উত্তর : ইসলামে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেয়া, গণপিটুনি দেয়া বা হত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছে কি না, তা প্রমাণ করা এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি প্রদান করা ব্যক্তিবিশেষ বা জনতার কাজ নয়; এটি ইসলামী বিচারব্যবস্থা ও ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কেউ অপরাধী বলে সন্দেহ হলেই তাকে মারধর বা হত্যা করা ইসলামে বৈধ নয়। বরং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তি নির্দোষ বলে গণ্য হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত হলেও শাস্তি কার্যকর করার অধিকার বিচারকের, জনসাধারণের নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ‘আল্লাহ যে প্রাণকে সম্মানিত করেছেন, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৩৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
مَنۡ قَتَلَ نَفۡسًۢا بِغَیۡرِ نَفۡسٍ اَوۡ فَسَادٍ فِی الۡاَرۡضِ فَکَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیۡعًا
‘যে ব্যক্তি কোন প্রাণের বিনিময় বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩২)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُوۡنُوۡا قَوّٰمِیۡنَ لِلّٰہِ شُہَدَآءَ بِالۡقِسۡطِ ۫ وَ لَا یَجۡرِمَنَّکُمۡ شَنَاٰنُ قَوۡمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعۡدِلُوۡا ؕ اِعۡدِلُوۡا ۟ ہُوَ اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ না করে। ন্যায়বিচার কর; এটাই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ ‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৭৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৯)। রাসূল (ﷺ) আরও বলেছেন,
لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لَادَّعَى رِجَالٌ دِمَاءَ قَوْمٍ وَأَمْوَالَهُمْ، وَلَكِنِ الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي، وَالْيَمِيْنُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ
‘মানুষকে যদি শুধু দাবির ভিত্তিতে (রায়) দেয়া হত, তবে অনেকেই অন্যের রক্ত ও সম্পদের দাবি করত। কিন্তু দাবিকারীর ওপর প্রমাণ পেশ করা এবং অস্বীকারকারীর ওপর শপথ করা আবশ্যক’ (সুনান আল-বায়হাকী, ১০/২৫২; সনদ ছহীহ)। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
لَوْ تَمَالَأَ عَلَيْهِ أَهْلُ صَنْعَاءَ لَقَتَلْتُهُمْ بِهِ
‘যদি ছান‘আ নগরীর সমস্ত লোক একজন ব্যক্তিকে হত্যার কাজে অংশগ্রহণ করত, তাহলে আমি সেই একজনের হত্যার অপরাধে তাদের সবাইকে ক্বিসাস হিসাবে হত্যা করতাম’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৩০)।
অতএব আদালত কর্তৃক বিচার শেষে ক্বিছাছ ব্যতীত সর্বাবস্থায় মানুষ হত্যা করা হারাম। এমনকি কোন স্পষ্ট অপরাধীকেও বিচারহীনভাবে মারা যাবে না। এক্ষণে কাউকে গণপিটুনী দিয়ে হত্যা করা হলে সংশ্লিষ্ট সকলেই অপরাধী সাব্যস্ত হবে এবং নিহতের উত্তরাধিকারীরা ক্ষমা না করলে সকলকেই ক্বিছাছ হিসাবে হত্যা করা হবে। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একজন লোককে হত্যার অপরাধে ছান‘আর সাতজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন এবং বলেছিলেন, যদি পুরো ছান‘আবাসী এতে জড়িত থাকত, তাহলে সকলকেই আমরা হত্যা করতাম (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৩০; মিশকাত, হা/৩৪৮১)।
আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) একজনকে হত্যার অপরাধে তিনজনকে হত্যা করেছিলেন (বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান হা/৫০৬৩; ইরওয়া হা/২২০২, সনদ যঈফ)। ইবনু আববাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) একজনকে হত্যার অপরাধে একদল লোককে হত্যার শাস্তি দিয়েছিলেন (আব্দুর রাযযাক হা/১৮০৮২; ইরওয়া ৭/২৬১)। সর্বোপরি বিচারক অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিচার করবেন। যদি গণপিটুনী হত্যার উদ্দেশ্যে না হয়ে থাকে, তবে আদালত ক্বিছাছের পরিবর্তে আসামীদের নিকট থেকে দিয়াত বা রক্তমূল্য আদায় করবে (সূরা আন-নিসা : ৯২)। আর যদি আদালতের বিচারে নিহত ব্যক্তি প্রকৃতই অপরাধী সাব্যস্ত হয়, তবে আদালত আসামীদের শাস্তি মওকূফ করতে পারেন।
প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বী, বরিশাল।