শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৪০ অপরাহ্ন

ঈদে মীলাদুন্নাবী : একটি পর্যালোচনা

- আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*



ভূমিকা

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা কুরআন ও সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত। মুসলিমদের যাবতীয় ইবাদত, উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতা এই দু’টি মূল উৎসের ভিত্তিতে নির্ধারিত। ইসলাম কখনো এমন কোনো আমলকে উৎসাহ দেয় না, যা রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ও ছাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) পালন করেননি। আজকাল হিজরী বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে মুসলিম সমাজে ‘ঈদে মিলাদুন্নাবী’ নামে একটি দিনকে ঈদ হিসেবে পালন করা হয়, যা নবী (ﷺ)-এর জন্মদিন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দিবসটি কি ইসলামী শরী‘আতের নির্ভরযোগ্য দলীলসম্মত? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে কিংবা তাঁর ছাহাবারা কি কখনো এই দিন পালন করেছেন? ইতিহাস ও হাদীছ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের প্রচলন বহু বছর পর চালু হয়েছে, যা ইসলামের মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এই প্রবন্ধে ঈদে মীলাদুন্নাবীর পরিচয়, উৎপত্তি, শারঈ হুকুম ও করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

ঈদে মীলাদুন্নাবীর পরিচয়

‘ঈদে মীলাদুন্নাবী’ একটি বহুল প্রচলিত পরিভাষা। এ নামটি তিনটি আরবী শব্দের সমন্বয়ে গঠিত, শব্দ তিনটি হল : (عید) ঈদ, (میلاد) মীলাদ, (النبي) নাবী।

ঈদ-এর পরিচয় : ঈদ (عيد) শব্দটি আরবী, বহুবচনে أَعْيَاد; যার অর্থ : বারংবার ফিরে আসা, সমবেত হওয়া, আনন্দ, উৎসব ইত্যাদি। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

العيد اسم لما يعود من الاجتماع على وجه معتاد عائد، إما بعود السنة أوبعود الأسبوع أو الشهر أو نحو ذلك

‘ঈদ এমন সাধারণ সমাবেশ যা নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসে। বছর ঘুরে আসে, সপ্তাহে আসে অথবা মাসে আসে’।[১] এ ঈদ সময় কেন্দ্রীক, আবার স্থান কেন্দ্রীকও হয়ে থাকে।

মীলাদুন্নাবীর পরিচয় : ميلاد (মীলাদ) শব্দটি আরবী, যার অর্থ জন্ম বা জন্মকাল, আর النبى (নাবী) শব্দটি আরবী হলেও তা সকল মুসলিমের বোধগম্য। উদ্দেশ্য হল নবী মুহাম্মাদ। সুতরাং ‘ঈদে মীলাদুন্নাবী’-এর অর্থ হলো নাবীর জন্মে খুশি বা উসৎব। পারিভাষিক অর্থে নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জন্ম উপলক্ষে যে আনুষ্ঠানিকতা বা ঈদ উৎসব পালন করা হয়, তাকে ঈদে মীলাদুন্নাবী বলা হয়। সাধারণত, বর্তমানে ১২ই রবিউল আওয়ালকে শেষ নাবীর জন্মদিন ধরে কিছু সুবিধাবাদী আলেমের পৃষ্ঠপোষকতায় ওয়াজ-নসীহত যিকির-আযকার ও ক্বিয়াম করে পরিশেষে মিষ্টিমুখ করে যে অনুষ্ঠান ত্যাগ বা সমাপ্ত করা হয়, সেটাই হলো ঈদে মীলাদুন্নাবী।

ঈদে মীলাদুন্নাবী-এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

‘ঈদে মীলাদুন্নাবী’ এ জাতীয় অনুষ্ঠানাদির ভিত্তি কুরআন ও সহীহ হাদীসে খুঁজে পাওয়া যায় না, তবে ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় প্রাক ইসলামী যুগেও এ জাতীয় আচার অনুষ্ঠান ছিল, যেমন- গ্রীক, ইউনান, ফিরায়ানা ইত্যাদি। সভ্যতায় তারা স্বীয় দেবতার অনুষ্ঠান উদযাপন করত। তাদের থেকে গ্রহণ করেছে তাদের পরবর্তী খ্রীস্টান সম্প্রদায়। যাদের কাছে বড় ঈদ হলো তাদের নাবী জন্মাৎসব পালন করা। খ্রীস্টানদের জন্মাৎসব বা বড় দিবসের অনুষ্ঠান শুধুপ্রাক ইসলামেই পালন করা হত না বরং আজও হয়ে চলছে, সেখান থেকেই অনুসৃত হয়ে মুসলিম সমাজে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো কখন থেকে মুসলিম সমাজে এ অনৈসলামিক সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটল এবং কার মাধ্যমে ঘটল?

সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদুন্নাবী উদযাপন

ঈদে মীলাদুন্নাবী-এর পক্ষে ও বিপক্ষে সকল আলেম সমাজ একমত যে, এ মীলাদুন্নাবীর উৎসব নাবী, সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন ও তাবেঈ-তাবেঈনদের মাধ্যমে কখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে অবশ্যই সে উত্তম যুগসমূহ অতিবাহিত হওয়ার পরই এ বিদ‘আতের উদ্ভব ঘটেছে। কিন্তু কোন সময় এবং কার মাধ্যমে এ বিদ‘আতের উদ্ভব ঘটল এ নিয়ে ইসলামী পন্ডিতগণ দু’টিমত ব্যক্ত করেছেন।

প্রথমতঃ হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শেষের মনিষীগণ সর্বপ্রথম মিসরে ফাতেমী সম্রাজ্যে এ বিদ‘আতের উদ্ভব ঘটে। তারা সর্বপ্রথম ছয়জন ব্যক্তির জন্মাৎসব পালন করেন। তারা হলেন ১. নাবী (ﷺ) ২. আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ৩. হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ৪. হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ৫. ফাতেমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এবং ৬. তৎকালীন ফাতেমী সম্রাজ্যের খলীফা। তখন হতে ফাতেমী বা শিয়া সম্প্রদায়ের খলীফা স্বউদ্যোগে জাতীয়ভাবে ছয় জনের জন্মদিবস পালন করতেন।[২]  

দ্বিতীয়তঃ হিজরী সপ্তম শতাব্দীর প্রথমদিকে ইরাকের মাওসুল শহরে তৎকালীন বাদশা আল মুযাফফার-এর পৃষ্ঠপোষকতায় দরবারী আলেম ‘উমর বিন মুহাম্মাদ মল্লা-এর পরিচালনায় সর্বপ্রথম নাবী (ﷺ)-এর জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়।[৩]

ইমাম আবু শামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত দু’টি মতের সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে বলেন, বস্তুত সর্বপ্রথম যারা এ বিদ‘আতের উদ্ভাব ঘটায় তারা হলো- ফাতেমী বা শিয়া সম্প্রদায়। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে তারা মিশরের রাজধানী কায়রোতে এ বিদ‘আতের আবির্ভাব ঘটায়। অতঃপর সেখান থেকে ফাতেমী সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লে ইরাকের মধ্যে মাওসুল শহরে সর্বপ্রথম বাদশা মুযাফফার-এর পৃষ্ঠপোষকতায় এ বিদ‘আত চালু হয়। যদিও অন্যাঞ্চলে তা আগেই উদ্ভব হয়েছিল কিন্তু ইরাকে মাওসুল শহরে তার মাধ্যমেই প্রথম চালু হয়।[৪]

আরেক বর্ণনা মতে, ক্রুসেড বিজেতা মিশরের সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ূবী (৫৩২-৫৮৯ হি.) কর্তৃক নিযুক্ত ইরাকের ‘এরবল’ এলাকার গভর্ণর আবু সাঈদ মুযাফফরুদ্দীন কুকুবুরী (৫৮৬-৬৩০ হি.) সর্বপ্রথম ৬০৪ হিজরীতে মতান্তরে ৬২৫ হিজরীতে মীলাদের প্রচলন ঘটান। যা ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুর ৫৯৩ বা ৬১৪ বছর পরে। এই দিন তারা ঈদে মীলাদুন্নাবী উদযাপনের নামে নাচ-গান সহ চরম স্বেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত হতো। গভর্ণর নিজে নাচে অংশ নিতেন। আর এই অনুষ্ঠানের সমর্থনে তৎকালীন আলেম সমাজের মধ্যে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন আবুল খাত্ত্বাব ‘উমর বিন দেহিইয়াহ (৫৪৪-৬৩৩ হি.)। তিনি মীলাদের সমর্থনে বহু জাল ও বানোয়াট হাদীছ জমা করে বই লেখেন এবং এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা বখশিশ পান।[৫]

ঈদে মীলাদুন্নাবী পালন করার শারঈ হুকুম

ঈদে মীলাদুন্নাবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো ঈদে মীলাদুন্নাবী পালন করেননি এবং করতেও বলেননি। চার খলীফাসহ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন ছাহাবীর কেউ এ অনুষ্ঠান পালন করেননি। লক্ষাধিক ছাহাবীর কোনো একজনও এ উৎসব পালন করেননি। পরবর্তী যুগের তাবেঈ ও তাবেঈ-তাবেঈগণও পালন করেননি। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিমসহ হাদীছ গ্রন্থ সংকলনকারী মুহাদ্দিছগণও পালন করেননি। এমনকি চার মাযহাবের ইমামগণের কোনো একজনও এ ঈদ পালন করেননি।[৬]

তাঁরা কেউ পালন করেছেন মর্মে কোনো প্রমাণ অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। সুতরাং বলা যায়, ঈদে মীলাদুন্নাবী নতুন আবিষ্কার। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন। এ দ্বীন পরিপূর্ণ বিধায় আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিদ‘আত থেকে বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর বিদ‘আতকারীর ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।[৭] তিনি আরো বলেন,وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَة ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি করা হতে বিরত থাক। নিশ্চয়ই প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদ‘আত ও প্রত্যেক বিদ‘আতই গোমরাহী’।[৮] অন্য বর্ণনায় এসেছে, وَكُلَّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّارِ ‘আর প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম জাহান্নাম’।[৯] সুতরাং ঈদে মীলাদুন্নাবী পালন করা বিদ‘আত। কেননা এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুর প্রায় ৫৯৪ বছর পর ৬০৪ হিজরীতে আবিষ্কৃত হয়।

ঈদে মীলাদুন্নাবী সম্পর্কে কতিপয় বিদ্বানদের অভিমত

শাইখ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

لا يجوز الاحتفال بمولد الرسول ﷺ ولا غيره؛ لأن ذلك من البدع المحدثة في الدين؛ لأن الرسول لم يفعله، ولا خلفاؤه الراشدون، ولا غيرهم من الصحابة رضوان الله عليهم ولا التابعون لهم بإحسان في القرون المفضلة، وهم أعلم الناس بالسنة، وأكمل حبا الرسول الله ، ومتابعة لشرعه ممن بعدهم

‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মীলাদ বা অন্য কোনো মীলাদ উদযাপন করা জায়েয নয়; কারণ এটি দ্বীনে সৃষ্ট নতুন বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটি করেননি, তাঁর খুলাফায়ে রাশেদীনও করেননি, অন্য কোনো ছাহাবীও করেননি এবং উত্তম যুগের তাবেঈনরাও করেননি। তাঁরা ছিলেন সুন্নাহ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং তাঁর শরী‘আতের অনুসরণে পরবর্তীদের চেয়ে অধিকতর পূর্ণাঙ্গ’।[১০]

আল্লামা ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

إن الاحتفال بالمولد النبوي ليس معروفاً عن السلف الصالح، وما فعله الخلفاء الراشدون، ولا فعله الصحابة، ولا التابعون لهم بإحسان، ولا أئمة المسلمين من بعدهم

‘নিশ্চয়ই নাবী (ﷺ)-এর জন্মদিন উদযাপন সালাফে সালিহীনের মধ্যে পরিচিত ছিল না, আর না খুলাফায়ে রাশেদীন তা করেছিলেন, না ছাহাবাগণ তা করেছিলেন, না তাদেরকে সুন্দরভাবে অনুসরণকারী তাবেঈন তা করেছিলেন, আর না তাদের পরবর্তী মুসলিম ইমামগণ তা করেছিলেন’।[১১]

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

الاحتفال بمولد النبي ﷺ بدعة من البدع المحدثة التي لم يفعلها أحد من السلف الصالح

‘নাবী (ﷺ)-এর জন্মদিন উদযাপন করা একটি বিদ‘আত, যা সালাফে ছলেহীনের কেউই করেননি’।[১২]

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন,الاحتفال

 بمولد النبي ﷺ بدعة في الدين

‘নাবী (ﷺ)-এর জন্মদিন উদযাপন করা দ্বীনের মধ্যে বিদ’আত’।[১৩]

ঈদে মীলাদুন্নাবী উপলক্ষে মুসলিম সমাজে প্রচলিত কর্মকাণ্ড

১. মিছিল ও শোভাযাত্রা

বর্তমানে ঈদে মীলাদুন্নাবীতে বহু মুসলিম দেশে বড় বড় শোভাযাত্রা ও মিছিল বের করা হয়। রাস্তাজুড়ে ব্যানার, ফেস্টুন, গাড়ি সাজানো হয়। ইসলামি সংগীত বাজানো হয় ব্যান্ড দলের মাধ্যমে। অনেক সময় এসব আয়োজন রাস্তার যানচলাচল বন্ধ করে দেয়, সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং মহিলাদের অংশগ্রহণ, উচ্চ আওয়াজে গান-বাজনা, ঢাকঢোল ইত্যাদির মাধ্যমে অসংযত পরিবেশ তৈরি হয়, যা ইসলামী আদব ও শরী‘আতের সুন্নাহসম্মত জীবনধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাস্তা জুড়ে শোভাযাত্রা, ব্যান্ড বাজানো, সাজ-সজ্জা করা হয়। ঈদে মীলাদুন্নাবীর নামে এ সব ভন্ডামি কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না।

২. মীলাদ মাহফিল ও কাসিদা পাঠ

মীলাদ মাহফিল উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় মানুষ নানা ধরনের পাপে লিপ্ত হয়। যেমন নারী-পুরুষের মেলামেশা, গান-বাজনা ও মাদক দ্রব্যের ব্যবহার ইত্যাদি। সর্বোপরি এসব মাহফিলে শিরকে আকবার তথা বড় ধরনের শিরকও সংঘটিত হয়ে থাকে। আর তা হলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও অন্যান্য আওলীয়া কেরামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা, তাদের কাছে দু‘আ করা, সাহায্য চাওয়া, বিপদ থেকে মুক্তি কামনা করা এবং এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, তারা গায়েবের খবর জানেন। অথচ এই সমস্ত কাজ করলে মানুষ কাফের হয়ে যায়। এমনকি নাবী (ﷺ)-এর জন্ম, জীবনী নিয়ে বক্তৃতা, গান (কাসিদা), কবিতা, নাটিকা পরিবেশন করা হয়।

৩. তবারুক বা বিশেষ খাবার বিতরণ

মহানবী (ﷺ)-এর জন্মদিন উপলক্ষে বর্তমান সময়ে অনেক জায়গায় নাবী (ﷺ)-এর নামে বিভিন্ন ধরনের মজাদার খাবার তৈরি করে তা বিতরণ করা হয়। সাধারণত এটি তবারুক বা বরকত হিসেবে নাবীর নামে করা হয়। মানুষ মনে করে, নাবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে এই খাবার বিতরণ একটি সুনিশ্চিত সৎ কাজ। কিন্তু ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদীছের আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, এটি একটি বিদ‘আত (নতুন উদ্ভাবন), অর্থাৎ নাবী (ﷺ) বা ছাহাবাগণের যুগে চালু ছিল না।

৪. গান-বাজনা ও আলোকসজ্জা

বিভিন্ন মসজিদ, রাস্তা, গলি এবং বাড়িঘরকে বর্ণিলভাবে সাজানো হয়, বাতি ও লাইটিং করে আনন্দ উদযাপন করা হয়। অথচ ইসলামী শরী‘আতে এই ধরনের অপসাংস্কৃতিক আয়োজন বা বাহ্যিক চাকচিক্য কখনো উৎসাহিত করা হয়নি। এমনকি কিছু এলাকায় ডেক, গান-বাজনা, আতশবাজি, নাচ, আলোকসজ্জা দেখা যায়।

৫. নাবী (ﷺ)-এর “আত্মা” আগমনে বিশ্বাস করা

অনেকের ধারণা, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মীলাদ মাহফিলে উপস্থিত হন। আবার কেউ মনে করে, ঐ রাতে নাবী (ﷺ)-এর রূহ আগমন করেন (নাউযুবিল্লাহ)। তাই তারা তাঁকে অভিনন্দন জানাতে দাঁড়িয়ে যায়। এটা বিরাট মূর্খতা ও অজ্ঞতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ক্বিয়ামত দিবসের পূর্বে আপন কবর থেকে বের হবেন না বা কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করবেন না এবং কোনো সমাবেশেও উপস্থিত হবেন না। বরং ক্বিয়ামত পর্যন্ত অন্যান্য নবীদের মতোই স্বীয় কবরে অবস্থান করবেন। অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ

‘ক্বিয়ামতের দিন আমি আদমের শ্রেষ্ঠ সন্তান। আমার কবরই সর্বপ্রথম উন্মুক্ত করা হবে। আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সবার আগে গৃহীত হবে’।[১৪]

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে ১২ই রবিউল আউয়ালকে তৃতীয় ঈদ হিসেবে পালন করা হয়। তবে ইসলামী শরী‘আতে ঈদ মাত্র দুটি; ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। নাবী (ﷺ)-এর জন্মদিন হিসেবে এই দিনকে পালন করার জন্য ‘জেশন বেলাদাত’ নামে অনুষ্ঠান, মীলাদ, মাহফিল ও জলুসের আয়োজন করা হয়। চারিদিক আলোকসজ্জা, গেট সাজানো, ঝাণ্ডা ও পতাকা উড়ানোসহ বিভিন্ন শিরক ও বিদ‘আতী কাজ সংঘটিত হয়, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত নয়।

ঈদে মীলাদুন্নাবী উপলক্ষে মুসলিমদের করণীয়

ঈদে মীলাদুন্নাবী উপলক্ষে বিশেষ কোন আমলের বর্ণনা শরী‘আতে নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে কোন আমল করেননি, তাঁর লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরাম কিছু করেননি, খুলাফায়ে রাশেদীনের কেউ কিছু করেননি, এমনকি তাঁর আত্মীয়-স্বজন কেউ কিছু করেননি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্ম অথবা মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত কোন ইবাদত করা, অনুষ্ঠান করা জায়েয নয়। বরং প্রতিদিন যেসকল ইবাদত পালন করা হয়, ঐ দিনও তাই পালন করতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মহাব্বত করা, তাঁকে সম্মান করা, তাঁর পরিপূর্ণ ইত্তেবা করা ইত্যাদি। মহান আল্লাহ বলেন,قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ‘আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন ও তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ৩১)।

উপসংহার

ঈদে মীলাদুন্নাবী একটি ইতিহাসনির্ভর ও সমসাময়িকভাবে আলোচিত বিষয় হলেও শরী‘আতের দৃষ্টিতে এর কোনো বৈধতা নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায়, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে এমন কোনো আমল বা আয়োজনের প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইসলামে ইবাদত ও উৎসব নির্ধারিত হয় কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা; তাই নিজের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ইবাদতের পদ্ধতি বা দিন নির্ধারণ করা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। বিদ‘আত পরিহার করে সুন্নাহর উপর অবিচল থাকাই প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্ম দিবস পালন নয়, বরং পরিপূর্ণভাবে তাঁকে অনুসরণই কাম্য। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!


* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

তথ্যসূত্র :
[১]. ড. শহীদুল্লাহ খাঁন মাদানী, ঈদে মীলাদুন্নাবী, পৃ. ৪।
[২]. আল খিতাত লিল মাকরীযী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৯০-৪৯৯।
[৩]. হাসনুল মাকসাদ লিস সুয়ূতী, পৃ. ৪২; আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ১৪৭।
[৪]. আল-বায়িস লিআবী শামাহ, পৃ. ২৩-২৪; বিস্তারিত দ্র. আল আইয়াদ ওয়া আছারুহা আলাল মুসলিমিন, পৃ. ২৮৬-২৮৯।
[৫]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (দারুল ফিকর, ১৯৮৬), ১৩তম খণ্ড, পৃ. ১৩৭।
[৬]. আব্দুস সাত্তার দেহলভী, মীলাদুন্নাবী, পৃ. ৩৫।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮।
[৮]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬।
[৯]. নাসাঈ, হা/১৫৭৮।
[১০]. মাজমুঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৮।
[১১]. মাজমুঊ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন, ২১তম খণ্ড, পৃ. ৬২।
[১২]. মাজমুঊ আল-ফাতাওয়া, ২৬তম খণ্ড, পৃ. ৩১৭।
[১৩]. আল ইজলাল আল ইলমী ওয়াল আমালী, পৃ. ১৫২।
[১৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২৭৮।




প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান (৪র্থ কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
আল-কুরআনে মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া: উপকরণ ও সৃষ্টির স্তর বিন্যাস (শেষ কিস্তি) - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
কুরবানীর মাসায়েল - ইবাদুল্লাহ বিন আব্বাস
ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজ (৩য় কিস্তি) - ড. মেসবাহুল ইসলাম
সূদ-ঘুষ ও অবৈধ ব্যবসা (৮ম কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
সুন্নাতের আলো বিদ‘আতের অন্ধকার (২য় কিস্তি) - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন : সংশয় নিরসন (৩য় কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
সূদের ইহকালীন ও পরকালীন ক্ষতিসমূহ - মাসঊদুর রহমান
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন সংশয় নিরসন (১০ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং মুসলিম জীবনে তার প্রভাব - আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
মসজিদ: ইসলামী সমাজের প্রাণকেন্দ্র (১২তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৭ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ