উত্তর : একজন মানুষের জন্য যুলম থেকে বাঁচার চেষ্টা করা জায়েয, এতে তার কোন গুনাহ নেই। তবে তা বিদ্রোহ বা শাসকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিরোধিতার মাধ্যমে হওয়া যাবে না। বিদ্রোহ না করে যদি কেউ তাদের আরোপিত যুল্ম থেকে বাঁচার চেষ্টা করে- যেমন কোন ব্যক্তি তার কিছু সম্পদ গোপন রাখে, তাহলে এতে কোন অসুবিধা নেই। কারণ এটি যুল্ম থেকে আত্মরক্ষা করার অন্তর্ভুক্ত। আর এ ধরনের কাজে (কর বিভাগে) চাকরির ব্যাপারে বলব, যদি কোন ব্যক্তি সেখানে চাকরি করার মাধ্যমে যুল্ম কমানোর উদ্দেশ্য রাখে, তাহলে এতে কোন অসুবিধা নেই; বরং এ জন্য সে ছাওয়াবও পাবে। কিন্তু যদি সে সেখানে চাকরি করে এই যুল্ম বাস্তবায়ন করার জন্য এবং তা লাঘব করার কোন চেষ্টা না করে, তাহলে তা জায়েয নয়। কারণ যালিমকে তার যুল্মে সহযোগিতা করা বৈধ নয়’ (https://alathar.net/home/esound/index .php?op=codevi&coid=36155)।
শাইখ ফাযল মুরাদ বলেন, ‘রাষ্ট্র নাগরিকদের উপর কর (ট্যাক্স) আরোপ করতে পারে, যাতে কর থেকে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জনসেবা প্রদান করা যায়, যেমন রাস্তা নির্মাণ, হাসপাতাল ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। তবে এর জন্য একটি শর্ত রয়েছে, তা হল- রাষ্ট্রীয় কোষাগারে থাকা সব সম্পদ প্রথমে ব্যয় হয়ে যেতে হবে। কিন্তু যদি রাষ্ট্র নাগরিকদের উপর কোন প্রতিদান ছাড়াই কর আরোপ করে, অথবা কোষাগারে জনসেবামূলক কাজ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও তাদের উপর কর আরোপ করে, তাহলে তা শরী‘আতসম্মত নয়, বরং হারাম। এ ধরনের কর আদায়কারী ব্যক্তি কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। কেননা উক্ববাহ ইবনু আমীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘অবৈধভাবে কর আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (আহমাদ, হা/১৭২৯৪; আবূ দাঊদ, হা/২৯৩৭)।
এখানে ‘ছাহিবু মাকসীন’ বলতে কর আদায়কারীকে বোঝানো হয়েছে। ‘মাকসুন’ বলতে এমন কর ও অনুরূপ অর্থ বোঝায়, যা শরী‘আতসম্মত অধিকার ছাড়া মানুষের কাছ থেকে নেয়া হয়। তদ্রƒপ, প্রয়োজনের কারণে কর গ্রহণের বৈধতাও এ শর্তের সাথে সীমাবদ্ধ যে, সরকারী অর্থের অপচয় বা অপব্যবহার থাকবে না। আর কর বিভাগে চাকরির হুকুম কর আদায়ের প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে বিস্তারিত হল-
(১) যদি কর বিভাগ শরী‘আতের নীতিমালা মেনে চলে, মানুষের উপর অতিরিক্ত ও কষ্টকর করের বোঝা চাপিয়ে না দেয়, সংগৃহীত অর্থ জনসাধারণের কল্যাণে ব্যয় করে এবং রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য বা প্রয়োজন মেটানোর মত অর্থশূন্য থাকে, তাহলে সেখানে চাকরি করা জায়েয। তবে কর্মচারীকে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ হতে হবে, যুলম থেকে দূরে থাকতে হবে এবং এমন ঘুষ থেকে সতর্ক থাকতে হবে যা তাকে করের পরিমাণ কমিয়ে দিতে বা কর মওকুফ করে দিতে প্ররোচিত করে। এ অবস্থায় তার বেতন হালাল হবে এবং এতে কোন সমস্যা নেই।
(২) আর যদি রাষ্ট্র জনগণের উপর কোন যথাযথ প্রতিদান ছাড়াই কর আরোপ করে, অথবা কর বিভাগে কাজ শরী‘আতবিরোধী আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তাহলে এ ধরনের কর আদায় করা এবং এ কাজে চাকরি করা জায়েয নয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাক্বওয়ায় পরস্পরকে সহযোগিতা কর এবং মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে অত্যধিক কঠোর’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ২)। এ অবস্থায় প্রাপ্ত বেতন হারাম হবে। তাই তা মুসলিমদের কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে তা থেকে মুক্ত হওয়া (তাওবাহ স্বরূপ বর্জন করা) আবশ্যক। তবে অতীতে এই অর্থ থেকে কর্মচারী নিজের বা তার ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকা লোকদের প্রয়োজন পূরণ করে থাকলে, আমরা মনে করি না যে এ ব্যাপারে তার কোন গুনাহ হবে। কিন্তু বর্তমানে যা অবশিষ্ট আছে, তা পূর্বে বর্ণিত পদ্ধতিতে পরিত্যাগ করা আবশ্যক।
আমরা আরও মনে করি যে, যদি মানুষের কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে কাজ করা হয়, তাহলে কর হারাম হলেও কর বিভাগে চাকরি করার সুযোগ থাকতে পারে। এর ভিত্তি হল ফিক্বহের এই নীতিমালা- الضرر يزال ‘ক্ষতি দূর করতে হবে’ এবং এ নীতির অধীন অন্যান্য নীতিমালা, যেমন: الضرر يزال قدر الطاقة ‘সাধ্য অনুযায়ী ক্ষতি দূর করা হবে’ এবং الميسور لا يسقط بالمعسور ‘যা করা সম্ভব, তা কেবল অসম্ভব অংশের কারণে পরিত্যাগ করা যাবে না’। এ প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে এক সৈনিক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে চাকরি (সামরিক সেবা) ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। তিনি উত্তরে বলেন, ‘যদি তার মাধ্যমে মুসলিমদের উপকার সাধিত হয় এবং সে তা করতে সক্ষম হয়, তাহলে মুসলিমদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর কোন কারণ ছাড়া তার উচিত হবে না এ কাজ ছেড়ে দেয়া’। সুতরাং, যদি আমরা এ ধরনের উদ্দেশ্যে (অর্থাৎ মানুষের কষ্ট কমানোর জন্য) চাকরি করার অনুমতি দিই, তাহলে এর বিনিময়ে যে বেতন গ্রহণ করা হবে তা হালাল হবে। একইভাবে চাকরির আইনগত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যে প্রাপ্য সুবিধা বা ভাতা দেয়া হবে, তাও বৈধ হবে...’।
তবে এর জন্য পূর্বে আমরা যে শর্ত ও বিধিনিষেধগুলো উল্লেখ করেছি, সেগুলো মেনে চলা আবশ্যক। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য ৫৮১১ নম্বর এবং ১৮৭২৭ নম্বর ফাতাওয়া দেখুন (ফাযল মুরাদ, কিতাবুল ক্বাওয়া’ঈদিল উম্মি লিল-ফিক্বহি, পৃ. ৫০৫-৫০৬)।
প্রশ্নকারী : মুহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ।