে সম্মান করতেন, যা তাঁদের মধ্যকার গভীর সম্পর্কেরই ইঙ্গিত দেয়। 

ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন, ‘শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন এই উম্মাহর একটি আলোকবর্তিকা। তাঁর জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও আল্লাহভীতি আমাদের সকলের জন্য আদর্শ’। ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শাইখের রেখে যাওয়া জ্ঞানভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন এবং তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর দ্বিতীয় শাইখের প্রশংসায় বলেন,

أما شيخنا عبد العزيز- رحمه الله تعالى- فإني قرأت عليه يسيراً، لكنني استفدت منه في الحديث فائدة عظيمة

‘আমাদের শাইখ আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে আমি অল্প কিছু পড়েছি। কিন্তু হাদীছের ক্ষেত্রে আমি তাঁর কাছ থেকে বিরাট উপকার লাভ করেছি’।[৫]

শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-মা‘হাদুল ইলমী’ বা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সাউদ ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে আক্বীদাহ, হাদীছ ও ফিক্বহ পড়ানোর দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন।[৬] তাঁকে যা পড়ে শোনানো হয়েছিল সে সম্পর্কে তিনি অন্যত্র বর্ণনা করেছেন। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘অতঃপর আমি যখন আমার দ্বিতীয় শিক্ষক সম্মানিত শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিকট পড়া শুরু করি। তখন আমি ছহীহ বুখারী দিয়ে পড়ার সূচনা করি, অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কিছু রিসালাহ পড়ি’।[৭] অতঃপর তিনি শাইখ, আল্লামা ইমাম ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার দিকগুলো বর্ণনা করে বলেন,

كان تأثري بالشيخ عبد العزيز رحمه الله: لعنايته بالحديث، وأخلاقه الفاضلة، وبسط نفسه للناس

‘শাইখ আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ)-এর হাদীছের প্রতি যত্ন, তাঁর উত্তম চরিত্র এবং মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয়ার কারণে আমি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি’।[৮]

অন্যত্র তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যে বিষয় দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আমি তাঁর নিকট পড়া শুনানোর কারণে উপকৃত হয়েছি নির্দেশনা, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, স্থানান্তর, পরিবর্তন ও রূপান্তরের দিক থেকে। ফিক্বহের বইয়ে নিমগ্ন থাকা, গভীরভাবে মনোনিবেশ করা, বিভিন্ন মতবাদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং সেগুলো সংক্ষিপ্ত করার পর্যায় থেকে আমি হাদীছের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি। আমি হাদীছের বিদ্যায় পারদর্শী ছিলাম না, তবে আমি শাইখের অনুপ্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে হাদীছের জ্ঞানের দিকে ঝুঁকেছি’।[৯]

শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন যে, তিনি তাঁর শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মানহাজ ও পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দ্বিতীয় শাইখ আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি রয়েছে, যা থেকে আমরা এখনও উপকৃত হচ্ছি’ (রিয়াযের কুরআনুল কারীম বেতার কার্যক্রম)। সুতরাং এটি মোট পাঁচটি বিষয়, কিন্তু চারটিতে বিভক্ত করে, যার সংক্ষিপ্তসার হল: (১) আচরণে। (২) পদ্ধতিতে। (৩) ব্যবহারে। (৪) কিতাব ও সুন্নাহর প্রতি যত্নবান হওয়া- অধ্যয়ন, দলীল সাব্যস্তকরণ ও আমলের মাধ্যমে।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. আদ-দুর্রুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল্লামা ইবনে উছাইমীন, পৃ. ৫৫।
[২]. আদ-দুররুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল্লামা ইবনে উছাইমীন, পৃ. ৫৬।
[৩]. আদ-দুর্রুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল্লামাহ ইবনে উছাইমীন, পৃ. ৫৭-৫৮।
[৪]. ইমামুল আছর, পৃ. ২২২।
[৫]. আদ-দাওয়াহ, সংখ্যা নং-১৭৭৬।
[৬]. আল-ইনযাজ ফী তারজামাতিল ইমাম ইবনে বায, পৃ. ২০১।
[৭]. উকায, সংখ্যা নং-১২৫৫৬।
[৮]. উকায, সংখ্যা নং-১২৫৫৬।
[৯]. আদ-দাওয়াহ্, সংখ্যা নং-১৭৭৬।




এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (২য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৫ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৭ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৮ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৪র্থ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৯ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
কে ছিলেন আব্দুল মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) (৩য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৬ষ্ঠ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ