উত্তর : প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হল নির্জনে, গোপনে ও রাতের অন্ধকারে পাপ করা থেকে সতর্ক থাকা। আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে নিন্দা করেছেন, যারা মানুষের কাছ থেকে দূ পাপ গোপন করে, কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে গোপন করে না। তিনি বলেন, ‘তারা মানুষ থেকে (পাপ) গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি তাদের সঙ্গেই আছেন, যখন তারা রাতের অন্ধকারে এমন কথার পরিকল্পনা করে যা তিনি পসন্দ করেন না’ (সূরা আন-নিসা : ১০৮)।
নবী (ﷺ) গোপন পাপ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, আমি আমার উম্মতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি যারা ক্বিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পাহাড় সমতুল্য নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে। মহান আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, ‘তারা তোমাদেরই ভাই এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ের মধ্যে জড়িয়ে পড়বে’ (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৪৫; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৫০৫)। হাফিয ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘সাবধান! সাবধান! গুনাহ থেকে বিশেষ করে নির্জনতার গুনাহ থেকে। কারণ আল্লাহ তা‘আলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ বান্দাকে তাঁর দৃষ্টিতে পতিত করে। তোমার গোপন অবস্থাকে তাঁর সাথে সংশোধন কর, তাহলে তিনি তোমার প্রকাশ্য অবস্থাও ঠিক করে দেবেন’ (সাইদুল খাত্বীর, পৃ. ২০৭)।
তাই কোন ব্যক্তি গুনাহ ও পাপে জড়িত থাকলে দ্রুত তাওবাহ ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে ফিরে আসতে হবে (সূরা আয-যুমার : ৫৩)। আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ মন্দ কাজ করে বা নিজের উপর যুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় , সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু হিসাবে পাবে’ (সূরা আন-নিসা : ১১০)। আল্লাহ তা‘আলা বান্দার তাওবায় অত্যন্ত আনন্দিত হন (ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৭)।
গোপন পাপ থেকে বাঁচার উপায়। যথা: (১) আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করা, যেন তিনি তাকে গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে রক্ষা করেন (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৬)। (২) নিজের নাফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা, কুমন্ত্রণা প্রতিহত করা এবং আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা (সূরা আশ-শামস : ৭-১০; সূরা আল-আনকাবূত : ৬৯)। (৩) পূর্বে বর্ণিত ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীছে যে কঠোর শাস্তির সতর্কবার্তা এসেছে, তা গভীরভাবে চিন্তা করা এবং ভয় করা, যেন তা নির্জনে গুনাহকারী ব্যক্তির উপর প্রযোজ্য না হয় (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৪৫)। (৪) সর্বদা আল্লাহর নজরদারি অনুভব করা। সর্বদা এই অনুভূতি রাখা যে, আল্লাহ তা‘আলা সব সময় পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সবকিছু অবগত আছেন। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি কখনও কখনও এই দু’টি পঙক্তি আবৃত্তি করতেন:
إذَا مَا خَلَوتَ الدهْرَ يَومًا فَلا تَقُل ... خَلَوتُ وَلكن قُل عَليّ رَقيب
وَلا تَحْسَبَن الله يَغْفُل ساعةً ... وَلا أن مَا يَخْفى عَلَيْه يَغيب
‘যখন তুমি কোন দিন একান্তে থাকো, তখন বলো না আমি একা আছি বরং বল, আমার উপর একজন পর্যবেক্ষক আছেন’। ‘কখনো মনে কর না যে, আল্লাহ এক মুহূর্তের জন্যও গাফিল, আর যা গোপন, তা তাঁর অগোচর নয়’ (তাফসীরে ইবনু কাছীর, ৬/২১৯ পৃ.)।
(৫) কল্পনা করা, যাদেরকে সে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে, তারা যদি তাকে সেই গুনাহ করতে দেখত! এবং আল্লাহর সামনে লজ্জাবোধ করা মানুষের সামনে লজ্জার চেয়েও বেশি হওয়া উচিত। হাদীছে নবী (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর সামনে এমনভাবে লজ্জা কর, যেমন তোমরা নিজেদের পরিবারের কোন সম্মানিত ব্যক্তির সামনে লজ্জা কর’ (সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩৫৫৯, সনদ ছহীহ)। (৬) মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। যদি সে গুনাহরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে সে কীভাবে তার রবের সামনে উপস্থিত হবে? (৭) আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নেক বান্দাদের জন্য যে জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন, যার প্রস্থ আসমান ও যমীনের সমানÑতা স্মরণ করা এবং আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে ব্যক্তিকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, সে কি উত্তম, না-কি সেই ব্যক্তি উত্তম, যে ক্বিয়ামতের দিন নিরাপদ অবস্থায় উপস্থিত হবে?’ (সূরা আল-ফুছছিলাত : ৪০; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১৩৪২১১, ২২৫৮৭৫, ২৮৭৭৪৬)।
প্রশ্নকারী : গোলাম রাব্বী, বরিশাল।