মুহাররম ও আশূরা : গুরুত্ব, করণীয় ও বর্জনীয়
-আবু মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ*
ভূমিকা
হিজরী বর্ষের প্রথম মাস মুহাররম। একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ মাস, যার শুরুতেই মুসলিমদের মনে জাগে নতুন ভাবনা, আত্মশুদ্ধির ডাক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির অনুপ্রেরণা। এই মাস আল্লাহ তা‘আলার নিকট বিশেষভাবে সম্মানিত, যাকে ‘আশহুরুল হুরুম’ তথা সম্মানিত চার মাসের অন্যতম হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। মুহাররম মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ‘আশূরা’, যা বহু ঐতিহাসিক ও নবীদের সঙ্গে জড়িত ঘটনার স্মৃতিবাহী। আল্লাহর পক্ষ থেকে এই দিনে বিভিন্ন নবীকে মুক্তি ও সাহায্য দান করা হয়েছে। তাছাড়া, এই দিনে ছিয়াম রাখা নবী করীম (ﷺ) নিজে উৎসাহিত করেছেন এবং এর ফযীলত সম্পর্কে বিশেষভাবে বলেছেন। এই প্রবন্ধে মুহাররম ও আশূরার পরিচয়, নামকরণ, গুরুত্ব ও আত্মশুদ্ধির তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
মুহাররম মাসের পরিচয়
মুহাররম (محرم) শব্দটি আরবী, যা حرم শব্দমূল থেকে এসেছে। যার অর্থ হল: পবিত্র, সম্মানিত। এই মুহাররম হিজরী বর্ষের প্রথম মাস। চারটি আশহুরে হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহের অন্যতম মুহাররম মাস। এটি এমন একটি মাস, যেখানে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল এবং মুসলিমদের জন্য এটি বিশেষভাবে মর্যাদাপূর্ণ।
‘মুহাররম’ নামে নামকরণ
চারটি আশহুরে হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহের একটি মুহাররম মাস। এই মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ থাকলেও আরবরা তা মানত না। তারা কৌশলের আশ্রয় নিত। তারা মুহাররম মাসকে ‘সফরুল আওয়াল’ বা প্রথম সফর নাম দিয়ে তাদের ইচ্ছামত যুদ্ধের সময় আগ-পিছ করত। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এই যাবতীয় কর্মকাণ্ড বাতিল করে এই মাসের নামকরণ করলেন মুহাররম নামে। তাইতো এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহিল মুহাররম’ বলা হয়।
মুহাররম মাসের গুরুত্ব ও ফযীলত
১- মুহাররম একটি হারাম বা সম্মানিত মাস : হিজরী বর্ষের সর্বপ্রথম মাস মুহাররম। হাদীছের ভাষায় شَهْرُ اللهِ الْمُحَرَّمِ বা শাহরুল্লাহিল মুহাররম। আল্লাহ তা‘আলা বছরের যে কয়টি মাসকে বিশেষ মর্যাদায় মহিমান্বিত করেছেন মুহাররম তার অন্যতম। পবিত্র কুরআনুল কারীম আল্লাহ বলেন,
اِنَّ عِدَّةَ الشُّهُوْرِ عِنْدَ اللّٰهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِيْ كِتٰبِ اللّٰهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ مِنْهَاۤ اَرْبَعَةٌ حُرُمٌ
‘নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে গণনায় মাসের সংখ্যা বারোটি। তার মধ্যে চারটি হল সম্মানিত মাস’ (সূরা আত-তাওবাহ: ৩৬)। আর সম্মানিত চারটি মাস হচ্ছে মুহাররম, রজব, যিলক্বদ ও যিলহজ্জ।[১]
২- রামাযানের ছিয়ামের পর সর্বোত্তম মুহাররম মাসের ছিয়াম
রামাযান মাসের ছিয়াম হল ফরয, আর মুহাররম মাসের ছিয়াম হল নফল। মুহাররমের ছিয়ামের মর্যাদা আল্লাহর কাছে এতই বেশি যে, রামাযানের ছিয়ামের পরেই সর্বোত্তম এই মাসের ছিয়াম। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَفْضَلُ الصَّيَامِ بَعْدَ شَهْرٍ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ المُحَرَّمُ، وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الفَرِيْضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ
‘রামাযানের ছিয়ামের পর সর্বোত্তম ছিয়াম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের ছিয়াম। আর ফরয ছালাতের পর সর্বোত্তম ছালাত হচ্ছে রাতের ছালাত’।[২]
৩- আশূরায়ে মুহাররমের ছিয়ামের বিনিময়ে পূর্বের এক বছরের গুনাহ মাফ হয়
মুহাররম মাসের দশ তারিখের মূল ইবাদত হচ্ছে ছিয়াম পালন করা। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এ দিনে নিজে ছিয়াম রেখেছেন এবং ছাহাবায়ে কেরামকেও উৎসাহ দিয়েছেন। এ দিনের ছিয়ামের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে পূর্বের এক বছরের গুনাহ মাফ হওয়ার আশাও ব্যক্ত করেছেন। আবূ ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِيْ قَبْلَهُ ‘আশূরার দিনের ছিয়ামের ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি, তিনি পূর্বের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন’।[৩]
৪- মুহাররম মাসের ছিয়ামের প্রতি রাসূল (ﷺ)-এর বিশেষ গুরুত্বারোপ
রাসূল (ﷺ) রামাযানের পর আশূরার ছিয়ামের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন, যা এই মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রমাণ করে। আশূরার ছিয়াম অতীত নবীদের সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلَّا هَذَا الْيَوْمَ، يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ، وَهَذَا الشَّهْرَ، يَعْنِيْ شَهْرَ رَمَضَانَ
‘আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আশূরার দিনের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে অন্য কোন দিন ছিয়াম রাখতে দেখিনি এবং রামাযান মাস অপেক্ষা অন্য কোন মাসে এত গুরুত্ব দিয়ে ছিয়াম রাখতে দেখিনি’।[৪]
আশূরা কী?
আশূরা শব্দটির বিশ্লেষণ নিয়ে ভাষাবিদগণ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। অধিকাংশের নিকট মুহাররম মাসের দশম তারিখই আশূরার দিন। এটা আরবী শব্দ (عشر) ‘আশারা’ হতে নির্গত, যার অর্থ হল দশ। অতএব, মুহাররম মাসের দশম তারিখে ছিয়াম রাখার নামই হলো আশূরার ছিয়াম।[৫]
আশূরার ছিয়াম গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ
মুহাররমের ১০ম তারিখ বা আশূরায়ে মুহাররম আল্লাহর হুকুমে মিশরের অত্যাচারী সম্রাট ফেরাঊন তার সৈন্যসহ সমুদ্রে ডুবে মরেছিল এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সাথী বনু ইসরাঈল ফেরাঊনের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তাই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে মূসা (আলাইহিস সালাম) এ দিন ছিয়াম রেখেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ الْمَدِيْنَةَ، فَوَجَدَ الْيَهُوْدَ يَصُوْمُوْنَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ، فَقِيْلَ لَهُمْ: مَا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِيْ تَصُوْمُوْنَهُ؟ فَقَالُوْا: هَذَا يَوْمٌ عَظِيْمٌ، أَنْجَى اللهُ فِيْهِ مُوْسَىٰ وَقَوْمَهُ، وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ، فَصَامَهُ مُوْسَىٰ شُكْرًا، فَنَحْنُ نَصُوْمُهُ. فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوْسَىٰ مِنْكُمْ، فَصَامَهُ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ
‘যখন নবী (ﷺ) মদীনায় এলেন, তখন দেখলেন যে, ইহুদীরা আশূরার দিন ছিয়াম রাখছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: এটা কোন্ দিনের ছিয়াম? তারা বলল, এটি সেই মহান দিন, যেদিন আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর কওমকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাঊন ও তার সৈন্যদের ধ্বংস করেছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মূসা (আলাইহিস সালাম) এদিন ছিয়াম রেখেছিলেন, তাই আমরাও রাখি। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমরা তোমাদের তুলনায় মূসার অনুসরণে অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর তিনি নিজে আশূরার ছিয়াম রাখলেন এবং ছাহাবীদেরও রাখতে নির্দেশ দিলেন’।[৬] সে কারণে এদিন নাজাতে মূসার শুকরিয়ার নিয়তে ছিয়াম রাখা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ছাহাবায়ে কেরাম নিয়মিতভাবে পালন করতেন। তাই এই দিনের ছিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।
আশূরার ছিয়ামের হুকুম
ইসলামের পূর্বযুগ হতেই এ ছিয়ামের প্রচলন ছিল। অতঃপর নবী (ﷺ)-এর মাধ্যমে তা উম্মাতে মুহাম্মাদীর জন্য ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়। রামাযানের ছিয়াম ফরয হওয়ার পর এটা সকলের ঐকমত্যে সুন্নাত। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَتْ قُرَيْشٌ تَصُوْمُ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ يَصُوْمُهُ، فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِيْنَةَ صَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ، فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تَرَكَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ، فَمَنْ شَاءَ صَامَهُ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ
‘কুরাইশরা জাহেলী যুগে আশূরার দিন ছিয়াম রাখত এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেও এই দিন ছিয়াম রাখতেন। যখন তিনি মদীনায় এলেন, তখন তিনি ছিয়াম পালন করলেন এবং ছাহাবীদেরকেও এটি পালনের আদেশ দিলেন। কিন্তু যখন রামাযানের ছিয়াম ফরয করা হল, তখন তিনি আশূরার ছিয়াম পরিত্যাগ করলেন। এরপর যার ইচ্ছা সে ছিয়াম রাখত, আর যার ইচ্ছা তা ছেড়ে দিত’।[৭]
আশূরার ইতিহাস
আল্লাহ কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের অন্যতম হলো ফেরাঊনের জাতি। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াতের জন্য মূসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর ভাই হারূন (আলাইহিস সালাম)-কে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। আর আসমানী কিতাব তাওরাত নাযিল করেন। মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জন্মের পূর্ব থেকেই বণী ইসরাঈলের উপর ফেরাঊন অত্যাচার করত। ফেরাঊন নিজেকে রব দাবী করল এবং মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কওমের উপর অত্যাচার আরো বৃদ্ধি করে দিল। ফলে মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর আদেশে একরাতে (সূরা ত্বোহা: ৭৭; সূরা আশ-শূরা: ৫২) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে চলে যাওয়ার সময় সমুদ্র বাধা হয়ে দাঁড়াল। আল্লাহ মূসাকে লাঠি দ্বারা সাগরে আঘাত করার আদেশ দিলে সাগর ভাগ হল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পর্বতের মত হয়ে গেল (সূরা শূরা: ৬৩)। সাগর পাড়ি দেয়ার সময় ফেরাঊন তাদের পিছনে ধাওয়া করল। আল্লাহ মূসা ও তাঁর জাতিকে আল্লাহ রক্ষা করলেন আর ফেরাঊন ও তার জাতিকে পানিতে নিমজ্জিত করে ধ্বংস করলেন (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৫০)। আল্লাহ বলেন,
وَ جٰوَزْنَا بِبَنِيْۤ اِسْرَآءِيْلَ الْبَحْرَ
فَاَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَ جُنُوْدُهٗ بَغْيًا وَّ عَدْوًا١ؕ حَتّٰۤى اِذَاۤ
اَدْرَكَهُ الْغَرَقُ١ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا الَّذِيْۤ
اٰمَنَتْ بِهٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِيْلَ وَ اَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ۰۰۹۰
آٰلْـٰٔنَ وَ قَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَ كُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِيْنَ.
‘আর আমরা বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করে দিলাম। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনী হঠকারিতা ও বাড়াবাড়ি বশে। অতঃপর যখন সে ডুবতে লাগল তখন বলে উঠল, আমি ঈমান আনলাম এই মর্মে যে, কোন উপাস্য নেই তিনি ব্যতীত যার উপরে বনী ইসরাঈলগণ ঈমান এনেছে। আর আমি তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (আল্লাহ বললেন) এখন? অথচ ইতিপূর্বে তুমি অবাধ্যতা করেছিলে এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে’ (সূরা ইউনুস: ৯০-৯১)।
এই মহান দিনটি ছিল মুহাররম মাসের দশ তারিখ তথা আশূরার দিন। ইহুদীরা এই দিনকে সম্মান করত ও গুরুত্ব দিত। আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُوْدُ عِيْدًا قَالَ النَّبِيُّ ﷺ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ
‘আশূরার দিনকে ইহুদীগণ ঈদ মনে করত। নবী করীম (ﷺ) ছাহাবীগণকে বললেন, তোমরাও এ দিনের ছিয়াম পালন কর’।[৮]
আশূরায়ে মুহাররমের করণীয়
১- হারাম মাস হিসাবে এ মাসকে সম্মান করা
মুহাররম চারটি পবিত্র (হারাম) মাসের একটি। এ মাসে গুনাহ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকা উচিত। ছাহাবীরা এ মাসকে যথাযথ সম্মান করতেন। আবূ জামরাহ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর সাথে বসতাম। তিনি আমাকে তাঁর আসনে বসাতেন। একবার তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে আমার ধন-সম্পদ হতে কিছু অংশ প্রদান করব। আমি তাঁর সাথে দু’মাস থাকলাম। অতঃপর একদা তিনি বললেন, আব্দুল কায়েস গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন, তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন্ প্রতিনিধি দলের? তারা বলল, ‘রাবী‘আ গোত্রের’। তিনি বললেন, স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল,
يَا رَسُوْلَ اللهِ، إِنَّا لَا نَسْتَطِيْعُ أَنْ نَأْتِيَكَ إِلَّا فِيْ شَهْرِ الْحَرَامِ، وَبَيْنَنَا وَبَيْنَكَ هَذَا الْحَىُّ مِنْ كُفَّارِ مُضَرَ، فَمُرْنَا بِأَمْرٍ فَصْلٍ، نُخْبِرْ بِهِ مَنْ وَرَاءَنَا، وَنَدْخُلْ بِهِ الْجَنَّةَ
‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! হারাম মাস ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফেরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে করে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে করে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি’।[৯]
২- আশূরার দিনে ছিয়াম রাখা
এ মাসের দশ তারিখে ছিয়াম পালন করা একটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কাতে অবস্থান কালে এ ছিয়াম পালন করতেন। মক্কার কুরাইশরাও এই দিনকে সম্মান করত ও ছিয়াম পালন করত
আশূরা অর্থাৎ মুহাররমের ১০ তারিখে ছিয়াম রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ تَصُوْمُهُ قُرَيْشٌ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَكَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ يَصُوْمُهُ فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِيْنَةَ صَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تَرَكَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ فَمَنْ شَاءَ صَامَهُ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ
‘জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশূরার ছিয়াম পালন করত এবং রাসূল (ﷺ)ও এ ছিয়াম পালন করতেন। যখন তিনি মদীনায় আগমন করেন তখনও এ ছিয়াম পালন করেন এবং তা পালনের নির্দেশ দেন। যখন রামাযানের ছিয়াম ফরয হল, তখন আশূরার ছিয়াম ছেড়ে দেয়া হল। যার ইচ্ছা সে পালন করবে, আর যার ইচ্ছা পালন করবে না’।[১০]
মদীনায় হিজরতের পর তিনি এ ছিয়াম পালন করতেন এবং ছাহাবায়ে কেরামকেও ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। রামাযানের ছিয়াম ফরয হওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুহাররম মাসের দশ তারিখে ছিয়াম পালনে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ছাহাবীগণও আশূরার ছিয়াম পালনের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন।
আশূরার ছিয়াম কতদিন?
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় ও মদীনায় প্রথম দিকে মুহাররম মাসে এক দিন ছিয়াম পালন করতেন। পরবর্তীতে ইহুদীদের বিরোধিতা করার জন্য ৯ তারিখসহ দুই দিন ছিয়াম পালনের আশা ব্যক্ত করেন। যেমন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) যখন নিজে আশূরার দিন ছিয়াম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! ইহুদী ও খ্রিস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন,
فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ صُمْنَا يَوْمَ التَّاسِعِ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ
‘আগামী বছর আসলে আমরা নবম দিনেও ছিয়াম পালন করব। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃত্যুবরণ করেন’।[১১] অনুরূপভাবে ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, صُوْمُوا التَّاسِعَ وَالْعَاشِرَ وَخَالِفُوا الْيَهُوْدَ ‘তোমরা ৯ ও ১০ তারিখে ছিয়াম রাখ এবং ইহুদীদের বৈপরীত্য কর’।[১২] সুতরাং মুহাররমের দু’টি ছিয়াম পালন করা উত্তম। এক্ষেত্রে দশ তারিখের আগের দিন বা পরের দিন ছিয়াম রাখা যেতে পারে। অতএব সুন্নাত হল ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মুহাররমের ছিয়াম রাখা।
আশূরায়ে মুহাররমের বর্জনীয়
১- হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুবার্ষিকী পালন : হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদত বরণের মর্মান্তিক ঘটনাটিও আশূরার দিনে অর্থাৎ ১০ই মুহাররম ঘটেছিল। যা মুসলিমদের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। কিন্তু এর জন্য সেদিন শোক দিবস হিসাবে পালন করা শরী‘আতসম্মত নয়।
২- মাতম করা : আশূরার দিনকে কেন্দ্র করে অনেকে ‘হায় হোসেন’ ‘হায় হোসেন’ বলে বিলাপ করেন, বুক চাপড়ান ও মাথায় কালো কাপড় বেঁধে শোক প্রকাশ করেন, যা সম্পূর্ণভাবে হারাম ও কাবীরা গুনাহ। সকল আলেম একমত যে, আওয়াজ করে মৃত ব্যক্তির জন্য কান্নাকাটি করা জায়েয নয়।
৩- মর্ছিয়া করা : মর্ছিয়া (المرثية) আরবী শব্দ। যার অর্থ- শোকগাথা, শোকসঙ্গীত। আমাদের সমাজে কারবালার ইতিহাসকে নিয়ে বিভিন্ন রকম কবিতা, জারী গান, বিভিন্ন নভেল-নাটক ও গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। যার অধিকাংশ ভিত্তিহীন ও মনগড়া। যেখানে ইয়াযীদ ও তার পিতা বিশিষ্ট ছাহাবী মু‘আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে হেয় করা হয়েছে। মীর মোশাররফ হোসেন কর্তৃক রচিত ‘বিষাদ সিন্ধু’-কে কারবালার ইতিহাস গ্রন্থ মনে করা হয়। অথচ এই উপন্যাসের অধিকাংশ তথ্যই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ইসলামে মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে এসকল কার্যকলাপ কখনো জায়েয নয়।
৪- তা‘যিয়া করা : তা‘যিয়া (التعزية) আরবী শব্দ। যার অর্থ- সান্ত¦না দান, শোক প্রকাশ। আশূরার দিন হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাল্পনিক কবর তৈরি করে তা‘যিয়া বা শোক মিছিল করা হয়। ঐ ভুয়া কবরগুলোকে ‘আত্মাসমূহের অবতরণস্থল’ বলে ধারণা করা হয়। সেখানে হুসাইনের রূহ হাযির হয় কল্পনা করে তাকে সালাম দেয়া হয়। তার সামনে মাথা ঝুঁকানো হয়। সেখানে সিজদা করা হয়, মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। এগুলো স্পষ্ট শিরক। তা‘যিয়া-মাতম বর্জন করে তাদের জন্য দু‘আ করা উচিত।
৫- নিজের উপর আঘাত করা ও কাপড় ছেঁড়া : আশূরার দিন অনেকে হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুকে স্মরণ করে, তার শোকে বিভিন্ন ধারালো জিনিস দিয়ে নিজের দেহকে আঘাত করে রক্তাক্ত করে এবং নিজের গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। এটা ইসলাম সমর্থন করে না। নবী করীম (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُوْدَ وَشَقَّ الْجُيُوْبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
‘যারা শোকে মুখে চপেটাঘাত করে, জামা ছিন্ন করে ও জাহিলী যুগের মত চিৎকার করে, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়’।[১৩] ইসলামের ইতিহাসে এরকম অনেক দুঃখজন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মুসলিমরা কারো জন্যই এ রকম শোক পালন করেন না।
৬- ছাহাবী-তাবেঈদেরকে মন্দ বলা : আশূরার দিন হাসান-হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে মর্যাদা দিতে গিয়ে অনেকে কোন কোন ছাহাবী-তাবেঈ সম্পর্কে মন্দ ধারণা করে থাকেন। এমনকি গালিও দিয়ে থাকেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নামে একটি বকরী বেঁধে রেখে লাঠিপেটা ও অস্ত্রাঘাতে রক্তাক্ত করা হয়। এছাড়াও মু‘আবিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর ছেলে ইয়াযীদকে কারবালার ঘটনার জন্য দাঈ করে গালি-গালাজ করে থাকেন। অথচ ছাহাবীগণকে গালি দেয়া বড় গুনাহের কাজ।
৭- বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা : আশূরার নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়। যেমন- সরকারী ছুটির ব্যবস্থা করা, রাস্তা-ঘাট বিভিন্ন রঙে সাজানো, লাঠি, তীর, বল্লম নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দেয়া, হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নামে কেক ও পাউরুটি বানিয়ে ‘বরকতের পিঠা’ বলে বিক্রি করা ইত্যাদি।
৮- কারবালার ঘটনাকে হক ও বাতিলের লড়াই মনে করা : কারবালার ঘটনাকে অনেকে হক ও বাতিলের লড়াই বলে আখ্যায়িত করেন। তারা হুসাইনকে হক ও ইয়াযীদকে বাতিল বলে মনে করেন। এই বিশ্বাস ঠিক নয়। বিষয়টি ছিল ইজতিহাদী বিষয়, হক বাতিলের বিষয় ছিল না। কারণ হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে হকপন্থী বলে মনে করলেও ইয়াযীদকে বাতিল বলা যাবে না।
৯- হুসাইনের মাথা ছয়টি দেশে প্রেরিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা : শী‘আদের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে বর্তমানে হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-এর মাথা ছয়টি দেশে পূজিত হচ্ছে। যথা:
১. মদীনার বাক্বী‘ গোরস্থানে তাঁর মা ফাতেমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর কবরের পাশে।
২. দামেষ্কে হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মাথা বা মসজিদুর রা’স সংলগ্ন গোরস্থানে।
৩. মিসরের রাজধানী কায়রোতে। যা ‘তাজুল হুসাইন’ বা হুসাইনের মুকুট নামে খ্যাত। এজন্য মিসরীয়রা নিজেদের দেশকে ‘আল্লাহর পসন্দনীয় দেশ’ বা ঈযড়ড়ংবহ পড়ঁহঃৎু বলে গর্ববোধ করে।
৪. ইরানের মারভে।
৫. ইরাকের নাজাফে।
৬. কারবালা প্রান্তরে। কিন্তু এসব তথ্যগুলোতে কেউ একমত নন।[১৪]
উপসংহার
এই মহিমান্বিত মাস ও আশূরার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমাদের উচিত যথাযোগ্য সম্মান, ইবাদত, আত্মসংযম ও সৎকর্মে মনোনিবেশ করা। হোক তা নফল ছিয়াম, ইবাদতে অতিরিক্ত যত্ন, তাওবা কিংবা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে দৃঢ় অঙ্গীকার। মুহাররম ও আশূরা আমাদের জীবনে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও নৈতিক উন্নতির এক অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়। এই পবিত্র সময় যেন আমাদের জীবনে সত্য, শান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠে। আল্লাহ আমাদেরকে মুহাররম মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফীক দান করুন, আমীন!
* আক্বীদাহ ও দাওয়াহ বিভাগ, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব এবং দাওরায়ে হাদীস, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা।
তথ্যসূত্র:
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৬২।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৩; আবূ দাঊদ, হা/২৪২৯; তিরমিযী, হা/৪৩৮।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬২।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩২।
[৫]. মির‘আতুল মাফাতীহ, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৪৫।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩০/১১৩২।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০২; ছহীহ মুসলিম, হা/১১২৫।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩১।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩, ৮৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭; মিশকাত, হা/১৭।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০২; ছহীহ মুসলিম, হা/১১২৫।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩৪; আবূ দাঊদ, ২৪৪৫।
[১২]. তিরমিযী, হা/৭৫৫; বাইহাক্বী, হা/৮৬৬৫।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৯৭।
[১৪].যঃঃঢ়ং://িি.িধষরসধসধষর.পড়স/যঃসষ/ধৎধ/ধযষ/ংরৎব/যড়ংধরহ/সধফভধহ-ৎধং.যঃস.