উত্তর : জানা আবশ্যক যে, স্বামী স্ত্রীকে ত্বালাক্ব দিতে পারে, আর স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে খুলা’ ত্বালাক্ব নিতে পারে, তালাক্ব দিতে পারে না। ত্বালাক্ব হচ্ছে স্বামীর অধিকার। তাই স্বামী ত্বালাক্ব দিলে তবেই ত্বালাক্ব সংঘটিত হবে। নবী (ﷺ) বলেন, ‘ত্বালাক্ব তারই অধিকার যার রয়েছে সহবাসের অধিকার’ অর্থাৎ স্বামীর (ইবনু মাজাহ, হা/১৭০৫, ২০৮১; সনদ হাসান)। ‘খুলা‘ ত্বালাক্ব বলতে বুঝায়- কোন কিছুর বিনিময়ে স্ত্রীর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে স্বামী উক্ত বিনিময় গ্রহণ করে স্ত্রীকে বিদায় করে দেবেন। এ বিনিময়টি স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত মোহরানা হোক কিংবা এর চেয়ে বেশি সম্পদ হোক অথবা এর চেয়ে কম হোক। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আর স্ত্রীগণকে দেয়া কোন কিছু ফিরিয়ে নেয়া তোমাদের পক্ষে বৈধ নয়, তবে যদি তাদের উভয়ের আশঙ্কা হয় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা (বাস্তবিকই) রক্ষা করে চলতে পারবে না, তাহলে (সে অবস্থায়) স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে (স্বামী থেকে) নিষ্কৃতি পেতে চাইলে তাতে (স্বামী-স্ত্রীর) কারো কোন পাপ নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২২৯)। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ছাবিত ইবনু ক্বায়স-এর স্ত্রী নবী (ﷺ)-র কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ)! চরিত্রগত বা দ্বীনি বিষয়ে ছাবিত ইবনু ক্বায়স-এর উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য) পসন্দ করছি না। রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি কি তাঁর বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? (যা মোহরানা স্বরূপ দেয়া হয়েছিল) তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং এই মহিলাকে এক ত্বালাক্ব দিয়ে দাও’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭)।
উপরিউক্ত বিচার ও সমাধানের আলোকে আলেমগণ বলেন, ‘কোন নারী যদি তার স্বামীর সাথে সংসার করতে না পারে সেক্ষেত্রে বিচারক স্বামীকে বলবেন তাকে ত্বালাক্ব দিয়ে দিতে, বরং স্বামীকে ত্বালাক্ব দেয়ার নির্দেশ দিবেন। এর পদ্ধতি হল- স্বামী বিনিময় গ্রহণ করবেন কিংবা তারা দু’জন এ বিষয়ে একমত হবেন। অতঃপর স্বামী তার স্ত্রীকে বলবেন, ‘আমি তোমাকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম অথবা আমি তোমাকে খুলা’ ত্বালাক্ব দিলাম, অথবা এ জাতীয় অন্য কোন শব্দ। ত্বালাক্ব হচ্ছে স্বামীর অধিকার। স্বামী ত্বালাক্ব দিলে তবেই ত্বালাক্ব সংঘটিত হবে। নবী (ﷺ) বলেন, ‘ত্বালাক্ব তারই অধিকার যার রয়েছে সহবাসের অধিকার’ অর্থাৎ স্বামীর (ইবনু মাজাহ, হা/১৭০৫, ২০৮১; ইরওয়াউল গালীল, হা/২০৪১)। এ জন্যই আলেমগণ বলেন, যে ব্যক্তিকে বলপ্রয়োগ করে ত্বালাক্ব দেয়ার জন্য বাধ্য করা হয়েছে, আর সে ব্যক্তি যদি ঐ পীড়ন থেকে বাঁচার জন্যই ত্বালাক্ব দেয়, তাহলে সে ত্বালাক্ব সংঘটিত হবে না (আল-মুগনী, ১০/৩৫২ পৃ.)। শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, لا، ليس هناك خلعٌ إلا بمالٍ ‘খুলা’ ত্বালাক্বের সময় বিনিময় বা মাল প্রদান না করলে ত্বালাক্ব সংঘটিত হবে না (ইবনে বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)। মোল্লা খুসরু হানাফী বলেন, ‘খুলা’ ত্বালাক্বে উভয় পক্ষের সম্মতি অপরিহার্য (দুরারুল হুক্কাম ফী শারহি গুরারুল আহকাম, ১/৩৮৯ পৃ.)। অতএব উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, স্বামীর সম্মতি ও বিনিময় প্রদান ব্যতীত খুলা’ ত্বালাক্ব সম্পূর্ণ হয় না। তাই এ কথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় যে, এমতাবস্থায় কোর্ট ত্বালাক্ব দিলেও শরী‘আতের দৃষ্টিতে এই ত্বালাক্ব সংঘটিত হয় না।
দ্বিতীয়তঃ সাধারণত দু’বার পর্যন্ত ত্বালাক্ব দিয়ে ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু তৃতীয়বার ত্বালাক্ব দিলে সেটাই শেষ ত্বালাক্ব হিসাবে বিবেচিত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘ত্বালাক্বের অধিকার দু’বার, অতঃপর স্ত্রীকে হয় বিধিসম্মতভাবে রাখবে অথবা সদ্ভাবে বিদায় দেবে। আর স্ত্রীগণকে দেয়া কোন কিছু ফেরৎ নেয়া তোমাদের পক্ষে বৈধ নয়...’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২২৯-২৩০)। সুতরাং ত্বালাক্ব দেয়ার পর ইদ্দতের অর্থাৎ তিন তুহুর বা তিন মাসের মধ্যে স্বামী তার স্ত্রীকে বিনা শর্তে (অর্থাৎ নতুন বিবাহ ও মোহরানা ছাড়াই) ফিরিয়ে নেয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আর যদি তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চায়, তবে ইদ্দতের মধ্যে তাদের স্বামীরা তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে অধিক হকদার’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২২৮)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ত্বালাক্ব প্রদানের সঙ্গে সঙ্গেই বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয় না। বরং স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ইদ্দত অর্থাৎ তিন মাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকে। ইদ্দতের মধ্যে ত্বালাক্ব প্রত্যাহার করলে পূর্বের বিয়েই অক্ষুণ্ন থাকে (তাফসীরে কুরতুবী, সূরা আল-বাক্বারাহ-এর ২২৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা, ইবনে কাছীর, ফাতহুল ক্বাদীর)।
ফিরিয়ে নেয়ার পদ্ধতি : মুখে ফিরিয়ে নেয়ার কথা উচ্চারণ করা। যেমন আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম অথবা স্ত্রী মিলন বা সহবাস করা। আর যদি ইদ্দতকাল অতিবাহিত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে নতুন বিবাহ ও মোহরানা ধার্য করে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর খুলা‘ ত্বালাক্বের ইদ্দত এক হায়েয বা এক মাস’ (নাসাঈ, হা/৩৪৯৭; তিরমিযী, হা/১১৮৫)। আর সাধারণ ত্বালাক্বের ইদ্দত তিন তুহুর বা তিন মাস। ইদ্দতকাল অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় স্বামী-স্ত্রী এক হতে চাইলে, সেক্ষেত্রে ত্বালাক্বপ্রাপ্তা স্ত্রীকে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে নেয়া জায়েয। এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর সম্মতি, অভিভাবক এবং দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতি এবং নতুন মোহরানা অপরিহার্য (তিরমিযী, ৩/৪৮৩; আল-মুগনী, ৮/৯৭; মাজমূঊল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, ৩২/৩৪৪; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২০/২৩৫-২৩৬; আশ-শারহুল মুমতি‘, ১২/৪৭১; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২২৩৫৭২)। হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মা‘কীল ইবনু ইয়াসার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর বোন এক ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। সে তাকে ত্বালাক্ব দিয়েছিল। অতঃপর তাকে ফিরিয়ে না নিয়ে তার থেকে দূরে অবস্থান করতে থাকে, আর এভাবেই তার ইদ্দতকাল অতিবাহিত হয়ে গেল, পরক্ষণেই সে আবার তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল। মা‘কীল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এতে খুবই রাগান্বিত হলেন এবং তিনি বললেন, সময় থাকতে ফিরিয়ে নিল না, এখন আবার প্রস্তাব পাঠাচ্ছে! তিনি বিয়ের ব্যাপারে তাদের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন। এরপর আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করেনঃ
وَ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ اَنۡ یَّنۡکِحۡنَ اَزۡوَاجَہُنَّ اِذَا تَرَاضَوۡا بَیۡنَہُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ
‘আর তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে ত্বালাক্ব দাও এবং তারা তাদের ‘ইদ্দতকাল পূর্ণ করে, অতঃপর তারা যদি বিধিমত পরস্পর সম্মত হয়, তাহলে স্ত্রীগণ নিজেদের স্বামীদেরকে পুনর্বিবাহ করতে চাইলে তাদেরকে বাধা দিও না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৩২)। এরপর রাসূল (ﷺ) মা‘কীল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ডাকলেন এবং তাঁর সম্মুখে আয়াতটি পাঠ করলেন। তিনি তার অহমিকা পরিত্যাগ করে আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৩১; আবূ দাঊদ, হা/২০৮৭)।
প্রশ্নকারী : তাওহীদ, ঢাকা।