অহীর সূচনা
- মূল: ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-ঊক্বাইলী
- অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার*
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট সর্বপ্রথম যে অহি আসে, তা ছিল নিদ্রাবস্থায় বাস্তব স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে প্রভাতের আলোর ন্যায় প্রকাশিত হতো। অতঃপর তাঁর নিকট নির্জনতা পসন্দনীয় হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। আপন পরিবারের নিকট ফিরে এসে কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে-এভাবে সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক দিন ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। অতঃপর খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট ফিরে এসে আবার একই সময়ের জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যেতেন। এভাবে হেরা গুহায় অবস্থানকালে তাঁর নিকট অহি আসলো। তাঁর নিকট ফেরেশতা এসে বলল, ‘পড়’। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, [আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না।] তিনি (ﷺ) বলেন, অতঃপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হল। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘পড়’। আমি বললাম, আমি তো পড়তে জানি না। সে দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে চেড়ে দিয়ে বলল, ‘পড়’। আমি উত্তর দিলাম, আমি তো পড়তে জানি না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, অতঃপর তৃতীয়বারে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, *
اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ -خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ- اِقۡرَاۡ وَ رَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ - الَّذِیۡ عَلَّمَ بِالۡقَلَمِ- عَلَّمَ الۡاِنۡسَانَ مَا لَمۡ یَعۡلَمۡ
‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড হতে। পড়। আর তোমার পালনকর্তা বড়ই দয়ালু। যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না’ (সূরা আল-‘আলাক্ব: ১-৫)।
অতঃপর এ আয়াত নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁর হৃদয় তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট এসে বললেন, ‘আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর’, ‘আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর’। তাঁরা তাঁকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন। এমনকি তাঁর ভয় দূর হল। তখন তিনি খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট ঘটনাবৃত্তান্ত জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি আমার নিজেকে নিয়ে আশঙ্কা বোধ করছি। খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন,
كَلَّا وَاللهِ مَا يُخْزِيْكَ اللهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ، وَتَقْرِى الضَّيْفَ ، وَتُعِيْنُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ
‘আল্লাহর কসম, কখনই নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনও লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং সঠিক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন’। অতঃপর তাঁকে নিয়ে খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল ইবনু আব্দুল আসাদ ইবনু আব্দুল উযযাহর নিকট গেলেন, যিনি অন্ধকার যুগে ‘ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবী ভাষায় লিখতে পারতেন এবং আল্লাহর তাওফীক্ব অনুযায়ী আরবী ভাষায় ইঞ্জীল হতে ভাষান্তর করতেন। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁকে বললেন, ‘হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন’। ওয়ারাকা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাতিজা! তুমি কী দেখ?’ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা দেখেছিলেন, সবই বর্ণনা করলেন। তখন ওয়ারাকা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাকে বললেন,
هَذَا النَّامُوْسُ الَّذِىْ نَزَّلَاللهُ عَلَى مُوْسَى ﷺ يَا لَيْتَنِىْ فِيْهَا جَذَعًا،لَيْتَنِىْ أَكُوْنُ حَيًّا إِذْ يُخْرِجُكَ قَوْمُكَ. فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ«أَوَمُخْرِجِىَّ هُمْ». قَالَ نَعَمْ، لَمْ يَأْتِ رَجُلٌ قَطُّ بِمِثْلِ مَاجِئْتَ بِهِ إِلَّا عُوْدِىَ، وَإِنْ يُدْرِكْنِىْ يَوْمُكَ أَنْصُرْكَ نَصْرًامُؤَزَّرًا.
‘এটা সেই বার্তাবাহক যাকে আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কওম তোমাকে বহিষ্কার করবে’। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘তারা কি আমাকে বের করে দেবে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি যা নিয়ে এসেছো অনুরূপ (অহী) কিছু যিনিই নিয়ে এসেছেন তাঁর সঙ্গেই বৈরিতাপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে জোরালোভাবে সাহায্য করব’।[১]
শিক্ষনীয় বিষয়
১. নবী করীম (ﷺ)-এর নিকট অহী শুরু হয়েছে সত্য স্বপ্ন দিয়ে, তাঁকে জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে প্রথম সাক্ষাতের জন্য পথ সুগম করা, সুসংবাদ প্রদান ও প্রস্তুত করার জন্য। ইমাম বদর আল-‘আইনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সত্য স্বপ্ন দিয়ে অহী শুরু হয়েছে, যাতে ফেরেশতা হঠাৎ করে তাঁর কাছে চলে এসে স্পষ্ট নবুওয়াত না নিয়ে আসে, অথচ সে সময়ে তাঁর মানবীয় সামর্থ্য সেটা ধারণ করতে পারবে না। যার কারণে নবুওয়াতের প্রাথমিক বৈশিষ্টসমূহ এবং কারামাতের লক্ষণসমূহ দিয়ে শুরু হয়েছে। যেমন, ধ্বনি শোনার সাথে সত্য স্বপ্ন, তাঁর প্রতি পাথর ও গাছপালার নবুওয়াতের সালাম এবং জ্যোতি দেখা। অতঃপর জাগ্রত অবস্থায় ফেরেশতা পাঠানোর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর নবুওয়াত পূর্ণ করেন এবং তাঁর জন্য কারামাত স্বরূপ হাক্বীকাত উন্মোচন করেন’।[২]
২. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-এর পরিচর্যার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই তিনি নবী (ﷺ)-কে মানুষ থেকে দূরে থেকে ইবাদত বন্দেগী ও পাপমুক্ত থাকাকে পসন্দনীয় করে দিয়েছেন। আর এর মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচন এবং নবী (ﷺ)-এর জন্য প্রতিপালন ও প্রস্তুতি।
৩. মুমিনের জন্য নির্জনতার মধ্যে রয়েছে মহৎ শ্রেষ্ঠত্ব। তার অন্তর দুনিয়াবাসী ও মানুষের সংস্পর্শ থেকে বিছিন্ন হয়ে পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য মনোনিবেশ করবে। ধ্যানে মগ্ন হবে এবং আল্লাহর পরিপূর্ণ মর্যাদা ও তাওহীদ বাস্তবায়ন করবে। আর এই নির্জনতা মসজিদ ও বাড়িতে অবলম্বন করা শরী‘আত সিদ্ধ। কারণ নবী করীম (ﷺ) নিয়মিত করেছেন।
৪. এটা বর্ণনা করা যে, কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিল হলো আল্লাহর এই বাণী اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ-خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ এই আয়াতগুলো (সূরা আল-‘আলাক্ব: ১-৫)। এগুলো দিয়ে তাঁকে নবুওয়াত দেয়া হয়েছে। অতঃপর তাঁর উপর নাযিল হয়েছে, قُمۡ فَاَنۡذِرۡ یٰۤاَیُّہَا الۡمُدَّثِّرُ ۙ﴿۱﴾ এই আয়াতগুলো (সূরা আল-মুদ্দাছছির: ১-৫)। আর এগুলো দিয়ে তাঁকে রিসালাত দেয়া হয়েছে।
হাফেয আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘প্রথম অহী ছিল নবুওয়াতের এবং দ্বিতীয় অহী ছিল রিসালাতের’। এটিকে ইমামুম মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহ্হাব (রাহিমাহুল্লাহ) তঁাঁর ‘আল-উসূলুছ ছালাছাহ’ গ্রন্থে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
৫. দৃঢ়তা ছাড়া আল্লাহর কিতাব ধারণ করা যায় না। কারণ জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী করীম (ﷺ)-কে তাঁর সাথে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যেন তিনি প্রস্তুতি সহকারে আল্লাহর কিতাবের সাথে মিলিত হতে পারেন এবং দৃঢ়তার সাথে তা ধারণ করতে পারেন। আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহয়া (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছেন, یٰیَحۡیٰی خُذِ الۡکِتٰبَ بِقُوَّۃٍ ‘হে ইয়াহয়া! তুমি কিতাবকে দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো’ (সূরা মারইয়াম: ১২)। সুতরাং দৃঢ়তা সেখানে (নবী (ﷺ)-এর ক্ষেত্রে) বিদ্যমান কথায় আর এখানে (এই আয়াতে) বিদ্যমান কাজে ও আদেশে।
৬. জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টির বিশালতা। কারণ তাঁর সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য বিশাল। তাঁর রয়েছে ৬০০ ডানা, যা দিগন্ত বন্ধ করে দেয়। আল-কুরআনের ভাষ্য মতে, তিনি একজন পুরুষ মানুষের আকৃতিতে অবতরণ করেন। সুতরাং তিনি আকৃতি ধারণ করতে পারেন। এটা তার সৃষ্টির পরিপূর্ণতা প্রমাণ করে।
৭. উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী করীম (ﷺ)-এর প্রথম স্ত্রী। তিনি সকলের পূর্বে নবী করীম (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান এনেছেন এবং তাঁকে সত্যায়ন করেছেন। তিনি তাঁর হৃদয় দৃঢ় করেন এবং তাঁকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট যান। আল্লাহ নবী (ﷺ)-কে আদেশ দিয়েছেন, তিনি যেন তাকে জান্নাতের একটি মুক্তাদানার ঘরের সুসংবাদ দেন, যেখানে কোন হৈ-হুল্লা ও ক্লান্তি থাকবে না। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় নবী করীম (ﷺ) তাঁকে ছাড়া আর কোন বিবাহ করেননি। এটা তাঁর মর্যাদা ও নবী করীম (ﷺ)-এর নিকট তাঁর মহান স্থানের কারণে। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন হিজরতের দেড় বছর পূর্বে।
আলেমগণ মতানৈক্য করেছেন, দু’জনের মধ্যে কে অধিক মর্যাদাবান, খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা), না-কি আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)?
কতিপয় আলেম বলেছেন, ‘খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) অধিক মর্যাদাবান। কারণ তাঁর কিছু শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে যেগুলো আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মধ্যে নেই’। আবার কতিপয় আলেম বলেছেন, ‘বরং আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) অধিক মর্যাদাবান। কারণ হাদীছ রয়েছে, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সমস্ত নারীর উপর সেরূপ যেমনটি ছারিদ নামক খাবারের শেষ্ঠত্ব সকল খাবারের উপর এবং আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর কিছু শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে যেগুলো খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মধ্যে নেই’। আবার কিছু আলেম ভাগে ভাগে বিন্যস্ত করে বলেছেন, ‘প্রত্যেকের এমন কিছু শ্রেষ্ঠত্ব আছে যা অপরজনের মধ্যে নেই’।
সুতরাং রিসালাতের প্রাথমিক সময়ে কোন সন্দেহ নেই খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে, যা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মধ্যে নেই। এক্ষেত্রে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর সমান হওয়ারও সম্ভব না। পক্ষান্তরে নবী করীম (ﷺ)-এর মৃত্যুর পরে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর পক্ষ থেকে যে ইলম ও সুন্নাহের প্রচার এবং উম্মাহর পথপ্রদর্শন সাধিত হয়েছে তা খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হয়নি। সুতরাং মুক্তভাবে দু’জনের একজনকে অপরজনের উপর প্রধান্য দেয়া বিশুদ্ধ নয়। বরং আমরা বলব, খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) একদিক থেকে শ্রেষ্ঠ এবং আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) অপরদিক থেকে শ্রেষ্ঠ। এভাবে আমরা ন্যায়ের পথে চলতে থাকবো।
৮. নবী করীম (ﷺ)-এর সাথে খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর অবস্থানের মধ্যে নবী করীম (ﷺ)-এর মর্যাদা, মহৎ গুণ, মানুষের প্রতি পূর্ণ অনুগ্রহ এবং হক্বের প্রতি তাঁর যে সহযোগিতা তা উল্লেখ করার মাধ্যমে নবী করীম (ﷺ)-কে শক্তিশালী করা, স্বান্তনা প্রদান, দৃঢ় করা ও তাঁর থেকে ভীতি দূর করাতে খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মর্যাদা, সংগ্রাম, প্রজ্ঞা, হৃদয়ের স্থিরতা ও সিদ্ধান্তের সঠিকতার স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।
সুতরাং প্রত্যেক আলেম ও দাঈর স্ত্রীকে এমনি ধৈর্য, প্রজ্ঞা, স্থিরতা ও সুচিন্তার উপর থাকা উচিত, তাঁর স্বামীর প্রতি যে বিপদ-আপদ ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে দুর্ব্যবহার এসে পড়ে তাঁর জন্য, যখন তার স্বামীর অবস্থান জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও শরী‘আতের অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
৯. চারিত্রিক মহৎ গুণাবলী ও উৎকৃষ্টতার বৈশিষ্ঠসমূহ ধ্বংস হওয়া থেকে মুক্তির সবচেয়ে বড় মাধ্যম। যেমনটি হাদীছে এসেছে। উম্মুল মুমিনীন খাদীজা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী করীম (ﷺ)-কে বলেন, ‘কখনোই নয়, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ আপনাকে কখনোই লাঞ্ছিত করবেন না। আপনিতো আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন। অসহায় দুঃস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে দান করেন, মেহমান আপ্যায়ন করেন এবং হক্ব পথের দুর্দশাগ্রস্থকে সাহায্য করেন’। সুতরাং এই হাদীছে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যারা কল্যাণকর কাজের স্বভাববিশিষ্ট হয় তাদের কাছে কষ্ট আসে না। আর নবী (ﷺ) যেহেতু ঐসব প্রশংসিত গুণাবলী ও স্বভাববিশিষ্ট, সুতরাং তাঁর ব্যাপারে ফায়ছালা দেয়া যায় যে, তাঁর কাছে কষ্ট আসবে না। এটা সেই চিরাচরিত বিধানের কারণে যেটা আল্লাহ তাদের জন্য জারী করেছেন যাদের অবস্থা এরূপ। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, ‘ভাল কর্মসমূহ খারাপতর ধ্বংস থেকে রক্ষা করে’।
১০. নবী করীম (ﷺ)-এর প্রতি ওয়ারাকা বিন নওফালের উপদেশের মধ্যে রয়েছে একটি বিশাল নীতিমালা। তা হলো, তাওহীদ ও সুন্নাহের দাঈ নির্যাতন ও পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন, তার অর্থ-সম্পদ ও পরিবারের ক্ষেত্রে তাকে কষ্ট দেয়া হবে এবং তার সুনাম সুখ্যাতি নষ্ট করা হবে। আর এটিই সকল দাঈদের সরদার আবুল কাসেম নাবী করীম (ﷺ)-এর ক্ষেত্রে সংঘটিত হয়েছে।
১১. এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণ যে, আমাদের কিছু মুসলিম ভাই হেরা গুহায় পৌঁছাবার জন্য মক্কার জাবালে নূর নামক পাহাড়ে আরোহণ করাকে নিজের উপর চাপিয়ে নিয়েছে। তাদের ধারণা হলো, এটা আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম!!
নবী করীম (ﷺ)-এর সুন্নাত ও তাঁর পথপ্রদর্শ নির্দেশ করে যে, এটি শরী‘আত সম্মত নয়। বরং উক্ত কাজটি নিকৃষ্ট বিদ‘আত। কারণ নবী করীম (ﷺ) এই কাজ করতে তো আদেশ করেননি বরং আল্লাহ যখন তাঁকে নবুওয়াত দিয়ে সম্মানিত করলেন নবুওয়াতের পূর্বে হেরা গুহায় তিনি যে ইবাদত করতেন সেটাও তিনি আর নবুওয়াতের পরে করতেন না। যদি এটি শরী‘আত সম্মত হতো তাহলে অবশ্যই তিনি (ﷺ) এটি করতেন। অনুরূপভাবে তার পরে তাঁর ছাহাবীগণও এটি করতেন। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) এই বিষয়টি সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে অনবরতভাবে সুন্নাহের সাথে থাকার এবং তা অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দিন-আমীন।
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, ছহীহ বুখারী, হা/৩ ‘বাবু বাদইল ওয়াহী’-১, অনুচ্ছেদ-৩, ‘শব্দ বিন্যাস তাঁরই; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬০।
[২]. বদরুদ্দীন আল-‘আইনী, ঊমদাতুল ক্বারী শারহু ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড (বৈরূত: দারু ইহইয়াইত তুরাছিল ‘আরাবী, তাবি), পৃ. ৬০।