শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদাসমূহ

-মূল: শায়খ হাফিয ইবনু আহমাদ আল-হাকামী
- অনুবাদক: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*


(২য় কিস্তি) 

প্রশ্ন (১৭):  لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই’ এ কথার দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

شَهِدَ اللّٰهُ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ١ۙ وَ الْمَلٰٓىِٕكَةُ وَ اُولُوا الْعِلْمِ قَآىِٕمًۢا بِالْقِسْطِ١ؕ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُؕ

‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। আর ফেরেশতামণ্ডলী ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি মহা পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়’ (সূরা আলে ইমরান: ১৮)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, فَاعْلَمْ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ ‘অতএব তুমি জানো যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই’ (সূরা মুহাম্মাদ: ১৯)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَا مِنْ اِلٰهٍ اِلَّا اللّٰهُ ‘বস্তুত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই’ (সূরা আলে ইমরান: ৬২)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, مَا اتَّخَذَ اللّٰهُ مِنْ وَّلَدٍ وَّ مَا كَانَ مَعَهٗ مِنْ اِلٰهٍ ‘না আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেছেন, না তাঁর সাথে অন্য কোন উপাস্য আছে’ (সূরা মুমিনূন, ২৩/৯১)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَابْتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا   ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, যদি তাদের কথা মত তাঁর সাথে অন্য কোন উপাস্য থাকত, তাহলে তারা অবশ্যই আরশের মালিকের নৈকট্য হাছিলের পথ তালাশ করত’ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৪২ প্রভৃতি)।
-----

প্রশ্ন (১৮):  لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ -‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই- এ কথার সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ কী?

উত্তর: এ কথার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য হওয়ার কথা অস্বীকার করে শুধু আল্লাহর জন্য ইবাদত সাব্যস্ত করা। তাঁর ইবাদতে কোন অংশীদার নেই। যেমন তাঁর রাজ্যে কারও কোন অংশ নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ذٰلِكَ بِاَنَّ اللّٰهَ هُوَ الْحَقُّ وَ اَنَّ مَا يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهٖ هُوَ الْبَاطِلُ وَ اَنَّ اللّٰهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيْرُ   ‘এটা একারণে যে, কেবল আল্লাহই সত্য এবং তিনি ব্যতীত যাকে তারা ডাকে সবই মিথ্যা। আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোচ্চ ও মহিয়ান’ (সূরা আল-হজ্জ: ৬২)।

প্রশ্ন (১৯): যে সমস্ত শর্ত ব্যতীত  لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই’- পাঠ করাতে কোন লাভ নেই সেগুলো কী কী?

উত্তর: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর শর্ত হচ্ছে সাতটি। ১- এই কালেমার অর্থ অবগত হওয়া। এর অর্থ হলো-এক আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই। এখানে দু’টি দিক রয়েছে: একটি হচ্ছে নেতিবাচক অপরটি হচ্ছে ইতিবাচক। নেতিবাচক দিকটি হলো لاَ إِلَهَ ‘নেই কোন উপাস্য’। এই বাক্যের মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত যত বস্তুর উপাসনা করা হয় তার সব কিছুই অস্বীকার করা হয়েছে। ইতিবাচক দিক হলো- إِلَّا اللهُ ‘আল্লাহ ব্যতীত’-এর মাধ্যমে শুধু এক আল্লাহ্র ইবাদতকেই সুদৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। ২- অন্তর দিয়ে উক্ত অর্থের উপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা। ৩-এর অর্থের প্রতি প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্যভাবে মস্তক অবনত করা ও অনুগত থাকা। ৪- পরিপূর্ণভাবে তা গ্রহণ করে নেয়া। এর চাহিদা ও দাবীর কোন অংশকেই প্রত্যাক্ষান না করা। ৫- একনিষ্ঠভাবে তা পাঠ করা। ৬- অন্তরের গভীর থেকে তা সত্য বলে মেনে নেয়া। শুধু মুখের মাধ্যমে নয় এবং ৭- এই কালেমাকে এবং তার অনুসারীদেরকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসা। এই কালেমার কারণেই কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা আবার কাউকে শত্রু মনে করা।

প্রশ্ন (২০): لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই’-এর সাক্ষ্য দেয়ার পূর্বে তার অর্থ সম্পর্কে অবগত হওয়া যে শর্ত, কুরআন ও সুন্নাহ হতে তার দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِلَّا مَنْ شَهِدَ بِالْحَقِّ وَ هُمْ يَعْلَمُوْنَ ‘কেবল তারা ব্যতীত যারা জেনে বুঝে সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে’ (সূরা আয-যুখরুফ: ৮৬)। অর্থাৎ তারা মুখের মাধ্যমে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করার পূর্বে অন্তর দিয়ে তার অর্থ উপলব্ধি করে থাকে। নবী করীম (ﷺ) -এর বাণী, مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‘যে ব্যক্তি অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে মৃত্যুবরণ করল যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[১]

প্রশ্ন (২১): لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মর্মার্থ যে অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা শর্ত তার দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوْا وَ جٰهَدُوْا بِاَمْوَالِهِمْ وَ اَنْفُسِهِمْ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ١ؕ اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الصّٰدِقُوْنَ.

‘তারা ব্যতীত মুমিন নয়, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। অতঃপর তাতে সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে তাদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করে। তারাই হল (ঈমানের দাবীতে) সত্যবাদী’ (সূরা আল-হুজরাত : ১৫)। নবী করীম (ﷺ)-এর বাণী,

أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ لَا يَلْقَى اللهَ بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ فِيْهِمَا إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ.

‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যে এ বিষয় দু’টোর প্রতি নিঃসন্দেহে বিশ্বাস রেখে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[২] একদা নবী করীম (ﷺ) আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, مَنْ لَقِيْتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْحَائِطَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ ‘এ বাগানের (দেয়ালের) বাইরে যার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে বলো- ‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও’।[৩]

প্রশ্ন (২২): لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অন্যতম শর্ত হচ্ছে, এর অর্থের প্রতি অনুগত থাকা। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَنْ يُّسْلِمْ وَجْهَهٗۤ اِلَى اللّٰهِ وَ هُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰى ‘আর যে ব্যক্তি তার চেহারাকে সমর্পণ করল আল্লাহর দিকে সৎকর্মশীল (মুমিন) অবস্থায়, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করল এক মযবুত হাতল’ (সূরা লুক্বমান: ২২)। নবী করীম (ﷺ) বলেন, لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُوْنَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ তার মনের প্রবৃত্তি আমার আনীত দ্বীন ও শরী‘আতের অধীন না হবে’।[৪]

প্রশ্ন (২৩): لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অন্যতম শর্ত হচ্ছে, এর মর্মার্থকে গ্রহণ করে নেয়া। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর দলীল কী?

উত্তর: যারা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মর্মার্থকে গ্রহণ করে নেয়নি, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اُحْشُرُوا الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا وَ اَزْوَاجَهُمْ وَ مَا كَانُوْا يَعْبُدُوْنَۙ.

‘(ফেরেশতাদের বলা হবে) তোমরা জমা কর যালেমদের ও তাদের সাথীদের এবং যাদের ওরা পূজা করত’ (সূরা আছ-ছাফফাত: ২২)। একই সূরার একটু পরেই মহান আল্লাহ বলেন,

اِنَّهُمْ كَانُوْۤا اِذَا قِيْلَ لَهُمْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ١ۙ يَسْتَكْبِرُوْنَ۠ۙ۰۰۳۵ وَ يَقُوْلُوْنَ اَىِٕنَّا لَتَارِكُوْۤا اٰلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنٍؕ.

‘যখন তাদেরকে বলা হত, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই, তখন তারা দম্ভ করত। আর বলত, আমরা কি একজন উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব?’ (সূরা আছ-ছাফফাত: ৩৫-৩৬)। নবী করীম (ﷺ) বলেন,

مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالعِلْمِ كَمَثَلِ الغَيْثِ الكَثِيْرِ أَصَابَ أَرْضًا فَكَانَ مِنْهَا نَقِيَّةٌ قَبِلَتِ المَاءَ فَأَنْبَتَتِ الْكَلَأَ وَالعُشْبَ الكَثِيْرَ وَكَانَتْ مِنْهَا أَجَادِبُ أَمْسَكَتِ المَاءَ فَنَفَعَ اللهُ بِهَا النَّاسَ فَشَرِبُوْا وَسَقَوْا وَزَرَعُوْا وَأَصَابَتْ مِنْهَا طَائِفَةً أُخْرَى إِنَّمَا هِيَ قِيْعَانٌ لَا تُمْسِكُ مَاءً وَلَا تُنْبِتُ كَلَأً فَذَلِكَ مَثَلُ مَنْ فَقُهَ فِيْ دِيْنِ اللهِ وَنَفَعَهُ مَا بَعَثَنِي اللهُ بِهِ فَعَلِمَ وَعَلَّمَ وَمَثَلُ مَنْ لَمْ يَرْفَعْ بِذَلِكَ رَأْسًا وَلَمْ يَقْبَلْ هُدَى اللهِ الَّذِيْ أُرْسِلْتُ بِهِ

‘আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যে হেদায়াত ও ইলম দিয়ে পাটিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত হল যমীনের উপর পতিত প্রবল বর্ষণের ন্যায়। কোন কোন ভূমি থাকে উর্বর যা সে পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা এবং সবুজ তরুলতা উৎপাদন করে। আর কোন কোন ভূমি থাকে কঠিন যা পানি আটকে রাখে। পরে আল্লাহ তা‘আলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন; তারা নিজেরা পান করে ও (পশুপালকে) পান করায় এবং তা দ্বারা চাষাবাদ করে। আবার কোন কোন যমীন রয়েছে যা একেবারে মসৃণ ও সমতল; তা না পানি আটকে রাখে, আর না কোন ঘাসপাতা উৎপাদন করে। এই হল সেই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দ্বীনের জ্ঞানার্জন করে এবং আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাতে সে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা করে এবং অপরকে শিখায়। আর সে ব্যক্তিরও দৃষ্টান্ত- যে দিকে মাথা তুলে দেখে না এবং আল্লাহ্র যে হেদায়াত নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তা গ্রহণও করে না’।[৫]

প্রশ্ন (২৪): কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ইখলাছ বা একনিষ্ঠতার এর দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَلَا لِلّٰهِ الدِّيْنُ الْخَالِصُ ‘মনে রেখ! একনিষ্ঠ আনুগত্য কেবল আল্লাহ্রই প্রাপ্য’ (সূরা আয-যুমার: ৩)। তিনি আরো বলেন, فَاعْبُدِ اللّٰهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَؕ ‘অতএব তুমি আল্লাহ্র ইবাদত কর তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য সহকারে’ (সূরা আয-যুমার: ২)। নবী করীম (ﷺ) বলেন, أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِيْ يَوْمَ القِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ ‘ক্বিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি, যে একনিষ্ঠচিত্তে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই) পাঠ করবে’।[৬] নবী করীম (ﷺ) আরো বলেন, فَإِنَّ اللهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللهِ ‘আল্লাহ তা‘আলা তো এমন ব্যক্তির প্রতি জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই) পাঠ করবে’।[৭]

প্রশ্ন (২৫): অন্তরের গভীরে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মর্মকে সত্য বলে গ্রহণ করার পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ يُّتْرَكُوْۤا اَنْ يَّقُوْلُوْۤا اٰمَنَّا وَ هُمْ لَا يُفْتَنُوْنَ۰۰۲ وَ لَقَدْ فَتَنَّا الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَ لَيَعْلَمَنَّ الْكٰذِبِيْنَ

‘মানুষ কি মনে করে যে, তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে কেবল এতটুকু বললেই যে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অথচ তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না। আমরা তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি। অতএব আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন কারা সত্যবাদী এবং অবশ্যই জেনে নিবেন কারা মিথ্যাবাদী’ (সূরা আল-‘আনকাবূত: ২-৩)। নবী করীম (ﷺ) বলেন,

مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ صِدْقًا مِنْ قَلْبِهِ إِلَّا حَرَّمَهُ اللهُ عَلَى النَّارِ

‘যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল’-তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন’।[৮] নবী করীম (ﷺ) একদা কোন একজন গ্রাম্য ব্যক্তিকে দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিলেন। গ্রাম্য লোকটি ফেরত যাওয়ার সময় বলল, وَاللهِ لَا أَزِيْدُ عَلَى هَذَا وَلَا أَنْقُصُ مِنْهُ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ أَفْلَحَ إِنْ صَدَقَ ‘আল্লাহর কসম! আমি এর চেয়ে বেশীও করব না কমও করব না। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, أَفْلَحَ إِنْ صَدَقَ ‘লোকটি যদি তার কথার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে তাহলে অবশ্যই সফলকাম হবে’।[৯]

প্রশ্ন (২৬): لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মর্মার্থকে ভালোবাসা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অন্যতম শর্ত। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এর কোন দলীল আছে কি?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَنْ يَّرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهٖ فَسَوْفَ يَاْتِي اللّٰهُ بِقَوْمٍ يُّحِبُّهُمْ وَ يُحِبُّوْنَهٗۤ ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে যদি কেউ স্বধর্ম থেকে ফিরে যায়, তাহলে আল্লাহ সত্বর এমন একটি দল এনে দিবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসবেন ও তারা আল্লাহকে ভালোবাসবে’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ৫৪)। নবী করীম (ﷺ) বলেন,

ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلَاوَةَ الْإِيْمَانِ أنْ يَّكُوْنَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُوْدَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ

‘তিনটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে রয়েছে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করবে। (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহ্র জন্য ভালোবাসা এবং (৩) আল্লাহ তা‘আলা কুফর হতে মুক্তি প্রদানের পর যে কুফর-এ প্রত্যাবর্তনকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপসন্দ করা’।[১০]

প্রশ্ন (২৭): لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর কারণে কারও সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে আবার এরই কারণেই কারও সাথে শত্রুতা পোষণ করতে হবে-এ কথার দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُوْدَ وَ النَّصٰرٰۤى اَوْلِيَآءَ١ؔۘ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ١ؕ وَ مَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظّٰلِمِيْنَ۰۰۵۱ فَتَرَى الَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ يُّسَارِعُوْنَ فِيْهِمْ يَقُوْلُوْنَ نَخْشٰۤى اَنْ تُصِيْبَنَا دَآىِٕرَةٌ١ؕ فَعَسَى اللّٰهُ اَنْ يَّاْتِيَ بِالْفَتْحِ اَوْ اَمْرٍ مِّنْ عِنْدِهٖ فَيُصْبِحُوْا عَلٰى مَاۤ اَسَرُّوْا فِيْۤ اَنْفُسِهِمْ نٰدِمِيْنَؕ۰۰۵۲ وَ يَقُوْلُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اَهٰۤؤُلَآءِ الَّذِيْنَ اَقْسَمُوْا بِاللّٰهِ جَهْدَ اَيْمَانِهِمْ١ۙ اِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ١ؕ حَبِطَتْ اَعْمَالُهُمْ فَاَصْبَحُوْا خٰسِرِيْنَ۰۰۵۳ يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَنْ يَّرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهٖ فَسَوْفَ يَاْتِي اللّٰهُ بِقَوْمٍ يُّحِبُّهُمْ وَ يُحِبُّوْنَهٗۤ١ۙ اَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اَعِزَّةٍ عَلَى الْكٰفِرِيْنَ١ٞيُجَاهِدُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ وَ لَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لَآىِٕمٍ١ؕ ذٰلِكَ فَضْلُ اللّٰهِ يُؤْتِيْهِ مَنْ يَّشَآءُ١ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِيْمٌ۰۰۵۴ اِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللّٰهُ وَ رَسُوْلُهٗ وَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوا الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَ يُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَ هُمْ رٰكِعُوْنَ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কর না, তারা পরস্পরের বন্ধু, আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, নিশ্চয় সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে; নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না। এ কারণেই যাদের অন্তরে পীড়া রয়েছে, তাদেরকে তোমরা দেখবে যে, তারা দৌড়ে তাদের (কাফিরদের) মধ্যে প্রবেশ করছে এবং তারা বলে আমাদের ভয় হচ্ছে যে, আমাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে না-কি! অতএব আশা করা যায় যে, অচিরেই আল্লাহ (মুসলিমদের) পূর্ণ বিজয় দান করবেন অথবা অন্য কোন বিষয় বিশেষভাবে তার পক্ষ হতে (দিবেন)। ফলে তারা নিজেদের অন্তরে লুকানো মনোভাবের কারণে লজ্জিত হবে। আর মুসলিমরা বলবে, এরাই কি তারা! যারা অতি দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর নামে শপথ করত যে তারা তোমাদের সাথেই আছে; এদের সমস্ত কর্মই ব্যর্থ হয়ে গেল, ফলে তারা অকৃতকার্য হল। হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি স্বীয় দ্বীন হতে ফিরে যায়, তবে (এতে ইসলামের কোন ক্ষতি নেই) কেননা আল্লাহ সত্বরই (তাদের স্থলে) এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালোবাসবে। তারা মুসলিমদের প্রতি মেহেরবান থাকবে, কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, আর তারা কোন নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করবে না; এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন বস্তুত আল্লাহ প্রাচুর্যদানকারী, মহাজ্ঞানী। তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) এবং মুমিনরা যারা ছালাত আদায় করে এবং যাকাত প্রদান করে এবং তারা বিনয়ী। তামাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ ব্যতীত কেউ নয়’ (সূরা আল-মায়েদাহ: ৫১-৫৫)। আল্লাহ তা‘আলার বাণী, يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْۤا اٰبَآءَكُمْ وَ اِخْوَانَكُمْ اَوْلِيَآءَ اِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْاِيْمَانِ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের পিতা ও ভাইদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমানের চাইতে কুফরকে প্রিয় মনে করে’ (সূরা আত-তওবাহ: ২৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, لَا تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْيَوْمِ الْاٰخِرِ يُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗ  ‘আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায়কে তুমি পাবে না, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধচারণ কারীদের সাথে বন্ধুত্ব করবে’ (সূরা আল-মুজাদালাহ: ২২)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوْا عَدُوِّيْ وَ عَدُوَّكُمْ اَوْلِيَآءَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কর না’ (সূরা আল-মুমতাহিনা: ১)।

প্রশ্ন (২৮): মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করার দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

لَقَدْ مَنَّ اللّٰهُ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اِذْ بَعَثَ فِيْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْا عَلَيْهِمْ اٰيٰتِهٖ وَ يُزَكِّيْهِمْ وَ يُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ

‘বিশ্বাসীদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন ও তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত (কুরআন ও সুন্নাহ) শিক্ষা দেন’ (সূরা আলে ইমরান: ১৬৪)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ عَزِيْزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيْصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِيْنَ رَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ ‘নিশ্চয় তোমাদের নিকট এসেছেন তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল, যার নিকট তোমাদের দুঃখ-কষ্ট বড়ই দুঃসহ। তিনি তোমাদের কল্যাণের আকাক্সক্ষী তিনি মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু’ (সূরা আত-তওবাহ: ১২৮)। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اللّٰهُ يَعْلَمُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُهٗ ‘অথচ আল্লাহ জানেন তুমি নিশ্চয়ই তাঁর রাসূল’ (সূরা আল-মুনাফিকূন: ১)।

প্রশ্ন (২৯): মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করার অর্থ কী?

উত্তর: যবানের উক্তি অনুযায়ী অন্তরের গভীর থেকে দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করা যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র বান্দা এবং সমস্ত মানব ও জিন্ন জাতির প্রতি তাঁর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يٰۤاَيُّهَا النَّبِيُّ اِنَّاۤ اَرْسَلْنٰكَ شَاهِدًا وَّ مُبَشِّرًا وَّ نَذِيْرًاۙ۰۰۴۵ وَّ دَاعِيًا اِلَى اللّٰهِ بِاِذْنِهٖ وَ سِرَاجًا مُّنِيْرًا .

‘হে নবী! নিশ্চয় আমরা তোমাকে প্রেরণ করেছি, সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীরূপে তাঁর অনুমতিক্রমে এবং উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে’ (সূরা আল-আহযাব: ৪৫-৪৬)। সুতরাং তিনি অতীতের যে সকল ঘটনা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন এবং আগামীতে যেসকল ঘটনা ঘটবে বলে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য বলে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। এমনিভাবে তিনি যা হালাল করেছেন তা হালাল হিসাবে মেনে নেয়া এবং যা হারাম করেছেন তা হারাম হিসাবে বিশ্বাস করা, তিনি যা আদেশ করেছেন তা অবনত মস্তকে মেনে নেয়া, যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা, তাঁর শরী‘আতের অনুসরণ করা, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করা, তাঁর ফায়ছালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ওয়াজিব। এ বিশ্বাস রাখা যে, তাঁর আনুগত্য মানেই আল্লাহ্র আনুগত্য এবং তাঁর নাফরমানীর অর্থই আল্লাহর নাফরমানী। কেননা তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে আল্লাহর রিসালাত মানব জাতির নিকট পৌঁছিয়েছেন। দ্বীনকে তাঁর মাধ্যমে পরিপূর্ণ করার পূর্বে এবং দ্বীনের যাবতীয় আহকাম (বিধি-বিধান) পরিপূর্ণরূপে পৌঁছানোর পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মৃত্যু দান করেননি। তিনি তাঁর উম্মতকে এমন একটি সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার মাঠে রেখে গেছেন যাতে দিন এবং রাত একই সমান। বদনসীব ও ক্ষতিগ্রস্ত লোক ব্যতীত অন্য কেউ এই রাজ পথ ছেড়ে অন্য পথে চলতে পারে না।[১১] এই অধ্যায়ে আরো মাসআলা রয়েছে। যার বিবরণ সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন (৩০): মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করার শর্ত কী? মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা ব্যতীত কি لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে?

উত্তর: পূর্বেই বলা হয়েছে, কোন বান্দা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল’ এ দু’টি বিষয়ের সাক্ষ্য প্রদান করা ব্যতীত কেউ ইসলামে প্রবেশ করতে পারে না। এ দু’টি বিষয়ের একটি অপরটির জন্য আবশ্যক। তাই لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য যে শর্তসমূহ আবশ্যক, مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ ‘মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহ্র রাসূল’- এর সাক্ষ্য প্রদান করার ক্ষেত্রেও সে শর্তসমূহ আবশ্যক।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)



* পরিচালক, দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।

[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬ ‘ঈমান’ অধ্যায়; মিশকাত, হা/৩৭।

[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭ ‘ঈমান’ অধ্যায়; মিশকাত, হা/৫৯১।

[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩১ ‘ঈমান’ অধ্যায়; মিশকাত, হা/৩৯।

[৪]. হাদীছটির সনদ হাসান, ইনশাআল্লাহ। হাসান ইবনু সুফিয়ান হাদীছটি তাঁর নিজ গ্রন্থ ‘আরবাঈন’-এ বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম বাগাবী হাদীছটি আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে ‘শরহুস সুন্নাহ’, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৩ এবং তারীখুল বাগদাদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৬৯-এ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু নু‘আই ইবনু হাম্মাদ এর দুর্বলতার কারণে হাদীছটির সনদ দুর্বল। ইবনুল আসাকির বলেন, উক্ত হাদীছটি গরীব। আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীছটি যঈফ, মিশকাত, হা/১৬৭। হাদছিটির পর্যালোচনা ইবনু আছীম, হা/১৫-এর ‘সুন্নাহ’ নামক গ্রন্থে করা হয়েছে। কিন্তু ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছটির সনদ ছহীহ বলেছেন। [নু‘আইম ইবনু হাম্মাদ হাদীছের ক্ষেত্রে বেশি ভুল করত, কিন্তু তিনি হলেন একজন ফিক্বাহবিদ এবং ফারায়েয বিশেষজ্ঞ]। হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইবনু আদী তার ভুলগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে বলেন, তার অন্যান্য হাদীছগুলো সঠিক। দেখুন! নু‘আইম ইবনু হাম্মাদ-এর জীবনী ‘তানকীল’ নামক গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৫০৭ নং পৃষ্ঠায়। হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, আবূ আহমাদ আল-হাকীম বলেন, সে বেশ কিছু হাদীছে ভুল করেছে। ইবনু আদী তার ভুলগুলো পর্যবেক্ষণ করার পর তার সম্পর্কে তার মন্তব্যটি হলো-তার সম্পর্কে সর্বোত্তম মন্তব্য। ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘মীযান’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ৮০টি হাদীছ। যেন মনে হচ্ছে, তিনি নু‘আইম এর বিরুদ্ধে খুবই কঠিন সমালোচনা করেছেন। কিন্তু এই হাদীছটি তার অন্তর্ভুক্ত নয়।

[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৮২ ‘ফযীলত’ অধ্যায়; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৫৮৮; মিশকাত, হা/১৫০।

[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৮৪৫।

[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৪২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩ ‘মসজিদ ও ছালাতের স্থাসমূহ’ অধ্যায়।

[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৩২; মিশকাত, হা/২৫।

[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬,১৮৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/১১ ‘ঈমান’ অধ্যায়; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৯০; আবূ দাঊদ, হা/৩৯১।

[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/১৬,২১,৬৯৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩ ‘ঈমান’ অধ্যায়; মিশকাত, হা/৮।

[১১]. এখানে লেখক ইরবায বিন সারিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত একটি মারফূ‘ হাদীছের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। বিস্তারিত দেখুন; আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন-অনুবাদক!!




প্রসঙ্গসমূহ »: আক্বীদা বা বিশ্বাস
ইসলামী শরী‘আতে খাওয়ার আদব - আল-ইখলাছ ডেস্ক
মুহাররম ও আশূরা : গুরুত্ব, করণীয় ও বর্জনীয় - আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (১৪তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
বিদ‘আত পরিচিতি (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
সালাম প্রদানের গুরুত্ব ও মর্যাদা - মুহাম্মাদ আরিফ হুসাইন
কুরআনী প্রবাদ সংকলন : তাৎপর্য ও শিক্ষা - প্রফেসর ড. লোকমান হোসেন
সুন্নাতের আলো বিদ‘আতের অন্ধকার (৯ম কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
সালাম প্রদানের গুরুত্ব ও মর্যাদা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আরিফ হুসাইন
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও তার সমাধান - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
বিদ‘আত পরিচিতি (১৭তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
রামাযান : কুরআন নাযিলের মাস - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
তাওহীদ প্রতিষ্ঠার উপায় (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ