শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

 যাদুটোনার শারঈ সমাধান

-মূল: ড. আব্দুল মুহসিন ইবনে মুহাম্মাদ আল-কাসিম*
-অনুবাদ: মাসঊদুর রহমান**


(৫ম কিস্তি) 

২১- যাদু দূর করার দু’টি উপায়

প্রথম উপায় : যাদু দূর করণার্থে আল্লাহর নিকট  দুআ করা এবং আল্লাহর প্রতি একাগ্র হওয়া। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)  রাসূল (ﷺ) এর যাদু সম্পর্কে বলেন

كَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَفْعَلُ الشَّىْءَ وَمَا يَفْعَلُهُ حَتَّى إِذَا كَانَ ذَاتَ يَوْمٍ أَوْ ذَاتَ لَيْلَةٍ دَعَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ثُمَّ دَعَا ثُمَّ دَعَا ....

‘আসাম নামে বানু যুরাইক সম্প্রদায়ের এক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যাদু করল। তিনি বলেন, এ যাদুর কারণে এমনও হত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্মরণ হত যে কোন (পার্থিব) কাজ তিনি করছেন, অথচ (প্রকৃতভাবে) তিনি তা করছেন না। পরিশেষে একদিনে কিংবা এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দু’আ করলেন, আবার দু‘আ করলেন, আবার দু‘আ করলেন...’।[১] অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দু‘আ কবুল করলেন।

অতএব দু‘আ করার সময় মিনতি ও অনুনয়ের সাথে দু‘আ করা এবং দু‘আর যে আদব-শিষ্টাচারগুলো রয়েছে সেগুলো সহকারে দু‘আ করা। যেমন, ক্বিবলামুখী হয়ে দু‘আ করা, দু‘আ কবুলের যে সময়গুলো রয়েছে সেই সময়গুলো অনুসন্ধান করে উক্ত সময়ে দু‘আ করা। যথা:  রাতের শেষ তৃতীয় অংশে দু‘আ করা  কেননা আল্লাহ তা‘আলা ঐ সময় বলেন,

مَنْ يَدْعُوْنِيْ فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ؟ مَنْ يَسْأَلُنِيْ فَأُعْطِيَهُ؟ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِيْ فَأَغْفِرَ لَهُ

‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব’।[২] রাসূল (ﷺ) আরও বলেন,

إِنَّ فِي اللَّيْلِ لَسَاعَةً لَا يُوَافِقُهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ يَسْأَلُ اللهَ فِيْهَا خَيْرًا مِنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاه وَذَلِكَ كل لَيْلَة

‘রাত্রে এমন একটা সময় অবশ্যই আছে, কোন মুসলিম যদি এ সময়টা প্রাপ্ত হয় এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকর কোন কিছু চায় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে তা অবশ্যই দান করেন। এ সময়টা প্রতি রাত্রেই আসে’।[৩]

দ্বিতীয়তঃ সর্বদা বেশি বেশি করে ইস্তিগফার পাঠ করা। কেননা এটা দুঃখ কষ্ট ও বিপদ আপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় একটি মাধ্যম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ١ؕ اِنَّهٗ كَانَ غَفَّارًاۙ۰۰۱۰ يُّرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَيْكُمْ مِّدْرَارًاۙ۰۰۱۱ وَّ يُمْدِدْكُمْ بِاَمْوَالٍ وَّ بَنِيْنَ وَ يَجْعَلْ لَّكُمْ جَنّٰتٍ وَّ يَجْعَلْ لَّكُمْ اَنْهٰرًا

‘অতঃপর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনিতো মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটাবেন। তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা’ (সূরা আন-নূহ: ১০-১২)।

২২- কোন্ কোন্ জিনিস দিয়ে যাদু সংঘটিত হয়?

বিভিন্ন পদ্ধতিতে জাদু করা হয়ে থাকে। নিম্নে তার কিছু আলোকপাত করা হল:

  1. খাদ্যের মাধ্যমে জাদু করা হয় : যখন কোন খাদ্যে জাদু করা হয়। অতঃপর যাদুকৃত ব্যক্তি না জেনেই ঐ খাদ্য খায়। তখন ঐ জাদু তার ওপর আল্লাহ তা‘আলার আদেশে প্রভাব ফেলে। আল্লাহর আদেশ ছাড়া যাদু কোন প্রভাব ফেলতে পারে না।
  2. পানীয় জাতীয় দ্রব্যের মাধ্যমে যাদু করা হয়। অতঃপর যাদুকৃত ব্যক্তি ঐ জুস, শরবত, চা বা এই জাতীয় পানীয় দ্রব্য পান করার মাধ্যমে যাদুগ্রস্ত হয়।
  3. খাওয়া বা পান করার মাধ্যমে যাদু একটি আঠালো জাতীয় পদার্থ নিয়ে আসে যা পাকস্থলীর সাথে লেগে থাকে। বিধায় জাদুগ্রস্থ ব্যক্তির পেটে জাদু স্থায়ীভাবে থেকে যায়। অতঃপর জাদুগ্রস্থ ব্যক্তি যদি বমি করার মাধ্যমে এই জাতীয় যাদু দূর করতে না পারে তাহলে তার পেটে সমস্যা হয়।
  4. যাদুটি ছিটিয়ে দেয়ার মাধ্যমে হয় অর্থাৎ যাদুটি মাটিতে একটি জায়গায় স্থাপন করা হয়। তাই যাকে যাদু করা হয়েছে সে যদি এটার উপর পা রাখে তখন এটা আল্লাহর ইচ্ছায় প্রভাবিত করে। আর আল্লাহ তার যে বান্দাকে সুরক্ষিত বা হেফাজত করেন, যাদু তাকে প্রভাবিত করে না।
  5. লেখার মাধ্যমে যাদু করা : যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির কোন চিহ্ন বা ছাপ  ছাড়াই তেলেসমতি বা যাদু মন্ত্র ব্যবহার করা। আর এটা আল্লাহ তা‘আলার অনুমতিতে যাদুগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে ক্ষীণভাবে। কেননা জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির ছাপ ও চিহ্ন ব্যবহার করা যাদু করার ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় বিষয়।
  6. গিরা দেয়ার মাধ্যমে জাদু করা- আর এটা এইভাবে হয় যে  যাদুকর জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির কোন চিহ্ন বা ছাপ গ্রহণ করে। যেমন: চুল অথবা ব্যবহৃত পোশাকের কোন অংশ। অতঃপর সেটাতে সুতার সাহায্যে গিরা দিয়ে শয়তানের সাহায্যে তাতে ফুঁক দেয়। আর এভাবেই রাসূল (ﷺ)-কে যাদু করা হয়েছিল চিরুনি ও চিরুনিতে থাকা আছড়ানো চুলের সাহায্যে। অতঃপর তাতে যাদুর গিরা দেয়া হয়েছিল তারপর ওই যাদুকৃত চিরনি একটি খেজুর বৃক্ষের সাহায্যে কূপে নিক্ষেপ করা হয়। যা ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীছে এসেছে।
২৩- যাদুর অবস্থান জানার পদ্ধতি

যাদুর অবস্থান জানার দু’টি বৈধ পন্থা রয়েছে। যথা-

  • হয়তো পাহারাদার জিন্ন দিয়ে যাদুগ্রস্ত বক্ত্যির শরীরে কুরআন তেলাওয়াত করার মাধ্যমে যাদুর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করা হয় এবং তা বের করা হয়।
  • অথবা আল্লাহ তা‘আলা যাদুগ্রস্ত ব্যক্তিকে স্বপ্নের মাধ্যমে তা জানার অনুগ্রহ দান করেন। অতঃপর সে স্বপ্নে তার অবস্থা জানতে পারে।
২৪- যাদু টোনার সমাধান পদ্ধতি

সব ধরনের যাদুর সমাধান পদ্ধতি রয়েছে নিম্নে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

প্রথম পদ্ধতি : যখন জাদুটা করা হবে পানাহার  দ্বারা, তখন তার সমাধান হলো তা পেট থেকে বের করতে হবে হোক  সেটা পায়খানার রাস্তা দিয়ে অথবা বমি করার মাধ্যমে। পেট থেকে যাদু বের করার পদ্ধতিসমূহ নিম্নরূপ:

  1. আধা কেজি সোনামুখি পাতা (সানা মাক্কি) উপস্থিত কর।
  2. দুই কাপ বা মগ পানি নিয়ে একটি জগে রাখ।
  3. এক মুষ্টি করে সোনাপাতা (সানা মার্কিন) নিয়ে দুইবার জগে রাখ।
  4. সোনাপাতা (সানা মাক্কি)ও পানি  ভর্তি জগ আগুনে দিয়ে তিন মিনিট রেখে পানিটা ফুিটয়ে নেয়া।
  5. যখন ফজরের সময় ঘুম হতে জাগবে তখন উক্ত জগ হতে দুই মগ ঠাণ্ডা পানি পান করবে।
  6. দুই মগ পানি পান করার পরে মোটামুটি চার ঘণ্টা হাঁটাহাটি করবে।
  7. যখন সোনা পাতা (সানা মাক্কি) খাবে তখন অন্তত ৪ ঘণ্টা অন্য কোন খাবার খাবে না যাতে করে উক্ত পাতা পাকস্থলীতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
  8. সোনা পাতা (সানা মাক্কি) পান করার পরপরই পেটে ব্যথা অনুভব করবে আর এটা সাধারণ বিষয় যাতে করে সোনা পাতা পেটে থাকা উচ্ছিষ্ট বা অতিরিক্ত যা কিছু রয়েছে তা বের করে দিতে পারে।
  9. যে ব্যক্তি সোনা পাতা (সানা মাক্কি) পান করবে, সে  যদি যাদুগ্রস্ত নাও হয় তবুও সে প্রথম দু’একদিন  টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করবে। যাতে পেটের মধ্যে থাকা উচ্ছিষ্ট বের হয়ে যায়।
  10. যদি পেটের ব্যথা তিন চারদিন ধরে চলতেই থাকে তবে বুঝতে হবে তার পেটে যাদুর আলামত   উপস্থিত রয়েছে।
  11. এমতাবস্থায় সাত দিন ধরে পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী সোনা পাতা (সানা মাক্কি) পান করতে থাকো।
  12. অতঃপর যদি পেটের ব্যথা এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে তাহলে সোনা পাতা (সানা মাক্কি) আরো এক সপ্তাহ ধরে পান করো।
  13. অতঃপর যখন পেটের ব্যথা দূর হয়ে যাবে এবং তোমার টয়লেটে যাওয়াটাও বন্ধ হয়ে যাবে তখন বুঝতে হবে যে আল্লাহ তা‘আলার আদেশে যাদুর আলামত দূর হয়ে গেছে।
এই পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার আদেশে খাদ্য ও পানীয় বস্তু দ্বারাকৃত যাদু দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

দ্বিতীয় পদ্ধতি : যখন যাদুটা কাগজ জাতীয় কোন বস্তুতে লেখা থাকবে তখন তা নষ্ট করার পদ্ধতি হলো- যাদু লেখা আছে উক্ত কাগজটি পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে যতক্ষণ না ঐ লেখার চিহ্নটি দূরীভূত না হয়। অতঃপর কাগজটিকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিতে হবে। তারপরও যদি লেখার কোন চিহ্ন বাকি থাকে তাহলে তা পানিতে ডুবিয়ে দিতে হবে।

তৃতীয় পদ্ধতি : যাদুটা যদি চুল-সুতা এই জাতীয় কোন কিছুতে গিরা দেয়া থাকে,  তাহলে তা নষ্ট করার পদ্ধতি হলো- উক্ত গিরা খুলতে হবে অতঃপর যখন তুমি সমস্ত গিরা খুলে ফেলবে তখন উক্ত সুতা টুকরা টুকরা করে ছিড়ে ফেলে দিতে  হবে।

চতুর্থ পদ্ধতি : যাদু টা যদি যমীনের কোন স্থানে ছিটানো থাকে তাহলে তা নষ্ট করার পদ্ধতি হলো-

  1. একটি গ্লাস বা মগে পানি নিয়ে  উক্ত পানিতে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা নাস ও ফালাক্ব পড়ে ফুঁ দিতে হবে।
  2. অতঃপর উক্ত পানি যমীনের যে স্থানে যাদু ছিটিয়ে দেয়া আছে সেখানে ছিটিয়ে দিতে হবে।
  3. এই কাজটি তিনবার করলে ইনশাআল্লাহ যাদু দূর হয়ে যাবে।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই মর্মে রাসূল (ﷺ) থেকে বর্ণিত আছে, তাহলো যাদুর চিকিৎসা দুই প্রকার। যথা:

  1. যাদু নষ্ট করা। যেমন রাসূল (ﷺ) কর্তৃক ছহীহ সূত্রে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি  এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলার নিকটে দু‘আ করেছিলেন অতঃপর তা কবুল করা হয়।
  2. যাদুর অনিষ্ট বা ক্ষতি যেখানে পৌঁছায় সেখানে বমি করা।[৪]

যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির বিধান

২৫- নিপীড়িত যাদুগস্ত ব্যক্তির জন্য উপদেশ

যখন কোন ব্যক্তির আল্লাহ তা‘আলার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য মানুষদের মধ্যে হতে এবং জিনদের মধ্যে হতে শয়তানকে শত্রু তৈরি করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيٰطِيْنَ الْاِنْسِ وَ الْجِنِّ يُوْحِيْ بَعْضُهُمْ اِلٰى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًا.

‘আর এমনিভাবেই আমরা প্রত্যেক নবীর জন্য বহু শয়তানকে শত্রুরূপে সৃষ্টি করেছি; তাদের কতক মানুষ শয়তানের মধ্য হতে এবং কতক জিন শয়তানের মধ্য হতে হয়ে থাকে, এরা একে অন্যকে কতকগুলো মনোমুগ্ধকর ধোঁকাপূর্ণ ও প্রতারণাময় কথা দ্বারা প্ররোচিত করে থাকে’ (সূরা আল-আন‘আম: ১১২)।

এমনিভাবে নবীগণদের অনুসারীর উপর সেই বিপদ পতিত হয় যে বিপদ নবীগণের ওপর পতিত হয়। আর যখন আল্লাহ তা‘আলা কোন বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান তখন তাকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করেন। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেন, مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُصِبْ مِنْهُ ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে বিপদগ্রস্ত করেন’।[৫]

অতএব হে যাদুগ্রস্ত ব্যক্তি! তোমার উপরে যাদুর দ্বারা যে কষ্ট আপতিত হয়েছে, এর কারণে তুমি দুশ্চিন্তা কর না। কেননা রাসূল (ﷺ)-কেও যাদু করা হয়েছিল। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার মুমিন বান্দাদেরকে এভাবে পরীক্ষা করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি তাকে আরো বেশি নিকটবর্তী করে নেন। ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অসুস্থতার মাধ্যমে পরীক্ষিত ব্যক্তি অসুস্থতার কারণে তার অন্তর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ায় সে আল্লাহর নৈকট্য, রহমত ও কল্যাণ অর্জন করে’।[৬]

হে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি! তোমার ওপর যে বিপদ আপতিত হয়েছে এবং আল্লাহ তোমার ওপর যা লিখে রেখেছেন এর জন্য তুমি রাগান্বিত ও ধৈর্য হারা হয়ো না। কেননা হতে পারে এটাই তোমার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ عَسٰۤى اَنْ تَكْرَهُوْا شَيْـًٔا وَّ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ١ۚ وَ عَسٰۤى اَنْ تُحِبُّوْا شَيْـًٔا وَّ هُوَ شَرٌّ لَّكُمْ   ‘এটি তোমাদের নিকট অপ্রীতিকর; বস্তুতঃ তোমরা এমন বিষয়কে অপসন্দ করছ যা তোমাদের পক্ষে বাস্তবিকই মঙ্গলজনক, পক্ষান্তরে তোমরা এমন বিষয়কে পসন্দ করছ যা তোমাদের জন্য বাস্তবিকই অনিষ্টকর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২১৬)। যদি দুনিয়ার কোন অংশ তোমার থেকে ছুটেও যায় তাহলে জেনে রেখো আল্লাহ তা‘আলার  নিকটে যা রয়েছে সেটাই উত্তম এবং স্থায়ী তাদের জন্য যারা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান আনে এবং যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘নিপীড়িত হিংসিত ব্যক্তি যদি ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহকে ভয় করে, তাহলে তার জন্য পরকালে উত্তম প্রতিদান রয়েছে’।[৭] সুতরাং তুমি বেশি বেশি  নিম্নের দু‘আগুলো পড়-

إنا لله وإنا إليه راجعون، اللهم آجرني في مصيبتي وأخلفلي خيرا منها.

উম্মে সালমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে ব্যক্তি উক্ত দু‘আগুলো পাঠ করবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে উত্তম প্রতিদান দান করবেন। উম্মে সালমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, যখন আবূ সালমা মারা গেল তখন আমি বললাম যে, মুসলিমদের মধ্যে হতে আবূ সালমার চাইতে উত্তম আর কে আছে?! অতঃপর রাসূল (ﷺ)-এর সাথে যখন তার বিয়ে হল তখন তিনি বললেন যে, আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ﷺ)-কে আবূ সালমার স্থলে উত্তম প্রতিদান হিসাবে দান করেছেন।[৮]

মানুষের ধন-সম্পদ যদি বেশিও হয় তবুও সেটা শেষ হয়ে যাবে এবং মানুষকে দুশ্চিন্তা পেয়ে বসবেই। অতঃপর এর পরিবর্তে স্থায়ী নে‘মত হিসাবে তাকে যা দান করা হবে এর মাধ্যমে দুনিয়ার সব দুশ্চিন্তা দুঃখ সে ভুলে যাবে। রাসূল (ﷺ) বলেন,

وَيُؤْتَى بِأَشَدِّ الْمُؤْمِنِيْنَ ضُرًّا وَبَلَاءً‏.‏ فَيُقَالُ اغْمِسُوْهُ غَمْسَةً فِي الْجَنَّةِ‏.‏ فَيُغْمَسُ فِيْهَا غَمْسَةً فَيُقَالُ لَهُ أَىْ فُلَانُ هَلْ أَصَابَكَ ضُرٌّ قَطُّ أَوْ بَلَاءٌ فَيَقُوْلُ مَا أَصَابَنِيْ قَطُّ ضُرٌّ وَلَا بَلَاءٌ. ‏

‘অতঃপর (ক্বিয়ামতের দিন) ঈমানদারদের মধ্য হতে এমন এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদে জীবন কাটিয়েছে। বলা হবে, একে একটু জান্নাত দেখাও। অতঃপর তাকে জান্নাত দেখানো হবে। এরপর তাকে বলা হবে, হে অমুক! তোমাকে কি কখনো দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদ স্পর্শ করেছে? সে বলবে, আমি কখনো দুঃখ-কষ্টে পতিত হইনি’।[৯]

তুমি নিশ্চিত থাকো যে, তোমার উপর যে যালেম যাদু করেছে উক্ত কারণে সে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রেহাই পাবে না। আল্লাহর শাস্তি তার জন্য অপেক্ষা করছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَا كُنَّا عَنِ الْخَلْقِ غٰفِلِيْنَ ‘আর আমরা সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই (সূরা আল-মুমিনূন: ১৭)।

হে যাদুগ্রস্ত নিপীড়িত ব্যক্তি! তুমি যালেম হয়ে যাদুকরের নিকট না গিয়ে বরং আল্লাহ অভিমুখী হও। ইহাতেই তোমার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান। তুমি বেশি বেশি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও দু‘আ কর এবং আল্লাহর নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তাহলে অচিরেই আল্লাহ কষ্ট লাঘব করে দেবেন। তুমি আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া থেকে বিরত থেকো। দু‘আ ও বৈধ প্রতিষেধক বা ঔষধের মাধ্যমে যাদুর সমাধান পদ্ধতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থেকো না। খারাপ ও তাদের অনুসারীদের নিকটে কখনো আত্মসমর্পণ কর না। কেননা শয়তানের চক্রান্ত খুবই দুর্বল। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের অভিভাবক, কাফেরেরা মুমিনদের অভিভাবক নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ذٰلِكَ بِاَنَّ اللّٰهَ مَوْلَى الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَ اَنَّ الْكٰفِرِيْنَ لَا مَوْلٰى لَهُمْؒ ‘এটা এ জন্য যে, আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই’ (সূরা মুহাম্মাদ:১১)। আল্লাহ তা‘আলা শক্তি ও প্রতাপের অধিকারী। আর যালেমরা যাই করুক ওগুলো তুচ্ছ কিছুই নয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাদের উপরে ক্ষমতাবান এবং তিনি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু যখন ধরেন তখন আর ছাড়েন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَحْسَبَنَّ اللّٰهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظّٰلِمُوْنَ ‘তুমি কখনও মনে কর না যে, যালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন’ (সূরা ইবরাহীম: ৪২)।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* ইমাম ও খত্বীব, মসজিদ নববী
** শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাউসা, হেদাতীপাড়া, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৮৯।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৫৮।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৫৭।
[৪]. যাদুল মা‘আদ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২৪।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৪৫।
[৬]. শিফাউল আলীল, পৃ. ৫০৭।
[৭]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১৭শ খণ্ড, পৃ. ২২।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯১৮।
[৯]. ইবনু মাজাহ, হা/৪৩২১।




প্রসঙ্গসমূহ »: বিবিধ
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (৫ম কিস্তি)  - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা (৫ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ আযীযুর রহমান
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা - মুহাম্মাদ আযীযুর রহমান
প্রশ্নোত্তরে নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদাসমূহ (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান (শেষ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
কুরআনী প্রবাদ সংকলন : তাৎপর্য ও শিক্ষা (শেষ কিস্তি) - প্রফেসর ড. লোকমান হোসেন
সালাম প্রদানের গুরুত্ব ও মর্যাদা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আরিফ হুসাইন
হজ্জ ও ওমরাহ সম্পর্কে প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ (শেষ কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১২তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১১তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বাংলাদেশে সমকামিতার গতি-প্রকৃতি : ভয়াবহতা, শাস্তি ও পরিত্রাণের উপায় অনুসন্ধান - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ