উত্তর : ইসলামী শরী‘আতে ঋণ বা অগ্রিম অর্থের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কুরআন ও সুন্নাহতে ‘রিবা’ বা সূদকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সূদকে হারাম করেছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ ذَرُوۡا مَا بَقِیَ مِنَ الرِّبٰۤوا ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সূদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৭৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূদখোর, সূদদাতা, সূদ লেখক ও সাক্ষীদ্বয় সকলের উপর লা‘নত করেছেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৮)।
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় গুদাম কর্তৃপক্ষকে ৬,০০,০০০ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে। যদি আলু সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে ঐ অর্থ ভাড়ার মধ্যে সমন্বয় হবে। কিন্তু যদি সংরক্ষণ না করা হয়, তাহলে ৮ মাস পরে ৮,০০,০০০ টাকা ফেরত দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন পণ্য বা সেবা গ্রহণ ছাড়াই ৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত সময় পরে ৮ লক্ষ টাকা নেয়া হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা মূলত সময়ের বিনিময়ে লাভ, যা শরী‘আতের দৃষ্টিতে ‘রিবা’ বা সূদের অন্তর্ভুক্ত। ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল- كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا ‘যে ঋণ কোন উপকার টেনে আনে, তা সূদ’। এখানে ৬ লক্ষ টাকা মূলত আমানত বা ঋণের মত ব্যবহৃত হচ্ছে, আর তার বিপরীতে অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা শর্তসাপেক্ষে প্রদান করা হচ্ছে। তাই এটি বৈধ ব্যবসায়িক লাভ নয়; বরং সূদভিত্তিক লেনদেনের সাদৃশ্য বহন করে। সঊদী আরবের শায়খগণও এ ধরনের লেনদেনকে হারাম বলেছেন। ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘যে ঋণের মধ্যে ঋণদাতার জন্য অতিরিক্ত সুবিধার শর্ত থাকে, তা জায়েয নয়। কারণ আলেমগণের ঐকমত্য হল- ঋণের বিনিময়ে শর্তযুক্ত উপকার গ্রহণ রিবা (সূদ)’। তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক ঋণ, যা কোন লাভ বা সুবিধা টেনে আনে, তা সূদের অন্তর্ভুক্ত। যদি তা শর্তযুক্ত বা পূর্বসম্মতও হয়’ (ফাতওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/৪২৬-৪২৭ পৃ.)।
মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ঋণ মূলত সহযোগিতা ও দয়ার চুক্তি। তাই এটিকে লাভ ও ব্যবসার মাধ্যমে পরিণত করা জায়েয নয়। এজন্য আলেমদের নিকট প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল- ‘প্রত্যেক ঋণ, যা কোন উপকার বয়ে আনে, তা রিবা’। তিনি উদাহরণ দিয়ে আরও বলেন, ‘যদি কেউ কাউকে ঋণ দেয় এবং শর্ত করে যে সে তার বাড়িতে থাকবে বা কোন সুবিধা নেবে, তাহলে তা হারাম; কারণ ঋণদাতা ঋণের মাধ্যমে লাভ গ্রহণ করছে’ (ফাতওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/৪২২-৪২৩; আশ-শারহুল মুমতি’, ৪/৬৪ পৃ.)। তবে যদি গুদাম কর্তৃপক্ষ ৬ লক্ষ টাকা নিরাপত্তা জামানত হিসাবে নেয় এবং আলু সংরক্ষণ না করলে ঠিক একই ৬ লক্ষ টাকা ফেরত দেয়, তাহলে তা বৈধ হবে। কারণ সেখানে অতিরিক্ত কোন আর্থিক সুবিধা নেই। আবার যদি আলু সংরক্ষণ করা হয় এবং সেই অর্থ ভাড়ার সমন্বয়ে ব্যবহৃত হয়, তাহলেও তা জায়েয হতে পারে; কারণ তা সেবার বিনিময়। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِيْنِهِ وَعِرْضِهِ ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৯)।
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, নয়নপুর, দিনাজপুর সদর।