শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:৪৫ অপরাহ্ন
উত্তর : যেহেতু রাষ্ট্রীয় আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা এবং ঘুষ দেয়া ও নেয়া উভয়ই নিষিদ্ধ, তাই এটা হারাম। তাছাড়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের অধিকার নষ্ট করা ও রাষ্ট্রের সাথে ধোঁকা হবে। আর ইসলামে প্রতারণা হারাম। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّيْ ‘যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১-১০২)। ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন যে, كَرِهُوا الْغِشَّ وَقَالُوا الْغِشُّ حَرَامٌ ‘আলেমগণের মতানুযায়ী প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি খুবই জঘন্য অপরাধ এবং তাঁরা বলেছেন, প্রতারণা করা হারাম’ (তিরমিযী, হা/১৩১৫)। সুতরাং যারা পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে তারা আইনের চোখে অপরাধী এবং ইসলামের দৃষ্টিতে মহাপাপী। আর যারা এমন কাজকে প্রশ্রয় দেয় তারাও যে মহাপাপী তা সহজেই অনুমেয়। শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

الغش محرم في الإختبارات، كما أنه محرم في المعاملات، فليس لأحد أن يغش في الاختبارات في أي مادة ، وإذا رضي الأستاذ بذلك فهو شريكه في الإثم والخيانة “... انتهى

‘পরীক্ষায় নকল করা বা ধোঁকা দেয়া হারাম, যেরকম তা হারাম ব্যবসা-বাণিজ্যে, পরীক্ষায় কারোর জন্য কোন বিষয়ে নকল করা বা টুকলি করা বৈধ নয়। যখন কোন শিক্ষক তাতে সহযোগিতা করে, তখন সেও গুনাহ এবং খিয়ানতে অংশীদার হয়ে যায়’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৬/৩৯৭ পৃ.)। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الغش في الامتحانات محرم ، بل من كبائر الذنوب ‘পরীক্ষায় চিট করা বা নকল করা হারাম, বরং এটা কাবীরা গুনাহসমূহের অন্তর্ভুক্ত’ (ফাতাওয়া নূর আলাদ-দারব, ২/২৪ পৃ.)। অনুরূপভাবে রিশওয়াহ বা ঘুষ দেয়া ও নেয়া উভয়ই হারাম। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)  বলেন, ‘ঘুষ গ্রহণকারী ও ঘুষ প্রদানকারী উভয়কেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লা‘নত বা অভিসম্পাত করেছেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৮০; তিরমিযী, হা/১৩৩৭)।

তবে সব ঘুষ এক রকমের নয়। যেমন অপরের অধিকার বিনষ্ট না করে শুধু নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ঘুষ দেয়া দোষনীয় নয়। শাইখ ইবনু উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ঘুষের মাধ্যমে মানুষ তার ন্যায্য অধিকার আদায় করে- যেমন, সে কিছু অর্থ প্রদান ছাড়া তার হক্ব আদায় করতে পারে না- এটা গ্রহণকারীর জন্য হারাম, দাতার জন্য হারাম নয়। কারণ দাতা শুধু তার হক্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেয়। কিন্তু গ্রহণকারী সেই ঘুষ নিয়ে গুনাহগার হবে, কারণ সে এমন কিছু নিয়েছে যা তার প্রাপ্য ছিল না (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৪/৩০২ পৃ.)। ইমাম ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ঘুষ হালাল নয়। আর ঘুষ হল- সেই জিনিস, যা মানুষ এই জন্য দেয়, যাতে তার জন্য মিথ্যা রায় দেয়া হয়, অথবা তাকে কোন পদে নিয়োগ করা হয়, অথবা তার জন্য কারো প্রতি যুলম করা হয়। এতে দাতা এবং গ্রহণকারী উভয়েই গুনাহগার। কিন্তু যদি কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, আর সে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য অথবা নিজের উপর থেকে যুলুম দূরীভূত করার জন্য কিছু প্রদান করে, তবে দাতার জন্য তা বৈধ, কিন্তু গ্রহণকারীর জন্য তা গুনাহ (আল-মুহাল্লা, ৮/১১৮ পৃ.)।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি কাউকে এই জন্য উপহার দেয়, যাতে সে তার উপর যুলুম করা বন্ধ করে বা তার প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়- তাহলে এ উপহার গ্রহণকারীর জন্য হারাম, কিন্তু দাতার জন্য তা প্রদান করা বৈধ। যেমন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘কখনো আমার কাছে কেউ কিছু চাইলে আমি তাকে তা দিয়ে দিই, সে তা বগলদাবা করে বয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু আসলে সেটি তার জন্য আগুন ছাড়া আর কিছু নয়। বলা হল- হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তাহলে কেন আপনি তাদের তা দেন? তিনি বললেন, ‘তারা তো চাইতেই থাকে, আর আল্লাহ আমার জন্য কৃপণতা মেনে নেন না’ (ছহীহুত তারগীব, হা/৮৪৪)। অতএব চাইতে আসলে নবী (ﷺ) তাদেরকে অর্থ দিতেন, যদিও তা গ্রহণ করা তাদের জন্য হারাম ছিল। তিনি কৃপণতার দোষারোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য দিতেন।

অনুরূপভাবে যে কোন খবর গোপন করেছে, কিংবা মানুষের প্রতি যুলুম করে- এদেরকে প্রতিহত করার জন্য কিছু দেয়া দাতার জন্য বৈধ, কিন্তু তাদের জন্য তা গ্রহণ করা হারাম। আর সুপারিশের বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করা- যেমন কারো পক্ষ থেকে শাসকের কাছে সুপারিশ করা, যাতে তার উপর থেকে যুলুম দূর করা হয়, বা তাকে তার অধিকার পৌঁছে দেয়া হয়, অথবা তাকে এমন কোন পদে নিয়োগ করা হয় যা সে পাওয়ার যোগ্য, অথবা তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সৈন্যদলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সে এটার উপযুক্ত, অথবা তাকে দারিদ্র্য পীড়িতদের, আলিমদের, কুরআন পাঠকদের, সাধকদের বা অন্য যাদের জন্য ওয়াক্বফ্ করা অর্থ রয়েছে তা দেয়া হয়, আর সে যদি তাদের মধ্যে একজন হয়Ñ তাহলে এ ধরনের সুপারিশ, যেখানে ফরয আদায়ে সাহায্য করা হয় বা হারাম বর্জনে সহায়তা করা হয়, এর বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করা বৈধ নয়। তবে দাতার জন্য বৈধ যে, সে তার অধিকার আদায় বা যুলুম দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রদান করবে। এ কথাই সালাফে ছালিহীন ও বড় বড় ইমামদের থেকে বর্ণিত’ (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ৪/১৭৪ পৃ.)।

শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, একজন ব্যক্তি একটি সনদের ভিত্তিতে চাকরি করছে, অথচ এই সনদের পরীক্ষায় সে প্রতারণা করেছিল। এখন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, সে এই কাজ ভালোভাবেই করছে। তার বেতনের হুকুম কী হবে, হালাল না হারাম? তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ কোন দোষ নেই। তবে পরীক্ষায় প্রতারণা করার কারণে তার উচিত আল্লাহর নিকট তাওবাহ করা। আর যদি সে কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করে থাকে, তাহলে তার উপার্জনের দিক থেকে কোন সমস্যা নেই, তবে সে পূর্বে যে প্রতারণা করেছে সেটি ভুল ছিল, আর তার উচিত সে ব্যাপারে আল্লাহর নিকট কঠোরভাবে তাওবাহ করা’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৯/৩১ পৃ.)।

দ্বিতীয়তঃ বিদেশে যাওয়ার জন্য যে ৫-৭ লক্ষ টাকা দেয়া লাগে সেই টাকাটা ঘুষ হবে না, বরং তা দালালীর অন্তর্ভুক্ত। দালালী বলতে বুঝায়, ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মধ্যস্থতা করা বা সংযোগ স্থাপন করা। আর দালাল বলতে বুঝায়- যে বিক্রয়ের কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে প্রবেশ করে। যাকে নিলামকারী বা ব্রোকার বলা হয়। কারণ সে ক্রেতাকে পণ্যের প্রতি নির্দেশনা দেয় আর বিক্রেতাকে নির্দেশনা দেয় মূল্যের প্রতি (ফিক্বাহ বিশ্বকোষ বা আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ, ১০/৫১৫ পৃ.)। আলিমদের সর্বসম্মতিক্রমে দালালী করা বৈধ এবং এর মাধ্যমে বিনিময় গ্রহণ করাও জায়েয। যেমন সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি ও শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বৈধ কাজের জন্য বৈধ চুক্তির ভিত্তিতে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে সংযোগ ঘটিয়ে দেয়ার জন্য উভয়ের সম্মতিক্রমে বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১১/১৭৫ ও ১৩/১২৫; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ ইবনে বায, ১৯/২৬১-২৬২ ও ১৯/৩৫৮ পৃ.)।


প্রশ্নকারী : আব্দুল্লাহ চারঘাট





প্রশ্ন (২১) : ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা ভলিবল খেলা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৯) : সর্বনিম্ন কত টাকা থাকলে যাকাত দিতে হবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩৬) : রাতে ঘুমানোর সময় ওযূ ছাড়াই আয়াতুল কুরছি, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস পড়া যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩৩) : মহিলার দেহ থেকে লোম তুলে ফেলা যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩৮) : প্রতি বছর ‘আরাফার দিন (৯ যিলহজ্জ) ছিয়াম রাখা সুন্নাত। কিন্তু বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী সাধারণত ৮ কিংবা ৭ যিলহজ্জ তারিখে ‘আরাফা হয়। এক্ষণে করণীয় কী? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৩) : ‘স্ত্রীকে খুশি করার জন্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব প্রকাশের জন্য দাড়িতে কলপ ব্যবহার করা যায়’ মর্মে বর্ণিত বর্ণনাটি কি ছহীহ? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (১৪) : আমরা জানি, দাদার আগে যদি বাবা মারা যান তাহলে নাতি/নাতনিরা দাদার সম্পত্তির অংশ পাবে না, সেক্ষেত্রে দাদা ওসিয়ত করতে পারবেন। আমার প্রশ্ন দাদা যদি ওসিয়ত করে না যান সেক্ষেত্রে নাতি/নাতনিরা কি কিছুই পাবে না? আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ওসিয়ত যে করা যায় এই বিষয়টা অনেকে জানেন না। - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩) : আহলে কুরআনদের দাবী হল, আল্লাহ কেবল কুরআন হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন, হাদীছের হেফাযতের দায়িত্ব নেননি। উক্ত দাবী কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৪) : সন্তান নেশার সাথে জড়িত হলে করণীয় কী? শাসনের জন্য সামাজিক বা প্রশাসনিক সাহায্য নেয়া যাবে কি? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৪২) : ‘তোমরা বেশী বেশী আল্লাহর যিকির কর, যেন লোকেরা পাগল বলে’ (ফাযায়েলে আমল (বাংলা), পৃ. ৩৬৭) মর্মে বর্ণনাটি কি সঠিক? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (২) : আলু বোখারা খাওয়া কি যায়েয? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
প্রশ্ন (৩২) : কোন ব্যক্তি যদি খেজুর গাছ লাগায়, বীজ বপন করে কিংবা অন্য কিছু লাগায় এবং তার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিছগণ এর থেকে উপকৃত হয়; তাহলে কি সে এর প্রতিদান পাবে? - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ