উত্তর : প্রথমতঃ নগদ অর্থ স্বতন্ত্রভাবে নিছাব পূর্ণ না করলে- তার সঙ্গে ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য ও সোনা-রুপার মূল্য যোগ করলে যদি নিছাব পূর্ণ হয় এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তাহলে উভয় সম্পদ মিলিয়ে যাকাত হিসাব করতে হবে। ইমাম খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আমি জানি না, আলিমদের মধ্যে কেউ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন কি-না যে, কোন ব্যক্তির কাছে যদি ১০০ দিরহাম থাকে এবং তার কাছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এমন পণ্যও থাকে যার মূল্য ১০০ দিরহাম, আর উভয়ের উপর এক বছর অতিবাহিত হয়ে যায়, তাহলে এই দু’টির একটিকে অপরটির সঙ্গে যোগ করা হবে এবং উভয়ের উপরই যাকাত ওয়াজিব হবে’ (মা‘আলিমুস সুনান, ২/১৬ পৃ.)।
ইবনুল হুমাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘সারকথা হল- ব্যবসায়িক পণ্যগুলো বিভিন্ন ধরনের হলেও, সেগুলোর মূল্য পরস্পরের সঙ্গে যোগ করা হবে। একইভাবে, ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য সোনা ও রুপার (দুই মুদ্রার) সঙ্গেও যোগ করা হবে- এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে’ (ফাৎহুল ক্বাদীর, ২/২২১ পৃ.)। আরো বলা হয়েছে, ‘ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত তার মূল্যের উপর নির্ভরশীল। অতএব মূল্য নির্ধারণের দিক থেকে এগুলো একই শ্রেণিভুক্ত। সুতরাং এগুলোকে (নগদ অর্থের) সঙ্গে যোগ করা আবশ্যক’ (ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, ৩/৩৬; ইবনু মুফলিহ, আল-ফুরূউ‘, ৪/১৩৮ পৃ.)।
নিছাব পূর্ণ করার ক্ষেত্রে কাগুজে মুদ্রাকে সোনা ও রুপার সঙ্গে সংযুক্ত করার মতটিই ‘রাবিতাতুল আলামিল ইসলামী’র অধীনস্থ ‘ফিক্বহ একাডেমি’র গৃহীত সিদ্ধান্ত। একইভাবে- সঊদী আরবের ‘হাইআতু কিবারিল উলামা’ (সর্বোচ্চ উলামা পরিষদ)-এর সিদ্ধান্তও এ মতের উপরই। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটিও এই মত অনুযায়ী ফাতাওয়া দিয়েছে। ‘রাবিতাতুল আলামিল ইসলামী’র অধীনস্থ ফিক্বহ একাডেমির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘কাগুজে মুদ্রার মূল্য যদি সোনা অথবা রুপার যেকোন একটি নিছাবের সর্বনিম্ন পরিমাণে পৌঁছে যায়, অথবা অন্য কোন মুদ্রা (সোনা ও রুপা) এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যোগ করলে নিছাব পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে কাগুজে মুদ্রার যাকাত দেয়া ওয়াজিব’ (সিদ্ধান্ত নং ৬, পৃ. ১০১)।
আর সঊদী আরবের ‘হাইআতু কিবারিল উলামা’র সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু কাগুজে মুদ্রার মধ্যে স্পষ্টভাবেই মূল্যমানের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে, তাই উপরিউক্ত সব কারণের ভিত্তিতে হাইআতু কিবারিল উলামা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, কাগুজে মুদ্রাকে স্বতন্ত্র একটি মুদ্রা হিসাবে গণ্য করা হবে, যেমন সোনা, রুপা এবং অন্যান্য মূল্যমানসম্পন্ন সম্পদ মুদ্রা হিসাবে গণ্য হয়। বর্তমান প্রচলিত কাগুজে মুদ্রা শরী‘আতের দৃষ্টিতে একটি স্বতন্ত্র নগদ/মুদ্রা হিসাবে বিবেচিত হবে। তাই এর যাকাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সোনা বা রুপার নিসাবকে মানদণ্ড হিসাবে নেয়া হবে। পাশাপাশি, নিছাব পূর্ণ করার ক্ষেত্রে কাগুজে মুদ্রার সঙ্গে সোনা, রুপা বা ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য যোগ করার কথাও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং যখন কাগুজে মুদ্রার মূল্য সোনা অথবা রুপার যেকোন একটির সর্বনিম্ন নিছাব পরিমাণে পৌঁছে যাবে। অথবা সোনা-রুপা ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যোগ করলে যখন নিছাব পূর্ণ হয়ে যাবে, তখনও যাকাত দিতে হবে’ (হাইআতু কিবারিল উলামা, ১/৮৮ পৃ.)।
সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলিমগণ বলেন, ‘নিছাব পূর্ণ করার ক্ষেত্রে অর্থ- তা রুপা হোক, কাগুজে মুদ্রা হোক অথবা ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য হোক সোনার সঙ্গে যোগ করা আবশ্যক। কারণ অর্থ ও সোনা একত্র করলে নিছাব পূর্ণ হয়ে যায়, ফলে যাকাত প্রদান করা আবশ্যক হয়। আর ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে যাকাত হিসাবে তার মূল্য দু’টি মুদ্রার অর্থাৎ সোনা অথবা রুপার যেকোন একটির মাধ্যমে হিসাব করে প্রদান করতে হয়’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৮/৩২৪ পৃ.)। অন্যত্র তাঁরা বলেন, ‘কাগুজে মুদ্রার যাকাত ওয়াজিব হবে, যখন তার মূল্য সোনা অথবা রুপার যেকোন একটির সর্বনিম্ন নিছাব পরিমাণে পৌঁছে যাবে। অথবা অন্যান্য মূল্যমানসম্পন্ন সম্পদ এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত পণ্যের সঙ্গে যোগ করলে যদি নিছাব পূর্ণ হয়ে যায়- সেক্ষেত্রেও যাকাত ওয়াজিব হবে’ (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ১৩/৩৯৯ পৃ.)।
শাইখ ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘কোন ব্যক্তির কাছে যদি কিছু সোনা এবং কিছু অর্থ থাকে, কিন্তু দু’টির কোনটিই এককভাবে নিছাব পরিমাণে পৌঁছে না, তাহলে কি সোনাকে অর্থের সঙ্গে যোগ করা হবে?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘যদি তার কাছে কাগুজে মুদ্রা নিছাবের অর্ধেক পরিমাণ এবং সোনা নিছাবের অর্ধেক পরিমাণ থাকে, তাহলে উভয়কে একত্র করা হবে’ (আশ-শারহুল কাফী থেকে উদ্ধৃত)। শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘কাগুজে মুদ্রার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে, যখন তার মূল্য সোনা অথবা রুপার যেকোন একটির সর্বনিম্ন নিছাব পরিমাণে পৌঁছে যাবে। অথবা অন্যান্য মূল্য মানসম্পন্ন সম্পদ এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত পণ্যের সঙ্গে যোগ করলে যখন নিছাব পূর্ণ হয়ে যাবে তখনও। তবে শর্ত হল যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সময় এগুলো এমন ব্যক্তির মালিকানাধীন থাকতে হবে, যার উপর যাকাত ওয়াজিব’ (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৪/১২৫ পৃ.)।
দ্বিতীয়তঃ নগদ অর্থের যাকাতের পরিমাণ হল চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫% কিংবা এক হাজারে ২৫ টাকা (আল-মাউসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ, ২১/২৯-৩০; ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৯/৪৩৯ পৃ.)। ছহীহ হাদীছে এসেছে, সোনা, রূপা অথবা অন্যান্য মুদ্রায় যাকাতের পরিমাণ হল চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫%। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেন, وَفِي الرِّقَّةِ رُبْعُ الْعُشْرِ ‘রৌপ্যের যাকাত চল্লিশ ভাগের এক ভাগ’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৫৪)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমার কাছে দু’শো দিরহাম থাকলে এবং তার উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে পাঁচ দিরহাম (যাকাত) দিবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দীনারের কমে যাকাত নেই। বিশ দীনারে উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে অর্ধ দীনার যাকাত দিতে হবে। এরপর যা বাড়বে তাতে উপরিউক্ত হিসাবে যাকাত দিতে হবে’ (আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩, ১৫৭২; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৯১)।
উপরিউক্ত হাদীছে রৌপ্যের যাকাত সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০০ দিরহামে ৫ দিরহাম যাকাত লাগবে। অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫%। আর স্বর্ণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০ দীনারে অর্ধ দীনার যাকাত লাগবে। অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫%। অতঃপর উপরের দিকে যত বাড়বে তাতে উপরিউক্ত হিসাবে যাকাত দিতে হবে (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফাতাওয়া নং-১৪৫৬০০, ২০৭৯৭২)।
প্রশ্নকারী : স্বপন মিয়া, মুন্সিগঞ্জ।