উত্তর : মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর মর্যাদা ও নারীদের উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন, وَ اِذۡ قَالَتِ الۡمَلٰٓئِکَۃُ یٰمَرۡیَمُ اِنَّ اللّٰہَ اصۡطَفٰکِ وَ طَہَّرَکِ وَ اصۡطَفٰکِ عَلٰی نِسَآءِ الۡعٰلَمِیۡنَ ‘যখন ফেরেশতাগণ বলেছিলেন, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বজগতের নারীগণের উপর তোমাকে মনোনীত করেছেন’ (সূরা আলে ইমরান: ৪২)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মহান আল্লাহর বাণী: وَ اصۡطَفٰکِ عَلٰی نِسَآءِ الۡعٰلَمِیۡنَ ‘তোমাকে বিশ্বজগতের নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন’ এর অর্থ হতে পারে, তাঁর যুগের নারীদের উপর অর্থাৎ সমসাময়িকদের উপর। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, اِنِّی اصۡطَفَیۡتُکَ عَلَی النَّاسِ ‘আমি তোমাকে মানুষের উপর নির্বাচিত করেছি’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৪৪)। অনুরূপভাবে বানী ইসরাঈল সম্পর্কে বলেছেন, وَ لَقَدِ اخۡتَرۡنٰہُمۡ عَلٰی عِلۡمٍ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ‘আমি জেনে-বুঝেই তাদেরকে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম’ (সূরা আদ-দুখান : ৩২)। আর জানা কথা যে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আর মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁদের উভয়ের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অনুরূপভাবে, বানী ইসরাঈল ও অন্যান্যদের তুলনায়ও এই উম্মত পূর্ববর্তী সকল উম্মতের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, সংখ্যায় অধিক, জ্ঞানে উত্তম এবং আমলে অধিক পবিত্র। সুতরাং সাধারণভাবে গৃহীত বক্তব্য হল- মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) দুনিয়ার সকল নারীর উপর শ্রেষ্ঠ হবেন, যারা তাঁর আগে ছিল এবং যারা তাঁর পরে এসেছে (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া, ২/৭০ পৃ.)।
মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) ক্বিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বজগতের নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, শুধু তাঁর যুগের নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ব্যতিক্রম। আনাস বিন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
حَسْبُكَ مِنْ نِسَاءِ الْعَالَمِيْنَ مَرْيَمُ ابْنَةُ عِمْرَانَ وَخَدِيْجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ وَفَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ وَآسِيَةُ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ
‘বিশ্বজগতের নারীদের মধ্যে তোমার জন্য যথেষ্ট তথা শ্রেষ্ঠ হলেন মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ, মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা এবং ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া’ (তিরমিযী, হা/৩৮৭৮, সনদ ছহীহ)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘জান্নাতী নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ, মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা, মারইয়াম বিনতে ইমরান এবং ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম’ (নাসাঈ, সুনানুল কুবরা, হা/৮৩৫৫; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৫০৮)।
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বললেন, ‘তুমি কি আমাকে বলবে, যখন তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ঝুঁকে পড়েছিলে, তখন তুমি কেঁদেছিলে, তারপর আবার হাসলে, এর কারণ কী? ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, ‘তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি এই অসুস্থতার কারণেই ইন্তিকাল করবেন, তখন আমি কেঁদেছিলাম। তারপর আমি তাঁর কাছে ঝুঁকে পড়লে তিনি আমাকে জানালেন যে, আমি তাঁর পরিবারবর্গের মধ্যে সবার আগে তাঁর সঙ্গে মিলিত হব এবং আমি জান্নাতী নারীদের নেত্রী হব, মারইয়াম বিনতে ইমরান ব্যতীত। তখন আমি হাসলাম’। এই হাদীছটির মূল অংশ ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী ছহীহ। এতে বুঝা যায় যে, উল্লিখিত চারজন নারীর মধ্যে মারইয়াম ও ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এই দু’জনই সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, فَاطِمَةُ سَيِّدَةُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ إِلَّا مَا كَانَ مِنْ مَرْيَمَ بِنْتِ عِمْرَانَ ‘ফাতিমা জান্নাতবাসী নারীদের নেত্রী, তবে মারইয়াম বিনতে ইমরান ব্যতীত’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৭৭৩, সনদ হাসান)।
মূল কথা হল- এই বর্ণনাগুলো নির্দেশ করে যে, মারইয়াম ও ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এই চারজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এরপর ‘ব্যতিক্রম’ (إلا) শব্দটি থেকে দু’টি সম্ভাবনা বোঝা যায়। যেমন: (১) মারইয়াম ফাতিমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং (২) উভয়েই মর্যাদায় সমান। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ২/৭২-৭৩ পৃ.)।
অতএব মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) সর্বাবস্থায়ই সকল নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সুতরাং আয়াতটি তার সাধারণ অর্থেই প্রযোজ্য। তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ক্ষেত্রে দু’টি সম্ভাবনা রয়েছে। আর তাহল- মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ অথবা উভয়েই মর্যাদায় সমান (বিস্তারিত দ্র.: ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়েমাহ, ২/৪৬৯-৪৭৩ পৃ, ফৎওয়া নং ২০৫৩০)।
প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বী, বরিশাল।