শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৪৫ অপরাহ্ন

এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) 

-হাসিবুর রহমান বুখারী* 

(৯ম কিস্তি)  

 
সুন্নাহর প্রতি তাঁর যত্ন, তাঁর অধ্যয়ন ও দাওয়াহর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এটি উপলব্ধি করার জন্য আপনি শুধু রিয়াদ শহরে শাইখের বক্তৃতার সময়সূচি দেখলেই বুঝতে পারবেন যে, তিনি এর প্রতি কতটা গুরুত্বারোপ করতেন। যেমন:

১- ‘আদ্-দিরাহ’ অঞ্চলে অবস্থিত ইমাম তুর্কী ইবনু আব্দুল্লাহ মসজিদে:

রবিবার ফজরে: তাফসীরে ইবনু কাছীর, ছহীহুল বুখারী, নুখবাতুল ফিকার, মুয়াত্তা মালিক বি শারহিয্ যুরক্বানী, মুসনাদুল ইমাম আহমাদ, আর-রাওযুল মুরবিউ।
সোমবার ফজরে: ছহীহুল বুখারী, নাইলুল আওত্বার, ফাৎহুল মাজীদ, মুসনাদুল ইমাম আহমাদ, সুনানু আবী দাঊদ।
বুধবার ফজরে: তাফসীরে ইবনু কাছীর, ছহীহুল বুখারী, সুনানু ইবনি মাজাহ, আর-রাওযুল মুরবিউ।
বৃহস্পতিবার ফজরে: ছহীহুল বুখারী, ছহীহ মুসলিম, কিতাবুস সুন্নাহ লিল বাগাবী, মুসনাদুল ইমাম আহমাদ, সুনানু ইবনি মাজাহ, আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ, তাফসীরে ইবনী কাছীর, ফাৎহুল মাজীদ, ইগাছাতুল লাহ্ফান।
২- ‘আল-বাদী’আহ্’ অঞ্চলে অবস্থিত আমিরাহ সারাহ মসজিদে

মাগরিবের পর- রবিবার ও বুধবার: তাফসীরে ইবনু কাছীর, ছহীহুল বুখারী, ছহীহ মুসলিম, যাদুল মা‘আদ, সুনানুন নাসাঈ।
৩- ইয়াহইয়াহ মসজিদে

শনিবার, সোমবার, মঙ্গলবার ও শুক্রবার আযান ও ইক্বামতের মাঝখানেÑ শারহু বুলুগিল মারাম।
এখানে একটি মজার ঘটনা রয়েছে, যেখানে শাইখ হাদীছের এক প্রোগ্রামে কম্পিউটারকে পরীক্ষা করেছিলেন। শাইখ ফাহ্দ আল-বুকরান বলেন, একদিন একটি ইলেকট্রনিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি উপস্থিত হলেন। তাদের সাথে একটি ব্যক্তিগত কম্পিউটারও ছিল। ওই কম্পিউটারে হাদীছের গ্রন্থসমূহ সংরক্ষিত ছিল। তারা চেয়েছিলেন, বাজারে প্রকাশের আগে সম্মানিত শাইখ এগুলো একটু দেখুন এবং তাঁর মূল্যবান মতামত প্রদান করুন। অতএব সম্মানিত শাইখ বললেন, ‘চলুন আপনার যন্ত্রটি পরীক্ষা করি’। অতঃপর তিনি একটি হাদীছ এলোমেলোভাবে বেছে নিলেন- এই বিস্ময়কর যন্ত্রটির ক্ষমতা যাচাই করার জন্য। যন্ত্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি সেই হাদীছের কয়েকটি শব্দ প্রবেশ করিয়ে তা অনুসন্ধান ও তাখরীজ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু যন্ত্রটি কাক্সিক্ষত হাদীছটি খুঁজে বের করতে সক্ষম হলো না। যদিও সেটি এমন কিছু হাদীছ পর্যন্ত পৌঁছেছিল যেগুলো একই অর্থ বহন করে। তখন সম্মানিত শাইখ বললেন, ‘তাহলে হাদীছের রাবী অর্থাৎ বর্ণনাকারীর নাম দিয়ে অনুসন্ধান করুন।” অতঃপর রাবীর নাম প্রবেশ করিয়ে হাদীছটি খোঁজার চেষ্টা করা হল। কিন্তু কোন ফল পাওয়া গেল না! সুতরাং সম্মানিত শাইখ বললেন, ‘ইবনু হাজার কোন ভুল করেননি (অর্থাৎ তিনি বুলূগুল মারামে হাদীছটির তাখরীজে সঠিক ছিলেন)। অতএব তোমাদের পুনরায় অনুসন্ধান করতে হবে। অতঃপর প্রায় ১৫ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে খোঁজাখুঁজি ও বারবার চেষ্টা চলতে থাকল। অবশেষে যন্ত্র পরিচালনাকারী ভাইয়েরা কাক্সিক্ষত হাদীছটি একই রাবীর সূত্রসহ খুঁজে পেলেন। তখন বোঝা গেল যে, রাবীর নাম প্রবেশ (ইনপুট) করানোর সময় একটি ভুল এবং নাম লেখায় বিকৃতি ঘটেছিল, যার কারণে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া এতটা কঠিন হয়ে পড়েছিল।[১]

তাঁর উত্তম চরিত্র ও সামাজিক আচার-আচরণ

শাইখের এক শিষ্য শাইখ আব্দুল্লাহ্ আল-উতাইয়ী শাইখের একটি দারসের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, শাইখকে যখন তিলাওয়াতের সাজদাহর  হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল- তিনি উত্তরে বললেন, ‘এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আরেকজন একই প্রশ্ন করলে তিনি আবার বললেন, সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এমনকি একজন তৃতীয় ব্যক্তি তাঁকে একই প্রশ্ন করল, সম্ভবত আগের উত্তরগুলো সে শোনেইনি। তখন শাইখ আবারও আনন্দের সঙ্গে একই উত্তর দিলেন, কোনরূপ মন খারাপ না করেই, বরং হাসিমুখে ধৈর্য ও সদাচরণের মাধ্যমে। তিনি প্রশ্নকারীদের প্রতি বিন্দুমাত্রও বিরক্ত হননি।[২]

শাইখ সবসময় উদারতা ও প্রশান্তচিত্তে প্রশ্নকারীদের গুরুত্ব দিতেন, সময় দিতেন এবং আন্তরিকভাবে সহায়তা করতেন। শাইখের আরেক ছাত্রÑ শাইখ উমার আহমাদ বলেন, ‘একবার আমি একটি বিষয়ে খুবই চিন্তিত ও অস্থির ছিলাম। পাঠ শেষে যখন শাইখ মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন প্রতিবারের মত অনেক ছাত্র ও জিজ্ঞাসুক ব্যক্তি তাকে ঘিরে ফেললেন, এমনকি তিনি গাড়িতে উঠে বসার পরও। যখন গাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন আমি তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে মৃদুস্বরে বললাম, ‘শাইখ আমার একটি প্রশ্ন আছে। আমি কি আপনার সাথে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারি? আমি কি সেখানে সুযোগ পাব? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এখনই’। অতঃপর তিনি গাড়ি থামালেন, আমাকে পাশে বসালেন এবং তখনই আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন। গাড়ি তখনও থেমে ছিল। তারপর আমি আনন্দিত চিত্তে গাড়ি থেকে বের হয়ে এলামÑ তাঁর প্রশস্ত হৃদয়, উদারতা ও সহনশীলতার জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ হয়ে’।[৩]

তাঁর আরেক ছাত্র- ই‘ছাম ইবনু আব্দুল মুনঈম বলেন, আমার সাথেও এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল মক্কায়। হিজরী ১৪০৬ সনের আশেপাশে। যখন আমি আযীযায় প্রতিবেশী হিসাবে শাইখের বাসার পাশেই বসবাসরত ছিলাম। আমি একদিন তাঁর সঙ্গে আসরের ছালাত আদায় করি এবং তাঁকে একটি প্রশ্ন করতে চাইছিলাম। তিনি ইতোমধ্যেই গাড়িতে উঠে পড়েছিলেন এবং গাড়ি প্রায় চলতে শুরু করেছে। আমি দ্রুত গাড়িতে উঠে শাইখের পাশে বসে পড়লাম এবং আমার প্রশ্ন করলাম। তিনি খুবই বিনয় ও নম্রতার সাথে উত্তর দিলেন। এরপর আমি গাড়ি থেকে নেমে গেলাম এবং খুবই আনন্দিত হলাম এই মহান চরিত্র দেখেÑ এমন গুণ আমি অন্য কারো মাঝে দেখিনি। আল্লাহ তা‘আলা শাইখের উপর রহম করুন এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।[৪]

শাইখের মানহাজ, পথ, পন্থা, পদ্ধতি

বুরআন ও সুন্নাহর দলীল দ্বারা যা প্রমাণিত সেটাই শাইখের মানহাজ বা পন্থা ছিল। তিনি কখনো তা থেকে সরে যেতেন না এবং মানুষের কোন তিরস্কার বা লাঞ্ছনার ভয়ে তিনি তা কখনো ত্যাগ করতেন না।

শাইখের এক শিষ্য শাইখ আব্দুল্লাহ আল-উতাইয়ী বর্ণনা করেন, শাইখের সামনে হাদীছটি উল্লেখ করা হল, إنَّ أبِي وأَباكَ في النَّارِ ‘আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে’।[৫] তখন একজন ছাত্র এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলল, আসলে রাসূল (ﷺ) শুধু নিজের মনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য এ কথা বলেছেন, এর বাইরে কিছুই নয়। তখন শাইখ রাগান্বিত হয়ে মুখ ফেরালেন এবং বললেন, ‘তিনি কি নিজের মনকে নিজের পিতার শাস্তির মাধ্যমে সান্ত্বনা দেবেন?’ এখানে শাইখ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে, যা প্রকৃত সত্য নয়, তেমন কোন কথা কেবল সান্ত্বনার জন্য রাসূল (ﷺ) কখনোই বলেন না, বরং হাদীছটি তার প্রকৃত অর্থেই গ্রহণযোগ্য। অতঃপর যখন আমাদের শাইখ তাফসীরের ক্লাসে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে আহলে কিতাবদের নারীদের সাথে বিবাহের বৈধতা বর্ণনা করছিলেন, তখন কিছু ছাত্র বলল, ‘ইয়া শাইখ! কিছু ছাহাবী তো এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন’। তখন শাইখ তার দিকে এমতাবস্থায় ফিরলেন যে, তাঁর মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেল এবং বললেন, ‘কোন ছাহাবীর কথা কি কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীতে দলীল হিসাবে দাঁড় করানো যাবে?’ এখানে শাইখ বেশ জোর দিয়েই বোঝান যে, কুরআন ও হাদীছের সরাসরি নির্দেশের বিপরীতে ছাহাবীর মতও গ্রহণযোগ্য নয়।[৬] অবশেষে এই গভীর প্রভাবের ফলস্বরূপ, এই মেধাবী ছাত্রের মধ্যে এক দৃঢ় প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল এবং এর ফলে দু’জনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে ওঠে, যার ভিত্তিতে শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁকে গবেষণামূলক কাজ প্রস্তুত করার দায়িত্ব দিতেন।

শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মানছূর (ইবনু উছাইমীনের এক সহপাঠী) বলেন, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উছাইমীন, শাইখ সা‘দীর কাছে শিক্ষা গ্রহণের পর রিয়াদে পড়াশোনার জন্য এসেছিলেন। এ কারণে তিনি অন্যদের তুলনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ও বিশেষভাবে অগ্রগণ্য ছিলেন। কেননা যারা আল-মা‘হাদুল ইলমী বা ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার আগে মসজিদে আলিমদের কাছে শিক্ষাগ্রহণের অভিজ্ঞতা পাননি, তারা এ ব্যাপারে পিছিয়ে ছিলেন। এ জন্যই শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর উপর অনেকটা নির্ভর করতেন এবং তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করতেন।[৭]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মুর্শিদাবাদ, ভারত।

তথ্যসূত্র :
[১]. মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা নং-১৬৯৩।
[২]. মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ্, সংখ্যা নং ১৬৩৮, শিরোনাম : ‘ইবনে বায তাঁর ছাত্রদের চোখে’।
[৩]. মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ্, সংখ্যা নং ১৬৩৮, শিরোনাম : ‘ইবনে বায তাঁর ছাত্রদের চোখে’।
[৪]. আদ-দুররুছ ছামীন ফী তারজামাতি ফাক্বীহিল উম্মাহ আল্লামাহ ইবনু উছাইমীন, পৃ. ৬৫-৬৬।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৩।
[৬]. মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ্, সংখ্যা নং ১৬৩৮।
[৭]. জারীদাতুল ওয়াত্বান, সংখ্যা নং-১০৬।




প্রসঙ্গসমূহ »: মনীষী চরিত
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৭ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (২য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৪র্থ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৬ষ্ঠ কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
কে ছিলেন আব্দুল মতীন সালাফী (রাহিমাহুল্লাহ) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৮ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৫ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) (৩য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
এক চলমান প্রতিষ্ঠান: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৯ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ